Monthly Archives: July 2009

মাইক্রোসফট এর সাতকাহন – পর্ব ৩ (মাইক্রোসফট এর সেকাল একাল)

শুরুর ঘটনাঃ

মাইক্রোসফট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কম্পিউটার সফটওয়ার প্রস্তুতকারী কম্পানী। এবং এটি সবচেয়ে পুরনো সফটওয়ার কম্পানীগুলোরও একটি।
মাইক্রোসফট এর শুরু হয় ১৯৭৫ সালে আমেরিকার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবাকার্কি শহরে। যদিও মাইক্রোসফট এর মূল প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এর বাড়ি ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে (যেখানে মাইক্রোসফট এর বর্তমান প্রধান অফিস), তিনি এর শুরুটা করেন প্রায় পনের’শ মাইল দূরের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি শহরে। এর কারণ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর প্রথম সফটওয়ারটি ছিলো আসলে একটি BASIC ইন্টারপ্রিটার যেটা প্রথমে কাজ করতো আল্টেয়ার নামক একটি কম্পিউটারএ। আল্টেয়ার এর অফিস ছিলো নিউ মেক্সিকোতে। বিল গেটস ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এর লেখাপড়া ছেড়ে নিউ মেক্সিকো চলে যান আল্টেয়ার এর মালিক কম্পানীকে তার ইন্টারপ্রিটার কেনার জন্য রাজী করাতে। আল্টেয়ার এর মালিক ইন্টারপ্রিটারটি কিনতে রাজী হওয়ার পর গেটস সেখানেই মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন তার বন্ধু পল অ্যালেনকে সাথে নিয়ে। আমার ধারণা বিল গেটস তখনো ভাবতে পারেননি তার এই কম্পানীটি একদিন পৃথিবীর সভ্যতার তথ্য যুগে প্রবেশএ একটা বড় ভূমিকা রাখবে।

সফটওয়ার সাম্রাজ্যঃ

চৌত্রিশ বছর পর আজ ২০০৯ সালে এসে মাইক্রোসফট হয়ে উঠেছে এক প্রযুক্তি সাম্রাজ্য। কিছু হার্ডওয়ার বাদ দিলে কম্পিউটারের এমন কোনো দিক নেই যেটা তারা প্রস্তুত করে না। বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত অপারেটিং সিস্টেম, সর্বাধিক ব্যবহৃত অফিস প্রডাক্টিভিটি সফটওয়ার, সর্বাধিক ব্যবহৃত চ্যাট মেসেঞ্জার, সর্বাধিক ব্যবহৃত ওয়েব ইমেইল, সর্বাধিক ব্যবহৃত ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট ইত্যাদি ছাড়াও অন্যান্য অসংখ্য সফটওয়ার পণ্য আছে মাইক্রোসফট এর যেগুলো প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে সারা পৃথিবীর কোটি কোটি কম্পিউটারএ। মাইক্রোসফট এর মোট কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৯৫,০০০। এর একটা বড় অংশ হচ্ছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।

ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের রেডমন্ড শহরের বিশাল এক এলাকা জুড়ে মাইক্রোসফট এর অফিস। প্রায় এক’শ এর মতো বিল্ডিং জুড়ে চলে এর কাজকর্ম। কম্পানীর ইঞ্জিনিয়ারিং কাজকর্ম করা হয় পাঁচটি বড় ডিভিশন এর মাধ্যমে – উইন্ডোজ এবং উইন্ডোজ লাইভ ডিভিশন, অনলাইন সার্ভিসেস ডিভিশন, ডিভাইস এবং এন্টারটেইন্টমেন্ট ডিভিশন, মাইক্রোসফট বিজনেস ডিভিশন, এবং সার্ভার এবং টুলস ডিভিশন। এছাড়াও আইন, এইচআর, মার্কেটিং, ফাইন্যান্স ইত্যাদি আরো অনেক গ্রুপ তো আছেই।

প্রত্যেকটি ডিভিশন এর রয়েছে একজন প্রেসিডেন্ট যারা সরাসরি সিইও স্টিভ বালমার এর কাছে রিপোর্ট করেন। উইন্ডোজ এবং উইন্ডোজ লাইভ ডিভিশন কাজ করে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম এবং এর অনলাইন ফিচার নিয়ে। উইন্ডোজকে বলা হয় মাইক্রোসফট এর ফ্ল্যাগশিপ পণ্য। মাইক্রোসফট এর সবচেয়ে বেশি আয় হয় এর মাধ্যমে। ২০০৭ সালের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটল করা কম্পিউটার এর সংখ্যা এক বিলিয়ন হয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীতে রাস্তাঘাটে যতো কার চলাচল করে তার চেয়ে বেশি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম চলে দুনিয়াজোড়া কম্পিউটারগুলোতে। বিজনেস ডিভিশন এর পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফট অফিস (ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, এক্সেল ইত্যাদি), সার্ভার ডিভিশন এর প্রধান পণ্যগুলো হচ্ছে উইন্ডোজ সার্ভার, এসকিউএল সার্ভার, ডট নেট ইত্যাদি। অনলাইন সার্ভিসেস এর প্রধান পণ্য (বা সেবা) হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন বিং, অনলাইন পোর্টাল এমএসএন ইত্যাদি। ডিভাইস এবং এন্টারটেইনমেন্ট ডিভিশন এর প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আইপড এর প্রতিদ্বন্ধী জুন মিউজিক প্লেয়ার, উইন্ডোজ মোবাইল, এক্সবক্স গেইম কনসোল ইত্যাদি। এই ডিভিশনগুলির প্রত্যকটিই অন্য অনেক স্বয়ংসম্পূর্ণ কম্পানীর চেয়ে অনেক বড়।

মাইক্রোসফট এর রয়েছে বিশাল গবেষণা গ্রুপ। “মাইক্রোসফট রিসার্চ” হচ্ছে কম্পিউটার বিজ্ঞান এর সবচেয়ে নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ২০০৯ সালে এর বাজেট এর পরিমাণ ছিলো ৯ বিলিয়ন ডলার এর বেশি! গবেষণার পেছনে এ পরিমাণ টাকা পৃথিবীর খুব কম্পানীই খরচ করে। এমনকি গতো এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও মাইক্রোসফট তার গবেষণা বরাদ্দ কমায়নি। এখানে কাজ করেছেন এবং করছেন টুরিং এবং ফিল্ডস মেডাল প্রাপ্ত বিজ্ঞানীরা!

মাইক্রোসফট এর অফিসগুলিকে চিহ্নিত করা হয় নাম্বার দিয়ে (ইদানিং অবশ্য এই রীতি থেকে বের হয়ে এসে অন্যান্য নাম দিয়েও বিল্ডিং চিহ্নিত করা হচ্ছে)। সাধারণত একই ডিভিশন এর বিল্ডিংগুলো কাছাকাছি থাকে। আমাদের উইন্ডোজ ডিভিশনের অফিসগুলো বেশির ভাগই বিল্ডিং ২৬, ২৭, ২৮, এবং ৩৭ এ অবস্থিত। তবে অন্যান্য বিল্ডিংএও উইন্ডোজ এর অফিস আছে। মাইক্রোসফট এর অফিসগুলো সাধারণত দরজাওয়ালা ব্যক্তিগত অফিস রুম টাইপের। কিউবিকল অফিস মাইক্রোসফটএ নাই বললেই চলে। আমি এখানকার অনেকের সাথেই এটা নিয়ে কথা বলেছি, এবং প্রায় সবাই বলেছে যে প্রোগ্রামিং কাজের জন্য কিউবিকলের চেয়ে ব্যক্তিগত অফিস রুমই ভালো। প্রত্যেক রুমেই থাকে কমপক্ষে দুটি সাদা বোর্ড, এক বা একাধিক বইএর সেলফ, এবং অফিস ডেস্ক। কিউবিকলে এই সাদা বোর্ড টানানোর সুবিধা থাকেনা। যেকোনো ধরণের ডিজাইন আলোচনার জন্য সাদা বোর্ডের বিকল্প নেই। এখানকার যে কারো অফিস রুমে ঢুকলেই অবধারিতভাবে সাদা বোর্ডটিতে নানারকম ফ্লোচার্ট কিংবা কোড দেখা যাবেই। অনেক বিল্ডিংএ রুম এর বাইরে করিডোরএও সাদা বোর্ড থাকে। কিংবা চা-কফি খাওয়ার, আড্ডা দেওয়ার জায়গাটিতেও সাদা বোর্ড থাকে। এর ফলে যে কোনো অবস্থাতেই ইঞ্জিনিয়াররা কোনো আইডিয়া কিংবা ডিজাইন নিয়ে ততক্ষণাৎ একটা ব্রেইন স্টর্মিং করতে পারে।

বহুমাত্রিক যুদ্ধঃ

বহু ধরণের সফটওয়ার পণ্য থাকার কারণে মাইক্রোসফটকে বহুমুখী যুদ্ধ করতে হচ্ছে দুনিয়ার সেরা সব কম্পানীর সাথে। মাইক্রোসফট এর চির প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে স্টিভ জবস এর অ্যাপল। অ্যাপল এর পণ্য সমূহের নয়নাভিরাম এবং নিখুঁত ডিজাইন এর জন্য কম্পিউটার মার্কেট এর বিশাল একটা অংশ দখল করে নিয়েছে। এবং এই অংশ দিন দিন বাড়ছে। অ্যাপল এর সম্প্রসারণশীল বাজার মাইক্রোসফটকে যারপরনাই ভাবাচ্ছে। এ যুদ্ধে সর্বশেষ সংযোজন বিজ্ঞাপন যুদ্ধ । অ্যাপল এবং মাইক্রোসফট উভয়েই একে অপরকে সরাসরি আক্রমন করে বিজ্ঞাপন বানিয়ে প্রচার করছে সম্প্রতি। উইন্ডোজ এর আরেক প্রতিদ্বন্ধী ওপেন সোর্স অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স। যদিও বাজার দখলের দিক থেকে লিনাক্স এখনো অনেক পিছিয়ে উইন্ডোজ কিংবা অ্যাপল এর থেকে। কিন্তু লিনাক্স এর উৎসাহীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় মাইক্রোসফট এর শংকা একেবারে কম নয়।

সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট এর দিক থেকে মাইক্রোসফট এর মূল প্রতিদ্বন্ধী জাভা প্রস্তুতকারী সান কর্পোরেশন (সম্প্রতি ওরাকল সানকে কিনে নিয়েছে)। মাইক্রোসফট এর ভিজুয়াল স্টুডিও নির্ভর ডট নেট ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট এর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সান এর জাভা প্লাটফর্ম। ডেটাবেজ এর দিক থেকে মাইক্রোসফট এর এসকিউএল সার্ভার এর শক্ত প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে ওরাকল এর ওরাকল ডেটাবেজ এবং আইবিএম এর ডিবি২ ডেটাবেজ সিস্টেম।

কিন্তু সব প্রতিদ্বন্ধীকে ছাড়িয়ে ইন্টারনেট যুগে মাইক্রোসফট এর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে গুগল। গুগল এর ব্যবসার ধরণ, সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং মেধা, মাইক্রোসফট এর চেয়ে বেশি ইন্টারনেটভিত্তিক পণ্য এবং সেবায় বিনিয়োগ করা ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে গুগল হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইক্রোসফট এর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্ধী। মাইক্রোসফট ইন্টারনেট এর গুরুত্ম অনেক আগে বুঝলেও এতে বিনিয়োগ করতে অনেক দেরি করে ফেলে। গুগল যেখানে ১৯৯৮ সালে সার্চ নিয়ে কাজ শুরু করে, মাইক্রোসফট সেখানে সত্যিকারের সার্চ নিয়ে আসে ২০০৬ সালে (“লাইভ” সার্চ নাম নিয়ে)। এতো দেরীতে শুরু করার ফল মাইক্রোসফটকে হাড়ে হাড়ে দিতে হচ্ছে – সার্চ এর বাজার দখলের ক্ষেত্রে মাইক্রোসফট গুগল থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে!

সিইও স্টিভ বালমার ভালো করেই জানেন দিন দিন মানুষ ইন্টারনেটএ বেশি বেশি সময় ব্যয় করছে এবং ওয়েব সাইটে বিজ্ঞাপনের পরিমাণও প্রতি বছর বাড়ছে দ্রুত গতিতে। তাই ইন্টারনেটেও মাইক্রোসফটকে ভালো করতে হবে। সার্চ হচ্ছে ইন্টারনেটএ প্রবেশদ্বার। তাই সার্চ এর শক্ত খেলোয়াড় হওয়ার জন্য মাইক্রোসফট মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে বিং. একই সাথে সার্চএ দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইয়াহুকে কিনে নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালায় মাইক্রোসফট। গতো বছর পুরো ইয়াহুকে কিনতে না পেরে এখন ইয়াহু এর সার্চ অংশটুকু কিনতে আগ্রহী মাইক্রোসফট। দেখা যাক গুগলকে মোকাবেলার মাইক্রোসফট এর এই চেষ্টা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

অ্যাপল, সান, ওরাকল, লিনাক্স, গুগল ইত্যাদি ছাড়াও আরো অসংখ্য ছোটবড় কম্পানী এবং পণ্য এর সাথে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে মাইক্রোসফটকে। সিসকো এর সাথে কমিউনিকেশন সফটওয়ার নিয়ে, ভিএমওয়ার এর সাথে ভার্চুয়াল অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে, অ্যামাজন এবং সেলসফোর্সের সাথে ক্লাউড কম্পিউটিং নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছেই!

বিল গেটস এবং স্টিভ বালমারঃ

২০০৮ সালের জুন পর্যন্ত কম্পানীর প্রধান ছিলেন চেয়ারম্যান বিল গেটস। কিন্তু তারপর থেকে তিনি অবসরে যাওয়ার কারণে সিইও স্টিভ বালমার এখন মাইক্রোসফট এর প্রধান কর্ণধার। বিল গেটস এখনো চেয়ারম্যান, কিন্তু তিনি এখন আর পুরো কম্পানীর দায়িত্বে নেই। তিনি শুধু মাত্র উইন্ডোজ এবং সার্চ এর মতো দুএকটি প্রধান পণ্য এর সাথে পরামর্শদাতা হিসেবে জড়িত থাকেন। বিল গেটস এখন মূলত তার বিল এন্ড মেলিন্ড গেটস ফাউন্ডেশন নিয়ে ব্যস্ত। তার ফাউন্ডেশনটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতব্য প্রতিষ্ঠান। বিল গেটস তার বন্ধু স্টিভ বালমারকে মাইক্রোসফটএ নিয়ে আসেন ১৯৮০ সালে। ২০০০ সালে বিল গেটস সিইও পদ থেকে সরে গিয়ে স্টিভ বালমারকে সে পদে নিয়োগ দেন। বিল গেটস হচ্ছে মাইক্রোসফট এর টেকনিকাল গুরু আর স্টিভ বালমার হচ্ছেন মার্কেটিং গুরু। তবে অনেকেই মনে করেন স্টিভ বালমার মাইক্রোসফটকে বিল গেটস এর মতো ভালোভাবে পরিচালিত করতে পারছেননা।

বিল গেটস এর প্রথম দিককার মন্ত্র ছিলো “বিশ্বের প্রতিটি ডেস্কে একটি করে কম্পিউটার যেটিতে মাইক্রোসফট এর সফটওয়ার চলবে”। বলা যায়, গেটস তার এ স্বপ্ন পূরণে মোটামুটি সার্থক হয়েছেন। ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাইক্রোসফটকে একটু একটু করে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য বিল গেটস এবং তার বিশাল কর্মী বাহিনী অবশ্যই কৃতিত্বের দাবীদার। তাদের এই ক্রমাগত প্রযুক্তি আবিষ্কার আর উদ্ভাবন তথ্য প্রযুক্তিকে দিন দিন আরো সমৃদ্ধ করছে, মানুষের জীবনকে করছে আরো আরামদায়ক।

Advertisements

মাইক্রোসফট এর সাতকাহন – পর্ব ২ (ইন্টার্ণশীপ অভিজ্ঞতা)

মাইক্রোসফটএ যারা ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জয়েন করে তাদের ওরিয়েন্টেশন হয় সোমবারে আর যারা ইন্টার্ণ হিসেবে জয়েন করে তাদের ওরিয়েন্টেশন হয় মঙ্গলবারে। গতো বছরের (এবং এই বছরেরও) অর্থনৈতিক মন্দার আগ পর্যন্ত সাধারণত এই ছিলো রেওয়াজ এবং সেই জন্য দেখা যেতো প্রতি সপ্তাহের সোম এবং মঙ্গলবার মাইক্রোসফট এর বিল্ডিং ৪৩ এর একতলার বড় কনফারেন্স রুমটি সবসময় নতুন জয়েন করা ইন্টার্ণ এবং ফুল টাইমারদের দ্বারা গিজগিজ করতো। (প্রসঙ্গক্রমে, গুগলেরও একটি বিল্ডিং ৪৩ আছে, এবং সম্প্রতি বিখ্যাত প্রযুক্তি ব্লগার রবার্ট স্কবল তার নতুন ব্লগ এর নাম রেখেছেন বিল্ডিং ৪৩। গতো বছর এবং এই বছরের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মাইক্রোসফট এর হায়ারিং অনেক কমে গেছে, তাই হয়তো সেখানে এখন আর অতো বেশি নতুন ইন্টার্ণ আর ফুল টাইমারদের দেখা যাবেনা।

তো ২০০৭ সালের জুন মাসের ১২ তারিখ মঙ্গলবার সকাল ৯ টায় আমাদের ওরিয়েন্টশনে যোগ দেওয়ার জন্য বিল্ডিং ৪৩ এর নির্ধারিত কনফারেন্স রুমটিতে যেয়ে পৌঁছাই। আলরেডি সেখানে হুলস্থূল অবস্থা। অসংখ্য ইন্টার্ণ এর ভিড়ে গিজগিজ অবস্থা। হরেক রকম লাইন সেখানে। কেউ হয়তো প্রাথমিক ফর্ম পূরণ করছে, কেউ হয়তো ব্যাংক সম্পর্কিত ফর্ম পূরণ করছে, কেউ কেউ আইডি কার্ড বানানোর জন্য ছবি তুলছে। আমিও একটার পর একটা লাইনে দাঁড়িয়ে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করছিলাম। আমরা যারা বিদেশী ছাত্র/ছাত্রী ছিলাম তাদের কিছু অতিরিক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয়েছিলো। ফর্ম পূরণের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাদের মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো।

মাইক্রোসফটএ একটা টিমই থাকে ওরিয়েন্টশন করার জন্য। তারা একে একে মাইক্রোসফট এর কম্পানী পলিসি, নিরাপত্তা, বিভিন্ন বেনেফিট (স্বাস্থ্য/বীমা/জিম/স্টক ইত্যাদি), এম্পলয়ীদের দায়িত্ব, আধিকার এবং তার সীমা, কম্পানী কালচার, ম্যানেজার এর সাথে সম্পর্ক, ক্যারিয়ার এডভান্সমেন্ট, ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে বলে যান এবং অংশগ্রহনকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে খাবার-দাবার চলতে থাকে। নতুন আগতরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হন। নতুন আসার কারণে সবারই মনে অসংখ্য প্রশ্ন থাকে, এবং আয়োজনকারীরা ধৈর্য ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দেন।

ওরিয়েন্টেশন সাধারণত দেড়দিন এর মতো হয়। আমার ওরিয়েন্টেশন শেষে পরদিন দুপুরে আমি আমার নির্ধারিত অফিস বিল্ডিং ৪০ এ গেলাম। নিচে রিসেপশনিস্টকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম আমি আমার ম্যানেজার ক্যারেন এর সাথে দেখা করতে চাই। ঘটনাক্রমে আমার ম্যানেজার ক্যারেন অফিস এ ছিলো না। তখন আমাদের টিম এর আরেকজন আ্যলেক্স (গতো পর্বে যার কথা উল্লেখ করেছিলাম – আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার!) এসে আমাকে উপরে নিয়ে গেলো। এখানকার সব অফিস ইলেক্ট্রনিক আইডি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, দরজার সাথে লাগানো ছোট মডিউলটাতে নিজের আইডি মেলে ধরলে ক্লিক করে দরজা খুলে যায়। যেহেতু তখনো আমার আইডি হয়নি তাই কী একজন এসে আমাকে নিয়ে যেতে হয়েছিলো।

আ্যলেক্স হচ্ছে আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে মজার মানুষদের একজন। সবসময় হাসিখুশি, প্রায় সময়ই চিৎকার চেঁচামেচি করে কথা বলে। আমাকে নিয়ে ও আমার রুম দেখিয়ে দিলো। সৌভাগ্যক্রমে সেই রুমটি তখন খালি ছিলো এবং রুমটি ছিলো জানালার ধারে। এখানে নতুনদের সিঙ্গেল অফিস রুম পাওয়া একটা বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার, আর পেলেও সেটি যে জানালার পাশে হবেনা সেটি প্রায় নিশ্চিত! মাইক্রোসফট অফিস এর ব্যাপারে কিউবিকল এর চেয়ে ব্যক্তিগত অফিস রুম এর পক্ষে। আমিও প্রোগ্রামারদের জন্য কিউবিকল এর চেয়ে ব্যক্তিগত রুম বেশি পছন্দ করি। কিউবিকলএ শব্দ বেশি হয় এবং সূক্ষ কাজে মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে আমার ধারণা। তাই জীবনের প্রথম ব্যক্তিগত রুম পেয়ে আমি যারপরনাই খুশি হয়ে উঠি!

আ্যলেক্স আমাকে টিম এর অন্য সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। এরপর আমাদের নেটওয়ার্কিং টিম এর এডমিনিস্ট্রেটিভ এসিসট্যান্ট এসে আমার কম্পিউটার দিয়ে গেলো। আ্যলেক্স এর সাহায্য নিয়ে আমি আমার কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক ইতাদি সেটাপ করলাম। একটু পরেই আমার ম্যানেজার ক্যারেন আসলো আমার রুমএ। মাইক্রোসফটএ যেকোনো এম্পলয়ী (ইন্টার্ণ বা ফুল টাইমার) এর একজন ম্যানেজার থাকে। সোজা বাংলায় বস! তবে এখানে বস শব্দটির চল নেই। সবাই সবার নাম ধরে ডাকে। শুধু অপিরিচিত কেউ হলে Mr অমুক বলে ডাকে। আ্যলেক্স এর মতো আমার ম্যানেজার ক্যারেনকেও আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেলো। আমাদের গ্রুপটি http নিয়ে কাজ করার কারণে ক্যারেন আমার জন্য http প্রোটকল এর উপর একটা বই নিয়ে এসেছিলো আমার জন্য।

এর পরের কয়েকদিন ক্যারেন আর আমার মেন্টর (mentor) আরি এসে আমার কাজ ঠিক করে দিলো। মাইক্রোসফটএ প্রত্যেক ইন্টার্ণ এর একজন ম্যানেজার এবং একজন মেন্টর থাকে। ম্যানেজার দেখেন ক্যারিয়ার এর দিকটা, আর মেন্টর দেখেন টেকনিকাল দিকটা। আমার মেন্টর আরি হচ্ছে আমার দেখা সবচেয়ে প্রতিভাবান সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের একজন। উইন্ডোজ এর এমন কোন দিক নেই যেটা সম্পর্কে ওর ভালো ধারণা নেই। আমার ভাগ্য ভালো আমি ওর মতো একজনকে আমার মেন্টর হিসেবে পেয়েছি। ও আমার সাথে প্রতিদিন সকাল নয়টায় আধঘন্টার একটা মিটিং করতো, যেটা প্রায়ই আধঘন্টার জায়গায় দুই/তিন ঘন্টা ধরে চলতো। আমার কাজের অংশ হিসেবে আমি ডাউনলোড ম্যানেজারের মতো একটি আ্যপলিকেশন লিখছিলাম, যেটির কী করতে হবে সেটা বলে দিতো আরি, আর কিভাবে করতে হবে সেটা আমি ঠিক করতাম। কিন্তু আমার অনভিজ্ঞতার কারণে প্রায় সময়ই আরি আমার ডিজাইনটি করে দিতো। ওর (এবং আমার) রুম এর সাদা বোর্ডটিতে কতো যে আঁকিজুঁকি করেছি আ্যপলিকেশন এর ডিজাইন এর বিভিন্ন দিক নিয়ে! ঘন্টার পর ঘন্টা চলতো আমাদের ব্রেইন স্টর্মিং। আ্যপলিকেশনটির ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট এর বিভিন্ন পর্যায়ে আরি টিম মিটিংএ আমাকে দিয়ে তখন পর্যন্ত যা যা করেছি সেটা উপস্থাপন করাতো।

যেহেতু সময়টা ছিলো গ্রীষ্মকাল তাই সবসময় এটা সেটা প্রোগ্রাম লেগে থাকতো ওখানে। সবচেয়ে সেরা প্রোগ্রামটি ছিলো বিল গেটস এর বাসায় একটা ডিনারের দাওয়াত। সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছি এখানে। এছাড়া প্রডাক্ট ফেয়ার হয়েছিলো যেখানে মাইক্রোসফট এর সব প্রডাক্ট গ্রুপ তাদের প্রডাক্ট উপস্থাপন করেছিলো। প্রত্যেকটি গ্রুপ তাদের প্রডাক্ট এর টেকনিকাল এবং বাণিজ্যিক দিক সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলো। প্রডাক্ট ফেয়ার এর একটা প্রোগ্রাম ছিলো সিইও স্টিভ বালমার এর বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব। মনে পড়ে এই প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন ইন্টার্ণ স্টিভ বালমারকে প্রশ্ন করেছিলো মাইক্রোসফট এর এম্পলয়ীদের ফ্রি লাঞ্চ দেওয়া যায় কিনা। প্রশ্ন শুনে সবাই হেসে উঠেছিলো কারণ প্রশ্নটি করা হয়েছে গুগলের কথা মাথায় রেখে – গুগল তাদের এম্পলয়ীদের ফ্রি লাঞ্চ এবং ডিনার দেয়! স্টিভ বালমার বেশ স্মার্টলি উত্তর দিয়ে বলেছিলো মাইক্রোসফট এম্পলয়ীদের যথেষ্ট বেতন দেয় এবং তারা ঠিক করবে তারা কোথায় লাঞ্চ করবে এবং কী লাঞ্চ করবে। এরপর তিনি ইন্টার্ণদের প্রশ্ন করেন কারা চায় তাদের বেতন কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া হোক আর কারা চায় বেতন ঠিক রেখে ফ্রি লাঞ্চ দেওয়া হোক! দেখা গেলো সবাই হাত তুলেছে বেতন বাড়ানোর পক্ষে! তিনি প্রমাণ করে ছাড়লেন এম্পলয়ীরা ফ্রি লাঞ্চ এর চেয়ে বেশি বেতন পছন্দ করে। মাইক্রোসফট এর বার্ষিক টেকনোলজি টাউনহল কনফারেন্সগুলি গ্রীষ্মকালে হয়। এই কনফারেন্সগুলির মূল বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর প্রযুক্তি কোন দিকে যাচ্ছে এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে মাইক্রোসফট কী কী পণ্য কিংবা সেবা আনছে, অথবা মাইক্রোসফট এর সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা। এইসব কনফারেন্সএ প্রায়শই মাইক্রোসফট এর উপরের দিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্টরা উপস্থিত থাকেন এবং মাইক্রোসফট এর ব্যবসায়িক এবং টেকনিকাল বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। আরেকদিন মাইক্রোসফট সারফেইস টিম একটি সারফেইস কম্পিউটার নিয়ে এসে ডেমোনেস্ট্রেশন করে গেলো ইন্টার্ণদের জন্য। সারফেইস কম্পিউটার তখনো সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি (এখন অল্প কিছু কম্পানী এটি ব্যবহার করে), তাই বাইরের মানুষের আগে এটি দেখতে পেরে বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম! যারা সারফেইস সম্পর্কে জানতে চান তারা এখানে ক্লিক করুণ।

আগস্ট এর ৩১ তারিখ ছিলো আমার ইন্টার্ণশিপ এর শেষ দিন। তার প্রায় এক সপ্তাহ আগে আমাকে আমার কাজের পূর্ণ ডেমন্সট্রেশন করতে হয় আমাদের টিম এর সামনে এবং উইন্ডোজ ডিভিশন এর কয়েকজন ভাইস প্রেসিডেন্টদের সামনে। টিম এর সাথে আগে থেকে পরিচয় থাকায় সহজেই ডেমন্সট্রেশন করতে পারি। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্টদের সামনে যেয়ে রীতিমতো ঘাম ছুটে যাবার অবস্থা! ভাগ্যিস আরি আমার পক্ষে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাকে অনাবশ্যক লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো!

মাইক্রোসফটএ সাধারণত গ্রুপএ খালি পজিশন থাকলে এবং ইন্টার্ণশীপ এর সময় ইন্টার্ণদের কাজ পছন্দ হলে তাদেরকে ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকুরীর অফার দেওয়া হয়। এবং এটা করা হয় কোনো ধরণের নতুন ইন্টারভিউ নেওয়া ছড়াই। সেজন্যই মাইক্রোসফট এর ইন্টার্ণশীপ ইন্টারভিউ প্রায় ফুল টাইম ইঞ্জিনিয়ারদের ইন্টারভিউ এর মতো হয়ে থাকে। চাকুরীর অফার দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে ইন্টার্নশীপ এর শেষ সপ্তাহে।কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার সারা জীবনের স্বপ্ন মাইক্রোসফট বা এ জাতীয় কোনো কম্পানীতে চাকুরী করা। তাই ইন্টার্ণশীপ এর শেষ সপ্তাহে এসে আমার হার্ট বিট নিয়ম করে অনিয়মিত হয়ে গেলো! কাজেই আমার সাথে যোগ দেওয়া ইন্ডিয়ান ছাত্রটিকে ফুল টাইম জব অফার দেওয়ার পর আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। আমার ম্যানেজারকে ইমেইল করলাম এই বলে – “আমি আমার ইন্টার্ণশীপ এর শেষ সপ্তাহে এসে পড়েছি। আমি জানিনা তোমরা আমাকে ফুল টাইম জব অফার দিবে কিনা। না দিলে কোনো সমস্যা নাই, আমি জানি মাইক্রোসফট এর মতো কম্পানীতে টেকনিকাল স্কিলস ছাড়াও অনেক কিছু দেখে ফুল টাইম জব অফার দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তত আমাকে জানিয়ে দাও অফার না দিলেও। তাহলে আমি এই সপ্তাহে অন্যান্য গ্রুপ যারা হায়ার করছে তাদের সাথে ইন্টারভিউ দিবো”। ইমেইল দেওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরও কোনো উত্তর না পেয়ে ভাবলাম ছোট মুখে বড় কথা বলে ফেললাম নাতো! কিন্তু আরো কিছুক্ষণ পর আমাকে অবাক করে দিয়ে ক্যারেন ইমেইল করলো – “আমরা তোমাকে আমাদের গ্রুপ এ ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জয়েন করার জন্য অফার দিচ্ছি! শীঘ্রই তোমার রিক্রুটার এ ব্যাপারে তোমার সাথে যোগাযোগ করবে।”

এর পরদিন আমার নতুন রিক্রুটার ড্যানিয়েল আমাকে বিল্ডিং ১৯ এ ডেকে নিয়ে মাক্রোসফটএ ফুল টাইম এম্পলয়মেন্ট এর জব অফার দেয়। যদিও এখানকার আবহাওয়া আমার একেবারে অপছন্দ (গ্রীষ্মকাল ছাড়া প্রায় সারাবছর গুঁড়িগঁড়ি বৃষ্টি কিংবা মেঘলা আকাশ থাকে), কিন্তু মাইক্রোসফট এর অফার বলে কথা! অফার এর সময় কম্পানীর নানারকম প্রশংসা ছাড়াও অন্যান্য কম্পানী থেকে যে কতো বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে ইত্যাদি নানা রকম কথাবর্তা বললো রিক্রুটার। আমার শেষ দিনটিতে ক্যারেন আমার জন্য ছোটখাটো একটা কেক-আইসক্রিম এর পার্টি দিয়েছিলো আমাদর অফিস এর বারান্দায়। গ্রুপ এর সবাই এসে আমাকে বিদায় জানালো আর কবে জয়েন করছি এইসব খোঁজখবর নিলো। আগস্ট মাসের ৩১ তারিখে প্রায় পৌনে তিনমাস ইন্টার্ণশীপ শেষে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসি।

মাইক্রোসফটএ ফুল টাইম এম্পলয়ী হিসেবে জয়েন করি ২০০৮ সালের জানুয়ারীতে এক প্রচন্ড তুষারপাত এর সকালে। পরের পর্বগুলোতে থাকবে মাইক্রোসফট ব্যবসা, প্রযুক্তি, এবং কম্পানী কালচার নিয়ে টুকিটাকি – ব্যক্তিগত কথাকে এখানেই বিদায়!

কর্পোরেটকে ঘৃণার সংস্কৃতি – এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং কর্পোরেট না থাকলে কি সভ্যতার চাকা ঘুরতো?

আমাদের অনেকেই কিছু শব্দ আওড়াতে বেশ পছন্দ করি – সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, পুঁজিবাদ-সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা বিশ্বের ষড়যন্ত্র, বস্তুবাদ, পরজীবি বুদ্ধিজীবি ইত্যাদি ইত্যাদি। ইদানিং এর সাথে যোগ হয়েছে কর্পোরেট থাবা, কর্পোরেট দখল, কর্পোরেট লোভ বা এই জাতীয় কিছু শব্দ। মোট কথা বড় কম্পানীগুলোর ব্যবসা-বানিজ্যের ধরণের বিরুদ্ধে এক ধরণের ঘৃণা বা অপছন্দতা। দেশে বড় কিছু ঘটলেই যেমন কিছু মানুষ অবধারিতভাবে ধরে নেয় এটা ইন্দো-মার্কিন-ইজরায়েল এর চক্রান্ত, তেমনি দেশের বড় বড় কম্পানীগুলো তাদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কোন নতুন কিছু করলেই গেলো গেলো রব উঠে যায়। ভাবখানা এমন এই কম্পানীগুলোর সিইও হচ্ছে স্বয়ং ইবলিশ শয়তান আর তাদের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের এই গরীব দেশটাকে চুষে নিঃশেষিত করে দেওয়া।

কর্পোরেট বলতে আমরা সাধারণত বড় কম্পানীগুলোকেই বুঝাই। এগুলোর অনেকগুলোই আবার বহুজাতিক কম্পানী। কর্পোরেট এর প্রতি আমাদের ঘৃণা যতোই হোক না কেনো, আমাদের একটা মুহুর্তও কর্পোরেট এর উৎপাদিত পণ্য ছাড়া চলবেনা। আঠারো শতকের দিকে যে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিলো ইউরোপে, আজকের কর্পোরেট তারই বিশ শতকীয় সংস্করণ। এই যে আমি যেই কম্পিউটার ব্যবহার করে এই লেখাটি লিখছি সেটি ডেল নামক বহুজাতিক কম্পানীর তৈরি, ইন্টারনেট কানেকশন নেওয়া হয়েছে আরেক বিশাল কম্পানী কমকাস্ট থেকে, আমার ঘরের প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসপত্র কোনো না কোনো কম্পানীর তৈরি। পানি, বাতাস, আর মাটি ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার তার সবই আসে কর্পোরেট থেকে। আমার নিজের চাকুরীটাও একটা বহুজাতিক কম্পানীতে! এবং এ চাকুরী পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি! এবং সেটাই কি আমাদের সবার জন্য সত্যি নয়? আমাদের সবাই কি একটা ভালো কম্পানীতে একটা ভালো চাকুরী পেলে নিজেদের ধন্য মনে করি না?

পৃথিবীর সভ্যতার চাকা ঘুরানোর মূল রসদগুলো আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এঁরা। কিন্তু এগুলো পৃথিবীর ছয় বিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে তাদের ব্যবহারের মতো পণ্য বা সেবা হিসেবে প্রস্তুত করে নিয়ে যায় মূলত বিভিন্ন বেসরকরারী প্রতিষ্ঠান এবং কম্পানীগুলো (কিছু ক্ষেত্রে সরকারও এই কাজটি করে থাকে)। কম্পানীগুলো এই কাজটি কোনো জনসেবার চিন্তা থেকে নয়, বরং পুরোপুরি মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই মুনাফা লাভ করতে গিয়ে ওরা অসংখ্য মানুষকে চাকুরী দেয় আর মানুষের জীবনকে করে দেয় অনেক বেশি আরামদায়ক। এখন ওরা কতোটুকু লাভ করবে, কিংবা কী প্রক্রিয়ায় ব্যবসা করবে এই আইনগুলি ঠিক করে দিবে দেশের সরকার, যেই সরকারকে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আনবে সেই দেশের জনগন। জনগন যেহেতু সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, তাই সরকার এমনভাবে আইন করবে যাতে জনগনের স্বার্থ সবার আগে রক্ষা হয়। এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে যারা ওই কম্পানীগুলোর মালিক/অংশীদার তারাও এই জনগনের অংশ, এবং তারাও অসংখ্য মানুষের চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখছে।

আমরা যারা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়এ পড়ছি বা পড়ে পাশ করে বের হয়েছি, আমাদের সবার লক্ষ্য কী? প্রায় সবাই কি একটা ভালো চাকুরী করতে চাই না? বড় বড় টেলিকম কম্পানীগুলো, কিংবা বড় বড় বুহুজাতিক কম্পানী-ব্যাঙ্কগুলো হয় আমাদের প্রথম টার্গেট, কারণ সেগুলো সবচেয়ে বেশি বেতন দেয়। একটা স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য সবারই টাকা দরকার হয়, টাকা নিয়ে যতোই বড় কথা বলি না কেনো আমরা। আর সেই টাকার একটা বড় অংশ অর্থনীতিতে পাম্প করে এই কম্পানীগুলো। অর্থনীতিকে সচল রাখতে কম্পানীগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

উন্নত দেশগুলিতে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে প্রচন্ড উৎসাহ দেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক বাল্বসহ অসংখ্য আবিষ্কারের জনক থমাস আলভা এডিসন ছিলেন একজন সফল উদ্দোক্তা (এন্ট্রাপ্রেনিউর)। মাইক্রোসফট এর বিল গেটস, গুগলের ল্যারি এবং সের্গেই, এইচপি এর হিউলেট এবং প্যাকার্ড – এরকম অনেক কম্পানীর প্রতিষ্ঠাতারা আক্ষরিক অর্থেই জিনিয়াস পর্যায়ের মানুষ। এই কম্পানীগুলো বিংশ এবং একবিংশ শতকের সভ্যতার পরিবর্তনের অন্যতম চালক। তেমনি করে সারা পৃথিবী জুড়ে খেলাধুলা, ইলেক্ট্রনিক্স, কম্পিউটার, টেলিকম, পেট্রোলিয়াম, কসমেটিক্স, খাদ্যদ্রব্য, যানবাহন, উড়োজাহাজ, স্বাস্থ্য – ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্ভর কম্পানী নানারকম পন্য এবং সেবা দিয়ে পৃথিবীতে আমাদের জীবন যাপনকে করে দিয়েছে অনেক বেশি সুবিধাজনক আর আরামদায়ক। আমাদের আজকের এই মোবাইল ফোন বিপ্লব, মিডিয়া বিপ্লব এগুলোর পেছনেও রয়েছে কর্পোরেট। মোবাইল ফোন ছাড়া কি একটা দিনও থাকার কথা ভাবা যায়? আর কর্পোরেটকে বাদ দিয়ে সরকারীভাবে ফোন সেবা দিতে চাইলে যে কী অবস্থা হয় সেটা টিএন্ডটি আর টেলিটককে দেখলেই বুঝা যায়!

দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য অনেকাংশেই নির্ভর করে এই কম্পানীগুলোর স্বাস্থের উপর। কম্পানীগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে টাকা কামানো, সরকার সঠিক আইনের মাধ্যমে এই কম্পানীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কম্পানীগুলোকে ঘৃণা করে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। দুঃখের বিষয় এমনকি বিয়ে করার সময় পাত্র ব্যবসা করে এমন কথা শুনলে আমাদের অভিভাবকরা তাদের মেয়ে বিয়ে দিতে চায়না অনেক সময় সেই পাত্রের কাছে। ব্যবসা মানেই মুদির দোকানী বা এরকম কিছু, কিংবা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে না পেরে কিছু একটা করার চেষ্টা – এই ধারণা থেকে আমাদের বের হতে হবে। মেধাবী ছেলেমেয়েরাও ব্যবসা করে, এবং সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনেক মেধাবী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যবসা প্রশাসন গ্র্যাজুএট কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে – এটাকে একটা বাস্তবতা হিসেবে আমাদের মেনে নিতে হবে।

আমাদের দরকার অনেক অনেক ব্যবসায়ী উদ্দোক্তা, অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। সিলিকন ভ্যালীর মতো সভ্যতা পরিবর্তনকারী ব্যবসা’র জায়গা তৈরী হয়েছে শুধুমাত্র উদ্দোক্তাদের মাধ্যমে। সিলিকন ভ্যালীর উদ্দোক্তারা প্রায় সবাই কোটিপতি, কিন্তু তাদের পন্য ব্যবহার করে আরো বেশি মানুষ কোটিপতি হয়েছে এবং তার চেয়েও বেশি মানুষ আরামদায়ক জীবন যাপন করছে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। “কর্পোরেট” শব্দটাকে একটা ভালো শব্দ হিসেবে দেখতে হবে। কর্পোরেটএ চাকুরী পাবার জন্য একের পর সিভি জমা দিবো কিন্তু ব্লগে বসে কর্পোরেটকে গালি দিবো সেটা হওয়া উচিত নয়। এরচেয়ে গণহারে সমালোচনা না করে স্পেসিফিক সমালোচনা করলে ব্যাপারটা অনেক বেশি ঠিক হয়। কর্পোরেট যেনো আমেরিকার মতো হয়ে না পড়ে – আমেরিকাকে সবাই গালি দেয় কিন্তু সবাই সেখানে যেতে চায়, ডিভি লটারিতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে বাংলাদেশ থেকে! কর্পোরেট যেনো একটা আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়, এন্ট্রাপ্রেনিউর হওয়া ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ম্যানেজার হওয়ার চেয়ে কম স্মার্ট ব্যাপার না। একটি সফল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা এবং সেটিকে সবার নিত্যদিনের ব্যবহার্য করে তোলা একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার, এবং এই কাজের জন্য দরকার ভিশন এবং এক্সিকিউশন। আজকের দিনের সেরা ব্র্যান্ডগুলি তৈরির পেছনে অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের অনেক বছরের পরিকল্পনা আর পরিশ্রম রয়েছে। এই পরিশ্রমকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

তবে কর্পোরেট যেনো মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য থাকতে হবে শক্ত আইন এবং তার শক্ত প্রয়োগ। বন উজাড় করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, চাষাবাদের জমি এবং নদী দখল করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলা, সেবার তুলনায় টাকা বেশি নেওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে সরকারকে থাকতে হবে তৎপর। কিন্তু এসব যাতে কর্পোরেট এর বিরুদ্ধে নির্বিচার ঘৃণার কারণ না হয়ে উঠে সেটি খেয়াল রাখতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কর্পোরেট এর বিকল্প নেই। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বছর বছর যে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিবিএ, অর্থনীতি, রাজনীতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, ইত্যাদি অসংখ্য বিষয় থেকে পাশ করে বের হচ্ছে তাদের পর্যাপ্ত চাকুরীর জন্য দরকার অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। শুধু খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সরকার যেনো দেশের আইনটা ঠিকমতো প্রয়োগ করে আর সাধারণ মানুষের স্বার্থের দিকটা ঠিক রাখে।

Advertisements