Category Archives: Life

এই মুহুর্ত

সেদিন বিকেলে আমার ছেলে ইলনকে নিয়ে বাসার পাশের এস্টোরিয়া পার্কে খেলছিলাম। ইস্ট নদীর পাড়ে চমৎকার ছোট একটা পার্ক। নদীর ওপারে ম্যানহাটানের উঁচু উঁচু বিল্ডিং গুলোর ফাঁকে গ্রীষ্মের অলস বিকেলের সূর্যের লাল আলোকছটার ঝলকানি এক মায়াময় অপার্থিব রূপের সৃষ্টি করেছে। পার্কের লম্বা লম্বা গাছগুলোর কচকচে সবুজ পাতার ফাঁক গলে আসা শেষ বিকেলের মিষ্টি নরম আলোতে প্লে-গ্রাউন্ডে ছুটোছুটি করা ছেলে-মেয়েগুলোকে স্বর্গ থেকে নেমে আসা দেবশিশুর দল মনে হচ্ছিল।
ছেলেটি আমার দেখতে দেখতে প্রায় চার বছর হয়ে গেল। এই সেদিন ও জন্মালো, মায়ের পেট থেকে বের করে নার্স ওকে একটা প্লাস্টিকের বিনে রাখলো। ও নবজাতকের তারস্বরে দেওয়া কান্না শুরু করলো। আমি ভয়ে ভয়ে নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি ওকে একটু ধরতে পারি?” নার্স হালকা হেসে বললো, “অবশ্যই!” আমি ওর তুলতুলে নরম শরীর স্পর্শ করলাম।
সেই ছেলে এখন – ওর জন্মের চার বছর পর – এস্টোরিয়া পার্কে সাইকেল চালিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে!
আর ঠিক তখনি আমার মনে হলোঃ এই পার্ক, এই বিকেল, এই শিশুদের কলকলানি, ইস্ট নদীর উপর দিয়ে বয়ে আসা মিষ্টি নরম হাওয়া, ম্যানহাটানের এম্পায়ার এস্টেট বিল্ডিং এর ওপারে অস্তায়মান সূর্য – এ সবই জীবন।
ইলন একদিন বড় হবে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, কতো রকম দেশের কতো রকম মানুষের সাথে মিশবে, বন্ধুত্ব পাতাবে, সম্পর্কে জড়াবে, কোন একটা পেশা বেছে নিবে জীবিকার জন্যে, কিন্তু সেই অজানা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ কিন্তু ওর জীবন নয়। ওর জীবন হচ্ছে এখন, এই মুহুর্ত! এই যে ও সাইকেল চালাচ্ছে, স্কুটার চালাচ্ছে, ছুটাছুটি করছে, এটাই ওর জীবন।
একইভাবে আমার জন্যেও কথাটা সত্যি। কে জানে আগামীকাল কী হবে, আগামী বছর কী হবে? গতকাল কিংবা গত বছর যা ঘটেছে সেটারও এখন আর স্মৃতি ছাড়া কোথাও অস্তিত্ব নাই। তাহলে এই যে আমি বেঁচে আছি, এই যে একটা জীবন যাপন করছি, সেটা তো এই বর্তমান ছাড়া আর কিছুই না, তাই না?
আমার কাজের জন্যে আমাকে এখনো ছাত্র অবস্থার চেয়ে বেশি পড়ালেখা করতে হয়। কম্পিউটার আর ইন্টারনেট এর জগতে কিছুদিন পরপর নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে, সারা পৃথিবীর মেধাবী ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয় আর টেক ইন্ডাস্ট্রি জুড়ে সেই বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও চেষ্টা করি যাতে নতুন আসা কিছু প্রযুক্তির সাথে পরিচিত থাকতে। ডিস্ট্রিবিউটেড সিস্টেম, মেশিন লার্নিং, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং, গালভরা সব নাম! ইন্টারনেট আর নানা বইপত্র ঘেঁটে এসব প্রযুক্তি শেখার চেষ্টা করি। স্বপ্ন দেখি একদিন খুব ভালো একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হবো…
কিন্তু এই চেষ্টা আর স্বপ্ন দেখার মাঝেই হারিয়ে যায় জীবন! যখন আমাদের ফোকাস হয় শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ, তখন আমরা আর বর্তমানে জীবন যাপন করি না, আমরা একটা ঘোরের মাঝে হারিয়ে যাই! এবং বেশির ভাগ সময়সময়ই এর ফল খুব একটা ভালো হয়না। ভবিষ্যতের আশায় আশায় জীবন কাটিয়ে দেওয়া মানে জীবন কোন ফাঁকে চলে গেল সেটা টের না পাওয়া!
সে জন্যেই বলা হয় – জীবন একটা ভ্রমণ, গন্তব্য নয়!
জীবন হচ্ছে প্রতিদিন অফিসে যাওয়া, সারাদিন খেটে কাজ করা, কাজ শেষে বাসায় ফিরে আসা। জীবন মানে শুধু মাস শেষে বেতন পাওয়া নয়।
এই যে আমরা ফেইসবুকে লাইক দিই, কমেন্ট করি, বাদানুবাদ করি, নিজের সুখের প্রচার করি, এটাই জীবন। প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধবের সাথে কাটিয়ে দেয়া মুহুর্তগুলিই জীবন।
আলবার্ট কামু “দি মিথ অফ সিসিফাস” রচনায় সিসিফাস, যে কিনা দেবতাদের দ্বারা দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে অনন্তকালের জন্যে ভারী পাথর পাহাড়ে উঠিয়ে চলেছে, সম্পর্কে বলেছিলেন “আমাদেরকে মানতে হবে যে সিসিফাস একজন সুখী মানুষ”। সিসিফাসের কাছে জীবন হচ্ছে সেই ভারী পাথরটি আর সেই পাহাড়টি, যে পাহাড়ের উপর ঠেলে ঠেলে সিসিফাস ভারী পাথরটি উঠায়। পাথরটি গড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের পাদদেশে, সিসিফাস আবার সেটি ঠেলে ঠেলে উপরে উঠায়। কামু’র মতে সিসিফাস একজন সুখী মানুষ। সিসিফাস জীবনকে বেছে নিয়েছে, মরণকে নয়, সে বেঁচে আছে, কাজ যাই হোক, সে তার কাজ করে যাচ্ছে নিরন্তর।
সিসিফাসের মতোই আমরা প্রত্যেকে আমাদের যার যার জীবনের পাথর ঠেলে চলেছি প্রতিদিন। বাসায় কিংবা অফিসে, মাঠে কিংবা কলকারখানায়, রাস্তায় কিংবা হাটে, এক কিংবা অন্য মানুষের সাথে, প্রতিদিন আমরা কিছু না কিছু করে চলেছি। এই “কিছু না কিছু করা” কাজগুলোর বেশির ভাগেরই একটা ভবিষ্যৎ লক্ষ্য আছে। হয়তো আপনি আপনার ছেলেমেয়েদের জন্যে কাজ করছেন যাতে ওদের একটা চমৎকার নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি হয়, কিংবা হয়তো নিজের রিটায়ারমেন্ট এর জন্যে টাকা জমাচ্ছেন, কিংবা একটা স্কুল বানাচ্ছেন, কিংবা মাস শেষে টাকা পাওয়ার জন্যে একটা কোম্পানিতে কাজ করছেন। যাই করেন না কেন এই প্রতিটা দিনের সমষ্টিই কিন্তু আপনার জীবন।
একদিন হয়তো আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করবো, অর্থ-বিত্ত, খ্যাতি, মানুষের ভালোবাসা সম্মান পাবো, দেশের জন্যে কিছু করতে পারবো, পৃথিবীর জন্যে কিছু করতে পারবো, কিন্তু সেই একদিন কিন্তু ভবিষ্যতের একদিন! ভবিষ্যৎ মানেই অজানা এবং অনিশ্চিত। এমনকি নিশ্চিত ভবিষ্যতেরও কিন্তু এখনো অস্তিত্ব নাই। আমি যদি দশ বছর ধরে কোন কিছুর জন্যে কাজ করে যাই তাহলে একদিন নিশ্চিত ফল পেলেও আমার জীবন থেকে কিন্তু দশ বছর চলে গেল! ওই দশ বছরের প্রতিটি দিন ছিল আমার জীবন। দশ বছরের শেষে যেদিন আমার স্বপ্ন পূরণ হলো সেদিন যেমন আমার জীবনের অংশ, এর আগের দশ বছেরের প্রতিটি দিনও তেমনিভাবে আমার জীবনের অংশ ছিল।
যে কারণেই হোক আমার মধ্যে সবসময় “কিছু একটার পেছনে ছোটা”র অভ্যাস ছিল। আমি ভুলে যেতাম যে ছুটতে ছুটতে আমি জীবনকে হারিয়ে ফেলছিলাম। স্বপ্ন পূরণ যেমন জীবনের অংশ, সেই স্বপ্নের পেছনে ছোটাটাও জীবনের একটা অংশ। দুটোকেই সমানভাবে উপভোগ করতে হবে। সম্প্রতি এই উপলব্ধি হওয়ার পর থেকে চেষ্টা করছি প্রতি দিন, প্রতি মুহুর্তকে উপভোগ করার জন্যে, এপ্রিশিয়েট করার জন্যে, বর্তমান মুহুর্তের প্রতি চোখ কান খোলা রাখার জন্যে।
কারণ, এই মুহুর্তই জীবন। জীবন ঘটে চলেছে।
Advertisements

ভাগ্য

আমি এক সময় বিশ্বাস করতাম ভাগ্য বলে কিছু নাই, আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে তার প্রত্যেকটি ঘটনার জন্যেই শুধুমাত্র আমরাই দায়ী। জীবনে খুব ভালো করতে হলে আমাদেরকে জাস্ট সময় নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হবে এবং এক সময় না এক সময় আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেয়ে যাবো।

সম্প্রতি ভাগ্য নিয়ে আমার চিন্তা-ভাবনায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আমি এখনো বিশ্বাস করি জীবনে খুব ভালো করতে হলে আমাদেরকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, কিন্তু মানুষের জীবনে ভাগ্যের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। আমি এখানে লটারি জেতা টাইপের ভাগ্যের কথা বলছিনা, আমি বলছি আমাদের জীবন-যাপনের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ্য যেভাবে আমাদেরকে প্রভাবিত করে সেটার কথা। আমাদের জীবনের একটা বিরাট অংশের উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই!

কারো জন্মের কথাই ধরুণ। কোন দেশে তার জন্ম হচ্ছে সেটার উপর নির্ভর করে অনেক কিছু। ২০১৫ সালের জাতিসঙ্ঘের হিসেবে সিয়েরা লিওনের শিশু মৃত্যুর হার শতকরা প্রায় দশ ভাগ। মানে জন্ম নেওয়া প্রতি একশ শিশুর মধ্যে দশটি শিশু তাদের প্রথম জন্মদিন পালন করার আগেই মারা যাবে! যেখানে উন্নত বিশ্বে প্রায় সব দেশেই এই হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। তাহলে সিয়েরা লিওনের মতো দরিদ্র দেশগুলোর জন্মের সময় বা তার পরপরেই শিশুগুলোর মারা যাওয়ার এই দায় কার? বেঁচে থাকলে হয়তো ওরা বড় রাজনীতিবিদ হতে পারতো, বিজ্ঞানী হতে পারতো! কে জানে!

ভালো গ্রেইড পাওয়ার জন্যে ভালো করে লেখা পড়া করা যায়, ভালো খেলোয়াড় হতে হলে খুব ভালো কোচের অধীনে বছরের পর বছর অনুশীলন করা যায়, কিন্তু আমাদের জন্মের সময় কেমন পরিবারে জন্ম হবে আমাদের সেটা আমরা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবো? কারো বাবা-মা কেমন হবে, তারা কি নিজেদের মধ্যে কুৎসিতভাবে ঝগড়াঝাঁটি করবে নাকি চমৎকারভাবে তাদের সন্তানদেরকে মানুষ করবে? যে পরিবারে তার জন্ম হবে সেই পরিবারের আর্থিক স্বাচ্ছল্য না থাকলে তারা কিভাবে ছেলেমেয়েদের বড় করবে? পরিবারের সদস্যদের যদি সবচেয়ে বড় চিন্তা থাকে যে ঘরে চাল আসবে কিভাবে, কিংবা আগামী মাসের বাড়িভাড়া আসবে কোত্থেকে তাহলে সেই পরিবারের ছেলেমেয়েরা ক্যালকুলাস এর অঙ্ক কিভাবে সল্ভ করবে? কিংবা কিভাবে ক্রিকেট বা ফুটবল বা দাবা খেলা প্র্যাকটিস করবে?

সন্তান যখন মায়ের পেটে থাকে তখন মা’র খাবার থেকে সন্তান পুষ্টি পায়, মা মানসিক চাপ বা রোগে থাকলে সেটা সন্তানকে প্রভাবিত করে, সন্তান বড় হলে তারও অপুষ্টি বা মানসিক সমস্যার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একটা শিশু মায়ের পেটে থাকা- কালীন সময়ে এভাবে মায়ের অসুখ বা অপুষ্টি নিজের ভেতরে নিয়ে নিলে বড় হয়ে যাওয়ার পর সেটা থেকে বের হয়ে আসার সম্ভাবনা খুবই কম।

আরেকটা গুরুত্মপূর্ণ ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে একজনের জন্ম কোন দেশে হচ্ছে সেই ব্যাপারটি। আমার জন্ম যদি বুরুন্ডি বা রোয়ান্ডায় হতো তাহলে এতদিনে হয়তো আমি শিশুযোদ্ধা হয়ে গৃহযুদ্ধে কয়েকশ মানুষকে মেরে ফেলতাম কিংবা নিজে আরেক শিশু-যোদ্ধার গুলিতে কিংবা রামদা’র কোপে মরে যেতাম। আবার একজনের জন্ম বাংলাদেশে হচ্ছে নাকি সুইজারল্যান্ডে হচ্ছে সেটার উপর নির্ভর করে সে কী ধরণের সামাজিক নিয়ম-কানুনের মধ্যে বড় হবে, কী ধরণের রাজনৈতিক পরিবেশ দেখে বড়ো হবে, কতোটুকু দুর্নীতি-সন্ত্রাস দেখে বড় হবে। প্রত্যেক ধরণের পরিবেশের নিজস্ব প্রভাব আছে মানুষের বড় হওয়ার উপর।

দেশের উপর নির্ভর করে শিক্ষা ব্যবস্থা, নারীদের নিরাপত্তা এবং অধিকার, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং অধিকার, ইত্যাদি। একটা মেয়ে কি রাত দশ’টার সময় শিস দিতে দিতে বাসায় ফিরতে পারবে নাকি ফেরার পথে গুন্ডা-বদমাশ (কিংবা পুলিশ?) এর হাতে নিগৃহীত হবে সেটাও নির্ভর করে সে কোন দেশে জন্ম নিয়েছে তার উপর।

জন্ম ছাড়াও আরো অনেক ধরণের ভাগ্যের ব্যাপার আছে। অনেক মানুষ আছে যারা অল্প সময় ঘুমিয়ে সারাদিন ফুরফুরা মেজাজে কাজ করে যেতে পারে। আপনার আমার যেখানে আট-নয় ঘণ্টা ঘুমিয়েও সারাদিন গা ম্যাজ-ম্যাজ করে সেখানে এইসব মানুষেরা মাত্র পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েও অনায়াসে কাজ চালিয়ে নিতে পারে। এই মানুষেরা জেনেটিক-ভাবেই কম ঘুমের জন্যে তৈরি হয়ে থাকে। বাড়তি সময়টা কাজে লাগিয়ে তারা আমাদের মতো আমজনতার চেয়ে অনেক এগিয়ে যেতে পারে!

অনেকে জন্ম নেয় একটা চমৎকার ইমিউন সিস্টেম (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) নিয়ে। ঠান্ডা-সর্দি-জ্বর তাদের সহজে কাবু করতে পারেনা। আর যাদের এর উল্টোটা হয় তাদের প্রায় সারা বছরই সর্দি, কাশি, হাঁচি, ইত্যাদি লেগে থাকে; সামান্য ঠাণ্ডা লাগলে বা ধুলা লাগলে শরীর খারাপ হয়ে যায়।

মানুষের লম্বা হওয়াটাও একটা মোটামুটি ভাগ্যের (জেনেটিক্স) এর ব্যাপার। লম্বা মানুষেরা সাধারণত বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে লম্বা মানুষেরা সাধারণত খাটো মানুষদের থেকে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়। আর আত্মবিশ্বাস না থাকলে জীবনে উন্নতি করা প্রায় অসম্ভব!

রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে কতো মেয়ের শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে কে জানে!

আরেকটা ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে একটা মানুষের জন্ম কোন সময়টাতে হয়েছে সেটার উপর। একটা মোটামুটি সাম্প্রতিক উদাহরণ দিই –  আশি-নব্বই দশকের কমিপিউটার বিপ্লব, নব্বই-দুই হাজার দশকের ইন্টারনেট বিপ্লব, আর দুই হাজার দশ দশকের মোবাইল বিল্পব – এই সময়গুলোতে যারা তরুণ ছিলো এবং এই প্রযুক্তি-গুলো আয়ত্ব করেছে, তারা এখন অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। অন্যরা পরে এসে যতোই চেষ্টা করুক না কেন যারা ইতিমধ্যে এগিয়ে গিয়েছে তাদের ধরাটা এখন অনেক কঠিন হবে। প্রথম দলটি শুধুমাত্র তাদের জন্ম সময়ের কারণেই এই সুবিধাটা লাভ করেছে।

উপরে যে উদাহরণগুলোতে ভাগ্যের ব্যাপারটা মোটামুটি পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। কিন্তু ভাগ্য আরো সুক্ষ্মভাবেও কাজ করে থাকে!

ধরুণ আমাদের সাস্টের বা বুয়েটের একটা টিম এর সদস্যরা প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট এর জন্যে একেবারে কলেজ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। ভার্সিটির থার্ড/ফোর্থ ইয়ারে উঠতে উঠতে ওদের প্রায় চার-পাঁচ বছরের ভালো প্রোগ্রামিং অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। তো ধরুণ ওরা একটা অনলাইন কন্টেস্টে অংশ নিচ্ছে বুয়েট বা সাস্ট এর ল্যাব রুম থেকে। ওরা কন্টেস্টটা করছে পৃথিবীর সেরা প্রোগ্রামিং দলগুলের সাথে, যারা রাশিয়া, চায়না, ইউরোপ, আমেরিকা থেকে অংশ নিচ্ছে। যদি আমরা ধরেও নিই আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রোগ্রামিং দক্ষতা অন্য দেশগুলোর বেশিরভাগের চেয়ে ভালো, আমাদের দেশের বিদ্যমান অন্য সব সমস্যার কারণে ওদের এই যোগ্যতা দিয়েও ওরা প্রত্যাশিত ফল নাও পেতে পারে। যেমন, ওরা যখন প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে অংশ নেওয়ার জন্যে বাসা থেকে রওয়ানা দিয়েছে, তখন ওদের অনেকেরই হয়তো গাড়ি থাকবে না। প্রচণ্ড কাঠফাটা রোদে ওরা হয়তো সিএনজি বা রিকশার জন্যে আধা ঘন্টা-এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে এরপর রিকশা বা সিএনজি পাবে। এরপর প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে কন্টেস্ট ভেন্যুতে আসতে আসতে ওদের উপর এক ধরণের মনস্তাত্বিক চাপ (Stress) পড়ে যাবে। এখন ওদের যোগ্যতা যতোই ভালো হোক না কেন, এই অযাচিত স্ট্রেস এর কারণে ওদের ফলাফল স্বাভাবিক এর চেয়ে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ইউরোপ আমেরিকার প্রতিযোগীরা হয়তো নিজস্ব গাড়ি বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ধরে গুন গুন গান গাইতে গাইতে তাদের ল্যাবে এসে কন্টেস্ট করছে!

এরকম পরোক্ষভাবে ভাগ্যের কাজ করার আরো উদাহরণ আছে। কিছু জিনিস সরাসরি বুঝা যায় না, কিন্তু খুবই সূক্ষ্মভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে।

ধরুণ বাংলাদেশের কোন একটা দল বিদেশে খেলতে গেছে। এই দলটি খুবই  ভালো খেলে, তাদের একাধিক বিদেশী কোচ আছে, খেলোয়াড়দের প্রত্যেকেই মাসে লাখ লাখ টাকা বেতন পায়। যেকোন খেলারই একটা বড় অংশ হচ্ছে মনস্তাত্বিক। আমাদের খেলোয়াড়রা তাদের খেলায় যথেষ্ট ভালো হলেও তাদের মানসিক অবস্থার উপর নির্ভর করে তারা তাদের দক্ষতার কতোটুকু ঢেলে দিতে পারবে। আমাদের বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে তাদের মানসিক অবস্থা তাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, কিংবা দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ঘটনাবলী দ্বারা নেগেটিভভাবে প্রভাবিত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি অন্য দেশের প্রতিযোগীদের চেয়ে। কোন খেলোয়াড়ের হয়তো মা’র শরীর খারাপ ছিল, হাসপাতালে নেওয়ার পর ধর্মঘটের কারণে ওর মা’র চিকিৎসা হচ্ছে না। আরেকজনের হয়তো ভাই অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীর হাতে পড়ে ছুরির আঘাত পেয়েছে। কিংবা পরিবারের কারো কিছু না হোক, দেশে হরতালকারীরা কোথাও জ্বালাও-পোড়াও করে হয়তো কয়েকজনকে মেরে ফেলেছে। এ ধরণের যেকোন নেগেটিভ খবরে আমাদের খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতি পভাবিত হতে বাধ্য। অন্যদিকে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা হয়তো আগের দিন তাদের গার্লফ্রেন্ডদের সাথে সারা বিকাল আর সন্ধ্যা ঘোরাঘুরি করে ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে হোটেলে ফিরে এসেছে!

আমাদের মা-বাবা’রা সারা জীবন মেয়েদের সাথে কথা বলাটা বারণ করে এসে বিয়ের বয়স হলে বলে “কিরে তুই মেয়েদের সাথে কথা বলতে পারিস না কেন?” সমাজে ছেলে-মেয়েদের মেলা-মেশার মধ্যে কঠোর কারফিউ জারি থাকার ফলে আমাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিপরীত লিঙের মানুষের মনস্তত্ব বোঝাটা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মাথা উঁচু করে পরিষ্কার গলায় কথা বলাটা খুব একটা ভালো চোখে দেখা হয়না। সব সময় একটা পুতু পুতু শ্রদ্ধা-শ্রদ্ধা ভাব না থাকলে মনে করা হয় বেয়াদবি করছে। এ কারণেই বিদেশে এসে আমারা টেকনিক্যালি ভালো করলেও প্রতিষ্ঠানের উপরের লেভেল উঠতে পারি না। দশজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে পরিষ্কারভাবে কথা বলতে গেলে আমাদের গলা শুকিয়ে যায়। বাংলাদেশের রেডিও-টিভিতে কারো সাক্ষাৎকার নিলে খুব মনোযোগ দিয়ে তার কথাগুলো শুনবেন। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি প্রতি দশজনের মধ্যে নয় জন মানুষই একটা বাক্য ঠিকভাবে সুন্দর করে পরিষ্কারভাবে বলতে পারে না। উচ্চারণের কথা বাদই  দিলাম, মনের ভাব প্রকাশ করার জন্যে যেসব শব্দ ব্যবহার করা দরকার সেগুলোই আমরা অন্যের সামনে বলার সময় ভুলে যাই! রাজনীতিবিদ বলেন, সরকারী কর্মকর্তা বলেন, রাস্তার পথচারী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী বলেন – সবারই এই অবস্থা।

আমি আমাদের সমালোচনার জন্যে এই কথাগুলো বলছিনা। আমি বলছি আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থায় জন্ম নেওয়ার এবং বড় হওয়ার কারণে আমরা অনেক কিছুতে ভয়াবহ রকমের পিছিয়ে আছি। এবং অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন চেষ্টা করেও অনেক দোষ-ত্রুটি থেকে আর বের হওয়া যায় না।

***

উপরের আলোচনার পর মনে হতে পারে বুঝি আমাদের কোন আশা নাই। জন্মের স্থানের কারণে আমরা বুঝি সারা জীবনের জন্যে পিছিয়ে গেলাম!

না, জন্মের কারণে আমাদের সারা জীবনের জন্যে পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্ভাবনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জীবনে সফলও হওয়া যায়! জীবনে ভাগ্যের প্রভাব আছে – খুব বেশিই আছে – কিন্তু জীবনে কঠোর পরিশ্রমের প্রভাবও  আছে। এবং খুব বেশি রকমই আছে।

আগামী পর্বে সেটা নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা থাকলো।

কাছের মানুষগুলো

আমেরিকান লেখক এবং মোটিভেশনাল বক্তা জিম রন (http://en.wikipedia.org/wiki/Jim_Rohn) একটা চমৎকার কথা বলেছিলেনঃ “যে পাঁচ জন মানুষের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান আপনি সেই পাঁচজন মানুষের গড় (You are the average of the five people you spend the most time with.)”। এর মানে হচ্ছে আপনার বুদ্ধি হচ্ছে আপনার সবচেয়ে কাছের পাঁচ জন মানুষের গড় বুদ্ধির সমান। কথাটার মানে অবশ্য শুধু বুদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় – মানুষের চিন্তা-ভাবনার অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই কথাটা খাটে (যেমন রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি ব্যাপারে আমরা কাছাকাছি ভাবনার মানুষের সাথেই বেশি মিশে – আওয়ামীলীগ-মনা মানুষ আওয়ামীলীগারদের সাথে মিশে বেশি, বিএনপি-মনারা বিএনপি সমর্থকদের সাথে মিশে বেশি, রাজাকার এর ছানারা অন্য রাজাকার ছানাদের সাথে বেশি মিশে, হেফাজতপন্থীরা অন্য তালেবানী কাঠমোল্লাদের সাথে মিশে, ইত্যাদি ইত্যাদি)।

কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার দরকার নেই, তবে এটা বাস্তবতার প্রায় কাছাকাছি একটা সত্যি কথা! আমরা যাদের সাথে আমাদের জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটাই – আমাদের পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, অফিসের সহকর্মী – তাদের দ্বারা আমরা সব সময়ই প্রভাবিত হতে থাকি। যার সাথে যতো বেশি সময় কাটাবো তার দ্বারা ততো বেশি প্রভাবিত হবো। প্রভাব অবশ্য উভয় দিকেই যায় – আপনি প্রভাবিত হওয়ার পাশাপাশি আপনিও অন্যজনকে প্রভাবিত করবেন। তবে যার ব্যক্তিত্ব বেশি দৃঢ় তিনি বেশি প্রভাবিত করতে পারেন অন্যদেরকে।

এই কারণে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিখ্যাত প্রযুক্তি কম্পানী, সিলিকন ভ্যালী ইত্যাদি জায়গায় বুদ্ধিমান, সৃজনশীল মানুষের আনাগোনা বেশি। একবার কোনো কারণে স্মার্ট, ট্যালেন্টেড মানুষের সমাগম শুরু হলে সেখানে তাদের কারণে আরো বেশি স্মার্ট এবং ট্যালেন্টেড মানুষের আসা শুরু হয়। এইভাবে একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সিলিকন ভ্যালী’র মতো জায়গা গড়ে উঠে।

গুগল, ফেইসবুকের মতো বড় বড় টেক কম্পানীগুলোর নতুন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নেওয়ার সময় একটা লক্ষ্য থাকে নতুন ইঞ্জিনিয়ারের মেধা এবং দক্ষতা যাতে কম্পানীর গড় মেধা এবং দক্ষতার চেয়ে বেশি হয়। এভাবে এক এক জন নতুন ইঞ্জিনিয়ার নেওয়ার মাধ্যমে কম্পানীর ওভারঅল মেধা এবং দক্ষতা বাড়তে থাকে।

আমরা মানুষেরা সাধারণত প্রশংসার কাঙ্গাল (ফেইসবুকের লাইক বাটন উঠে গেলে আমাদের স্ট্যাটাসের সংখ্যা দশ ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে বলে আমার ধারণা!)। এটা দোষের কিছু নয় – প্রশংসা আমাদেরকে ভালো কিছু করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু প্রশংসার পাশাপাশি আমাদেরকে সমালোচনা গ্রহণ করার জন্যেও প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু আমরা প্রশংসার জন্যে যতোটা উদগ্রীব সমালোচনা শোনারা জন্যে আমরা প্রায়ই ততোটা প্রস্তুত থাকিনা। কিন্তু আমাদের বুদ্ধি, মেধা, এবং সৃজনশীলতার উন্নতি ঘটাতে হলে প্রশংসার চেয়ে সমালোচনা (গঠনমূলক সমালোচনা – নির্বিচার গালাগালি নয়!) বেশি জরুরী। আমরা যখন আমাদেরকে কম চিন্তাশীল, গাধা টাইপের মানুষ দিয়ে ঘিরে রাখি তখন আমরা প্রচুর প্রশংসা শুনতে পাই। কিন্তু আমরা যতোই মেধাবী, স্মার্ট, এবং সৃজনশীল মানুষ দিয়ে নিজেদের ঘিরে রাখবো ততোই আমাদের চিন্তার এবং কাজের সমালোচনা বাড়তে থাকবে। এবং এই সমালোচনার মাধ্যমেই আমাদের চিন্তা এবং কাজের মান আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে। আর মানুষ হিসেবেও আমরা চমৎকার মানুষ হয়ে উঠতে থাকবো।

কেউ এক গাদা প্রশংসা করলেই সে আমার খুব ভালো বন্ধু, আর কেউ আমার কোনো একটা ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিলে সে আমার বন্ধু নয় – এই ধরণের সস্তা টাইপের চিন্তা করলে কোনো দিন নিজের ব্যক্তিগত উন্নতি সাধন করা যাবে না।

কাছের প্রিয় মানুষগুলোর ভালো হওয়া জরুরী, স্মার্ট এবং সৃজনশীল হলে আরো ভালো। কিন্তু আপনি যদি শুধু নিজের গুনগান শোনার জন্যে তোষামোদ টাইপের মানুষ দিয়ে আপনার চারপাশ ভরে রাখেন (আমাদের অনেক নেতা/নেত্রীর মতো!) তাহলে আপনি যে মানুষ হিসেবে খুব ভালো, চমৎকার, দক্ষ একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারবেন না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত!

অপরাজিত – ২

Boat_in_river,_Bangladesh

Image source: http://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/6/66/Boat_in_river%2C_Bangladesh.jpg

(বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর “অপরাজিত” উপন্যাস থেকে নেওয়া)

ইছামতী এই চঞ্চল জীবনধারার প্রতীক। ওর দু’পাড় ভরিয়া প্রতি চৈত্র বৈশাখে কত বনকুসুম, গাছপালা, পাখি-পাখালি, গাঁয়ে গাঁয়ে গ্রামের ঘাট – শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া কত ফুল ঝরিয়া পড়ে, কত পাখির দল আসে যায়, ধারে ধারে কত জেলেরা জাল ফেলে, তীরবর্তী গৃহস্তবাড়িতে হাসি-কান্নার লীলাখেলা হয়, কত গৃহস্ত আসে, কত গৃহস্ত যায় – কত হাসিমুখ শিশু মায়ের সঙ্গে নাহিতে নামে, আবার বৃদ্ধাবস্থায় তাহাদের নশ্বর দেহের রেণু কলস্বনা ইছামতীর স্রোতোজলে ভাসিয়া যায় – এমন কত মা, কত ছেলেমেয়ে, তরুণতরুণী মহাকালের বীথিপথে আসে যায় – অথচ নদী দেখায় শান্ত, স্নিগ্ধ, ঘরোয়া, নিরীহ…

আজকাল নির্জনে বসিলেই তাহার মনে হয়, এই পৃথিবীর একটা আধ্যাত্মিক রুপ আছে, এর ফুলফল, আলোছায়ার মধ্যে জন্মগ্রহণ করার দরুণ এবং শৈশব হইতে এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার দরুণ এর প্রকৃত রুপটি আমাদের চোখে পড়ে না। এ আমাদের দর্শন ও শ্রবণগ্রাহ্য জিনিসে গড়া হইলেও আমাদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও ঘোর রহস্যময়, এর প্রতি রেণু যে  অসীম জটিলতায় আচ্ছন্ন – যা কিনা মানুষের বুদ্ধি ও কল্পনার অতীত, এ সত্যটা হঠাৎ চোখে পড়ে না। যেমন সাহেব বন্ধুটি বলিত, “ভারতবর্ষের একটা রুপ আছে, সে তোমরা জান না। তোমরা এখানে জন্মেছ কিনা, অতি পরিচয়ের দোষে সে চোখ ফোটে নি তোমাদের।”

আকাশের রঙ আর এক রকম – দূরের সে গহন হিরাকসের সমুদ্র ঈষৎ কৃষ্ণাভ হইয়া উঠিয়াছে – তার তলায় সারা সবুজ মাঠটা, মাধবপুরের বাঁশবনটা কি অপূর্ব, অদ্ভুত, অপার্থিব ধরনের ছবি ফুটাইয়া তুলিয়াছে!… ও যেন পরিচিত পৃথিবীটা নয়, অন্য কোনো অজানা জগতের কোনো অজ্ঞাত দেবলোকের…

প্রকৃতির একটা যেন নিজস্ব ভাষা আছে। অপু দেখিয়াছে, কতদিন বক্রতোয়ার উপল-ছাওয়া-তটে শাল ঝাড়ের নিচে ঠিক দুপুরে বসিয়া – দূরে নীল আকাশের পটভূমিতে একটা পত্রশূন্য প্রকান্ড কি গাছ – সেদিকে চাহিলেই এমন সব কথা মনে আসিত যা অন্য সময় আসার কল্পনাও করিতে পারিত না – পাহাড়ের নিচে বনফলের জঙ্গলেরও একটা কি বলিবার ছিল যেন। এই ভাষাটা ছবির ভাষা – প্রকৃতি এই ছবির ভাষায় কথা বলেন – এখানেও সে দেখিল গাছপালায়, উইঢিপির পাশে শুকনো খড়ের ঝোপে, দূরের বাঁশবনের সারিতে – সেই সব কথাই বলে – সেই সব ভাবই মনে আনে। প্রকৃতির এই ছবির ভাষাটা সে বোঝে। তাই নির্জন মাঠে, প্রান্তরে, বনের ধারে একা বেড়াইয়া সে যত প্রেরণা পায় – যে পুলক অনুভব করে তা অপূর্ব – সত্যিকার Joy of Life – পায়ের তলার শুকনো লতা-কাটি, দেয়াড়ের চরে রাঙ্গা-রোদ-মাখানো কষাড় ঝোপ, আকন্দের বন, ঘেঁটুবন – তার আত্মাকে এরা ধ্যানের খোরাক যোগায়, এ যেন অদৃশ্য স্বাতী নক্ষত্রের বারি, তারই প্রাণ মুক্তার দানা বাঁধে।

সন্ধার পুরবী কি গৌরীরাগিণীর মতো বিষাদ-ভরা আনন্দ, নির্লিপ্ত ও নির্বিকার – বহুদূরের ওই নীল কৃষ্ণাভ মেঘরাশি, ঘন নীল, নিথর, গহন আকাশটা মনে যে ছবি আঁকে, যে চিন্তা যোগায়, তার গতি গোমুখী-গঙ্গার মতো অনন্তের দিকে, সে সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কথা বলে, মৃত্যুপারের দেশের কথা কয়, ভালবাসা-বেদনা-ভালবাসিয়া হারানো – বহুদূরের এক প্রীতিভরা পুনর্জন্মের বাণী…

এইসব শান্ত সন্ধ্যায় ইছামতীর তীরের মাঠে বসিলেই রক্তমেঘস্তুপ ও নীলাকাশের দিকে চাহিয়া চারিপাশের সেই অনন্ত বিশ্বের কথাই মনে পড়ে। মনে পড়ে বাল্যে এই কাঁটাভরা সাঁইবাবলার ছায়ায় বসিয়া মাছ ধরিতে ধরিতে সে দূর দেশের স্বপ্ন দেখিত – আজকাল চেতনা তাহার বাল্যের সে ক্ষুদ্র গন্ডি পার হইয়া ক্রমেই দূরে আলোকের পাখায় চলিয়াছে – এই ভাবিয়া এক এক সময় সে আনন্দ পায় – কোথাও না যাক – যে বিশ্বের সে একজন নাগরিক, তা ক্ষুদ্র, দীন বিশ্ব নয়। লক্ষ কোটি আলোক-বর্ষ যার গণনার মাপকাঠি, দিকে দিকে অন্ধকারে ডুবিয়া ডুবিয়া নক্ষত্রপুঞ্জ, নীহারিকাদের দেশ, অদৃশ্য ইথারের বিশ্ব যেখানে মানুষের চিন্তাতীত, কল্পনাতীত দূরত্বের ক্রমবর্ধমান পরিধিপানে বিস্তৃত – সেই বিশ্বে সে জন্মিয়াছে…

milky-way

ঐ অসীম শূন্য কত জীবলোকে ভরা – কি তাদের অদ্ভুত ইতিহাস! অজানা নদীতটে প্রণয়ীদের কত অশ্রুভরা আনন্দতীর্থ – সারা শূন্য ভরিয়া আনন্দস্পন্দনের মেলা – ইথারের নীল সমুদ্র বাহিয়া বহু দূরের বৃহত্তর বিশ্বের সে-সব জীবনধারার ঢেউ প্রাতে, দুপুরে, রাতে, নির্জনে একা বসিলেই তাহার মনের বেলায় আসিয়া লাগে – অসীম আনন্দ ও গভীর অনুভূতিতে মন ভরিয়া ওঠে – পরে সে বুঝিতে পারে শুধু প্রসারতার দিকে নয় – যদিও তা বিপুল ও অপরিমেয় – কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চেতনা-স্তরের আর একটা Dimension যেন তার মন খুঁজিয়া পায় – এই নিস্তব্দ শরত-দুপুর যখন অতীতকালের এমনি এক মধুর মুগ্ধ শৈশব-দুপুরের ছায়াপাতে স্নিগ্ধ ও করূণ হইয়া ওঠে তখনই সে বুঝিতে পারে চেতনার এ স্তর বাহিয়া সে বহুদূর যাইতে পারে – হয়তো কোনো অজ্ঞাত সৌন্দর্যময় রাজ্যে, দৈনন্দিন ঘটনার গতানুগতিক অনুভূতিরাজি ও একঘেয়ে মনোভাব যে রাজ্যের সন্ধান দিতে পারিতই না কোনোদিন…

নদীর ধারে আজিকার এই আসন্ন সন্ধ্যায় মৃত্যুর নব রুপ সে দেখিতে পাইল। মনে হইল, যুগে যুগে এ জন্মমৃত্যুচক্র কোন বিশাল-আত্মা দেবশিল্পীর হাতে আবর্তিত হইতেছে – তিনি জানেন কোন জীবনের পর কোন অবস্থার জীবনে আসিতে হয়, কখনো বা বৈষম্য – সবটা মিলিয়া অপূর্ব রসসৃষ্টি – বৃহত্তর জীবনসৃষ্টির আর্ট-

ছ’হাজার বছর আগে হয়তো সে জন্মিয়াছিল প্রাচীন ঈজিপ্টে – সেখানে নলখাগড়া প্যাপিরাসের বনে, নীলনদের রৌদ্রদীপ্ত তটে কোন দরিদ্র ঘরের মা বোন বাপ ভাই বন্ধুবান্ধবদের দলে কবে সে এক মধুর শৈশব কাটাইয়া গিয়াছে – আবার হয়তো জন্ম নিয়াছিল রাইন নদীর ধারে – কর্ক-ওক, বার্চ ও বীচবনের শ্যামল ছায়ায় বনেদি ঘরের প্রাচীন প্রাসাদে, মধ্যযুগের আড়ম্বরপূর্ণ আবহাওয়ায়, সুন্দরমুখ সখীদের দল। হাজার হাজার বছর পর হয়তো সে আবার ফিরিয়া আসিবে – তখন কি মনে পড়িবে এবারকার জীবনটা? – কিংবা কে জানে আর হয়তো এ পৃথিবীতে আসিবে না – ওই যে বটগাছের সারির মাথায় সন্ধ্যার ক্ষীণ প্রথম তারকাটি – ওদের জগতে অজানা জীবনধারার মধ্যে হয়তো এবার নবজন্ম! – কতবার যেন সে আসিয়াছে… জন্ম হইতে জন্মান্তরে, মৃত্যু হইতে মৃত্যুর মধ্য দিয়া… বহু দূর অতীতে ও ভবিষ্যতে বিস্তৃত সে পথটা যেন সে বেশ দেখিতে পাইল… কত নিশ্চিন্দিপুর, কত অপর্ণা, কত দুর্গা দিদি – জীবনের ও জন্মমৃত্যুর বীথিপথ বাহিয়া ক্লান্ত ও আনন্দিত আত্মার সে কি অপরুপ অভিযান… শুধু আনন্দে, যৌবনে, পুণ্যে ও দুঃখে, শোকে ও শান্তিতে…। এই সবটা লইয়া যে আসল বৃহত্তর জীবন – পৃথিবীর জীবনটুকু যার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র – তার স্বপ্ন যে শুধুই কল্পনাবিলাস, এ যে হয় তা কে জানে – বৃহত্তর জীবনচক্র কোন দেবতার হাতে আবর্তিত হয় তা কে জানে?… হয়তো এমন সব প্রাণী আছেন যাঁরা মানুষের মতো ছবিতে, উপন্যাসে, কবিতায় নিজেদের শিল্পসৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করেন না – তাঁরা এক এক বিশ্ব সৃষ্টি করেন – তার মানুষের সুঝে-দুঃখে উখথানে-পতনে আত্মপ্রকাশ করাই তাঁদের পদ্ধতি – কোন মহান বিবর্তনের জীব তাঁর অচিন্ত্যনীয় কলাকুশলতাকে গ্রহে গ্রহে নক্ষত্রে নক্ষত্রে এ-রকম রুপ দিয়াছেন – কে তাঁকে জানে?…

একটি অবর্ণনীয় আনন্দে, আশায়, অনুভূতিতে, রহস্যে মন ভরিয়া উঠিল। প্রাণবন্ত তার আশা, সে অমর ও অনন্ত জীবনের বাণী বনলতার রৌদ্রদগ্ধ শাখাপাত্রের তিক্ত গন্ধ আনে – নীলশূন্যে বালিহাঁসের সাঁই সাঁই রব শোনায়। সে জীবনের অধিকার হইতে তাহাকে কাহারো বঞ্চনা করিবার শক্তি নাই – তার মনে হইল সে দীন নয়, দুঃখী নয়, তুচ্ছ নয় – ওটুকু শেষ নয়, এখানে আরম্ভও নয়। সে জন্মজন্মান্তরের পথিক আত্মা, দূর হইতে কোন সুদূরের নিত্য নূতন পথহীন পথে তার গতি, এই বিপুল নীল আকাশ, অগণ্য জ্যোতির্লোক, সপ্তর্ষিমন্ডল, ছায়াপথ, বিশাল অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার জগৎ, বহির্ষদ পিতৃলোক, – এই শত সহস্র শতাব্দী, তার পায়ে-চলার পথ – তার ও সকলের মৃত্যুদ্বারা অস্পৃষ্ট সে বিরাট জীবনটা নিউটনের মহাসমুদ্রের মতো করলেই পুরোভাগে অক্ষুন্নভাবে বর্তমান – নিঃসীম সময় বাহিয়া সে গতি সারা মানব যুগে বাধাহীন হউক।…

অপু তাহাদের ঘাটের ধারে আসিল। ওইখানটিতে এমন এক সন্ধ্যার অন্ধকারে বনদেবী বিশালাক্ষী স্বরুপ চক্রবর্তীকে দেখা দিয়াছিলেন কতকাল আগে!

আজ যদি আবার তাহাকে দেখা দেন!

– তুমি কে?
– আমি অপু।
– তুমি বড় ভালো ছেলে। তুমি কি বর চাও?
– অন্য কিছু চাই নে, এ গাঁয়ের বনঝোপ, নদী, মাঠ, বাঁশবনের ছায়ায় অবোধ, উদ্গ্রীব,  স্বপ্নময় আমার সেই যে দশ বৎসর বয়সের শৈশবটি – তাকে আর একটি বার ফিরিয়ে দেবে দেবী? –

“You enter it by the Ancient way
Through Ivory Gate and Golden”

অপরাজিত…

Le-Meridien-Bora-Bora---Aerial
প্রথম জীবনের সে-সব মাধুরীভরা মুহূর্তগুলি যৌবনের কলকোলাহলে কোথায় মিলাইয়া গেল? কোথায় সে নীল আকাশ, মাঠ, আমের বউলের গন্ধভরা জ্যোৎস্নারাত্রি? পাখি আর ডাকে না, ফুল আর ফোটে না, আকাশ আর সবুজ মাঠের সঙ্গে মেশে না – ঘেঁটুফুলের ঝোপে ফোটা সদ্যফোটা ফুলের তেতো গন্ধ আর বাতাসকে তেতো করে না। জীবনে সে যে রোমান্সের স্বপ্ন দেখিয়াছিল – যে স্বপ্ন তাহাকে একদিন শত দুঃখের মধ্য দিয়া টানিয়া আনিয়াছে, তার সন্ধান তো কই এখনো মিলিল না? এ তো একরঙ্গা ছবির মতো বৈচিত্রহীন, কর্মব্যস্ত, একঘেয়ে জীবন – সারাদিন এখানে অফিসের বদ্ধ জীবন, রোকড়, খতিয়ান, মর্টগেজ, ইনকামট্যাক্সের কাগজের বোঝার মধ্যে পক্ককেশ প্রবীন ঝুনো সংসারাভিজ্ঞ ব্যক্তিগণের সঙ্গে সপিনা ধরানোর প্রকৃষ্ট উপায় সম্বন্ধে পরামর্শ করা, এটর্নিদের নামে বড় বড় চিঠি মুসাবিদা করা – সন্ধ্যায় পায়রার খোপের মতো অপরিষ্কার নোংরা বাসাবাড়িতে ফিরিয়াই তখনি আবার ছেলে পড়াইতে ছোটা।

অফিসে সে নানা স্থানের ভ্রমণকাহিনী পড়ে, ডেস্কের মধ্যে পুরিয়া রাখে। পুরোনো বইয়ের দোকান হইতে নানা দেশের ছবিওয়ালা বর্ণনাপূর্ণ বই কেনে – নানা দেশের রেলওয়ে বা স্টিমার কোম্পানি যে সব দেশে যাইতে সাধারণকে প্রলুব্ধ করিতেছে – কেহ বলিতেছে, হাওয়াই দ্বীপে এসো একবার – এখানকার নারকেল কুন্জে, ওয়াকিকির বালুময় সমুদ্রবেলায় জোৎস্নারাত্রে যদি তারাভিমুখী ঊর্মিমালার সঙ্গীত না শুনিয়া মর, তবে তোমার জীবন বৃথা।

এল পাশো দেখ নাই। দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়ার চুনাপাথরের পাহাড়ের ঢালুতে, শান্ত রাত্রির তারাভরা আকাশের তলে কম্বল বিছাইয়া একবারটি ঘুমাইয়া দেখিও।।। শীতের শেষে নুড়িভরা উঁচুনিচু প্রান্তরে কর্কশ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে দু-এক ধরণের মাত্র বসন্তের ফুল প্রথম ফুটিতে শুরু করে, তখন সেখানকার সোডা-আলকালির পলিমাটিপড়া রৌদ্রদীপ্ত মুক্ত তরুবলয়ের রহস্যময় রুপ – কিংবা ওয়ালোয়া হ্রদের তীরে উন্নত পাইন ও ডগলাস ফারের ঘন অরণ্য, হ্রদের স্বচ্ছ বরফগলা জলে তুষারকিরীট মাজামা আগ্নেয়গিরির প্রতিচ্ছায়ার কম্পন – উত্তর আমেরিকার ঘন, স্তব্দ্ধ, নির্জন অরণ্যভূমির নিয়ত পরিবর্তনশীল দৃশ্যরাজি, কর্কশ বন্ধুর পর্বতমালা, গম্ভীরনিনাদী জলপ্রপাত, ফেনিল পাহাড়ি নদীতীরে বিচরণশীল বলগা হরিণের দল, ভালুক, পাহাড়ি ছাগল, ভেড়ার দল, উষ্ন প্রস্রবণ, তুষারপ্রবাহ, পাহাড়ের ঢালুর গায়ের সিডার ও মেপল গাছের বনের মধ্যে বুনো ভ্যালোরিয়ান ও ভায়োলেট ফুলের বিচিত্র বর্ণসমাবেশ – দেখ নাই এসব? এস এস!

টাহিটি! টাহিটি! কোথায় কত দূরে, কোন জোৎস্নালোকিত রহস্যময় কূলহীন স্বপ্নসমুদ্রের পারে, শুভরাত্রে গভীর জলের তলায় যেখানে মুক্তার জন্ম হয়, সাগরগুহায় প্রবালের দল ফুটিয়া থাকে, কানে শুধু দূরশ্রুত সংগীতের মতো তাহাদের অপূর্ব আহবান ভাসিয়া আসে। অফিসের ডেস্কে বসিয়া এক-একদিন সে স্বপ্নে বিভোর হইয়া থাকে – এই সবের স্বপ্নে। এই রকম নির্জন স্থানে, যেখানে লোকালয় নাই, ঘন নারিকেল কুন্জের মধ্যে ছোট কুটিরে, খোলা জানালা দিয়া দূরের নীল সমুদ্র চোখে পড়িবে – তার ওপারে মরকতশ্যাম ছোট ছোট দ্বীপ, বিচিত্র পক্ষীরাজি, অজানা দেশের অজানা আকাশের তলে তারায় আলোয় উজ্জ্বল মাঠটা একটা রহস্যের বার্তা বহিয়া আনিবে – কুটিরের ধারে ফুটিয়া থাকিবে ছোট ছোট বনফুল – শুধু সে আর অপর্ণা।

(বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর “অপরাজিত” উপন্যাস থেকে নেওয়া)

Tagged , ,

ডিম

(অ্যান্ডি উইয়ার এর লেখা “দি এগ” গল্পের বাংলা অনুবাদ। মূল রচনাঃ http://www.galactanet.com/oneoff/theegg_mod.html)

Chicken_egg

*image source: http://commons.wikimedia.org/wiki/File:Chicken_egg.png

যেদিন তুমি মারা গেলে সেদিন তুমি তোমার বাড়ি ফিরছিলে।

তুমি একটা কার দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলে। সাধারণ একটা দূর্ঘটনা, কিন্তু তোমার আঘাতটা মারাত্মক ছিলো। তুমি স্ত্রী এবং দুই সন্তান রেখে গিয়েছিলে। মৃত্যুর সময় তুমি খুব বেশি ব্যথা পাওনি। হাসপাতালের ডাক্তার এবং নার্সরা মিলে তোমাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বিশ্বাস করো – তোমার শরীর এমনভাবে ভেঙ্গে গিয়েছিলো যে তোমার জন্যে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাই ভালো হয়েছে।

এরপরই তোমার সাথে আমার দেখা হয়।

“কী… কী হয়েছে?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “আমি কোথায়?”
“তুমি মারা গিয়েছো,” আমি নিরাবেগভাবে বললাম। এটা কথা নিয়ে খেলার সময় ছিলোনা।
“একটা… একটা ট্রাক আসছিলো এবং সেটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এগিয়ে আসছিলো…”
“হ্যাঁ,” আমি বলেছিলাম।
“আমি… আমি মারা গিয়েছিলাম?”
“হ্যাঁ। কিন্তু এটা নিয়ে মন খারাপ কোরো না। সবাইকেই মরতে হয়,” আমি বলেছিলাম।

তুমি চারদিকে একবার চোখ বুলালে। চারদিকে ছিলো শুধু শুন্যতা। শুধু তুমি আর আমিই ছিলাম সেখানে। “এটা কোন জায়গা?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “এটাই কি মৃত্যুর পরের জীবন?”
“সেটা বলতে পারো,” আমি বলেছিলাম।
“তুমি কি ঈশ্বর?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে?
“হ্যাঁ,” আমি জবাব দিয়েছিলাম। “আমি ঈশ্বর।”
“আমার সন্তানরা… আমার স্ত্রী,” তুমি বলেছিলে।
“কেন, তাদের কী হয়েছে?”
“ওরা কি ভালো আছে? ওরা আমাকে ছাড়া ভালো থাকবে?”
“আমি এটাই দেখতে চেয়েছি,” আমি বলেছিলাম। “তুমি এই মাত্র মারা গেলে আর তোমার প্রথম চিন্তা হচ্ছে তোমার পরিবার নিয়ে। চমৎকার।”
তুমি খুশি হয়ে আমার দিকে তাকালে। তোমার কাছে আমাকে ঈশ্বর মনে হচ্ছিলো না। আমাকে একজন সাধারন মানুষ মনে হচ্ছিলো তোমার কাছে। হয়তো পুরুষ, কিংবা মহিলা। কোনো শক্তিশালী কেউ যাকে তুমি চেননা। কিংবা একজন স্কুল শিক্ষক, কিন্তু কোনোভাবেই ঈশ্বর নয়।
“চিন্তা কোরোনা,” আমি বলেছিলাম। “তারা ভালো থাকবে। তোমার সন্তানদের কাছে তুমি একজন চমৎকার মানুষ হয়ে থাকবে। তারা এখনো মানুষ হিসেবে তোমার দোষত্রুটি বুঝার মতো বড় হয়নি। তোমার স্ত্রী তোমার জন্যে অনেক কাঁদবে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে আসলে একটা বিশাল ভারমুক্ত হবে। সত্যি কথা বলতে কি – তোমাদের স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কটা আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়ছিলো। জানিনা এটা শুনে কি তুমি খুশি হবে কিনা – কিন্তু তোমার স্ত্রী ভারমুক্ত হবার কারণে নিজেকে দোষী ভাববে।”
“ওহ্‌,” তুমি বলেছিলে। “তাহলে এখন কী হবে আমার? আমি কি বেহেশতে যাবো নাকি দোজখে যাবো?”
“তুমি বেহেশত বা দোজখ এর কোনোটাতেই যাবা না,” আমি বলেছিলাম। “তোমাকে আবার জন্ম দেয়া হবে।”
“ওহ্‌,” তুমি বলেছিলে। “তাহলে হিন্দু ধর্মের কথাই ঠিক,”
“সব ধর্মই আসলে তাদের মতো করে সত্যি,” আমি বলেছিলাম। “হাঁটো আমার সাথে।”

তুমি আমার সাথে সাথে হাঁটতে শুরু করেছিলে। “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“বিশেষ কোথাও না,” আমি বলেছিলাম। “আমার হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে ভালো লাগে।”
“তাহলে ঘটনা কী দাঁড়ালো?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “আমি যদি আবার জন্ম নিই তাহলে সবকিছুই আবার শুন্য থেকে শুরু হবে? একটা নবজাতক শিশু হয়ে আমি জন্ম নিবো। অতএব আমার এই জীবনের সব অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য থাকবেনা।”
“সেটা ঠিক না,” আমি বলেছিলাম। “তোমার মধ্যে এই মুহুর্তে তোমার অতীত সব জীবনের অর্জিত সব জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা আছে। শুধু তুমি এই মুহুর্তে সেগুলো মনে করতে পারছোনা।”
আমি হাঁটা থামিয়ে তোমার কাঁধে হাত রাখলাম। “তোমার আত্মা আসলে তোমার কল্পনার চাইতেও অনেক বড়, সুন্দর, এবং মহান। মানুষের মন আসলে তার সম্পূর্ণ সত্ত্বার একটা ক্ষুদ্র অংশ ধারণ করতে পারে। এটা অনেকটা একটা গ্লাসে একটা আঙ্গুল রেখে দেখার মতো যে গ্লাসের পানি ঠান্ডা না গরম। তুমি তোমার একটা ক্ষুদ্র অংশ সেখানে ছোঁয়াও, এবং এরপর যখন তুমি সেটা বের করে আনো এর সবকিছু ততক্ষনে তুমি জেনে যাও।
গতো ৪৮ বছর ধরে একজন মানুষের জীবন যাপন করছো কিন্তু তুমি এখনো তোমার অস্তিত্বের একটা বড় অংশ দেখতে পাওনি। আমরা যদি এখানে দীর্ঘ সময় ধরে থাকি, তাহলে তুমি আস্তে আস্তে সব মনে করতে পারবা। কিন্তু তোমার বিভিন্ন জীবনের মাঝখানে এটা করার কোনো মানে হয়না।”
“আমাকে কতোবার জন্ম দেওয়া হয়েছে?”
“অনেক বার। অসংখ্য বার। একেক বার একে ধরণের জীবন তোমাকে দেয়া হয়েছে।” আমি বলেছিলাম। “এবার তোমাকে ৫৪০ খ্রিস্টাব্দের এক চীনা কৃষক মেয়ে হিসেবে জন্ম দেওয়া হবে।”
“দাঁড়াও, কী বললে?” তুমি তোতলাতে তোতলাতে বলেছিলে। “তুমি আমাকে সুদূর অতীতে পাঠিয়ে দিচ্ছো?”
“টেকনিকালি সেটা তুমি বলতে পারো। তোমরা যেটাকে সময় বলো সেটা শুধু তোমাদের জগতেই আছে। আমি যেখান থেকে আসছি সেখানে সময়ের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।”
“তুমি কোথা থেকে আসছো?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে।
“আমি কোনো এক জায়গা থেকে আসছি। অন্য কোনো জায়গা থেকে। এবং আমার মতো আরো অনেকে আছে। আমি জানি তোমার জানতে ইচ্ছা করবে আমাদের জায়গাটা কেমন কিন্তু বিশ্বাস করো তুমি সেটা বুঝবেনা।”
“ওহ্‌,” একটু মন খারাপ করে তুমি বলেছিলে। “কিন্তু… আমি যদি বিভিন্ন সময়ে এভাবে জন্ম নিয়ে থাকি তাহলে হয়তো এক সময় আমার নিজের সাথে আমার দেখা হয়েছে?”
“অবশ্যই। এটা প্রায়ই ঘটে থাকে। কিন্তু যেহেতু তোমার সেই জীবনগুলো প্রত্যেকে নিজের জীবনকাল এর বাইরে কিছু জানেনা তারা জানেওনা যে তারা আসলে একই ব্যক্তি।”
“কিন্তু এসব কিছুর মানে কী?”
“হাহা, তুমি আমাকে জীবনের মানের কথা জিজ্ঞেস করছো?” আমি বলেছিলাম। “সবাই কি জানতে চায়না তাদের জীবনের মানে কী? উদ্দেশ্য কী?”
“কিন্তু এটা একটা খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন,” তুমি তোমার প্রশ্নে অনড় থাকলে।
আমি তোমার চোখের দিকে তাকালাম। “জীবনের মানে হচ্ছে, এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে তুমি পরিণত একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারো।”
“তুমি বলতে চাচ্ছো মানবজাতির কথা? তুমি চাও পুরো মানবজাতি পরিণত হোক, বুদ্ধিমান হয়ে উঠুক?”
“না, শুধুমাত্র তুমি। আমি এই পুরো বিশ্বজগৎ শুধুমাত্র তোমার জন্যে বানিয়েছি। একেকটা জীবন পার হওয়ার পর তুমি আরো পরিণত হয়ে উঠো, আরো বুদ্ধিমান, এবং প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠো।”
“কেবল আমি? বাকি সবার কী হোলো?”
“আর কেউ বাকি নাই,” আমি বলেছিলাম। “এই বিশ্বজগতে আছি শুধু আমি আর তুমি।”
তুমি হতবুদ্ধের মতো আমার দিকে তাকালে। “কিন্তু পৃথিবীর আর সব মানুষ…”
“তারা সবাই আসলে তুমি। তোমার ভিন্ন ভিন্ন জন্ম।”
“দাঁড়াও… পৃথিবীর সবাই আসলে আমি?”
“এইতো তুমি বুঝতে পারছো,” আমি বলেছিলাম তোমার পিঠ চাপড়ে।
“পৃথিবীতে যতো মানুষ জন্ম নিয়েছে তারা সবাই আমি?”
“এবং ভবিষ্যতে যারা নিবে তারাও…”
“আমি আব্রাহাম লিংকন?”
“এবং তুমিই তার আততায়ী জন ওয়াইলক্স বুথ,” আমি যোগ করেছিলাম।
“আমি হিটলার?” তুমি অবিশ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলে।
“এবং তুমিই সেই লক্ষ লক্ষ মানুষ যাদেরকে হিটলার মেরেছিলো।”
“আমি যিশু খ্রিস্ট?”
“এবং তুমিই তার সব অনুসারী খ্রিস্টান মানুষ।”

তুমি কথা হারিয়ে ফেলেছিলে। “যতোবার তুমি কাউকে আঘাত করেছো তুমি আসলে নিজেকেই নিজে আঘাত করেছো। মানুষের প্রতি দেখানো তোমার সব ভালোবাসা আসলে তুমি তোমার প্রতিই দেখিয়েছো। পৃথিবীতে জন্ম নেয়া প্রতিটি মানুষের সব সুখ আর দুঃখের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এক সময় তুমিও যাবে।”
তুমি দীর্ঘ সময় নিয়ে ভাবলে।
“কেনো?” তুমি জিজ্ঞেস করলে। “এসব কিছু করার কী দরকার ছিলো?”
“কারণ – একদিন তুমি আমার মতো হয়ে যাবে। সেটাই তোমার আসল পরিচয়। তুমি আমাদেরই দলের। তুমি আমার সন্তান।”
“কী বললে?” তুমি চরম অবিশ্বাস নিয়ে তাকালে। “তুমি বলছো আমি ঈশ্বর?”
“না, এখনো না। তুমি এখনো একটা ভ্রূণ। সে ভ্রূণ এখনো বড় হচ্ছো। যখন তুমি সব কালের সব মানব জন্ম পার করবে, তখন তোমার জন্ম নেয়ার সময় হবে।”
“তাহলে এই পুরো বিশ্বজগৎ,” তুমি বলেছিলে, “এটা শুধু…”
“একটা ডিম।” আমি বলেছিলাম। “এখন তোমার পরবর্তী জীবন শুরু করার সময় হয়েছে।”

এবং এরপর আমি তোমাকে তোমার গন্তব্যের পথে পাঠিয়ে দিলাম।

সবচেয়ে বড় যে ভয় – এবং যেভাবে আমি এটাকে জয় করলাম

আমার উচ্চতাভীতি (Acrophobia) আছে। উঁচু দালানের ছাদের কিনারায় দাঁড়ালে পায়ের তলায় শিরশির করে, প্লেইন যখন টেইক অফ করে মাটি ছেড়ে উঠে যেতে থাকে তখন বুকের মধ্যে ধক করে উঠে। এরপরও যখনি কাউকে আকাশে স্কাই ডাইভিং করতে দেখি তখন প্রচন্ড ইচ্ছে হয় স্কাই ডাইভিং করার। এই ভিডিও দেখার পর কার আকাশে উড়তে ইচ্ছে না করবে?

কিন্তু প্রাণের মায়া সম্ভবত সবচেয়ে বড় মায়া, মৃত্যুভয় সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভয়! একটা চমৎকার উড়ন্ত প্লেইন থেকে কোন দুঃখে আমি শুন্যে ঝাঁপ দিতে যাবো?

কিন্তু একমাত্র মানুষই সম্ভবত আপাতদৃষ্টিতে দেখতে সবচেয়ে অযৌক্তিক কাজটি অবলীলায় করতে পারে। তাই গতো রোববার একটা চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে আমি আর আমার দুই বন্ধু মিলে যখন স্কাই ডাইভিং করতে রওয়ানা দিলাম তাতে অবাক হওয়ার কিছু ছিলোনা!

নিউ ইয়র্কে এখন গ্রীষ্মকাল প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আর মাস খানেক এর মধ্যে শরৎ/হেমন্ত চলে আসবে। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ছিলো চমৎকার একটা দিন। বাইরের তাপমাত্রা ছিলো ৭৫-৮০ ফারেনহাইটের মধ্যে। রৌদ্রজ্জ্বল দিন, আকাশে হালকা ছেঁড়া মেঘের ভেলা। আমার বন্ধুদের তাদের এপার্টমেন্ট থেকে গাড়ীতে তুলে নিলাম ঠিক ১১:৩০ এ। আমাদের গন্তব্য ক্যালভারটন নামক একটা শহর। ক্যালভারটন নিউ ইয়র্ক শহর থেকে ঘন্টা দেড়েকের ড্রাইভ। শহর ছেড়ে হাইওয়েতে উঠতেই মনটা ভালো হয়ে গেলো। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। ব্যাপারটা আমি আগেও খেয়াল করেছি, যখনি আমি কোনো বড় শহর ছেড়ে বের হয়ে যাই আমার খালি বুক ভরে নিশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। চারদিকের খোলা মাঠ, চনমনে বাতাস, মনের সাথে সাথে শরীরটাও কেমন যেন ফ্রেশ হয়ে যায়!

আমেরিকার হাইওয়েতে একবার এক্সিট ভুল করলে শাস্তি হিসেবে অনেক পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। আমার প্ল্যান ছিলো নর্দার্ন স্টেইট পার্কওয়ে ধরে অনেক দূর ড্রাইভ করে এরপর লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গন্তব্যে পৌঁছাবো। কিন্তু একটা এক্সিট মিস করার কারণে অনেক ঘুরাঘুরি করে যেয়ে উঠলাম সাউদার্ন স্টেইট পার্কওয়েতে। সাউদার্ন স্টেইট পার্কওয়ে ধরে অনেক দূর যাওয়ার পর লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ে তে উঠে যাই। এরপর মিনিট পনের বিভিন্ন লোকাল হাইওয়ে ধরে আমরা আমাদের গন্তব্য ক্যালভারটন শহরের এক কোণায় অবস্থিত ড্রপ জোনে (স্কাই ডাইভিং করার স্থানটিকে ড্রপ জোন বলা হয়) পৌঁছে যাই।

ড্রপ জোন যায়গাটা আসলে একটা এয়ারপোর্টকে ঘিরে স্কাই ডাইভিং এর আয়োজন ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা গাড়ী পার্ক করে অফিস বিল্ডিংয়ে ঢুকলাম চেকইন করার জন্যে। কাউন্টারের মেয়েটি দ্রুত চেকইন শেষ করে আমাদের একটা টিভির সামনে বসিয়ে দিলো। টিভিতে মিনিট পাঁচেক এর একটা ভিডিও দেখতে হবে যেটা আমাদের আজকের স্কাই ডাইভিং এর ট্রেইনিং। ভিডিওতে আমাদের ডাইভিং এর সময় কিভাবে হাত-পা ভাঁজ করে থাকতে হবে, জাম্প করার সময় কিভাবে গায়ে লাগানো জাম্প হারনেস এর স্ট্র্যাপ ধরে উপরের দিকে চেয়ে থাকতে হবে, ল্যান্ড করার সময় ইন্সট্রাকর এর কথা অনুযায়ী স্ট্যান্ড বা স্লাইড করতে হবে কিভাবে ইত্যাদি সবকিছু ডেমন্সট্রেইট করা হলো।

ভিডিও দেখা শেষে আমাদের “কোনো ধরণের দূর্ঘটনার জন্যে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়” টাইপের কাগজপত্র সই করতে হলো। এমনকি মৃত্যু হতে পারে, বা চিকিৎসা খরচ ইত্যাদি কিছুই দাবী করবো না বলে সই করতে হলো।

অবশেষে আমাদেরকে বলা হলো বাইরে যেয়ে অপেক্ষা করার জন্যে। যথাসময়ে আমাদের নাম ধরে ডাকা হবে বলে বলা হলো।

বাইরে অপেক্ষা করার যায়গাটায় এসে তো আমাদের আক্কেলগুড়ুম। একটু পরপর আমাদের সামনে এসে টুপ টুপ করে প্যারাশুট নিয়ে পড়ছে স্কাই ডাইভাররা। বিশেষ করে যারা অভিজ্ঞ স্কাই ডাইভার তার যেভাবে বিপজ্জনকভাবে প্রচন্ড গতিতে এসে ধুপ করে ল্যান্ড করছিলো তা দেখে আমার শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেলো! অবশ্য আমরা যেটা করছি সেটা হলো ট্যান্ডেম স্কাই ডাইভিং। আমি বা আমার বন্ধুরা কেউই একা জাম্প করবোনা। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের ইন্সট্রাকটরের গায়ের সাথে শক্ত করে বাঁধা থাকবো। আমাদের পুরো জাম্পের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ইন্সট্রাকটরের হাতে, আমাদের কাজ হলো শুধু জাম্প দেওয়া এবং আকাশে উড়ে বেড়ানো উপভোগ করা!

আমরা জানতাম স্কাই ডাইভিং এর জাম্পের জন্যে ডাক পেতে বেশ কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হয়। তাই আমাদেরকে যখন প্রায় দুই ঘন্টা পর ডাকলো আমরা খুব একটা অবাক হলাম না।

মাইকে আমাদের নাম শোনার পর আমরা জাম্প গিয়ার এর জায়গাটার দিকে এগিয়ে যাই। জাম্প গিয়ার মানে নানা রকম বেল্টে ঠাসা একটা জিনিস যেটা দিয়ে আমি আমার ইন্সট্রাকট্রের গায়ের সাথে আঠার মতো লেগে থাকবো। একজন আমাদের সবাইকে গিয়ার পরিয়ে দিলো। আমার ইন্সট্রাকটর উইনি এসে আমাকে একটা গগল (এক ধরণের চশমা) দিয়ে গেলো যেটা জাম্পের সময় আমাকে পরে থাকতে হবে প্রচন্ড বাতাস থেকে চোখকে বাঁচানোর জন্যে। এরপর আমার ভিডিও এবং ফটোগ্রাফার কেইট এসে আমার সাথে পরিচিত হলো। ও আমার ছবি এবং ভিডিওর দায়িত্বে থাকবে আকাশে। একজন মানুষের প্রতিদিনের কাজ ১৩,৫০০ ফুট উপরের আকাশে ব্যাপারটা ভাবতেই আমার গায়ে চমক খেলে যায়!

এরপর আমরা একে আমাদের প্লেইনের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ছোট, পুরনো, জীর্ণ-শীর্ণ একটা প্লেইন। আমার বন্ধু কৌতুক করে বললো – “এই ভাঙ্গা প্লেইন থেকে বাঁচার জন্যে হলেও আমাদের আকাশ থেকে ঝাঁপ দিতে হবে”! প্লেইন আস্তে আস্তে চলা শুরু করলো। ছোট একটা প্লেইন। যাত্রী সব মিলিয়ে জনা দশেক হবে। এর মধ্যে প্লেইনের একমাত্র দরজাটা হাট হয়ে খুলে আছে। জীবনে কোনোদিন প্লেইনের দরজা খোলা থাকতে দেখি নাই! আমি মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি – “একটু পর যখন আকাশে থাকবো তখন তো কোনো দরজাই থাকবেনা, সুতরাং দরজা খোলা কি বন্ধ সেটা কোনো ব্যাপার না”!

কিছুক্ষণ পর প্লেইনটা মাটি ছেড়ে আকাশে উঠা শুরু করলো। প্রায় ৪৫ ডিগ্রী কোণে প্লেইনটা উঠতে উঠতে যখন নিচের সবকিছু ছোট বিন্দুতে পরিণত হলো আমি আর আমার বন্ধু শাহেদ প্রায় একসাথে একে অপরের দিকে তাকালাম। দুইজনই প্রথমবারের মতো উচ্চতা দেখে একটু ভয় পেলাম। আর কিছুক্ষণ পর এখান থেকে শুন্যে লাফিয়ে পড়বো ভাবতেই একটা হিমশীতল স্রোত রক্তের সাথে বেয়ে গেলো। আমার ক্যামেরাম্যান কেইট আমার একটা ছবি তুললো, আমি নার্ভাস ভঙ্গিতে হেসে পোজ দিলাম।

প্লেইন ১৩,৫০০ ফুট (প্রায় আড়াই মাইল/সাড়ে চার কিলোমিটার) উপরে এসে স্থিত হলো। আমি লাইনে দ্বিতীয় জাম্পার। আমার আগে সারা গায়ে টাট্টু লাগানো টিংটিঙ্গে একটা আমেরিকান ছেলে লাফ দিলো। মুহুর্তের মধ্যেই সে এবং তার ইন্সট্রাকটর শুন্যে হাওয়া হয়ে গেলো। এরপর আমার পালা। কেইট আগে বের হয়ে দরজার বাইরে যেয়ে একটা হাতল ধরে দাঁড়ালো। সে ওখান থেকে আমার লাফ দেওয়ার মুহুর্ত ক্যামেরায় ধরবে। এরপর আমার ইন্সট্রাকটর এর ঈশারার সাথে সাথেই কেইট লাফ দিবে এবং সাথে সাথে আমরাও।

আমার ইন্সট্রাক্টর প্লেইনেই আমাকে তার শরীর এর সাথে খুব শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। সে আমাকে ঠেলে ঠেলে প্লেইনের দরজার সামনে নিয়ে আসলো। আমার প্রায় পুরো শরীর প্লেইনের বাইরে, আমার হাত আমার বুকে জাম্প হারনেস এর সাথে ধরে রাখা। ঠিক সেই মুহুর্তে আমি কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার ইন্সট্রাক্টর উইনি আমাকে সহ শুন্যে ঝাঁপ দিলো। কয়েক মুহুর্তের জন্যে আমার মনে হলো এটা কী হলো? আমি দুস্বপ্ন দেখার মতো পড়েই যাচ্ছি নিচে… কিন্তু পুরো ব্যাপারটা মাত্র তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ড স্থায়ী হলো। ততক্ষণে উইনি ছোট একটা প্যারাশুট (যাকে drogue বলে) ছেড়ে দিলো। এই ছোট প্যারাশুট এর কাজ হলো পৃথিবীর অভিকর্ষনজনিত ত্বরণকে বাধা দিয়ে আমাদের মোটামুটি ঘন্টায় ১২০ মাইল বেগের মধ্যে সীমিত রাখা। প্রাথমিক জাম্পের রেশ কাটতে না কাটতেই উইনি আমার হাত ধরে সামনে তাকাতে ইশারা দিলো। আমি সামনে তাকিয়ে দেখি কেইট এসে আমাদের সামনে আমাদের সমান তালে শুন্যে ভাসছে!

কেইটকে আমাদের পাশে শুন্যে ভেসে থাকতে দেখে মজা লাগলো। সে ঠিক আমাদের দশ ফুট নিচে থেকে আমাদের দিকে চেয়ে শুয়ে ছিলো। তার হাতে ক্যামেরা ছিলো, তাই সে আমার শুন্যে ভেসে থাকা শুট করার জন্যে আমাদের নিচে এসে বাতাসের কোলে শুয়ে ছিলো সারাক্ষণ!

স্কাই ডাইভিং না করার আগ পর্যন্ত যেটা মনে হতো – প্লেইন থেকে লাফিয়ে পড়ার পর প্রচন্ড গতিতে পড়ে যেতে থাকবো – আসলে ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম নয়। ছোট প্যারাশুট খোলার পর আমাদের গতি ছিলো ঘন্টায় ১২০ মাইল। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো একটা গাড়ীতে করে ১২০ মাইল বেগে চলতে থাকলে বাতাস এসে চোখে মুখে পড়লে যা হয়। প্রচন্ড বাতাস এসে আমার মুখে পড়ছিলো। নিশ্বাস নিতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছিলো। মুখ, ঠোঁটও শুকিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু আকাশে ভেসে থাকার আনন্দ এবং উত্তেজনার কাছে সেটা আসলে কিছু ছিলোনা!

ঠিক এই সময় হঠাৎ করে প্রচন্ড ঝাঁকি খেলাম। কিছুক্ষণের জন্যে একটু হতচকিত হয়ে গেলাম। পরে বুঝলাম আমরা ভূমি ৫,০০০ ফুট উপরে এসে গিয়েছি, তাই উইনি আমাদের মূল প্যারাশুট খুলে দিয়েছে। হঠাৎ করে গতি একেবারে কমে গেলো। আমি প্রথমবারের মতো ভালো করে চার দিকে তাকানোর সুযোগ পেলাম। নিচের সবকিছু ক্ষুদ্র খেলনার মতো লাগছিলো। দূরে লং আইল্যান্ড এর সমুদ্র তীর দেখা যাচ্ছিলো।

সঠিক যায়গায় ল্যান্ডিং এর জন্যে উইনি প্যারাশুটকে বেশ কয়েকবার ডানে বামে টেনে আমাদের গতিপথ পরিবর্তন করছিলো। এসময় দুএকবার প্রচন্ড ভয় লেগে গিয়েছিলো। ওই অনুভূতিটা ছিলো সত্যিকারের ত্বরণ জনিত টান (free fall) যেটা এমনকি প্যারাশুট খোলার আগেও ছিলোনা।

জাম্প করার প্রায় পাঁচ ছয় মিনিট পর উইনি খুব দক্ষভাবে এসে প্যারাশুটটাকে ল্যান্ড করালো। মাটিতে পা রেখে আমার মনে হলো – “অবশেষে আমি এটা করেছি”! কতোদিন ধরে স্কাই ডাইভিং করতে ছেয়েছিলাম, কিন্তু মূলত ভয়ের কারণেই এতোদিন করা হয়নি। কিন্তু আমার মনে হলো শুধুমাত্র এই ফালতু ভয়ের কারণে এতো উত্তেজনা এবং আনন্দময় একটা জিনিস থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবো এর কোনো মানে হয় না। অবশেষে আমার ইচ্ছে শক্তির কাছে আমার ভয় পরাজিত হয়েছে আর এমি এমন চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করলামঃ)

আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি – শেষ পর্ব

২০। সানস্ক্রীন ব্যবহার করুন

বেশি রোদ পড়লে ত্বকের ক্ষতি হয়, সানস্ক্রীন ব্যবহার করে ত্বকের যত্ন নিন। এবং নিচের ভিডিওটিতে যতো উপদেশ দেওয়া আছে সেগুলো সব অনুসরণ করার চেষ্টা করুনঃ

বাংলা অনুবাদ

২১। বেশি ভাবাভাবি বন্ধ করে কাজ করুন

বেশি ভাবতে যেয়ে জীবনের দরকারী কাজগুলো প্রায়ই করা হয়ে উঠেনা। আমি আমার জীবনে বেশি ভেবেচিন্তে একটা কাজও করতে পারেনি।

বেশি চিন্তা না করে কাজে নেমে পড়ুন। নাহলে কিছুই আর করা হয়ে উঠবেনা।

২২। সুযোগ পেলেই গান গাইতে, নাচতে চেষ্টা করুন

গান এবং নাচ চমৎকার আর্ট এবং মনকে খুব হালকা করে। নাচানাচি কিংবা গান গাওয়া/শুনার পড় মন ভালো না হতে উপায় নেই!

২৩। নতুন বন্ধু বানানো কঠিন কিছু না, এবং বর্তমান বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখাও জরুরী

আমি আমার গতো আট বছরের ভ্রমণ করে আসছি পুরোপুরি একা। প্রায়ই আমি একটা নতুন দেশে যে পা রাখি যেখানে আমাকে নিতে আসার কেউ থাকেনা। আমার তেমন কোনো কানেকশন নাই, কিন্তু আমি যেভাবেই হোক নতুন কানেকশন তৈরি করি। ইন্টারনেটে কোথাও কোনো পার্টি হচ্ছে দেখলে আমি সোজা যেয়ে সবাইকে “হ্যালো” বলি। এবং একটু লেগে থাকলে আমি কিছু মানুষকে পেয়ে যাই যাদের সাথে আমি গল্প-গুজব-আড্ডা দিতে পারি।

আপনি যদি বন্ধুত্বপরায়ন, অকপট, এবং মোটামুটি মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখেন তাহলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গার যেকোনো মানুষের সাথে আপনি বন্ধুত্ব করতে পারবেন।

২৪। আপনার যা যা আছে তা হারিয়ে যাবার আগে সেগুলোর মূল্য বুঝবেন না

কোনো কিছুকেই খুব সহজপ্রাপ্য হিসেবে ধরে নিবেন না। একদিন রাতে আমার হোটেলে থাকার টাকা ছিলোনা এবং আমাকে বাইরে পাথরের উপর ঘুমাতে হয়েছিলো। সেই থেকে আমি আমার ঘুমানোর জন্যে যে একটা বিছানা এবং বাসা আছে সেটা নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কারণ আমি জানি পৃথিবীর অনেক মানুষের এই মৌলিক জিনিসগুলোও নাই। কেবল এক রাতের বাইরে ঘুমানোর কষ্ট থেকে আমি এখন প্রতিদিন রাতে আমার বিছানায় ঘুমাতে যাবার আগে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি!

একবার আমার কানের ইনফেকশনের কারনে আমি প্রায় দুই সপ্তাহ কানে কিছু শুনতে পারতামনা। এরপর থেকে আমি আমার শ্রবণশক্তির জন্যে সবসময় কৃতজ্ঞ থাকি। সুস্থ কান থাকার কারণে আমি চারদিকের এতো সব চমৎকার শব্দ শুনতে পাই!

আমি কখনো আমার খুব কাছের কাউকে মারা যেতে দেখিনি এখনো, কিন্তু আমি আমার পরিবারের কারো সাথে দেখা হলে তাদেরকে জড়িয়ে ধরে বলি আমি তাদের কতোটা ভালোবাসি। বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনদের সাথে আমি কোনো মনোমালিন্য পুষে রাখিনা, এবং আমার মনের কথাটি আমি সবসময় খোলাখুলিভাবে বলে ফেলি।

২৫। অযাচিত অহম ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজের ভুলের জন্যে ক্ষমা চেয়ে ফেলুন

কারো প্রতি মনে ক্ষোভ পুষে রাখবেননা, এবং সবসময় অন্যের সাথে বিতর্কে জেতার জন্যে মরিয়া হয়ে থাকবেননা। মাঝেমধ্যে নিজের অহমকে ছোট করে মানুষের সাথে মনোমালিন্য এড়ানো যায়। অপরজনের আগে আপনি নিজেই বলে ফেলুন আপনি দুঃখিত। কখনোই যার সাথে সমস্যা হচ্ছে তার ভুল বুঝার জন্যে অপেক্ষা করে থাকবেন না। নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে ভুল বুঝাবুঝির সমাধান করে ফেলুন।

২৬। শুধুমাত্র অন্যদের মুগ্ধ করার জন্যে কিছু করা গাধামি

মানুষকে মুগ্ধ করার জন্যে যা-ই করেন না কেনো মানুষ আপনাকে সেই স্বীকৃতিটুকে দিবেনা। মানুষকে যদি বলে বেড়ান যে আপনি কতোগুলো ভাষা জানেন, কিংবা আপনি কতো ধনী, কতো উঁচু লেভেলের মানুষের সাথে আপনার সম্পর্ক আছে, আপনি কতো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন, আপনি কতো ভালো কাজ করেন, কোনো কিছুতেই আসলে মানুষের থেকে সেই স্বীকৃতিটুকু আপনি পাবেননা যেটা আপনি চাচ্ছেন। মানুষকে চমকিত করে আপনি নিজে গৌরবান্বিত হতে পারবেননা।

মানুষ তাদের দ্বারাই মুগ্ধ হয় যাদের কাছে গেলে তারা মন খুলে কথা বলতে পারে, এবং যাদের কথা এবং কাজ তাদের কাছে ইন্টারেস্টিং লাগে। মোটামুটিভাবে বলা যায় আপনি মানুষ হিসেবে ইন্টারেস্টিং হতে পারলেই মানুষ আপনাকে পছন্দ করবে, আপনার দ্বারা মুগ্ধ হবে।

২৭। পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ একাকীত্বে ভোগে

একা একা ভ্রমণ করার কারণে যে প্রশ্নটি আমাকে প্রায়ই শুনতে হয় তা হচ্ছে আমার নিজেকে একা লাগে কিনা। এক কথার হচ্ছে – না। আর লম্বা করে উত্তর দিতে গেলে একটা আলাদা পোস্ট লিখতে হবে।

সত্যি কথা বলতে কি পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ একাকীত্বে ভোগে। আর আমি আসলে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক বেশি একা ছিলাম। এখন আমি এমন অনেক মানুষের সাথে মিশি যাদের অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব, সামাজিক-পেশাগত নেটওয়ার্ক আছে। কিন্তু এদের অনেকেই নিজেকে একা ভাবেন কারণ তাদের ধারণা মানুষ তাদেরকে বুঝেনা।

আবার অনেকে পেশাগত কিংবা পারিবারিক কারনে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনদের থেকে দূরে সরে গিয়েছেন এবং এখন নিজেকে একা লাগে।

অনেকেই আমাকে বলেন যে পৃথিবীতে তাদের মতো একা আর কেউ নেই। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমার আসলে আমার নিজ বাড়ি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে যেখানে কেউ আমার নাম পর্যন্ত জানেনা সেখানে বরং আমার অনেক ভালো লাগে। আমি নিশ্চিত এই মুহুর্তে পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আমার মতো অবস্থায় আছে যেখানে তারা তাদের প্রিয়জন থেকে অনেক দূরে আছেন।

নিজেকে একা লাগলে ভাববেন না আপনিই একমাত্র এই অবস্থায় আছেন। চারদিকের অনেকেই আপনার মতো একা আছেন এবং তারা নিশ্চিতভাবেই আপনার অবস্থা বুঝতে পারে।

২৮। ভালোবাসা-ই জীবনে সব নয়, তবে কিছু ভালোবাসার মানুষ ছাড়া জীবনটা শূন্য মনে হতে পারে

ভালোবাসা ছাড়াও আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন, কিন্তু ভালোবাসা ছাড়া জীবনের একটা অংশ খালি মনে হবে। আপনার জীবনে কিছু মানুষ থাকা দরকার যারা আপনাকে ভালোবাসে – বন্ধুবান্ধব, পরিবার, অথবা আপনার প্রেমিক/প্রেমিকা।

২৯। জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলি কেউ আপনাকে কাগজে লিখে দিতে পারবেনা, আপনাকে অবশ্যই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মনে হতো আমি প্রায় সবকিছু জেনে গিয়েছি – এবং জীবনের গুরুত্মপূর্ণ প্রায় সবকিছুই বইয়ে লেখা আছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলো নির্ভুলভাবে কাগজে লেখা প্রায় অসম্ভব, এবং সেটা আমার এই পোস্ট সম্পর্কেও সত্যি।

যখন সারা পৃথিবীর প্রায় সব জ্ঞান যখন একটা কীবোর্ড এবং মাউস দিয়ে পাওয়া যায়, তখন এটা মনে হতে পারে বাইরের পৃথিবীতে যেয়ে সেই জ্ঞান নিজে অর্জন করার কোনো দরকার নেই। সিনেমা, বই, খবরের কাগজ ইত্যাদির মাধ্যমে এখন মনে হতে পারে আমরা প্রায় সব কিছু সম্পর্কে জেনে যেতে পারি।

এটা একটা ভুল ধারণা। পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শিক্ষক হচ্ছে মানুষের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

ঘরে বসে বসে নাটক, সিনেমা, কম্পিউটার এর মাধ্যমে পৃথিবী সম্পর্কে জানা বন্ধ করে বাইরে যেয়ে নিজের জীবন থেকে সেই অভিজ্ঞতা লাভ করুন।

আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি – ২

পর্ব – ১

৬. মানুষকে কোনো কিছু বিশ্বাস করানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে নিজে একটা চমৎকার জীবন যাপন করা

কথা কিংবা যুক্তি-তর্ক দিয়ে মানুষকে যতোটা না বুঝাতে পারবেন, যেটার কথা বলছেন সেটা নিজে করে তার চেয়ে অনেক ভালো বুঝাতে পারবেন। যখন মানুষ আপনাকে দেখবে, আপনার কাজ দেখবে, তখন আপনার ওদেরকে আর আলাদাভাবে বিশ্বাস করানোর দরকার হবে না। তাদেরকে শুধু বলুন আপনি আপনার কাঙ্খিত জিনিসটি অর্জন করেছেন, জীবনে যেখানে পৌঁছাতে চান সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন কিংবা সেদিকেই ধাবিত হচ্ছেন। এরপর তাদেরকে জানান কীভাবে আপনি সেটা অর্জন করলেন বা করছেন। তাহলেই সবাই বুঝতে পারবে আপনি আসলে ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছেননা শুধু।

৭। পৃথিবীর কেউই সবকিছু জেনে বা পেয়ে বসে নেই

সবারই কিছু না কিছু সমস্যা আছে, কিন্তু তারা সেটা গোপন করে চলে। আপনি যখন একজন মানুষকে দেখেন তখন শুধু সে তাকে যেভাবে বাইরের পৃথিবীর কাছে দেখাতে চায় সেটাই দেখেন। আপনি হয়তো ভাবতেও পারবেন না তারা কীসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, কিংবা যে সুখী অবস্থায় তাদের দেখছেন সে অবস্থায় আসতে তাদের কীসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এটা সবার জন্যে সত্যি – কোটিপতি, ছাত্রছাত্রী, স্মার্ট তরুণ-তরুণী, লাজুক মানুষটি, এবং আর যেকোনো ধরণের মানুষই বলুন না কেনো, তাদের সবারই ভেতরের একটা জগত আছে – বাইরে থেকে তাদেরকে যেমনই মনে হোক না কেনো।

কারো সম্পর্কে সবকিছু জানার আগে কখনোই ভাববেন না সে খুব সহজে জীবনে সবকিছু পেয়ে গেছে।

৮। “আমি জানিনা” – এটা বলায় কোনো লজ্জা নাই

অনেকে কোনো বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করায় লজ্জা পান। এটা নিয়ে কোনো ভাবাভাবির অবকাশ নাই – জাস্ট বলে ফেলুন “আমি ব্যাপারটা সম্পর্কে জানিনা”। অজ্ঞতা লুকানোর চেয়ে সততা অনেক বেশি স্মার্ট একটা ব্যাপার।

৯। আরো বেশি টাকা কখনোই আপনার সব সমস্যার সমাধান করবে না

আপনার যদি খাবার এবং থাকার জন্যে পর্যাপ্ত টাকা থাকে তাহলে এরচেয়ে বেশি টাকা ছাড়াও আপনি জীবন চালিয়ে নিতে পারবেন। এটা আরো ভালো করে বুঝতে পারবেন যদি আপনি অসচ্ছল অথচ মোটামুটি সুখী এমন মানুষদের সাথে মিশেন। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলি পেতে কোনো টাকা লাগেনা, আর বাদবাকী জিনিসগুলো আপনি যতো দামী ভাবছেন ততোটা দামী না।

১০। আপনার সম্পদ আপনাকে কিনে নেয়

সত্যিকারের দরকারী জিনিসগুলো ছাড়া মানুষের অন্যান্য দামী সম্পত্তি-সম্পদ আসলে অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি বা এক ধরণের লোক দেখানো ছাড়া কিছুই না। বেঁচে থাকা এবং জীবন যাপনে সুবিধার জন্যে দরকারী না হলে এসব দামী জিনিসপত্র ছাড়া আপনি অনায়াসে আপনার জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন।

যখন আপনি জীবনে দামী জিনিসপত্র ছাড়া চলতে পারবেননা তখন এই জিনিসপত্রগুলি আপনার জীবনকে পরিচালিত করবে। আপনার দামী বাড়ি বা ফ্ল্যাট এবং ঘরের দামী ফার্নিচার থাকার কারণে আপনি অন্য জায়গায় সহজে চলে যেতে পারবেন না, এবং এগুলো পাওয়ার জন্যে আপনাকে সবসময় অনেক বেশি উপার্জন করা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। এবং আমার ধারণা এইসব দামী সম্পদ আপনার জীবনকে খুব বেশি সমৃদ্ধ করেনা। জীবনে যতো কম সম্পদ থাকবে ততোই আসলে ভালো।

১১। টেলিভিশনের মতো সময় অপচয়কারী বস্তু পৃথিবীতে আর কিছু নাই

আমার বয়স একুশ হওয়ার আগে আমি টিভি দেখে আমার জীবনের অনেক সময় অপচয় করেছি। আমার মনে হতো “অমুক প্রোগ্রামটি আমাকে দেখতেই হবে”। এখন আমার সেই হারানো প্রতিটি সেকেন্ডের জন্যে খুব দুঃখ হয়। সারা পৃথিবী এগিয়ে চলে যাচ্ছিলো ভবিষ্যতের দিকে আর আমি বসে বসে টিভি দেখছিলাম!

বিংশ শতাব্দীতে টিভি একটা গুরুত্মপূর্ণ জিনিস ছিলো – সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ এবং সংবাদ এর জন্যে। কিন্তু এখন টিভির আর তেমন দরকার নেই। টিভির খবরগুলো সাধারণত পক্ষপাতিত্বপূর্ণ হয় যেখানে আমাদের অনেক বিকল্প সংবাদ মাধ্যম রয়েছে। আর টিভির অনুষ্ঠানগুলো থেকে শেখার প্রায় কিছুই নেই, যদিও এগুলো মানুষের দিন থেকে ঘন্টার পড় ঘন্টা নিয়ে নেয়। অথচ আমরা প্রায়ই অনুযোগ করি আমাদের হাতে সময় নেই!

টেলিভিশন মানুষকে ঘরকুনো করে ফেলে। যদি টেলিভিশনে পছন্দের কোনো অনুষ্ঠান বা খেলা দেখতে চান তাহলে কোনো বন্ধুর বাসায় যেয়ে আড্ডা দিতে দিতে একসাথে দেখুন।

ঘরের ভেতরে বসে টেলিভিশনের স্ক্রীন এর মতো জড় একটা জিনিসের দিকে তাকিয়ে থেকে জীবনকে কোনোভাবের সমৃদ্ধ করতে পারবেননা।

১২। ইন্টারনেট হচ্ছে মানুষের তৈরি সবচেয়ে উপকারী জিনিস, কিন্তু এটাকে পরিমিতভাবে ব্যবহার করতে হবে

টেলিভিশন হচ্ছে একটা নির্বোধ জড় স্ক্রীন, তার বিপরীতে ইন্টারনেট হচ্ছে একটা সক্রিয় মাধ্যম। ইন্টারনেট নিয়ে আপনি অনেক কিছু করতে পারবেন, একটা ভার্চুয়াল সামাজিক জগতে ঢুকে যেতে পারবেন। ইন্টারনেট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে নানাভাবে সংযোগ স্থাপন করে এবং এটা ছাড়া আমার গতো আট বছরের জীবন অনেক কঠিন হতো।

ইন্টারনেটের এতো উপকারিতা সত্ত্বেও এটারো টেলিভিশনের মতোই সময় অপচয় করার সম্ভাবনা আছে। জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্যে ইন্টারনেট ব্যব্যহার করুন, কিন্তু সারাদিন এর মধ্যে পড়ে না থেকে বাইরে যেয়ে সেই সমৃদ্ধ জীবন উপভোগ করুন। টেলিভিশনের জড় স্ক্রীন এর জায়গায় কম্পিউটার এর অনেক কর্মকান্ডভরা স্ক্রীন ব্যবহার করলেই যে আপনার সময়ের সদব্যবহার হবে তা কিন্তু না। বাইরের পৃথিবী অনেক বেশি সুন্দর, বের হোন এবং সেটা উপভোগ করুন।

১৩। বাইরে যেয়ে মানুষের সাথে কিছু সময় কাটান

আমার খুব প্রিয় একটা ওয়েবসাইট হচ্ছে http://www.couchsurfing.org/। যেহেতু আমি নতুন নতুন ভাষা শিখতে আগ্রহী, এই সাইটের মাধ্যমে অনেক ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষকে আমার অতিথি হিসেবে আমার বাসায় থাকতে দিয়েছি এবং বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে তাদের ভাষা শিখতে পেরেছি।

সত্যিকারের পৃথিবী হচ্ছে বাইরের পৃথিবী – বই, টেলিভিশন, এবং ইন্টারনেটে যে পৃথিবী দেখছেন সেটা না। এই পৃথিবীর দেখা পাবেন আপনি বাইরের মানুষের সাথে মিশলে। নিজেকে লাজুক বা ইন্ট্রোভার্ট হিসেবে ভাবা বন্ধ করুন এবং নিজের ঘরের কিংবা দেশের বাইরে যেয়ে অন্য মানুষের সাথে মিশুন।

১৪। শুধু ইংরেজী ভাষা দিয়ে অন্য দেশের মানুষেকে খুব গভীরভাবে জানতে পারবেন না

আপনার বিদেশ ভ্রমণ যদি অল্প কিছুদিনের হয় তাহলে আপনি ইংরেজী দিয়ে অনায়াসে কিছুদিন চালিয়ে নিতে পারবেন। হোটেল বুক করা, রেস্টুরেন্টে খাবার অর্ডার দেওয়া, কিংবা একজন ভ্রমণ গাইডের সাথে ইংরেজীতে কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়া – সবই করতে পারবেন। হয়তো কিছু স্থানীয় শিক্ষিত বন্ধুবান্ধবও বানিয়ে নিতে পারবেন। আপনার হয়তো মনে হবে আপনি সে দেশ সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে গিয়েছেন

কিন্তু আপনি আসলে সত্যিকারভাবে কোনো দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবেননা শুধু সেদেশের ইংরেজী জানা মানুষজনের সাথে কথা বলে। শুধুমাত্র ইংরেজী জানলে আপনি সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। আমি আমার ভ্রমণ করা দেশগুলো সম্পর্কে এতো বেশি জানতে পেরেছি কেবলমাত্র তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলার কারণে। ওদের ভাষায় কথা বলতে না পারলে এতো গভীরভাবে তাদের সম্পর্কে জানা আমার পক্ষে অসম্ভব হতো।

যে কেউ চাইলেই একটা নতুন ভাষা শিখতে পারে। আমার বয়স যখন ২১ ছিলো তখনো আমি ভাবতাম এটা সম্ভব না। কিন্তু একদিন আমি সব ফালতু অজুহাত দেখানো বন্ধ করলাম এবং একটা নতুন ভাষা শিখে ফেললাম। কোনো ভাষা তাড়াতাড়ি শেখার গোপন উপায় হচ্ছে প্রথম দিন থেকেই সেই ভাষায় অল্প অল্প করে কথা বলা শুরু করা।

১৫। অন্য দেশের মানুষজন সম্পর্কে আপনি যা ভাবেন তারা আসলে সেরকম না

পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশই ধীরে ধীরে আধুনিক হয়ে উঠছে। এর মানে এই নয় যে ওরা সব পশ্চিমা দেশগুলো বা আমেরিকার মতো হয়ে উঠছে। সব দেশই ভিন্ন এবং সেটা ট্যুর বইয়ে তাদের সম্পর্কে যা পড়ে এসেছেন সেরকম নয়। ভিন্ন দেশের, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ সম্পর্কে প্রথাগত এবং পুঁথিগত ধারণা বাদ দিয়ে খোলা মন নিয় এওদের সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করুন।

আইরিশ মানুষ মানেই যে বিয়ার খায় তা নয়, ব্রাজিলের সবাই ফুটবল খেলেনা কিংবা সাম্বা নাচেনা, এবং জার্মান, ডাচ, ফিলিপিনো সবার সাথে কথা বলে আপনি অবাক হবেন যদি আপনার আগে থেকে পুষে রাখা ধারণা বাদ দিয়ে তাদের সাথে মিশেন।

মানুষের ভিন্নতাকে সম্মান করুন, তাদের কাছে গেলে তাদের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করুন। এমনো হতে পারে আপনার সংস্কৃতই ওদের কাছে পশ্চাদপদ মনে হবে!

১৬। জীবন নিয়ে তাড়াহুড়ো করবেন না, সময় নিন

যেসব দেশকে আমাদের কাছে “ধীর গতির” মনে হয়, আমি দেখেছি তারা আসলে তাদের নিজস্ব গতির জীবনে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী। যেসব মানুষ কিংবা দেশ সবকিছু তাড়াহূড়ো করে করতে চায় তাদের কাজের কোয়ালিটি আসলে ততোটা ভালো হয়না। সবকিছু সহজভাবে নিন এবং ধীরে ধীরে কাজ করুন।

খাবারের প্রতিটি কামড় উপভোগ করুন, হাঁটার সময় চারপাশ দেখে ধীরে ধীরে হাঁটুন, কারো সাথে কথা বলার সময় তাকে তার কথা পুরোপুরি শেষ করতে দিন এবং সে পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সেটা শুনুন।

দিনের কাজের ভেতর মাঝে মধ্যে কাজ বন্ধ করে বাইরে তাকান, কিংবা চোখ বন্ধ করে একটা বড় নিশ্বাস নিন, বেঁচে থাকার জন্যে নিজেকে সুখী ভাবুন।

১৭। আপনি সবাইকে খুশি করতে পারবেন না

“সফল হওয়ার উপায় হয়তো আমি জানিনা, কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার উপায় হচ্ছে সবাইকে খুশি করতে যাওয়া” – বিল কসবি।

নিজের মতামত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করুন। আপনার যদি আপনার মতামতের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস থাকে এবং সেই মতামত অন্যদের সাথে শেয়ার করেন তাহলে নিশ্চিতভাবে অনেক মানুষ আপনার উপর বিরক্ত হবে, আপনার কথাটা যতোই চমৎকার হোকনা কেনো। যারা আপনার সাথে একমত না এবং আপনার মত পছন্দ করছেনা এটা তাদের সমস্যা, আপনার না।

১৮। Cool হওয়ার চেষ্টা করা কিংবা সর্বশেষ ক্রেইজের পেছনে ছোটা আসলে Uncool

যারা সবসময় অন্যের দেখাদেখি নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে তারা আসলে নিজেদের ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভয় পায়। নিজের মেরুদন্ড শক্ত করুন, এবং স্রোতের বিপরীতে যাওয়াটাকে যদি আপনার সঠিক পথ মনে হয় তাহলে শক্তভাবে তাই করুন। আজকে যেটা চমকপ্রদ কয়েক বছর পর সেটাই হয়তো সবার অপছন্দের জিনিসে পরিণত হবে।

১৯। ভুল করতে ভই পাবেন না, জীবনে অনেক ভুল করুন

ভুলের মাধ্যমেই আমরা শিখি। সাফল্য আসে অনেক ভুলের পরেই

আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি

কিছুদিন আগে একটা ওয়েব সাইটে একটা চমৎকার লেখা পড়ি। ভদ্রলোক গতো আট বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং বিভিন্ন দেশের ভাষা এবং সংস্কৃতি শিখছেন। তার পৃথিবী ভ্রমনের আট বছর পুর্তি উপলক্ষে তিনি তার ভ্রমন থেকে কী শিখেছেন সেটার একটা লিস্ট দিয়েছেন ভাবলাম অনুবাদ করে ফেলি:)

মূল লেখার লিঙ্কঃ http://www.fluentin3months.com/life-lessons/

আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি
===========================================

আট বছর।
৪১৬ সপ্তাহ, যেটা প্রায় ৩০০০ দিন।

এই দীর্ঘ সময় আমার কোনো নির্ধারিত ঘর ছিলোনা। আমি ঘুরে বেড়িয়েছি দেশ থেকে দেশে, এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে। আমার সারা জীবনের অর্জন করা সব সম্বল আমার ট্রাভেল ব্যাগে করে নিয়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এই সময়টা। এটা ছিলো আমার জীবনের একটা বড় অংশ, এবং আমি এখনো এটা করে চলেছি।

এর আগেও আমি অবশ্য কয়েকটা জায়গায় ভ্রমন করেছি – দুটো গ্রীষ্ম আমেরিকায়, আর এক মাস স্পেইনে। এবং ২০০৩ সালে, আমার একুশতম জন্মদিনের সপ্তাহটিতে, আমি আমার জন্মস্থান আয়ারল্যান্ড ছাড়ি চিরদিনের জন্যে। এর কয়েকদিন আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করি, এবং আমি জানতাম এরপর হয়তো আমি আয়ারল্যান্ডে শুধু বেড়াতে আসবো, যদিও আমি জীবনে কখনো আমার পরিবারের সাথে ক্রিসমাস ডিনার না খেয়ে থাকিনি। কিন্তু আয়ারল্যান্ড আর আমার বাড়ি না। এখন থেকে “যেখানে আমি যাবো সেটাই হবে আমার বাড়ি”।

এর আগে আমার জীবনের প্রায় সবটুকু আমি ব্যয় করেছি বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে। কিন্তু সেখানে আমি গুরুত্মপূর্ণ প্রায় কিছুই শিখিনি। বইয়ে লেখা জিনিসগুলো প্রায় সবই আমি আগে থেকে জানতাম, কিন্তু আমি যা হতে চেয়েছি জীবনে সেটা আমি শিখেছি গতো আট বছরে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে। এবং আমার নিশ্চিতভাবে এখনো অনেক কিছু শেখার আছে।

গতোকাল ছিলো আমার ২৯-তম জন্মদিন, এবং এই সপ্তাহে আমার পৃথিবী ভ্রমনের আট বছর পূর্ণ হচ্ছে। তাই ভাবলাম আমার এই আট বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ২৯টি শিক্ষা আপনাদের সাথে শেয়ার করি। এগুলো বেশিরভাগই জীবন নিয়ে সাধারণ কথাবার্তা, কিন্তু এগুলো আমি শিখেছি সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের সাথে মেশার পরঃ

১। সব জায়গায় সব মানুষ আসলে একই জিনিস চায়

যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি অনেক ভিন্ন, আপনি ইটালিয়ান কোটিপতি থেকে শুরু করে গৃহহীন ব্রাজিলিয়ান, নেদারল্যান্ডস এর জেলে, ফিলিপাইনের কম্পিটার প্রোগ্রামার এর সাথে তাদের নিজের ভাষায় তাদের মতো করে কথা বলে দেখবেন যে তারা সবাই জীবনের গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলোর ব্যাপারে একই রকম চিন্তা করে।

সবাই চায় স্বীকৃতি, ভালোবাসা, নিরাপত্তা, বিনোদন, এবং একটা ভবিষ্যতের আশা। এই চাওয়াগুলির প্রকাশ এবং এগুলো পাওয়ার জন্যে সবার কাজে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এই বাহ্যিক ব্যাপারগুলো উপেক্ষা করলে দেখবেন পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ আসলে প্রায় একই জিনিস চায়।

২। সুখ ভবিষ্যতের জন্যে তুলে রাখা বড় ভুল

অসংখ্য মানুষ ভাবে “ওই একটা জিনিস” যদি ঠিক হয়ে যায় “তাহলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে”।

এটা একটা ঘোর (ডিলুশন)।

যখন “ওই একটা জিনিস” ঠিক হবে, তখন “আরো একটা” জিনিস আপনার জীবনে বাকি থেকে যাবে। জীবনে কখনো সবকিছু একসাথে আপনার কাছে ধরা দিবেনা। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি জীবনে সুখী হওয়া শুধু একটা জিনিস ঠিক হয়ে যাওয়ার উপর নির্ভর করেনা, এভাবে সুখী হওয়াও যায়না। এরচেয়ে এই মুহুর্তে আপনার যা আছে তা নিয়ে সুখী হোন, বর্তমানকে উপভোগ করুন, এবং একইসাথে ভবিষ্যতের জন্যে জন্যে কাজ করে যান। সাফল্য আসলে একটা ভ্রমন, গন্তব্য নয়!

আপনার জীবনের একটা বড় অংশ যদি একটা বড় কিছুর জন্যে কাজ করে চলে যায় তাহলে সে কাজটি হয়ে যাওয়ার পর আপনার জীবনে আর তেমন কিছুই থাকবেনা। কোনো বড় কিছুর জন্যে কাজ করলেও নিজেকে সুখী হওয়া থেকে বঞ্চিত করবেন না, কাজটি শেষ হওয়া পর্যন্ত সুখী হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে থাকবেন না, কাজ করতে করতেই সুখী হওয়ার চেষ্টা করুন।

ধীরে ধীরে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন এবং এই ভ্রমন উপভোগ করুন।

অনুষ্টানটি উপভোগ করুন, শেষ দৃশ্যের জন্যে তাড়াহূড়ো করবেন না।

আমাদের জীবন হচ্ছে এখন – অতীত এবং ভবিষ্যত কোনোটাই না।

৩। “একদিন আমার সময় আসবে আর আমি সুখী হবো” – এটা একটা ফালতু চিন্তা। আপনি কখনোই লটারি জিতবেন না। বাস্তববাদী হোন।

অনেকের ভাগ্য নিয়ে একটা অদ্ভুত ধারণা আছে – আল্লাহ/ঈশ্বর/ভগবান/দেবতা কেউ একদিন কোনোভাবে তাদের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিবেন। তারা ভাবেন তারা “সৌভাগ্য পাবার যোগ্য” এবং “একদিন সব এমনি এমনি ঠিক হয়ে যাবে” তাদের জন্যে। কেউ কেউ ভাবেন একদিন তারা লটারি জিতবেন কিংবা ভালো কিছু একটা ঘটবে তাদের জীবনে। অনেক মেয়ে ভাবে একদিন তার রাজপুত্র এসে তাকে নিয়ে যাবে স্বপ্নের দেশে!

এই ধরণের ভাবনা আসে পৃথিবী কীভাবে কাজ করে সেটা সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা থেকে। হতে পারে আমি ভুল, হয়তো প্রার্থনা বা আশা থেকে ভালো কিছু ঘটতে পারে, হয়তোবা মানুষ হিসেবে ভালো হয়ে থাকতে পারলে একসময় ভালো কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু আশা, প্রার্থনা, এবং ভালো হওয়ার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম করে চাওয়ার জিনিসটাকে অর্জন করার চেষ্টা করে যেতে দোষ কোথায়?

আমি ব্যক্তিগতভাবে জাদু, জ্বীন-পরী, জ্যোতিষবিদ্যা, কিংবা কোনো অদৃশ্য সত্ত্বায় বিশ্বাস করিনা । এগুলোর ব্যাপারে আমি সন্দিহান এবং আমি বিশ্বাস করি এগুলো সবকিছু অসম্ভব এবং হাস্যকর। এইসব অদৃশ্যে বিশ্বাস না করাটা আমার জীবনকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। একজন বাস্তববাদী মানুষ হিসেবে পৃথিবীকে আমি খুব যুক্তির জায়গা হিসেবে দেখি যেখানে প্রকৃতির তৈরি বৈজ্ঞানিক নিয়ম এবং মানুষের তৈরি সামাজিক নিয়ম অনুসারে সবকিছু চলে। এবং পৃথিবীকে এভাবে দেখার কারণে আমি অনেক সহজভাবে সবকিছু দেখতে পারি।

এই বিশ্বজগত আপনাকে কিছু দেবার জন্যে পণ করে বসে নেই। আপনাকেই আপনার জীবন গুছিয়ে তোলার জন্যে কাজ করে যেতে হবে।

৪। নিয়তি বলে কিছু নাই, এবং এটা একটা সুখবর!

নিয়তি’র দোহাই দিয়ে আমরা অনেকেই জীবনে ভালো কিছু করা থেকে বিরত থাকি। আসল ঘটনা হচ্ছে নিয়তি বলে কিছু নাই ।

আপনার ব্যর্থতা কিংবা সীমাবদ্ধতা আপনার জন্ম কোথায় হয়েছে সেটার উপর নির্ভর করেনা, কিংবা আপনি কাকে চিনেন, আপনার জিন কেমন, আপনার কতো টাকা আছে, আপনার বয়স, আপনার অতীত, বা অন্য কোনো কিছুর সাথেই এর কোনো সম্পর্ক নাই। কোনো কিছুর দোহাই দিয়ে আপনার সীমাবদ্ধতাকে আপনি জাস্টিফাই করতে পারবেননা।

যদি সত্যিকারভাবে সংকল্পবদ্ধ হন, তাহলে জীবনে অর্জন করার অজস্র সুযোগ আছে – আপনি কে কিংবা আপনার কাছে কতো টাকা আছে এটা কোনো ব্যাপারই না।

৫। আপনার থেকে ভিন্ন বিশ্বাস ও মতের মানুষের সাথে কথা বলুন এবং তাদের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করুন

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সাথে পৃথিবীর অনেক মানুষের বিশ্বাসের কোনো মিল নাই। কিন্তু মানুষ এই ভিন্ন বিশ্বাসে থেকেও জীবনের তাৎপর্য খুঁজে পায়। যদি সবাই আমার মতো বিশ্বাস করতো এবং ভাবতো তাহলে পৃথিবীটা একটা রসকষহীন জায়গায় পরিণত হতো।

অতএব আমি যখন আমার থেক ভিন্ন বিশ্বাসের কোনো মানুষের সাথে মিশি, তখন তাদেরকে আমার বিশ্বাসে নিয়ে আসার চেয়ে তাদের বিশ্বাস তাদের কাছে রেখে একসাথে মিলে চলার চেষ্টা করাই ভালো।

কেউ যখন তার কোনো বিশ্বাস এর ব্যাপারে “১০০% নিশ্চিত” এবং বহু বছর ধরে সেই বিশ্বাস ধারণ করে আসছে, তখন তাকে কিছু চালাকী কথাবার্তার মাধ্যমে তার বিশ্বাস থেকে সরানো যায় না। সবাই কিছু কিছু ব্যাপারে বদ্ধ মনের মানুষ, আমি নিজেও তাই।

কেউ যদি নিজে নিজের বদ্ধ মন থেকে বের হতে না পারে তাহলে তাকে সেটাই বিশ্বাস করতে দেওয়া উচিত। আপনিই ঠিক আর অন্যরা ভুল – পৃথিবীকে এটা বোঝানোর দায়িত্ব নেওয়ার দরকার নাই। কখনো কখনো হয়তো আপনার বিশ্বাসটিই ভুল!

পৃথিবী আরো অনেক বেশি মজার জায়গা হয় যখন সেখানে বিভিন্ন বিশ্বাসের এবং আগ্রহের মানুষ থাকে। আমার নিজের সন্দেহবাদীতা সত্ত্বেও আমি অনেক জ্যোতিষী, হস্তরেখা বিশারদ, অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ, রক্ষণশীল মানুষ, এবং প্রযুক্তিকে ঘৃনা করে এমন অনেক মানুষের সাথে মিশেছি। এবং সেজন্যে আমার জীবন অনেক বেশী বৈচিত্রময় এবং সমৃদ্ধ
হয়েছে।

আপনি যদি শুধুমাত্র যারা আপনার সব কথায় হ্যাঁ বলে এমন মানুষদের সাথে মিশেন তাহলে আপনি কখনো ভুল করছেন কিনা এটা জানার সুযোগ পাবেন না এবং নতুন জিনিস শিখতেও পারবেন না।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)