Category Archives: Life

আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?

১। মৃত্যু উপত্যকা

প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীরের দূর্ঘটনায় অকালমৃত্যু আমাদের সবার হৃদয় ভেঙ্গে দিয়েছে। এটা এমন এক ক্ষতি আমাদের জাতির জন্যে যেটা সহজে পূরণ হবার নয়। এমনিতেই আমাদের চলচ্চিত্রের যাচ্ছেতাই অবস্থা, এর মধ্যে একজন চরম প্রতিভাবান নির্মাতাকে হারানো মানে আসলে আমাদের চলচ্চিত্রের আরো অনেকখানি পিছিয়ে যাওয়া।

সড়ক দূর্ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিছুদিন আগেও আমাদের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে বাসে বাসে সংঘর্ষের পর অল্পের জন্যে বেঁচে গেলেন, যদিও সেই দূর্ঘটনায় ছয়জন হতভাগা মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলো।

নৌপথেও আমাদের দেশে প্রায়ই লঞ্চডুবি হয়। বছর বছর শত শত মানুষ মারা যায় তাতে।

কয়দিন পরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে রাস্তায় পড়ে মরে থাকে কিশোরের মৃতদেহ। ইট, রড দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে রাখি তরুণদের, যে আমাদেরই কারো না কারো স্বজন, পরিচিত জন।

আমাদের র‍্যাব-পুলিশ তো মানুষ মারাকে কৌতুকের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। রাত তিনটার সময় র‍্যাবের গাড়ি থেকে পালাতে যেয়ে গুলি খেয়ে মরে যায় কোনো তরুন, তার মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকে কোনো দেশীও অস্ত্র! বিচার বিভাগ নামে যে একটা প্রতিষ্ঠান আছে সেটা মনে হয় আমাদের র‍্যাব-পুলিশের লোকজন কোনোভাবেই মানতে রাজী নন।

২। এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়!

তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর খবরের কাগজে, ফেইসবুক, টুইটার, ব্লগে মানুষের হাহাকার উঠেছে। সবারই মোটামুটি এক কথা – এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়! এ কোন দেশে আছি আমরা, আমাদের কি সরকার নেই? আমরা কি আফ্রিকার কোন যুদ্ধপীড়িত দেশ? এই লাশের মিছিল থামানোর দায়িত্ব কি কারো নয়?

৩। অযোগ্য রাজনীতিবিদ-আমলা-পুলিশ

রাজনীতিবিদরা আমাদের দেশের চিরকালীন ভিলেন। বাজের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে? বানিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সাথে যোগসাজশ করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সড়ক দূর্ঘটনায় কেউ মারা গেছে? যোগাযোগ মন্ত্রী করেটা কী? জঙ্গিরা বোমা ফাটিয়েছে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নিজের দলের উপকার ছাড়া আর কোনো কাজে আগ্রহী না। শেয়ার বাজার পড়ে গেছে? অর্থ মন্ত্রী নিজেই এই চক্রের সাথে জড়িত!

হয়তো ব্যাপারটি সত্যি। আমাদের রাজনীতিবিদদের অদক্ষতা এবং অসততা আমরা আমাদের সামনেই দেখে চলেছি।

রাজনীতিবদদের সাথে আমাদের ভিলেনের তালিকায় আছে দুর্নীতিপরায়ণ এবং অদক্ষ আমলা এবং পুলিশ বাহিনী। রাজনীতিবিদদের সাথে তাল মিলিয়ে এই মানুষগুলোর কর্মকান্ডও দিন দিন আমাদের কষ্টের এবং দেশকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন ভঙ্গের পেছনে অনেক অবদান রাখছে।

৪। অযোগ্য আরো অনেকে

শুধু কি রাজনীতিবিদ, আমলা, পুলিশ নিয়ে আমাদের অভিযোগ?

– আমাদের শিক্ষকদের নিয়েও আমাদের অনেক হতাশা, তারা দিনের পর দিন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা বাদ দিয়ে রাজনীতি করে চলেছেন।
– হতাশা আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের নিয়ে যারা আমাদের আশা অনেক উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে বারবার নিরাশ করছে। ফুটবল খেলোয়াড়দের নিয়ে আমাদের হতাশা তো এমন পর্যায়ে যে আমাদের আর কোনো আশাই নাই ওদের নিয়ে।
-আমাদের বিজ্ঞানীরা খুব কমই গর্ব করার মতো কিছু আবিষ্কার করতে পেরেছেন এখন পর্যন্ত।
– আমাদের চলচ্চিত্র এমন পর্যায়ে যে আমাদের মধবিত্ত, উচ্চবিত্ত সমাজ চলচ্চিত্র প্রায় বর্জন করে চলেছেন।
– আন্তর্জাতিক কোনো ক্রীড়া প্রতযোগিতায় আমাদের কখনো তেমন কোনো সাফল্য নাই।
– বিজ্ঞান-প্রকৌশলে আমাদের কোনো বড় অর্জন নাই। আমাদের বড় বড় ব্রিজ, বিল্ডিং ইত্যাদি এখনো বিদেশী প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয়।
– আমাদের বাস-ট্রাক ড্রাইভাররা খেয়াল খুশি মতো গাড়ি চালায় আর মানুষ মারে?

এই লিস্ট এর অন্ত নেই। মনের সুখে যোগ করুন আপনার অভিযোগটি।

এবং এর প্রতিটির জন্যে আমরা নিয়ম করে বকাঝকা, গালাগাল করে যাচ্ছি অদক্ষ, অযোগ্য মানুষগুলোকে। আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের যে কী পরিমান গালি খেতে হয় সেটা ফেইসবুক, ব্লগিং না থাকলে মনে হয় আমার জানা হতো না!

৫। আমি ছাড়া আর সবাই খারাপ, অযোগ্য?

এই যে চারদিকে এতো খারাপ মানুষ, অযোগ্য মানুষের দল এরা কোথাকার মানুষ, কোন দেশের মানুষ?

এরাই কি “আমরা” নয়? এরা কি আমাদের পরিবার, স্বজন, বন্ধু, পরিচিত কেউ নয়?

আয়নার সামনে দাঁড়ালে যে মানুষটাকে দেখা যায় সে কতোটুকু ভালো? কতটুকু যোগ্য?

নিজের ভালোত্ব বাড়ানোর জন্যে জীবনে কী করেছি? দক্ষতা, যোগ্যতা বাড়ানোর জন্যে কী করেছি? দেশের ভালোর জন্যে কী করেছি? নাকি নিজেকে অযোগ্য রেখে দিয়ে দেশকে আশা করেছি যোগ্য হতে? দেশ কি পনের কোটি মানুষের বাইরের কিছু? পনের কোটি মানুষ যদি যোগ্য হয়ে না উঠে, তাহলে দেশ কিভাবে যোগ্য হবে?

৬। এই মৃত্য উপত্যকা আসলে আমি, আপনি, এবং আমাদের আগের প্রজন্মের তৈরি!

কিশোর এবং তরুণ বয়সে আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল পড়ালেখা। এর সাথে খেলাধুলা আর কিছু সাংস্কৃতিক কাজে জড়িত হওয়া। আমি এর কোনোটাই ভালোভাবে করতে পারিনি। আমি বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে মেরে আলসেমী করে আমার সময় নষ্ট করেছি। সেজন্যেই আজ আমার কাজে দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের না। আমাদের দেশ যে পিছিয়ে আছে অন্য অনেক দেশ থেকে সে ব্যাপারে আমি অবদান রাখছি।

আমার ধারণা একই কথা আপনার ক্ষেত্রেও সত্যি। সেটা না হলে আপনার প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। আপনি এখন আমাদের দেশের জন্যে কিছু করুন এবং আমাদেরকেও পথ দেখান।

আমাদের চেয়ে বড় দোষ আমাদের আগের প্রজন্মের। আমাদের বাবা-মা’র। আমি দুঃখিত আপনার অনুভুতিতে আঘাত লাগলে, কিন্তু আমাদের আগের প্রজন্ম আমাদেরকে একটা জঘন্য বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন।

তারা আমাদের একটা স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়েছে সত্যি (সেজন্যে তাদের কাছে সীমাহীন কৃতজ্ঞতা), কিন্তু তারা আমাদের উপহার দিয়েছেন একটা দুর্নীতিতে শ্রেষ্ট দেশ। দেশের প্রতি মায়া-মমতাহীন একদল রাজনীতিবিদ। ছাত্র রাজনীতি নামক ভয়াবহ সন্ত্রাসী এবং পশ্চাদপদ একটা ব্যবস্থা যেটা আমাদের সমাজকে, দেশকে তিলতিল করে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

তারা আমাদের মানুষ করার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারেন নি। যখনি আমি একটা অযোগ্য বালক-বালিকা কিংবা কিশোর-কিশোরী দেখি, তখনি আমার সেই বালক-বালিকা কিংবা কিশোর-কিশোরীর বাবা-মা’র প্রতি এক ধরনের রাগ কাজ করে। বাবা-মা চাইলে সন্তানদের সঠিকভাবে বড় করে তোলা খুব কঠিন কিছু না। আমাদের সীমিত সম্পদ, কিন্তু এটা দিয়েই আমাদের শুরু করতে হবে। কোনো দেশই প্রথমের উন্নত হয়ে শুরু করেনি!

এই অযোগ্য আমি, আপনি, আর আমাদের আগের প্রজন্ম থেকে তৈরি হয়েছে আমাদের রাজনীতিবিদগন, আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা, আমাদের ফুটবলাররা, চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকারা, ঘাতক বাস ড্রাইভার, খুনী র‍্যাব-পুলিশ।

৭। পরিবর্তন শুরু হতে হবে নিজের থেকে

যে দেশের স্বপ্ন দেখি আমরা (এবং প্রতিনিয়ত সেই স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় ভুগি) সে দেশ পেতে হলে আগে নিজেকে ভালো, যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।

পনের কোটি মানুষের বেশির ভাগ মানুষ যেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে বলতে পারবে “আমি সত্যিকারভাবে একজন ভালো মানুষ, যোগ্য মানুষ, অন্তত পক্ষে সেরকম হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি” সেদিন শুধুমাত্র আমরা আমাদের স্বপ্নের দেশ পাবো। তার আগ পর্যন্ত কেবল “নিজে ভালো, অন্যরা খারাপ” বলে গলা ফাটিয়ে যাবো, কিংবা বিভিন্ন উন্নত দেশের এম্ব্যাসিতে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে কোনোমতে এই মৃত্যু উপত্যকা থেকে পালানোর চেষ্টা করে যাবো।

Advertisements

সমালোচনা

সম্প্রতি আমেরিকান লেখক, দার্শনিক এলবার্ট হাবার্ড একটা দুর্দান্ত উদ্ধৃতি পড়লামঃ “To avoid criticism do nothing, say nothing, be nothing”. অর্থ্যাৎ, সমালোচনা এড়াতে চাইলে কিছু করো না, বলো না, হয়ো না। যার জীবনে কোনো অর্জন নেই, যে পৃথিবী ধ্বংস হলো কি গড়লো এটা নিয়ে মাথা ঘামায়না তাকে নিয়ে কেউ সমালোচনা করার তেমন কিছু খুঁজে পায়না। যখনি আপনি কিছু করতে যাবেন, কিছু একটা বলতে যাবেন, কিছু একটা হতে যাবেন, পৃথিবী দুইভাগ হয়ে যাবে। একদল আপনাকে প্রশংসা করবে, আপনি আরো এগিয়ে যান সেই কামনা করবে, আর আরেকদল আপনার মুন্ডুপাত করবে। জীবনের বাস্তবতায় স্বাগতম!

পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটির বিরুদ্ধেও অনেক সমালোচনা হয়। সত্যিকথা বলতে কি, “সবচেয়ে ভালো মানুষ” নামে কিছুর আসলে অস্তিত্ব নেই। আপনার কাছে যিনি অনেক ভালো মানুষ, অনেক শ্রদ্ধার পাত্র, অন্যের কাছে তিনি হয়তো ততোটাই বাজে লোক।

আমরা মানুষেরা আমাদের পরিবেশের দ্বারা তৈরি। আমরা যে পরিবেশে বড় হয়েছি, আমাদের বাবা-মা আমাদের যে শিক্ষা আর মূল্যবোধ শিখিয়েছেন, আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা যা শিখেছি, চারদিকের পরিচিত আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুবান্ধব থেকে আমরা যে জ্ঞ্যান লাভ করেছি, বই-পত্র-টেলিভিশন-সিনেমা ইত্যাদি থেকে আমরা সংস্কৃতি-চেতনা শিখছি, সেসব ব্যবহার করে আমরা আমাদের চারপাশকে বিচার করি, মূল্যায়ন করি। এবং প্রত্যেক মানুষের বড় হয়ে উঠা, শিক্ষার বিষয়বস্তু একে অন্যের চেয়ে ভিন্ন। ফেইসবুক, টুইটারের কল্যানে মানুষের “সামাজিক গ্রাফ” দেখা যায় এখন। এই সামাজিক গ্রাফ থেকেই মানুষ তার বিচার-বিবেচনা তৈরি করে, পৃথিবীকে দেখার লেন্স বানায়।

আমি অনেক মেধাবী এবং গুনী মানুষকে চিনি যারা শুধু উটকো সমালোচনার ভয়ে নিজের নিরাপদ বলয়ের বাইরে বের হননা। “কী দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে, ভালোই তো আছি” – এটা হচ্ছে তাদের চিন্তা। এবং তাদেরকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সাথে সাথে আমাদের সমালোচনার বারুদও অনেক তাড়াতাড়ি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আপনি হয়তো কোনো গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্যে একটা স্কুল করে দিলেন। দুইটা পত্রিকায় আপনাকে নিয়ে বিশাল প্রশংসাসূচক লেখা ছাপা হতে না হতেই অন্য তিনটা পত্রিকায় আপনার নামে যাবতীয় কুৎসা ছড়ানো হবে। পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, কর্পোরেট শক্তির ইন্ধনে আপনি যে স্কুলের নাম করে তলে তলে বিশাল ষড়যন্ত্র করে বসে আছেন সেটা নিয়ে অনেক কেচ্ছা কাহিনী ছাপানো হবে। অথচ আপনি শুধু ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার একটা ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন, এই যা।

আমি যখন প্রথম বিদেশে পড়তে আসি তখন এখানকার একজন বাংলাদেশী অধ্যাপক আমাকে বলেছিলেন বাংলাদেশে একজন মানুষের ক্ষতি করা অনেক সহজ কিন্তু কারো উপকার করা অনেক ঝামেলার ব্যাপার। তাঁর কথাটি ভালো করে বুঝিনি তখন। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কেনো তিনি ওরকম একটি কথা বলেছিলেন। আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা চারদিকের নেগেটিভ জিনিসে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এখন আর মানুষের ভালোত্বে বিশ্বাস করি না সহজে। কেউ যে বিনা কারণে ভালো হতে পারে, স্বার্থহীন হতে পারে এটা বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়।

আমি সবসময় যে উপমাটার কথা ভাবি আমাদের বিচার-বিবেচনা নিয়ে সেটা হলোঃ আমরা আমাদের চারপাশকে হয় গাফফার চৌধুরী কিংবা শফিক রেহমানের দৃষ্টিতে দেখি। এই দুইজন মেধাবী মানুষ বিএনপি এবং আওয়ামীলীগের আইকন সমর্থক। “সূর্য পূর্বদিকে উঠে” এটা নিয়ে রচনা লিখতে দিলে এরা খুব সুন্দর করে প্রমান করতে পারবে সূর্য পূর্বদিকে উঠাটা কিভাবে হাসিনার/খালেদার কৃতিত্ব কিংবা আওয়ামীলীগ/বিএনপির ষড়যন্ত্র। কোনো কিছু সাদাকালো চোখে দেখার ক্ষমতা এরা হারিয়ে ফেলেছেন। স্পেইডকে স্পেইড বলার ক্ষমতা আর এদের নাই। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে আমাদেরও সবসময় একটা পক্ষ নিয়েই পৃথিবীটাকে দেখতে হবে। হয় আওয়ামীলীগ, না হয় বিএনপি, না হয় জামাত, না হয় সমাজতন্ত্র।

আমাদের একদল ডক্টর ইউনুসকে শ্রদ্ধা করি, বিশ্বাস করি তিনি মানুষের ভালো করতে চান। ভালো করতে পারছেন কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য মহৎ সেটা আমরা বিশ্বাস করি। আবার আরেকদল বিশ্বাস করি তিনি পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, কর্পোরেটবাদী, সামন্ততান্ত্রিক বিশ্ব মোড়লদের প্রতিনিধি। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে দারিদ্র্য দূর করার নামে মানুষের টাকা হাতিয়ে নেয়া এবং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের কাছে পাচার করা। আমাদের একদল মানুষ জাফর ইকবাল স্যারের নামে পাগল, আবার আরেকদল তাঁকে ইসলাম এর শত্রু, আওয়ামীলীগের দালাল মনে করে। অনেকে প্রথম আলোকে একটা সৎ পত্রিকা মনে করি, অন্তত সৎ থাকার চেষ্টা করে বলে মনে করি। আরেকদল ভাবি প্রথম আলো সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার। একইভাবে বড় বড় বহুজাতিক কম্পানীগুলোকে আমরা মনে করি শয়তানের দোসর, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের গরীব মানুষদেরকএ শোষণ করে সব টাকা বিদেশে পাচার করা।

আমাদের অনেকের রাতের ঘুম হারাম হয় আমেরিকা, ভারত এবং অন্যদের চক্রান্তের কথা ভেবে ভেবে। আজকে আমেরিকা যে এতো উন্নত হয়ে উঠেছে এটা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সব টাকা শোষণ করে হয়েছে। এবং অন্যনায় গরীব দেশেরও। আচ্ছা আমেরিকা না হয় বিশ্ব মোড়ল। সুইজারল্যান্ড এর কথা ধরি। কিংবা ফিনল্যান্ড। অথবা নিউজিল্যান্ড। এরা এতো উন্নত হয়েছে কোন দেশকে শোষণ করে? কখনোতো শুনিনি এই দেশগুলো অন্যে দেশকে মিয়ে মাথা ঘামাতে। কাউকে শোষণ না করে যে শুধুমাত্র একটা চমৎকার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস, মানুষের ভালো কামনা করে যে উন্নত হওয়া যায় সেটা তো আমেরিকা আর ইংল্যান্ড কে বাদ দিয়ে বাদবাকী উন্নত দেশগুলোর দিইকে তাকালেই বুঝা যায়। জীবন যে কতো সুন্দর হতে পারে, জীবন-যাপন যে কতো আরামদায়ক হতে পারে আধুনিক সভতার কল্যানে সেটা এসব উন্নত দেশে গেলে বুঝা যায়। আমরা কবে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত নিয়ে বেহুদা চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশটাকে সেরকম উন্নত করতে পারবো?

আমরা কেনো উন্নত হতে পারছিনা? আমাদের কেনো মনে হয় চারদিকের সবাই খারাপ, সবাই ষড়যন্ত্রকারী, চক্রান্তকারী? আমি আমার সাম্প্রতিক একটা লেখায় বলেছিলামঃ

“যেসব মানুষের নিজের উপর শ্রদ্ধা কম তারা বেশি (কু)সংস্কারে ভোগে। অর্থাৎ যেসব মানুষ আসলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে খুশি নয়, নিজের উপর নিজের খুব বেশি শ্রদ্ধা নাই, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে, তারা সাধারণত মানুষকে নিয়ে বেশি নেগেটিভ কথা বলে। অন্যের ভালো কিছু দেখলে তারা সহজে খুশি হতে পারেনা, তাদের প্রথম চিন্তাটি হয় নেগেটিভ। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারেনা এরা।”

আমরা যদি বিশ্বাস করি ইউনুস খারাপ তাহলে কেনো আমরা নিজেরা একটা নতুন মডেলের প্রতিষ্ঠান গড়ে ভালো কাজটি করে দেখাইনা? প্রথম আলো খারাপ; ঠিক আছে, তাহলে ভালো পত্রিকা কোনটি? একটাও না? আপনি নিজে একটা পত্রিকা বানিয়ে দেখিয়ে দিন ভালো পত্রিকা কেমন হতে পারে। ফোন কম্পানীগুলো খারাপ? দেশের গরীব মানুষের টাকা চুষে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে? চলেন আমরা নতুন একটা ফোন কম্পানী বানাই। কিংবা আমাদের সরকারকে চাপ দেই যাতে এমন আইন তৈরি করে যেটা দিয়ে মানুষের স্বার্থ রক্ষা হবে আরো ভালো করে। হাজার হোক সরকার তো আমাদের, ওরা তো আর বিদেশী শক্তি নাই।

দুঃখজনকভাবে একই কথা খাটে আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রেও। আমরা সবাই (এই লেখকসহ) রাজনীতিবিদদের ঢালাও সমালোচনা করি, কিন্তু আমরা কেউই নিজেরা রাজনীতিতে জড়াতে চাইনা। হাসিনা-খালেদার হাজার দোষত্রুটি সত্ত্বেও ওরাই কিন্তু রাজনীতি নামের কষ্টকর পেশাটি করে যাচ্ছে, এবং আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশের জন্যে মোটামুটি সন্তোষজনক একটা জিডিপি বৃদ্ধির হার বজায় রেখেছে গতো দুই দশক ধরে। আমরা আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ বানাতে চাই, কিন্তু রাজনীতিবিদ বানাতে চাইনা। মেধাবী ছেলেমেয়েরা যদি রাজনীতিতে না যায়, তাহলে ছাত্রদল-ছাত্রলীগের ছাত্ররাজনীতিবিদ নামের অর্ধশিক্ষিত ছাত্ররা রাজনীতিতে যেয়ে দেশের ভবিষ্যতের আরো বারোটা বাজাবে। আমি জানি রাজনীতিতে যোগ দেওয়া অনেক কঠিন, বর্তমান রাজনীতিবিদ এবং ছাত্ররাজনীতির গুন্ডারা এটাকে আরো কঠিন করে রেখেছে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্যে। কিন্তু তাই বলে তো বসে থাকলে চলবেনা, একটা না একটা পথ বের করতেই হবে এটাকে সংশোধনের জন্যে। রাজনীতির বাইরে থেকে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে যেতে হবে এই ট্রেন্ড পরিবর্তন করার।

যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম। পৃথিবীতে “নিখুঁত” বলে কিছু নেই। মানুষও নিখুঁত হতে পারেনা। পরম শদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সাইদ স্যারকে নিয়েও কতো বাজে কথা শুনেছি। এবং এটা হবেই। এর একটা ভালো দিক হচ্ছে সমালোচনা আমাদেরকে, আমাদের কাজকে আরো শুদ্ধ করে। “নিখুঁতত্ত্ব” এর দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়া যায় সমালোচনার মাধ্যমে। যতোদিন মানুষ থাকবে ততোদিন মানুষের ভিন্ন মত থাকবে। ঘটনাক্রমে এটা গণতন্ত্র নামক শাসন ব্যাবস্থার সৌন্দর্য্য! পৃথিবীর সব উন্নত দেশগুলোতে যে কার্যকর একটা গণতন্ত্র আছে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই!

যারা সমালোচনার ভয়ে বসে না থেকে নিজের মনের কথা বলে ফেলে, দেশের জন্যে কিছু একটা করার চেষ্টা করে ফেলে, নিজে কিছু একটা হতে চেষ্টা করে তাদের নিয়ে প্রয়াত আমারিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট একটা যুগান্তকারী কথা বলেছিলেনঃ

“It’s not the critic who counts, not the man who points out how the strong man stumbled, or when the doer of deeds could have done better. The credit belongs to the man who is actually in the arena; whose face is marred by dust and sweat and blood; who strives valiantly; who errs and comes short again and again; who knows the great enthusiasms, the great devotions and spends himself in a worth cause; who at the best, knows in the end the triumph of high achievement; and who at the worst if he fails, at least fails while daring greatly, so that his place shall never be with those cold and timid souls who know neither victory nor defeat।”

অনুবাদঃ

যারা সমালোচনা করছে তারা গুরুত্মপূর্ণ না। যারা আঙ্গুল উঁচু করে দেখিয়ে দিচ্ছে শক্ত মানুষটি কিভাবে হোঁচট খাচ্ছে তারাও গুরুত্মপূর্ণ না। যারা বাইরে থেকে উপদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছে কিভাবে কাজটা আরো ভালোভাবে করা যেতো ওরাও গুরুত্মপূর্ণ না। সব কৃতিত্ব হচ্ছে তাঁর যিনি আসলে সত্যিকার মাঠে নেমে যুদ্ধ করছেন। যাঁর মুখ এবং দেহ ধূলা, ঘামে, এবং রক্তে রঞ্জিত। যিনি জীবন দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যিনি বারবার ভুল করছেন এবং জয়ের একেবারে শেষ মাথায় এসে পৌঁছাচ্ছেন। যিনি চরম উৎসাহ, আগ্রহ, সাধনা নিয়ে নিজেকে একটা অর্থপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করেছেন। যিনি বিজয়ী হওয়ার কৃতিত্বের কথা জানেন, কিংবা যদি জয়ী হতে নাও পারেন, অন্ততপক্ষে বীরের মতো চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। অতএব, তাঁর স্থান কখনোই সেইসব ভীরু এবং দূর্বল মানুষের সাথে হবেনা যারা জয় কিংবা পরাজয় কোনোটার স্বাদ কখনো পায়নি।

আমাদের নেগেটিভ আবেগগুলো

আমরা বাংলাদেশীরা মানুষের প্রশংসা করতে জানিনা। এতো ঢালাওভাবে হয়তো বলা ঠিকনা, কিন্তু আমাদের এতো বড় একটা অংশ এই সমস্যায় ভোগে যে মোটামুটিভাবে বলা যায় আমরা বাংলাদেশীরা মানুষের প্রশংসা করতে পারিনা।

এই ব্যাপারটা আমি সবসময় খেয়াল করে এসেছি, কিন্তু এটা আরো বেশি করে আমার মাথায় এসেছে ডক্টর ইউনুসকে আওয়ামীলীগ সরকারের হেনস্থা করার পর।

সারা পৃথিবীতে যদি একজন বাংলাদেশীর জন্যে মানুষ আমাদেরকে চেনে, আমাদের সুনাম করে, তবে সেই মানুষটি হচ্ছে ডক্টর ইউনুস। দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং ধর্মের নামে জঙ্গীপনার কারণে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা খুব বেশি একটা কখনো ছিলো না, কিন্তু ডক্টর ইউনুস প্রায় এককভাবে সেই মর্যাদা অনেকটা ফিরিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। কিন্তু আওয়ামীলীগ এর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোপানলে পড়ে সেই মানুষটিকে এতোটা হেনস্থা হতে হবে সেটা কখনো আমি ভাবিনি।

তো ডক্টর ইউনুস এর সাথে বাংলাদেশের মানুষের অন্যকে প্রশংসা করতে না পারার সম্পর্ক কী?

ডক্টর ইউনুসকে দিয়েই শুরু করি। এমনকি হাসিনা সরকার তাঁকে হেনস্থা শুরু করার আগেও তাঁকে নিয়ে আমরা নানারকম সমালোচনা করতাম। তাঁর নোবেল পুরষ্কারকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছি অনেকে। অনেকেই বলেছিলো নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার মতো কোনো কাজ তিনি করেন নাই, আমেরিকা এবং পুঁজিবাদী পশ্চিমা দেশগুলো ষড়যন্ত্র করে তাঁকে এই পুরষ্কার দিয়েছে। আমরা সবসময় সবকিছু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করি, সবকিছুতে ষড়যন্ত্র দেখি। গরীব দেশগুলো থেকে কেউ নোবেল না পেলে বলি আমেরিকা এবং পশ্চিমা বিশ্ব ষড়যন্ত্র করে সব নোবেল নিজেরা নিয়ে যায়। আবার আমাদের কেউ পেলে বলি সেটাও একটা ষড়যন্ত্রের একটা অংশ!

ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে কেউ ডানে গেলে আমরা ভাবি কেনো সে ডানে গেলো বামে যায় নাই, আবার সে বামে গেলে সাথে সাথেই ভাবি কেনো সে ডানে না যেয়ে বামে গেলো, নিশ্চয়ই তার কোনো মতলব আছে!

ধরুন কেউ একটা নতুন গাড়ি কিনলো। আমাদের ততক্ষনাৎ প্রতিক্রিয়া কী হবে? মোটামুটি সবাই সাথে সাথে ভাববো “ব্যাটা অনেক দুই নাম্বারি টাকা কামাইছে, সেই অসৎ টাকা দিয়ে গাড়ি কিনছে”, কিংবা “গাড়ি কিনছে লোক দেখানোর জন্যে”, “মানুষ ভাত খাইতে ভাত পায়না আর উনি গাড়ি কিনছেন”, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ ভদ্রলোক হয়তো কিছু টাকা জমিয়ে চলাফেরার সুবিধার জন্যে গাড়িটা কিনেছেন, এই যা।

কেউ হয়তো একটা বড়ো বেতনের চাকরি পেয়েছে, কিংবা চাকরিতে প্রমোশন পেয়েছে, আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় “ব্যাটা একটা চাটুকার লোক”, কিংবা “সে খুবই চাল্লু, বসদের ভাঁজ করে প্রমোশন বাগাই নিছে”। খুব কম মানুষই ভাববো সে হয়তো অনেক পরিশ্রম করে চাকুরীটা পেয়েছে কিংবা প্রমোশনটা পেয়েছে।

ইদানিং আরেকটা সমালোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে কর্পোরেট কম্পানীগুলো, বিশেষ করে টেলিকম কম্পানীগুলো। কথায় কথায় ওদেরকে গালি দিয়ে আমরা কেমন যেনো একটা সুখ পাই। ওরা দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায় এমন বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান করলেও ওদেরকে আমরা গালি দিই, বলি যে দেশপ্রেমের বানিজ্যিকিকরণ হচ্ছে। আবার দেশের জন্যে কিছু না করলে বলি যে ওদের কর্পোরেট সোশাল রেস্পন্সিবিলিটি বলতে কিছু নাই। আরে ভাই, ওরা তো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চ্যারিটি না। ওদের প্রধান কাজ হচ্ছে ব্যবসা, এর ফাঁকে ওরা ওদের মতো করে দেশপ্রেমমূলক বিজ্ঞাপন বানায়, অনুষ্ঠান করে এটাই বা কম কিসের? আপনার পছন্দ না হলে বলেন কিভাবে করলে আপনার পছন্দ হবে। কিংবা আপনি একটা কম্পানী বানান এবং দেখিয়ে দেন কিভাবে বিজ্ঞাপন বানাতে হবে কিংবা অনুষ্ঠান বানাতে হবে।

আমাদের সমালোচনার আরেক নির্বিচার টার্গেট হচ্ছে বিনোদন জগতের মানুষজন। বাংলাদেশে প্রায় সবাই নিয়মিত টিভি দেখে, অনেকেই সিনেমা দেখে, গান দেখে, কিন্তু আমরা প্রায় সবাই নিয়ম করে অভিনয় কিংবা গানের শিল্পীদের সম্পর্কে অনেক বাজে কথা বলি, কটুক্তি করি। “ওই নায়ক কোনো অভিনয় পারে নাকি?”, “ওই নায়িকাটার স্বাস্থ্য দেখেছিশ?”, “আরে ওই মেয়ে তো একটা রাস্তার মেয়ে …”, “ওই ছেলে মদ-গাঞ্জা খেয়ে বেড়ায়”, “ওই মাইয়া তো খালি স্টেইজে উঠে লাফালাফি করে, ও আবার গান গাইতে জানে নাকি” ইত্যাদি ইত্যাদি। আরে বাবা, আপনি যদি এতোই বিনোদন বোদ্ধা হয়ে থাকেন, আপনার কোন গুনটা আছে আমাদের বলেন এবং দয়া করে গান গেয়ে বা অভিনয় করে আমাদের বিনোদন জগতকে সমৃদ্ধ করেন। ধন্যবাদ।

জাফর ইকবাল স্যার এবং অন্যরা মিলে যে গণিত অলিম্পিয়াড করে এটা নিয়ে জামাত-শিবিরের লোকজন বলে যে স্যার নাকি আসলে পলিটিক্স করছেন গণিত অলিম্পিয়াডের নামে। গণিত অলিম্পিয়াড যে কতো গুরুত্মপূর্ণ একটা জিনিস এইটা এইসব জামাতী ব্রেইনে ঢুকার আগে পৃথিবীর মানুষ মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি ছেড়ে অন্য গ্যালাক্সির দিকে যাত্রা করবে।

দেশে মাঝে মাঝে বিদেশী শিল্পীরা আসে, অনুষ্ঠান করে। এতেও আমাদের অনেকের সমস্যা। শাহরুখ খান এসেছিলো, এটা নিয়ে তো ব্লগ, ফেইসবুক, পত্রিকাজুড়ে সমালোচনার বন্যা। “দেশটা ভারতের দখলে চলে গেলো রে”, “দেশের মানুষ ঠিক মতো খেতে পায়না, সেখানে এতো টাকা টিকেট কেটে অনুষ্ঠান দেখা একেবারে অনুচিত” ইত্যাদি। আচ্ছা, বাংলাদেশের রুনা লায়লা বা জেমস যদি ভারতে বা আমেরিকা যেয়ে গান গায় তাহলে বাংলাদেশ ভারত কিংবা আমেরিকা দখল করে ফেলে? আর আমার কষ্ট করে উপার্জন করা দশ হাজার টাকা দিয়ে আমি যদি একটা অনুষ্টান দেখতে যাই, তাতে আপনার সমস্যাটা আসলে কোথায়? আপনার কি ঈর্ষা হচ্ছে আমি অনুষ্ঠান দেখছি বলে?

আমাদের দেশের শতকরা চল্লিশ ভাগ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এখান থেকে উপরে উঠতে হলে আমাদের আরো অনেকদূর যেতে হবে। আমরা অনেকটা পথ চলে এসেছি – আমাদের মোটামুটি একটা চলনসই গণতন্ত্র আছে, আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে, আমরা ষোল কোটি মানুষের খাবার উৎপাদন করতে পারি, দেশের বেশির ভাগ মানুষ জঙ্গিবাদকে ঘৃণা করে। আমাদের উন্নতির পথে এখনো অনেকদূর যেতে হবে, কিন্তু তাই বলে আমরা আমাদেরকে বিনোদন থেকে বঞ্চিত করবো কেনো? কিছুদিন আগে কোন একটা ভারতীয় শিল্পী আসলো ঢাকায়, এক বন্ধু দেখলাম সেটা নিয়ে লিখলো যে দেশে মানুষ যেহেতু এখনো লাইন দিয়ে সস্তায় চাল কিনে সেহেতু আমাদের এইসব অনুষ্ঠানে এতো টাকা টিকেট কেটে যাওয়া ঠিক না। ব্লগেও দেখি মানুষজন পোস্ট দিচ্ছে, এইসব অনুষ্ঠানে না যেয়ে একটা গরীব শিশুকে সাহায্য করতে।

এই ধরনের কথাবার্তায় আমি আসলে কোনো যুক্তি দেখিনা। আমার ধারণা এটা অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত আবেগ। একটা সুস্থ্য জীবনের জন্যে চিত্ত-বিনোদন খুবই দরকারী। আমরা যদি যারা টাকার অভাবে বিনোদন করতে পারছেনা তাদের কথা ভেবে আমাদের নিজেদের বিনোদন করা থেকে বিরত থাকি তাহলে আমাদের কর্মক্ষমতা এবং সৃষ্টিশীলতা কমে যাবে, এবং আমরাও দেশের অর্থনৈতিক অবনতিতে ভুমিকা রাখা শুরু করবো। দেশের দারিদ্য সীমার নিচের মানুষের সংখ্যা তখন আরো বেড়ে যাবে। এইটা একটা নেগেটিভ ফিডব্যাক লুপ। একজন দূর্বল মানুষ আরেকজন দূর্বল মানুষকে সাহায্য করতে পারেনা। অন্যকে সাহায্য করতে হলে আগে নিজেকে শক্ত হতে হবে। আর আমার ধারণা যারা মানুষকে এইসব অনুষ্ঠানে যেতে নিষেধ করে তাদের অনেকেই সুযোগ পেলে সেখানে যেতো এবং তারা নিজেরা ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি উপকারী মানুষ হয় না।

সম্প্রতি একটা লেখা পড়লাম – “যেসব মানুষের নিজের উপর শ্রদ্ধা কম তারা বেশি (কু)সংস্কারে ভোগে”। অর্থাৎ যেসব মানুষ আসলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে খুশি নয়, নিজের উপর নিজের খুব বেশি শ্রদ্ধা নাই, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে, তারা সাধারণত মানুষকে নিয়ে বেশি নেগেটিভ কথা বলে। অন্যের ভালো কিছু দেখলে তারা সহজে খুশি হতে পারেনা, তাদের প্রথম চিন্তাটি হয় নেগেটিভ। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারেনা এরা।

বাংলাদেশকে উন্নত করতে হলে আমাদেরকে, বিশেষ করে তরুন সমাজকে, অনেক প্রাণশক্তির অধিকারী হতে হবে। বেশ কিছুদিন আগে “প্রাণশক্তি” নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, যেটার কিছু কথা এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারেঃ

“প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষ কৌতুহলী হয়, আগ্রহী হয়, সবসময় কিছু একটা করতে চায়, যেকোনো জিনিসের ভালো দিকটা দেখে প্রথমে, নিজের ভুল/দোষ হলে সেটা স্বীকার নেয় সহজে, অন্যের সফলতা দেখে হিংসা করেনা, সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ায়না, অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে নিজেই এগিয়ে আসে যেকোনো কাজে, ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকেনা, এবং আশেপাশের সবার মধ্যে নিজের প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করে। একজন সফল মানুষ আরেকজন সফল মানুষকে হিংসা করবেনা। যে ছেলেগুলো হরতাল-বিক্ষোভ এর সময় নির্বিচারে অন্যের গাড়ি ভাংগে, সেই ছেলেগুলোর প্রত্যেকের একটা করে গাড়ি থাকলে ওরা কখনো এই কাজটি করতো না। অসফল মানুষ স্বভাবতই কিছুটা হীনমন্যতাবোধে ভোগে, এবং সুযোগ পেলেই তার দুঃখ-কষ্টের কারণ অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।”

মানুষকে বিশ্বাস করা খুবই দরকারী একটা জিনিস। মানুষের মঙ্গল চিন্তা করা, মানুষের খুশিতে নিজে খুশি হওয়া এগুলো খুব চমৎকার ব্যাপার। মানুষ যতোদিন থাকবে ঈর্ষা ব্যাপারটা ততোদিন থাকবে মানুষের মধ্যে, কিন্তু এটাকে একটা খারাপ বিষয় ভেবে নিজের ভেতরে মেরে ফেলতে হবে। ঈর্ষাকে শক্তিতে রুপান্তরিত করতে হবে। কেউ একটা চমৎকার ফ্ল্যাট কিনেছে দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার নামে বদনাম না করে বরং ঈর্ষান্বিত হয়ে বেশি বেশি পরিশ্রম করে নিজে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলুন না। সেও সুখি তার ফ্ল্যাটে, আপনিও সুখি আপনার ফ্ল্যাটে!

মানুষের প্রশংসা করলে সে প্রশংসা আপনিই ফিরে পাবেন। মানুষের সুখে আপনি সুখী হলে সে সুখ একদিন আপনিও পাবেন। অন্যথায় ঈর্ষা, বদনাম, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ইত্যাদি নেগেটিভ ভাবাবেগ আপনাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে, সুখ সোনার হরিণ হয়েই অধরা থেকে যাবে।

আনফেয়ার লাইফ, বিউটিফুল লাইফ

এমন একটা জীবন আমরা যাপন করি যে জীবনে প্রবেশের আগে আমাদেরকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি এই জীবন আমরা চাই কি চাইনা। আমাদের ইচ্ছার কোনো খবর না নিয়েই আমাদেরকে এ জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

শুধু যে আমাদের অজান্তে আমাদেরকে এ জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তাই নয়, আমাদেরকে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যে দৌড়ের উপর রাখারও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এবং সেটা যাতে যথেষ্ঠ না হয়, তার সাথে দেওয়া হয়েছে রোগ-বালাই, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, নদী ভাঙ্গন, সুনামি ইত্যাদি। ভয়ংকর সব ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে, যেকোনো সময় আঘাত করে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে অনেক কষ্টে গড়ে তোলা একটা জীবন!

একটা শিশুর জন্ম হয় খুবই অসহায়ভাবে। বাবা-মা এবং অন্যান্য আপনজনের আদর-যত্ন ছাড়া শিশুটি বেড়ে উঠতে পারেনা। এক দেড় যুগ ধরে বাবা-মা’কে অনেক কষ্ট স্বীকার করে বড় করতে হয় একটা সন্তানকে। সেই অনেক যত্ন করে বড় করা মানুষটিকে তখন প্রবেশ করতে হয় বড় মানুষদের জীবনে, যুদ্ধ করতে হয় জীবনের পদে পদে। পড়ালেখায় ভালো করার যুদ্ধ। ভালো একটা চাকুরী কিংবা ব্যবসা করার যুদ্ধ। পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলা/এড়িয়ে চলার যুদ্ধ। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রোগজীবানুর সাথে যুদ্ধ। এইডস, ক্যান্সার, হার্টের অসুখ, চোখের অসুখ, দাঁতের অসুখ, প্যারালিসিস, পঙ্গুত্ব – কতো রকম অসুখ আর দূর্ঘটনা ওঁত পেতে আছে মানুষের জীবনটা দুর্বিষহ করে দেওয়ার জন্যে।

এরপর আছে সামাজিক এবং মানসিক কতো অসংখ্য যন্ত্রণা। স্বামীর অত্যাচার, স্ত্রীর সীমাহীন আবদার, নানারকম সম্পর্কের নানারকম টানাপোড়ন, এর ওর এটাসেটা কতো রকম চাওয়া পাওয়া পূরণের চাপ। আছে সমাজের বেঁধে দেওয়া নানান নিয়ম। আছে ধর্মের এটা করো ওটা কোরোনা। পরিবার এর ব্যাপারগুলি মোটামুটি সবজায়গায় দেখা গেলেও সমাজ এবং ধর্মের নিয়মকানুনগুলি মূলত জন্মের স্থান এর উপরই নির্ভর করে। একজনের জন্ম আফ্রিকার জঙ্গলে নাকি আমেরিকায় নাকি আফগানিস্তানে – এর উপর নির্ভর করে সমাজ এবং ধর্ম তার জীবনে কতোটা সুখ কিংবা কতোটা যন্ত্রণা দিবে। এই নিয়মগুলিও আমাদের জন্মের আগেই ঠিক হয়ে থাকে, আমাদেরকে কেউ জিজ্ঞেস করেনা কখনো আমরা সেগুলো চাই কিনা! এবং আমাদের চাওয়ার উপর ভিত্তি করে আমাদের জন্মস্থান নির্ধারণ করা হয়না।

অবশ্যই জীবনে অনেক সুখও আছে। আনন্দ আছে। কিন্তু জীব হিসেবে আমার মনে হয় সুখের তীব্রতার চেয়ে যন্ত্রণার তীব্রতা অনেক বেশি। একটা মানুষ সারা জীবন অনেক সুখ পেয়ে যদি পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে অসুখে কিংবা দূর্ঘটনায় বিকলাঙ হয়ে যায় তাহলে তার সেই সারা জীবনের সুখের কোনো মূল্য আছে তার জীবনে? আমাদের গ্রামের অসংখ্য মানুষ – নারীরা বিশেষ করে – সারা জীবন যে কষ্ট সংগ্রাম করে জীবন যাপন করে এবং সেভাবেই সংগ্রাম করতে করতে নিদারুণ দারিদ্র্যে মৃত্যুবরন করে পরিণত বয়সে, সেটা তো আমার নিজের চোখে দেখা। সেইসব মানুষের জীবনের কী মূল্য? জন্মের আগে তাদেরকে যদি বলা হতো “তোমরা এইভাবে দুঃখ-কষ্টে তোমাদের জীবন অতিবাহিত করবে, তোমরা কি এই জীবন নিতে চাও?”, কয়জন সেই জীবন নিতে রাজী হতো?

এরকম একটা অযাচিত, অজিজ্ঞাসিত জীবন আমরা যাপন করি। যে জীবনের বড় বড় নিয়মগুলি বেশিরভাগই আমাদের জন্মের আগে কিংবা জন্মের স্থানের সাথে ঠিক হয়ে যায়। জন্মের আগের সময় অথবা জন্মের স্থান – কোনোটির উপরই আমাদের কোনো ধরণের নিয়ন্ত্রণ নেই। রোগ-ব্যাধির উপর নিয়ন্ত্রণের অনন্ত চেষ্টায় আছে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান। কিন্তু দূর্ঘটনার উপর কতোটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে আমাদের? সুনামি কিংবা ভূমিকম্পের উপর?

পুরো ব্যাপারটিকে সবচেয়ে জটিল করে দেওয়া হয়েছে জীবনের প্রতি আমাদের সীমাহীন ভালোবাসা দিয়ে। এতো কষ্ট, এতো অনিশ্চয়তা, সমাজ আর ধর্মের এতো নিয়মের বেড়াজাল, জীবানুরুপী ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার এতো আক্রমণ, সুনামি আর ভূমিকম্পের আঘাত – এতো কিছুর পরও বেঁচে থাকার সেকি আকুলতা আমাদের, বেঁচে থাকতে কি যে সুখ! যতো যাই ঘটুক, “লাইফ ইজ বিউটিফুল” বলে এগিয়ে যাই আমরা। সব শক্তি একত্র করে যুদ্ধ করে যাই বেঁচে থাকার জন্যে, জীবনকে “বিউটিফুল” করার জন্যে।

হ্যাঁ, লাইফ মে নট বি ফেয়ার। বাট ইট ইজ বিউটিফুল। অন্তত আমরা সে চেষ্টাই করে যাই অবিরাম। আনফেয়ার প্রকৃতির বিরুদ্ধে অসহায়, ভঙ্গুর মানুষের জীবনকে বিউটিফুল করার যুদ্ধে মানুষ যাতে জয়ী হয় সবসময় সেজন্যে সবার জন্যে অনেক অনেক শুভকামনা।

“ভালোবাসার কাজটি খুঁজে নিতে হবে” – স্টিভ জবস এর বিখ্যাত সমাবর্তন বক্তৃতা

স্টিভ জবস আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। ২০০৫ সালে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হন। সেখানে দেওয়া তাঁর বক্তৃতাটি ছিলো অসাধারণ একটি বক্তৃতা। সত্যি কথা বলতে কি এটা আমার জীবনে শোনা/পড়া সেরা বক্তৃতা। দুর্ভাগ্যক্রমে অনুবাদের পর এর আবেগ অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে! তবুও অনুবাদ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। মূল ইংরেজী বক্তৃতাটি পাওয়া যাবে এখানেঃ http://news-service.stanford.edu/news/2005/june15/jobs-061505.html

ভালোবাসার কাজটি খুঁজে নিতে হবে
======================

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমি খুবই সম্মানিত বোধ করছি। আমি কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করিনি। সত্যি কথা বলতে কি, আজকেই আমি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সবচেয়ে কাছ থেকে দেখছি। আজ আমি তোমাদেরকে আমার জীবনের তিনটি গল্প বলবো। তেমন আহামরী কিছু না। শুধু তিনটা গল্প।

প্রথম গল্পটি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এক সূতোয় বাঁধা নিয়ে (connecting the dots)।

রিড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার ছয় মাসের মাথায় আমি মোটামুটি পড়ালেখা ছেড়ে দিই। অবশ্য পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার আগে প্রায় বছর দেড়েক এটা সেটা কোর্স নিয়ে কোনমতে লেগেছিলাম। তো কেনো আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিলাম?

ঘটনার শুরু আমার জন্মের আগে থেকে। আমার আসল মা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অবিবাহিতা তরুণী গ্রাজুয়েট ছাত্রী। আমার জন্মের আগে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে কারো কাছে দত্তক দিবেন। মা খুব চাচ্ছিলেন আমাকে যারা দত্তক নিবেন তাদের যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী থাকে। তো একজন আইনজীবি এবং তাঁর স্ত্রী আমাকে দত্তক নেওয়ার জন্য রাজি হলো। কিন্তু আমার জন্মের পর তাঁদের মনে হলো তাঁরা আসলে একটা কন্যা শিশু চাচ্ছিলেন।

অতএব আমার বর্তমান বাবা-মা, যারা অপেক্ষমাণ তালিকাতে ছিলেন, গভীর রাতে একটা ফোন পেলেন – “আমাদের একটা অপ্রত্যাশিত ছেলে শিশু আছে, আপনারা ওকে নিতে চান?” “অবশ্যই!” – আমার বাবা-মা’র তড়িৎ উত্তর। আমার আসল মা পরে জানতে পেরেছিলেন যে আমার নতুন মা কখনো বিশ্ববিদ্যালয় আর নতুন বাবা কখনো হাই স্কুলের গন্ডি পেরোননি। তিনি দত্তক নেবার কাগজপত্র সই করতে রাজী হননি। কয়েক মাস পরে অবশ্য তিনি রাজী হয়েছিলেন, আমার নতুন বাবা-মা এই প্রতিজ্ঞা করার পর যে তারা একদিন আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন।

১৭ বছর পর আমি সত্যি সত্যি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি বোকার মতো প্রায় স্ট্যানফোর্ডের সমান খরচের একটা বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিলাম। এবং আমার নিম্ন মধ্যবিত্ত পিতামাতার সব জমানো টাকা আমার পড়ালেখার খরচের পেছনে চলে যাচ্ছিলো। ছয় মাস এভাবে যাওয়ার পর আমি এর কোন মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জীবনে কী করতে চাই সে ব্যাপারে আমার তখনো কোন ধারণা ছিলোনা, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা এ ব্যাপারে কিভাবে সাহায্য করবে সেটাও আমি বুঝতে পারছিলাম না। অথচ আমি আমার বাব-মা’র সারা জীবনের জমানো সব টাকা এর পেছনে দিয়ে দিচ্ছিলাম। তাই আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং আশা করলাম যে সবকিছু আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। ওই সময়ের প্রেক্ষিতে এটা একটা ভয়াবহ সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে, কিন্তু এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত ছিলো। যেই মুহুর্তে আমি বিশ্ববিদ্যালয়
ছেড়ে দিলাম সেই মুহুর্ত থেকে আমি আমার অপছন্দের অথচ ডিগ্রীর জন্য দরকারী কোর্সগুলো নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারলাম, এবং আমার পছন্দের কোর্সগুলো নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়ে গেলো।

অবশ্য ব্যাপারটি অতোটা সুখকর ছিলোনা। ছাত্রহলে আমার কোন রুম ছিলোনা, তাই আমি আমার বন্ধুদের রুমে ফ্লোরে ঘুমাতাম। ব্যবহৃত কোকের বোতল ফেরত দিয়ে আমি পাঁচ সেন্ট করে পেতাম (প্রতি বোতল) যেটা দিয়ে আমি আমার খাবার কিনতাম। প্রতি রবিবার আমি সাত মাইল হেঁটে শহরের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরে কৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম শুধুমাত্র একবেলা ভালো খাবার খাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি এটাকে পছন্দ করতাম। আমার কৌতুহল এবং ইনটুইশন অনুসরণ করে আমার জীবনে আমি যতোকিছু করেছি পরবর্তীতে সেটাই আমার কাছে মহামূল্যবান হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। একটা উদাহরণ দিইঃ

সেই সময় রীড কলেজ সম্ভবত দেশের সেরা ক্যালিগ্রাফী কোর্সগুলো করাতো। ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটি পোস্টার, প্রতিটি লেবেল করা হতো হাতে করা ক্যালিগ্রাফী দিয়ে। যেহেতু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম না, তাই আমি যেকোনো কোর্স নিতে পারতাম। তাই ভাবলাম ক্যালিগ্রাফী কোর্স নিয়ে ক্যালিগ্রাফী শিখবো। আমি সেরিফ এবং স্যান সেরিফ টাইপফেইস শিখলাম, বিভিন্ন অক্ষরের মধ্যে স্পেস কমানো বাড়ানো শিখলাম, ভালো টাইপোগ্রাফী কিভাবে করতে হয় সেটা শিখলাম। ব্যাপারটা ছিলো দারুণ সুন্দর, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরের একটা আর্ট। এবং এটা আমাকে বেশ আকর্ষণ করতো।

এই ক্যালিগ্রাফী জিনিসটা কখনো কোনো কাজে আসবে এটা আমি কখনো ভাবিনি। কিন্তু, দশ বছর পর যখন আমরা আমাদের প্রথম ম্যাকিন্টস কম্পিউটার ডিজাইন করি তখন এর পুরো ব্যাপারটাই আমাদের কাজে লেগেছিলো। ম্যাক কম্পিটার টাইপোগ্রাফী সমৃদ্ধ প্রথম কম্পিটার। আমি যদি দশ বছর আগে সেই ক্যালিগ্রাফী কোর্সটা না নিতাম তাহলে ম্যাক কম্পিউটারে কখনো মাল্টিপল টাইপফেইস এবং আনুপাতিক দুরত্মের ফন্ট থাকতো না। আর যেহেতু উইন্ডোজ ম্যাক এর এই ফন্ট নকল করেছে, বলা যায় কোনো কম্পিউটারেই এই ধরণের ফন্ট থাকতো না। আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয় না ছাড়তাম তাহলে আমি কখনোই ওই ক্যালিগ্রাফী কোর্সে ভর্তি হতাম না, এবং কম্পিউটারে হয়তো কখনো
এতো সুন্দর ফন্ট থাকতো না। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় এই সব বিচ্ছিন্ন ঘটোনাগুলোকে এক সুতোয় বাঁধা অসম্ভব ছিলো, কিন্তু দশ বছর পর সবকিছু একেবারে পরিস্কার বোঝা গিয়েছিলো!

তুমি কখনোই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে এক সূতায় বাঁধতে পারবেনা। এটা শুধুমাত্র পেছনে তাকিয়েই সম্ভব। অতএব, তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একসময় একটা ভালো পরিণামের দিকে যাবে ভবিষ্যতে। তোমাকে কিছু না কিছুর উপর বিশ্বাস করতেই হবে – তোমার মন, ভাগ্য, জীবন, কর্ম, কিছু একটা। এই বিশ্বাস আমাকে কখনোই ব্যর্থ করে দেয়নি, বরং আমার জীবনের সব বড় অর্জনে বিশাল ভুমিকা রেখছে।

আমার দ্বিতীয় গল্পটি ভালোবাসা আর হারানো নিয়ে।

আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম। আমি আমার জীবনের প্রথম দিকেই আমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে পেয়েছিলাম। ওজ আর আমি আমার বাবা-মা’র বাড়ির গারাজে এপল কম্পানী শুরু করেছিলাম। তখন আমার বয়স ছিলো ২০ বছর।

আমরা কঠিন পরিশ্রম করেছিলাম – ১০ বছরের মাথায় এপল কম্পিউটার গারাজের ২ জনের কম্পানী থেকে ৪০০০ এম্পলয়ীর ২ বিলিয়ন ডলারের কম্পানীতে পরিণত হয়। আমার বয়স যখন ৩০ হয় তার অল্প কিছুদিন আগে আমরা আমাদের সেরা কম্পিউটার – ম্যাকিন্টস – বাজারে ছাড়ি। আর ঠিক তখনি আমার চাকরি চলে যায়। কিভাবে একজন তার নিজের প্রতিষ্ঠিত কম্পানী থেকে চাকরিচ্যুত হয়? ব্যাপারটি এমনঃ এপল যখন অনেক বড়ো হতে লাগলো তখন আমি কম্পানীটি খুব ভালোভাবে চালাতে পারবে এমন একজনকে নিয়োগ দিলাম। প্রথম বছর সবকিছু ভালোভাবেই গেলো। কিন্তু এরপর তার সাথে আমার চিন্তাভাবনার বিভাজন স্পষ্ট হওয়া শুরু হলো। এবং পরিচালনা পর্ষদ তার পক্ষ নিলো। অতএব, ৩০ বছর বয়সে আমি কম্পানী থেকে আউট হয়ে গেলাম। এবং খুব ভালোভাবে আউট হলাম। আমার সারা জীবনের স্বপ্ন এক নিমিষে আমার হাতছাড়া হয়ে গেলো। ঘটনাটা আমাকে বেশ ভেঙ্গে দিয়েছিলো।

এরপরের কয়েক মাস আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কী করবো। আমার মনে হচ্ছিলো আমি আগের প্রজন্মের উদ্যোগতাদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছি – আমার হাতে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটা আমি করতে পারিনি। আমি ডেভিড প্যাকার্ড এবং বব নয়েস এর সাথে দেখা করে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইলাম। একবার ভাবলাম ভ্যালী ছেড়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি একটা ব্যাপার অনুভব করতে লাগলাম – আমি আমার কাজকে এখনো ভালোবাসি! এপলের ঘটনাগুলি সেই সত্যকে এতোটুকু বদলাতে পারেনি। আমাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কিন্তু আমি এখনো আমার কাজকে ভালোবাসি। তাই আমি আবার একেবারে গোড়া থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথমে এটা তেমন মনে হয়নি, কিন্তু পরে আবিষ্কার করলাম এপল থেকে চাকরিচ্যুত হওয়াটা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা। সফল হবার ভার চলে যেয়ে আমি তখন নতুন করে শুরু করলাম। কোন চাপ নেই, সবকিছু সম্পর্কে আগের চেয়ে কম নিশ্চিত। ভারমুক্ত হয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়ে যাত্রা শুরু করলাম।

পরবর্তী পাঁচ বছরে আমি নেক্সট এবং পিক্সার নামে দুটো কম্পানী শুরু করি, আর প্রেমে পড়ি এক অসাধারণ মেয়ের যাকে আমি পরে বিয়ে করি। পিক্সার থেকে আমরা পৃথিবীর প্রথম এনিমেশন ছবি “টয় স্টোরী” তৈরি করি। পিক্সার বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল এনিমেশন স্টুডিও। এরপর ঘটে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। এপল নেক্সটকে কিনে নেয় এবং আমি এপলএ ফিরে আসি। এবং নেক্সটএ আমরা যে প্রযুক্তি তৈরি করি সেটা এখন এপল এর বর্তমান ব্যবসার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্যদিকে লরেন আর আমি মিলে তৈরি করি একটা সুখী পরিবার।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত এগুলোর কিছুই ঘটতো না যদি না আমি এপল থেকে চাকরিচ্যুত হতাম। এটা ছিলো খুব তেতো একটা ওষুধ আমার জন্য, কিন্তু আমার মনে হয় রোগীর সেটা দরকার ছিলো। কখনো কখনো জীবন তোমাকে মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে। তখন বিশ্বাস হারাইওনা। আমি নিশ্চিত যে জিনিসটা আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো সেটা হচ্ছে – আমি আমার কাজকে ভালোবাসতাম। তোমাকে অবশ্যই তোমার ভালবাসার কাজটি খুঁজে পেতে হবে। তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে যেভাবে তোমার খুঁজে পেতে হয়, ভালোবাসার কাজটিকেও তোমার সেভাবে খুঁজে পেতে হবে। তোমার জীবনের একটা বিরাট অংশ জুড়ে থাকবে তোমার কাজ, তাই জীবন নিয়ে সন্তুস্ট হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে চমৎকার কোনো কাজ করা। আর কোনো কাজ তখনি চমৎকার হবে যখন তুমি তোমার কাজকে ভালোবাসবে। যদি এখনো তোমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে না পাও তাহলে খুঁজতে থাকো। অন্য কোথাও স্থায়ী হয়ে যেওনা। তোমার মন আর সব জিনিসের মতোই তোমাকে জানিয়ে দিবে যখন তুমি তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পাবে। যে কোনো সম্পর্কের মতোই, তোমার কাজটি যতো সময় যাবে ততোই ভালো লাগবে। সুতরাং খুঁজতে থাকো যতক্ষন না ভালোবাসার কাজটি পাচ্ছো। অন্য কোন কাজে স্থায়ী হয়ো না।

আমার শেষ গল্পটি মৃত্যু নিয়ে।

আমার বয়স যখন ১৭ ছিলো তখন আমি একটা উদ্ধৃতি পড়েছিলামঃ “তুমি যদি প্রতিটি দিন এটা ভেবে পার কর যে আজই তোমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে একদিন তুমি সত্যি সঠিক হবে”। এই লাইনটা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিলো, এবং সেই থেকে গতো ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি – “আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো তাহলে আমি কি যা যা করতে যাচ্ছি আজ তাই করতাম, নাকি অন্য কিছু করতাম?” যখনি এই প্রশ্নের উত্তর “না” হতো পরপর বেশ কিছু দিন, আমি জানতাম আমার কিছু একটা পরিবর্তন করতে হবে।

“আমি একদিন মরে যাবো” – এই কথাটা মাথায় রাখা আমার জীবনে আমাকে বড় বড় সব সিদ্ধান্ত নিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। কারণ সবকিছু – সকল আশা-প্রত্যাশা, গর্ব, ব্যর্থতার ভয় বা লজ্জা – এইসব কিছু মৃত্যুর মুখে নাই হয়ে যায়, শুধুমাত্র সত্যিকারের গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলোই টিকে থাকে। তোমার কিছু হারানোর আছে এই চিন্তা দূর করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে এটা মনে রাখা যে একদিন তুমি মরে যাবে। তুমি নগ্ন হয়েই আছো।

অতএব নিজের মনকে না শোনার কোনো কারণই নাই।

প্রায় এক বছর আগে আমার ক্যান্সার ধরা পড়ে। সকাল ৭:৩০ এ আমার একটা স্ক্যান হয় এবং এতে পরিস্কারভাবে আমার প্যানক্রিয়াসএ একটা টিউমার দেখা যায়। আমি তখনো জানতাম না প্যানক্রিয়াস জিনিসটা কী। আমার ডাক্তাররা বললেন এই ক্যান্সার প্রায় নিশ্চিতভাবে আরোগ্য, এবং আমার আয়ু আর তিন থেকে ছয় মাস আছে। আমার ডাক্তার আমাকে বাসায় ফিরে যেয়ে সব ঠিকঠাক করতে বললেন। সোজা কথায় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া।

এরমানে হচ্ছে তুমি তোমার সন্তানদের আগামী দশ বছরে যা বলবে বলে ঠিক করেছো তা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বলতে হবে। এরমানে হচ্ছে সবকিছু গোছগাছ করে রাখা যাতে তোমার পরিবারের সবার জন্য ব্যাপারটি যথাসম্ভব কম বেদনাদায়ক হয়। এরমানে হচ্ছে সবার থেকে বিদায় নিয়ে নেওয়া।

এভাবে সেদিন সারাদিন গেলো। সেদিন সন্ধ্যায় আমার একটা বায়োপসি হলো। তারা আমার গলার ভেতর দিয়ে একটা এন্ডোস্কোপ নামিয়ে দিলো, এরপর আমার পেটের ভেতর দিয়ে যেয়ে আমার ইনটেস্টাইন থেকে সুঁই দিয়ে কিছু কোষ নিয়ে আসলো। আমাকে অজ্ঞান করে রেখেছিলো তাই আমি কিছুই দেখিনি। কিন্তু আমার স্ত্রী পরে আমাকে বলেছিলো যে আমার ডাক্তাররা যখন এন্ডোস্কোপি থেকে পাওয়া কোষগুলি মাইক্রোস্কোপ এর নিচে রেখে পরীক্ষা করা শুরু করলো তখন তারা প্রায় কাঁদতে শুরু করেছিলো, কারণ আমার যে ধরণের প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়েছিলো সেটার আসলে সার্জারীর মাধ্যমে চিকিৎসা সম্ভব। আমার সেই সার্জারী হয়েছিলো এবং এখন আমি সুস্থ্য।

এটাই আমার মৃত্যুর সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়া, এবং আমি আশা করি আরো কয়েক দশকের জন্যও এটা তাই যেনো হয়। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যাওয়ার এই বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে মৃত্যু সম্পর্কে এখন আমি অনেক বেশি জানি, যেটা আমি জানতাম না যদি না এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না যেতামঃ

কেউই মরতে চায় না। এমনকি যারা বেহেশতে যেতে চায়, তারাও সেখানে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মরে যেতে চায় না। কিন্তু এরপরও মৃত্যুই আমাদের সবার গন্তব্য। কেউই কখনো এটা থেকে পালাতে পারেনি। এবং সেটাই হওয়া উচিৎ, কারণ মৃত্যু সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় আবিস্কার। এটা জীবনের পরিবর্তনের এজেন্ট। মৃত্যু পুরনোকে ধুয়ে মুছে নতুনের জন্য জায়গা করে দেয়। এই মুহুর্তে তোমরা হচ্ছো নতুন, কিন্তু খুব বেশিদিন দূরে নয় যেদিন তোমরা পুরনো হয়ে যাবে এবং তোমাদেরও ধুয়ে মুছে ফেলা হবে। নাটকীয়ভাবে বলার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এটা খুবই সত্যি।

তোমাদের সময় সীমিত, অতএব, অন্য কারো জীবন যাপন করে সময় নষ্ট করো না। কোনো মতবাদের ফাঁদে পড়ো না, অর্থ্যাৎ অন্য কারো চিন্তা-ভাবনা দিয়ে নিজের জীবন চালিয়ো না। তোমার নিজের ভেতরের কন্ঠকে অন্যদের চিন্তা-ভাবনার কাছে আটকাতে দিও না। আর সবচেয়ে বড় কথাঃ নিজের মন আর ইনটুইশন এর কথা শোনার সাহস রাখবে। ওরা ঠিকই জানে তুমি আসলে কি হতে চাও। বাকী সব কিছু ততোটা গুরুত্মপূর্ণ নয়।

আমি যখন তরুণ ছিলাম তখন একটা পত্রিকা বের হতো যার নাম ছিলো “The Whole Earth Catalog” (সারা পৃথিবীর ক্যাটালগ). এটা ছিলো আমার প্রজন্মের একটা বাইবেল। এটা বের করেছিলেন স্টুয়ার্ড ব্র্যান্ড নামে এক ভদ্রলোক যিনি মেনলো পার্কের কাছেই থাকতেন। তিনি পত্রিকাটিকে কাব্যময়তা দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। এটা ছিলো ষাট এর দশকের শেষ দিককার কথা – কম্পিউটার এবং ডেস্কটপ পাবলিশিং তখনো শুরু হয়নি। তাই পত্রিকাটি বানানো হতো টাইপরাইটার, কাঁচি, এবং পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে। পত্রিকাটিকে ৩৫ বছর আগের পেপারব্যাক গুগল বলা যায়ঃ অনেক তত্ত্ব-তথ্যে সমৃদ্ধ আর মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

স্টুয়ার্ট এবং তার টিম পত্রিকাটির অনেকগুলি সংখ্যা বের করেছিলো। পত্রিকাটির জীবন শেষ হয় একটা সমাপ্তি সংখ্যা দিয়ে। এটা ছিলো সত্তর এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমার বয়স ছিলো তোমাদের বয়সের কাছাকাছি। সমাপ্তি সংখ্যার শেষ পাতায় একটা ভোরের ছবি ছিলো। তার নিচে ছিলো এই কথাগুলিঃ “ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো”। এটা ছিলো তাদের বিদায় বার্তা। ক্ষুধার্ত থেকো। বোকা থেকো। এবং আমি নিজেও সবসময় এটা মেনে চলার চেষ্টা করে এসেছি। এবং আজ তোমরা যখন পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি ছেড়ে আরো বড় জীবনের গন্ডিতে প্রবেশ করছো, আমি তোমাদেরকেও এটা মেনে চলার আহবান জানাচ্ছি।

ক্ষুধার্ত থেকো। বোকা থেকো।

সবাইকে ধন্যবাদ।

I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ on

A very favorite song of mine, by Dolly Parton. Listen to it a lot these days…

***********************************************************************

Well I can’t tell you where I’m going, I’m not sure of where I’ve been
But I know I must keep travelin’ till my road comes to an end
I’m out here on my journey, trying to make the most of it
I’m a puzzle, I must figure out where all my pieces fit

Like a poor wayfaring stranger that they speak about in song
I’m just a weary pilgrim trying to find what feels like home
Where that is no one can tell me, am I doomed to ever roam
I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ on

Questions I have many, answers but a few
But we’re here to learn, the spirit burns, to know the greater truth
We’ve all been crucified and they nailed Jesus to the tree
And when I’m born again, you’re gonna see a change in me

God made me for a reason and nothing is in vain
Redemption comes in many shapes with many kinds of pain
Oh sweet Jesus if you’re listening, keep me ever close to you
As I’m stumblin’, tumblin’, wonderin’, as I’m travelin’ thru

I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ thru
I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ thru

Oh sometimes the road is rugged, and it’s hard to travel on
But holdin’ to each other, we don’t have to walk alone
When everything is broken, we can mend it if we try
We can make a world of difference, if we want to we can fly

Goodbye little children, goodnight you handsome men
Farewell to all you ladies and to all who knew me when
And I hope I’ll see you down the road, you meant more than I knew
As I was travelin’, travelin’, travelin’, travelin’, travelin’ thru

I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’
Drifting like a floating boat and roaming like the wind
Oh give me some direction lord, let me lean on you
As I’m travelin’, travelin’, travelin’, thru

I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ thru
I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ thru

Like the poor wayfaring stranger that they speak about in song
I’m just a weary pilgrim trying to find my own way home
Oh sweet Jesus if you’re out there, keep me ever close to you
As I’m travelin’, travelin’, travelin’, as I’m travelin’ thr

প্রজাপতি মন

কতো কিছুই না হতে চেয়েছি এই জীবনে। কতো কিছুই না চেয়েছি পেতে।

একেবারে ছোটকালে, যখন ক্লাস সেভেন এইট এ পড়ি, তখন সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা পড়তাম। তিন গোয়েন্দার দল – কিশোর, রবিন, আর মুসা – রোমাঞ্চকর সব রহস্য সমাধান করে বেড়াতো। আমার কিশোর মন কী যে শিহরিত হতো ওদের এডভেঞ্চার এর কাহিনী পড়ে। কল্পনায় ভিড়ে যেতাম ওদের দলে আর সমাধান করে বেড়াতাম চাঞ্চল্যকর সব রহস্যের! ওদের সাথে আমিও ঘুরে বেড়াতাম লস এঞ্জেলেসের রকী বীচ এলাকায়। কিশোরদের বাসার পাশের গারাজের হেডকোয়াটার্সে ওদের সাথে আমিও যে রহস্য সমাধানে আমার মাথা খাটাতাম এটা ওরা কোনদিন জানতে পারবে না! সে এক অদ্ভুত যাদুকরী রোমাঞ্চকর জীবন। দুষ্ট মানুষদের সকল চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে তিন গোয়েন্দার দল আর আমি মিলে সমাধান করে দিতাম জটিল সব রহস্যের…

আরেকটু বড় হবার পর, নাকের নিচে যখন গোঁফের হালকা কালো রেখা দেখা দিতে শুরু করলো, তিন গোয়েন্দার বই এর জায়গা ধীরে ধীরে দখল করা শুরু করলো মাসুদ রানার বই। সে এক অন্য জগত। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর এক দুর্ধষ স্পাই, মাসুদ রানা ক্রমেই হয়ে উঠলো আমার স্বপ্নের নায়ক। গোপন মিশন নিয়ে দেশ থেকে দেশে ঘুরে বেড়ায় রানা। কোমলে কঠোরে মেশানো, অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত চির সবুজ এক যুবক মাসুদ রানা। প্রথম বই ধ্বংস পাহাড় থেকে শুরু করে প্রায় দুইশ’র মতো বই পড়ে ফেলেছি বছর দুয়েকের মধ্যেই। আমাদের বাসার কাছেই ছিল একটা বইয়ের দোকান যেখানে সেবা প্রকাশনীর বই ভাড়া পাওয়া যেত। প্রতি বই দুই টাকা করে। পড়ে দুই-তিন দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হতো। রানা’র বুদ্ধি, শক্তি, স্মার্টনেস, আর সুন্দরী রমণীদের সাথে রোমান্টিকতা, সবকিছু মিলে ওকে মনে হতো স্বপ্নের দেশে থাকা এক পুরুষ। কতো অসংখ্যবার প্রতিজ্ঞা করেছি বড় হলে স্পাই হবো, ঘুরে বেড়াবো দেশ থেকে দেশে, সমাধান করে বেড়াবো জটিল সব রহস্যের, সান্নিধ্যে আসবো রুপবতী সব নারীদের, কোমরের হোলস্টারে লুকানো থাকবে পিস্তল…

এসএসসি পাশের পর ভর্তি হই নটর ডেম কলেজে। ততোদিনে আমার চিন্তাভাবনা আর আগ্রহের পরিধি আরো বেড়ে গেছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদির প্রতি অনেক আগ্রহ বোধ করতাম। বিশেষ করে বিজ্ঞানের প্রতি। অণু-পরমাণু কিভাবে কাজ করে, পৃথিবীর সৃষ্টি হলো কিভাবে, প্রাণ এর সৃষ্টি হলো কিভাবে, প্লেইন কিভাবে আকাশে উড়ে, কম্পিউটার কিভাবে কাজ করে – এরকম রাজ্যের প্রশ্ন আমার মাথায় খেলা করতো তখন। নটর ডেম এ পরিচয় হয় আমার বন্ধু তানভীর এর সাথে। বিজ্ঞান এর বিভিন্ন ব্যাপারে ওর ছিলো অনেক জ্ঞ্যান। ওর সাথে কতো যে তর্ক বিতর্ক করেছি বিজ্ঞ্যানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে! তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর
ফুলার রোডে ছিলো ব্রিটিশ কাউন্সিল এর লাইব্রেরী। ওখানে সদস্য হলে বিভিন্ন ধরণের বই আনতে পারা যায়, এটা শোনার পর দেরী না করে সদস্য হয়ে যাই। এরপর কতো যে বই এনেছি ওখান থেকে! যে বইটি বিশেষভাবে আমার এখনো মনে আছে সেটার নাম হলো “প্ল্যানেট আর্থ”, লেখকের নাম সিজার এমিলিয়ানি। এই বইটি আমার জীবনকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিলো। বইটির বিষয়বস্তু ছিলো অনেক ব্যাপক – বিশ্বজগতের সৃষ্টি, প্রাণের সৃষ্টি, পৃথিবীর জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত চার বিলিয়নেরও বেশি সময়ের ভূতাত্বিক ইতিহাস, ইত্যাদি। এইসব বইপত্র পড়ে পড়ে আর সেগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি বড় হলে বিজ্ঞানী হওয়ার কথা ভাবতাম। পদার্থবিজ্ঞান আমাকে খুব
টানতো। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর বিচিত্র জগৎ, কসমোলজির অবিশ্বাস্য ঘটনাপ্রবাহ, রিলেটিভিটি’র “আপেক্ষিক সত্য” – এসবকিছুর কারণে আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম বড় হলে একজন পদার্থবিজ্ঞানীই হবো।

আইডিয়ালে (আমার হাই স্কুল) থাকতেই আমার আরেকটা স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো ধীরে ধীরে। সেই স্বপ্নের নাম হলো “আমেরিকা”! সেই ছোটবেলা থেকে মনে হয় এমন কোন দিন যেতো না যেদিন কোন না কোন ব্যাপারে আমেরিকা’র নামটা শুনিনি। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন সংবাদ, টেলিভিশন সিনেমা, ভিসিআর এর সিনেমা, তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা, এফবিআই-সিআইএ, ম্যাডোনা, মাইকেল জ্যাকসন, হলিউড, টারমিনেটর টু, বেসিক ইন্সটিঙ্কট, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যতো আবিষ্কার, হার্ভার্ড-এমআইটি, নাসা, সারা পৃথিবী জুড়ে যতো যুদ্ধ-বিগ্রহ – সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলো এই আমেরিকা। আমেরিকা ক্রমেই ঢুকে যাচ্ছিলো আমার উৎসুক মনের গভীরে। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম প্রচন্ডভাবে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই ছুটলাম মতিঝিলের ইউসিস অফিসে। সেখান থেকে আমেরকার যতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা নিয়ে ভর্তির জন্য এপ্লাই করলাম। ভর্তির অফারও পেলাম কয়েকটি থেকে। ভিসা’র জন্য দাঁড়ালাম ঢাকার বনানীর সবচেয়ে বড় লাল দালানটিতে – স্বপ্নের দেশের এম্ব্যাসিতে। তখন ভিসা নিয়ে ছিলো ভয়াবহ রকমের কড়াকড়ি। যথারীতি ভিসা পাইনি। তিনবার দাঁড়ানোর পর রণে ভঙ দিলাম। কিন্তু আমেরিকা যাবার স্বপ্ন তাতে এতোটকু কমেনি!

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার শুরু হলো এক নতুন জীবন। সেখানে ছিলেন আমার স্বপ্নের মানুষ – মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আমার জীবন যে কয়জন মানুষ দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে তাদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে আছে জাফর স্যারের নাম। মাঝে মাঝে যখন খুব বেশি মন খারাপ থাকে, নিরাশ হয়ে থাকি, জীবনের কোন মানে খুঁজে পাই না, তখন একটা কথা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিই – জাফর স্যারের মতো মানুষেরা যখন বেঁচে আছে তখন বেঁচে থাকার নিশ্চয়ই কিছু একটা অর্থ আছে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসিএম প্রোগ্রামিং করতাম। কম্পিউটার দিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা। খুবই আনন্দদায়ক একটা ব্যাপার ছিলো এই প্রবলেম সলভিং। প্রোগ্রামিং করতে করতে স্বপ্ন দেখতাম একদিন খুব বড় প্রোগ্রামার হবো, খুব বড় প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানীতে পৃথিবী বদলে দেওয়া যায় এমন সব কম্পিউটিং প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করবো। কখনো বা হ্যাকার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। জটিল সব ভাইরাস লিখে বড় বড় কম্পিউটার এর নিরাপত্তা ভেঙ্গে সেখানের সব তথ্য বের করে ফেলবো আর সবাই আমার প্রোগ্রামিং দক্ষতার প্রশংসা করবে!

আরো একটা স্বপ্ন ছিলো বিশেষ করে কলেজ জীবন থেকে – দেশের জন্য কিছু একটা করা। সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, হরতাল-অবরোধ, হত্যা-প্রতিহত্যার রাজনীতি, ঘুষ, অনিয়ম, ট্রাফিক জ্যাম, পানি-বিদ্যুতের অভাব – আরো কতো কী! কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলোতে পড়ালেখা ছাড়া আর যা যা করা যায় তার সবকিছুই চলে অবিরাম। খুব ইচ্ছে হয় দেশের জন্য কিছু একটা করতে। আমি আর আমার বন্ধু রাজু কমলাপুর রেল স্টেশনের কাছে রেল লাইনের উপর বসে বসে কতো বিকেল পার করেছি দেশের জন্য স্বপ্ন দেখে দেখে! কতো প্ল্যান করেছি কিভাবে দেশের জন্য কিছু করা যায়। একটা খুব ভালো বিশ্ববিদ্যালয় বানাবো যার উপাচার্য হবেন জাফর স্যার। সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব ছেলেমেয়েরা বের হবে তারা একেকজন হবে একেকটা বারুদের মতো। অসম্ভব সেই প্রতিভাবান ছেলেমেয়েরা কেউ হবে বিজ্ঞানী, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেই ডাক্তার, কেউ আর্কিটেক্ট, কেউ দেশের প্রতি পরম মমতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, কেউ ভবিষ্যৎ নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, কেউ বিখাত গণিতবিদ… ভাবতাম বড় হয়ে রাজনীতি করবো। একদিন এই দেশের সরকার প্রধান হবো আর বদলে দিবো দেশটাকে…

স্বপ্ন আর পরিকল্পনার এখনো শেষ নেই। কতো নতুন নতুন স্বপ্ন দেখি, কতো কিছু করতে চাই, কতো কিছু পেতে চাই এই জীবনে। এক জীবনে মানুষ কতো বছর বাঁচে? সত্তর, আশি, নব্বই, কিংবা বড়জোর একশ বছর? এই সময়ের মধ্যে কি সব কিছু পাওয়া যায়? প্রজাপতির মতো আমাদের মন খালি উড়ে বেড়ায়। কতো স্বপ্ন পূরণ হয়, কতো চাওয়া পূরণ হয়, তবু কি স্বপ্নগুলো থেমে থাকে? আমাদের চাহিদা কি কখনো কমে আসে?

সবকিছুর শেষে এই স্বপ্নগুলোই, চাওয়াগুলিই আমাদের জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রজাপতি মন-ই আমাদের জীবনের সম্পুর্নতার দিকে টেনে নিতে থাকে। জীবন চলতে থাকে…

Tagged ,

Be Happy in a Few Simple Steps!

I recently read this beautifully written essay on how to be happy and live a satisfying life. Loved it so much that I thought of republishing it on my site. Luckily I have permission to reprint it under the Creative Commons Attribution- Noncommercial- No Derivative Works 3.0 United States License. The name of the writer is Michael Montoure.

Here it is:

You can be happy. You can live the life you want to live. You can become the person you want to be.

This is what I’ve figured out so far.

Stop assigning blame. This is the first step. Stop assigning blame and leave the past behind you.

You know whose fault it is that your life isn’t perfect. Your boss. Your teachers. Your ex-lovers. The ones who hurt you, the ones who abused you, the ones who left you bleeding. Or even yourself. You know whose fault it is — you’ve been telling yourself your whole life. Knowing whose fault it is that your life sucks is an excellent way to absolve yourself of any reponsibility for taking your life into your own hands.

Forget about it. Let it go. The past isn’t real. “That was in another country, and besides, the wench is dead.” If we’re not talking about something that is real and present and in your life right now, then it doesn’t matter. Nothing can be done about it. If nothing can be done about it, then don’t spend your energy dwelling on it — you have other things to do.

I may sound cruel, I may sound simplistic, I may sound like I’m saying you should just “get over it,” by suggesting that you should let go of your past. I’m sorry for that. But life won’t hold still and wait for you to lick your wounds. The race is still being run. Get up and keep moving. You can’t do anything about yesterday.

You can do something about tomorrow. And about the next day. Focus your energies there.

“I don’t have time to write.” “I can’t dance.” “I can’t talk to new people.” “I’m not attractive.”

I hear this all the time. I always hear the people around me sabotaging themselves, drawing lines and borders and boxes around themselves.

To which I say, make the time; dance; just talk to people; be attractive!

Yes, again, it’s simplistic of me to say that. But it’s simplistic of you to so easily say what you cannot do!

We’re excellent pattern-matchers. That’s what the human mind does — it’s a pattern-matching engine. So we look at ourselves, at our history, at our behaviors, and we draw straight lines between the points — we assume that just because we’ve done things a certain way in the past, we’ll always do them that way in the future. If we’ve failed before, we’ll always fail.

Screw that.

Surprise yourself. No — amaze yourself.

You don’t have to keep doing the things you hate. Why go home and beat yourself up for, say, not going over and saying a few words to someone you find really attractive? Can any damage they could do to you by rejecting you possibly be any worse than the damage you’re going to do to yourself for missing the chance?

Find the demon.

Do you know what I’m talking about? It’s the little voice in the back of your head that’s always whispering, “You can’t.” You know the demon. You may think you hate the demon, but you don’t. You love it. You let it own you. You do everything it says. Everytime there’s something you want, you consult the demon first, to see if it will say, “You can’t have that.”

What you don’t realize is that your demon doesn’t know anything. It’s an idiot. It’s nothing but a parrot, repeating back to you anything negative that it’s ever heard, anything that makes you hurt, makes you squirm. If a teacher once told you “You’ll never accomplish anything,” it was listening; it hoards words like that and repeats them back to you to watch you jump. It doesn’t know what it’s saying. It doesn’t care.

Exorcise yourself.

You can take me literally or not, as suits you. But do, please, the next time you hear that voice in your head, imagine it, visualize it, as something physical that you can get hold of; tear it out of you, feel its fingers weaken and lose their grip on your spine, and grind it to dust, to nothing, under your boot heel on your way out to dance in the streets.

You can. You think you can’t; but it’s telling you that. You can.

You don’t exist.

You just think you do.

We’re nothing but the stories we tell ourselves. We know in our hearts what kind of people we are, what we’re capable of, because we’ve told ourselves what kind of people we are. You’re a carefully-rehearsed list of weaknesses and strengths you’ve told yourself you have.

(Self-confidence, for example, is a particularly nebulous quality you can easily talk yourself out of having.)

You owe no allegiance to that self-image if it harms you. If you don’t like the story your life has become — tell yourself a better one.

Think about the person you want to be and do what that person would do. Act the way that person would act.

Amazingly enough, once you start acting like that person, people will start treating you like that person.

And you’ll start to believe it. And then it will be true.

Welcome to your new self.

You are a product of your environnent.

Most people realize this — usually, in the form of having something else to blame — but they tend to forget one important fact:

Humans are the masters of changing their environment.

What this means is that if your environment affects you, and you can affect your environment, then obviously, you can affect yourself.

  • Your environment includes people. Figure out who in your life isn’t good for you, whose presence tears you down more than it builds you up, whose nearness is poison to you — and get rid of them. Get them out of your life. I don’t care if it’s your best friend, your boss, your mother, your lover — if they are harming you, if they are doing nothing but reinforce everything bad you tell yourself about yourself, then your relationship with them needs to radically alter or it needs to end.
  • Your environment includes goals. Don’t set yourself pie-in-the-sky impossible goals and then beat yourself up over not achieving them — set yourself goals that will be good for you, not a source of pain. Attainable goals. Set them and meet them. Don’t tell yourself you can’t — that’s the old story, that story you used to tell yourself about what a poor sad victim you were and how you could never change anything about your life. You can meet your goals. This is the new story.Trying to clean your house? Good for you — a clean house can really affect your state of mind for the better. But don’t say “Today I’m going to clean the entire house from top to bottom,” when you don’t have the time and energy to — don’t set yourself up for failure; don’t feed the demon. Just say, “Today I’m going to wash all the dishes and clean off the kitchen counter.” And do it.Don’t tell yourself, “This month I’m going to write that novel.” Tell yourself, “Today I’m going to write five pages.” And do it. Take your dreams and break them down into small pieces and you’ll have them in your hands before you know it.

    And you’ll find, as you start meeting your goals, that you like it. That it feels good, makes you feel confident and capable. You’ll develop a hunger for it.

  • Your environment includes yourself — your physical presence. Do what you know you need to do — treat yourself better. Sleep, eat right, exercise. This doesn’t mean you have to stop staying out late at night now and then, it doesn’t mean you can’t have a candy bar, it doesn’t mean you have to stop sitting around watching television — it just means start doing the things that are good for you as well as the things that are bad for you, every so often. It’s not an all-or-nothing proposition; you don’t have to devote your life to being a health nut. Just try eating more fruits and vegetables, the occasional vegetarian meal; go for walks in the park on the weekends. You’ll feel better and be more alert if you’re a little healthier, and once you start feeling a little better, you’ll start wanting the things that make you feel better. You’ll see.
  • Your environment includes your appearance. If you’re not happy with yourself, if you’re angry with the person in the mirror, it can honestly help to literally change who you see when you look in the mirror. Try a different hairstyle, new glasses, new jewelry, new clothes. It doesn’t have to be expensive — there’s a whole universe full of possible You’s waiting to be found in thrift stores, if need be. If you’re deciding to become the person you want to be, then decide what that person is going to look like. Dress the part. It’s not shallow, it’s not about vanity, it’s about self-transformation — even the most primitive tribes understand the value of costumes and masks for ritual, for change, for becoming someone else.

You are not an object. You are a system. Like with any system, if you change the inputs — change what goes into it — you’ll change what comes out.

Despite everything I’ve just said:

Self-examination can be paralysis.

Don’t “remember to breathe” — just breathe. It’s a Tao thing.

It’s the paradox at the center of all this — remember that, “Am I living up to being the person I want to be?”, is not a question the person you want to be would ask.

If I can leave you with just one thought, it’s this:

Stop wasting your time fretting over not being happy.

Just be happy.

Michael Montoure is a writer and a web developer living in the Pacific Northwest.

(reprinted under Creative Commons Attribution- Noncommercial- No Derivative Works 3.0 United States License.)

Tagged , ,

ঘর আমার ঘর

ঘর ছেড়েছি সেই কবে।

প্রথমবার ১৯৮৯ সালে। আগের বছর ক্লাস ফাইভ পাশ করে ঢাকা বেড়াতে এসেছিলাম  ডিসেম্বর মাসে। আব্বা আইডিয়াল হাই স্কুলের একটা ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম নিয়ে আসলো। ভর্তি পরীক্ষাও দেওয়া হলো। এবং কিভাবে কিভাবে যেন সত্তর জনের মধ্যে ছেষট্টিতম হয়ে টিকেও গেলাম। আমার আম্মা আল্লার কাছে দোয়া করেছিলেন আমি যাতে না টিকি। আম্মা ভাবলেন আমরা গ্রামে থাকি, বেড়াতে এসেছি খালাদের বাসায়, এর মধ্যে এত ভাল একটা স্কুলে টিকে গেলে না আমাকে গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে গ্রামের সাধারণ স্কুলগুলায় ভর্তি করাতে পারবেন (মানে খুব কষ্ট হবে আইডিয়ালে না দিয়ে গ্রামের স্কুলে দিতে), না ঢাকায় আমাকে রেখে আইডিয়াল স্কুলে পড়াতে পারবেন। তো টিকে যাওয়ার পর আম্মা পড়লেন মহা মুস্কিলে, ছেলেকে তিনি কোথায় রেখে পড়াবেন।

ঘটনাক্রমে আমরা যে খালার বাসায় বেড়াতে এসেছি উনি ছিলেন দাতা হাতেম তাই এর মহিলা সংস্করণ। উনি আমার আম্মাকে বললেন কেউ আইডিয়ালে এত সহজে চান্স পায় না, ও পেয়েছে, আমি ওকে আমার বাসায় রাখবো। খালাদের দুই রুম এর বাসাটাতে খালার তিন সন্তান ছাড়াও একজন টিউটর থাকতেন। এর মধ্যে খালা আমাকে রেখে দিলেন। আমার আম্মা তার বোন আর আল্লার হাতে আমাকে ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে গেলেন।

আমার বয়স তখন সবে দশ ছেড়ে এগারোতে পড়েছে। যে ছেলেটি দশটি বছর গ্রামের পথে-ঘাটে-মাঠে, বনে-বাদাড়ে, পুকুরে, ধান ক্ষেতে, বাঁশ বাগানে, কাঁঠাল-তেঁতুল-কাম্রাঙ্গা গাছে তার উত্তাল শৈশব কাটিয়েছে মায়ের শাসন আর সোহাগের ভেতর, হঠাৎ করে সেই ছেলেটি আবিষ্কার করলো তার জীবনে এখন সেই গ্রামও নেই, আর তার মাও নেই। ঘর ছাড়ার কষ্টে, বেদনায় কাটতো আমার প্রতিটি দিন। আইডিয়াল স্কুলের কড়া শাসন আর মাকে ছেড়ে দূরে থাকার কষ্ট আমার শিশু হৃদয়কে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল। মনে পড়ে আমি আমার ফুপুদের দোতলা বাসার ছাদের উপর যেয়ে দক্ষিন-পূর্ব দিকে তাকিয়ে থাকতাম ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের দিকে। ওই সড়ক দিয়েই আমাদের নোয়াখালীর বাসগুলো যেতো। বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর কল্পনা করতাম ওই বাসগুলোর একটা দিয়ে আমি নোয়াখালীর চাটখিলে আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছি। গ্রামে যেয়ে আমি অদৃশ্য হয়ে আমার আম্মাকে দেখছি। যেহেতু আম্মা চায়না আমি গ্রামে যাই তাই আমি কল্পনায় শুধু আম্মাকে দূর থেকে দেখে আসার কথা ভাবতাম। আরো মনে পড়ে আইডিয়াল স্কুলের জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম বাইরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো কতো সুখী। আইডিয়াল স্কুলে আমার প্রতি মুহুর্তে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইতো।

সৌভাজ্ঞক্রমে আমার সেই ভয়াবহ দুস্বপ্নের দিনগুলো প্রায় দেড় বছরের মাথায় শেষ হয়ে আসে। ক্লাস সেভেন এর মাঝামাঝি সময়ে আমাদের পুরো পরিবার ঢাকায় চলে আসে। আমি ফিরে পাই আমার ঘর।

দ্বিতীয়বার ঘর ছাড়ি ১৯৯৮ সালে।

আমি সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল নভেম্বর মাসের পনের তারিখে। আমি অক্টবরের ঊনত্রিশ তারিখে তল্পিতল্পা গুছিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্য ঘর ছাড়ি। আমার আম্মা চোখের জলে তার সন্তানকে বিদায় জানালেন। আমার প্রাণের বন্ধুদের একজন আশিক আমাকে কমলাপুর স্টেশনে বিদায় দিতে গেল। ও বিদায় নেওয়ার আগ মুহুর্তে চোখের পানি ফেলল। আমার বুকে প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে থাকার বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। আমার এখনো মনে আছে আমি আশিককে বলেছিলাম, “দোস্ত, আমি যাচ্ছি অনেক ভালোভাবে (মানে অনেক সফল হয়ে) ফিরে আসার জন্য”। হায়, ভালো অনেক কিছুই আমি অর্জন করেছিলাম সিলেটে যেয়ে, কিন্তু আমার আর ফেরা হয়নি। আসলে ফেরা হয়েছে, কিন্তু সেটা খুব স্বল্প সময়ের জন্য। সিলেটে থেকেই আমি আবার, আরো লম্বা সময়ের জন্য ঘর ছাড়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছি।

সিলেটের পাট চুকাই ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে। চার বছরের ডিগ্রী অর্জন করি প্রায় ছয় বছরে। এরপর আবার ঘরে ফিরে আসি।

সর্বশেষ ঘর ছাড়ি ২০০৬ সালের মে মাসে।

আমেরিকার ওহাইও স্টেইট বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিটার বিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য যোগ দিই ২০০৬ সালের জুন মাসে।

এরপর ঘটে গেছে আরো কতো ঘটনা। আমি পিএইচডি প্রোগ্রাম থেকে মাষ্টার্স এ পরিবর্তন করে চলে আসি। এরপর মাষ্টার্স শেষ করে চাকরীতে জয়েন করি। আমার স্ত্রীও এখানে চাকরী করে, কিন্তু সে আমার থেকে তিন হাজার মাইল দূরে থাকে। প্রায় আড়াই বছরের বিবাহিত জীবনে আমাদের সত্তিকারের ঘর বেঁধে একসাথে থাকা এখনো হলো না।

ঘরে ফেরা এখনো আমার কাছে একটা বড় স্বপ্ন। অবশ্য এখন ঘরে ফেরার চেয়ে বড় ব্যাপার হলো ঘর বাঁধা। প্রায় তিন দশকের জীবনের একটা বড় অংশ ঘরের বাইরে কাটিয়ে দেয়ায় বুকের ভেতর থেকে শঙ্কা আর যায় না।

কবে পাবো আমার ঘর?

Tagged

পথের পাঁচালী – ২

ওই আস্তাবলের মাথায় যে আকাশটা, ওরই ওপারে পুবদিকে বহুদুরে তাহাদের নিশ্চিন্দিপুর।

আজ কতোদিন সে নিশ্চিন্দিপুর দেখে নাই – তি-ন বতসর! কতকাল!

সে জানে নিশ্চিন্দিপুর তাহাকে দিনে-রাতে সবসময় ডাকে, শাঁখারীপুকুর ডাক দেয়, বাঁশবনটা ডাক দেয়, সোনাডাঙ্গার মাঠ ডাক দেয়, কদমতলার সাহেবের ঘাট ডাক দেয়, দেবী বিশালাক্ষী ডাক দেন।

………

এতদিনে তাহাদের সেখানে ইছামতীতে বর্ষার ঢল নামিয়াছে। ঘাটের পথে শিমুলতলায় জল উঠিয়াছে। ঝোপে ঝোপে নাটাকাঁটা, বনকলমির ফুল ধরিয়াছে। বন অপরাজিতার নীল ফুলে বনের মাথা ছাওয়া।

…………………

বনের ধারে সে অপূর্ব মায়াময় বৈকালগুলি মিছামিছিই নামিবে চিরদিন।

…………………

(বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের “পথের পাঁচালী” হতে নেওয়া)

Tagged
Advertisements