Category Archives: Uncategorized

বুক রিভিউ – সেপিঅ্যান্সঃ মানব (প্র)জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

Sapiens-book

 

ইতিহাসের প্রফেসর ইউভাল হারারির Sapiens: A Brief History of Humankind বইটা গত বছর বের হওয়ার কয়েক মাস আগেই আমাজন ডট কমে প্রি-অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু নানা ব্যস্ততায় গত এক বছরে বইটা আর পড়া হয়ে ওঠেনি। তাই গত কয়েক সপ্তায় একেবারে পণ করে প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা করে পড়ে বইটা অবশেষে শেষ করেছি! এত পছন্দের একটা বই আর এত কষ্ট (!) করে পড়লাম তাই ভাবলাম একটা রিভিউ লিখে ফেলি!

বইটা চারশ পৃষ্ঠার চেয়ে সামান্য কয়েক পৃষ্ঠা বেশি, কিন্তু এর মধ্যে প্রফেসর হারারি মানুষের গত ৭০,০০০ বছরের ইতিহাসকে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন।

আমাদের মানুষের যেই প্রজাতি যাকে জীববিজ্ঞানের ভাষায় হোমো সেপিঅ্যান্স (Homo Sapiens) বলা হয় তার উদ্ভব গঠে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে। কিন্তু আমাদের সত্যিকারের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি শুরু হয় প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে। হারারি এটার নাম দিয়েছেন “বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব” (Cognitive Revolution)। ইতিহাস নামক যে বিষয়টা আমরা পড়ি বা জানি তার শুরু এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের সময় থেকেই। এর আগের মানুষের যে আমাদের মানুষের মত বুদ্ধি ছিল এর তেমন কোন প্রমাণও পাওয়া যায়না।

এই সময় আমরা ভাষার সৃষ্টি করি। মানুষের মাঝে যোগাযোগ অনেক দৃঢ় হয় ভাষার কারণে। মানুষ দল বেঁধে চলা শুরু করে। এবং পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বারের মত মানুষ আফ্রিকার জঙ্গল থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

মজার ব্যাপার হলো এই সময় মানুষের শুধু একটা প্রজাতি ছিল না। মানুষের প্রায় পাঁচ/ছয়টা প্রজাতি ছিল তখন। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল নিয়ান্ডারথাল (Neandarthal) মানুষেরা। কিভাবে নিয়ান্ডারথাল এবং অন্যান্য মানুষ প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হলো সেটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো একমত নয়।

প্রায় ১১,০০০ বছর আগে শুরু হয় “কৃষি বিপ্লব”। কৃষি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত মানুষ ছিল মূলত শিকারি (Hunter-gatherer)। মানুষ নানা জায়গায় ঘুরে ফিরে পশুপাখি শিকার কিংবা বিভিন্ন ধরণের পাতা-লতা-ফল-মূল খেয়ে বেঁচে থাকতো এবং এক জায়গায় বেশি দিন থাকতো না। কিন্তু কৃষি কাজ আবিষ্কারের পর থেকে মানুষ চাষের জমি নির্ধারণ করে এর চারপাশে বসতি গড়া শুরু করে। প্রফেসর হারারির মতে কৃষি বিপ্লব মানুষকে আগের চেয়ে অসুখী এবং দুর্বল করে দেয়। আগে মানুষ বিভিন্ন ধরণের পুষ্টিকর খাবার খেতে পারতো, শিকার করার কারণে মানুষের শরীর অনেক শক্ত ছিল। কিন্তু কৃষি কাজ করতে যেয়ে মানুষ এক ধরণের খাবার খেতে অভ্যস্ত হওয়া শুরু করে। আর কৃষি কাজের জন্যে ঝুঁকে ঝুঁকে কাজ করার ফলে মানুষের শারীরিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রায় ৫০০ বছর আগে শুরু হয় “বৈজ্ঞানিক বিপ্লব”। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের হাত ধরে আসে “শিল্প বিপ্লব” এবং গত কয়েক দশকে শুরু হয় “তথ্য বিপ্লব” এবং “জৈব-প্রযুক্তি বিপ্লব”।

বইটির মূল বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে মানুষ কিভাবে পৃথিবীতে রাজত্ব করতে পেরেছে যেখানে ৭০,০০০ বছরের আগেও মানুষের চেয়ে বন-মানব বা শিম্পাঞ্জির শক্তি অনেক বেশি ছিল এবং বুদ্ধিও প্রায় সমান পর্যায়ে ছিল। মানুষের কী সেই গুণ যার দ্বারা মানুষ অন্য সব পশু পাখি এবং পুরো পৃথিবীকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে?

এর উত্তর হারারি দিয়েছেন এভাবেঃ মানুষের রূপকথা (myth – মিথ) বা গল্প বানানো এবং সেই মিথ অন্যদের বিশ্বাস করানোর ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে মানুষের সাফল্যের মূলমন্ত্র। পুরো বই জুড়ে হারারি অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছেন মানুষের বানানো মিথের। যেমন – আমেরিকা একটা মিথ। বাংলাদেশ একটা মিথ। ফেইসবুক একটা মিথ। আমেরিকা, বাংলাদেশ, বা ফেইসবুক এই সব গুলোর অস্তিত্ব কিন্তু আমাদের মনে। আমেরিকা এবং বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে যেই মানুষগুলো থাকে তারা আমেরিকা এবং বাংলাদেশ নামক “দেশ” এর ধারণাকে মেনে নিয়ে এই মিথ তৈরি করেছে। কয়েক’শ বছর আগেও পৃথিবীতে কোন দেশ ছিল না। তখন ছিল সাম্রাজ্য – মিশরীয় সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য, অটোমান সাম্রাজ্য, অ্যাজটেক সাম্রাজ্য, ইনকা সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ইত্যাদি। তখন মিথ ছিল সাম্রাজ্য কেন্দ্রিক। এর আগের মিথ ছিল ধর্ম কেন্দ্রিক। এর আগে ছিল সারা পৃথিবী জুড়ে ছোট ছোট নানা গোত্র এবং গোষ্টি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সাম্রাজ্য, গোত্র, ধর্ম, কোম্পানি, দেশ, ইত্যাদি নানা ধারণার তৈরি করে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে।

তেমনিভাবে ফেইসবুক, গুগল, মাইক্রোসফট ইত্যাদি কম্পানী কিন্তু কিছু ধারণা ছাড়া আর কিছু নয়। এদের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নাই। সরকার নামে একটা মিথের মাধ্যমে আমরা কম্পানী নামের একটা মিথ এর আইনগত একটা অস্তিত্ব বজায় রাখি। সেই আইনও আরেকটা মিথ!

একটা খুব পরিচিত মিথ হচ্ছে টাকা। টাকা জিনিসটা বাস্তবে শুধু একটা কাগজ। কিন্তু আমরা সবাই টাকায় বিশ্বাস করি বলেই টাকার এত মূল্য। আগেকার দিনে সোনা ছিল টাকার মত বিনিময়ের মাধ্যম। এরও আগে ছিল রুপা।

প্রফেসর হারারির মতে আমরা মানুষেরা যে এক সাথে মিলে মিশে কাজ করতে পারি এর মূল কারণ হচ্ছে আমরা একদল অপরিচিত মানুষ মিলে একটা মিথ বানিয়ে বিশ্বাস করতে পারি এবং সেই বিশ্বাসের ছায়াতলে সবাই এক সাথে মিলে মিশে কাজ করতে পারি। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, কম্পানী ইত্যাদি হচ্ছে শক্তিশালী কিছু মিথের উদাহরণ। মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণী এভাবে গল্প বানিয়ে সেটাকে অন্যদের দ্বারা বিশ্বাস করাতে পারে না। একটা বানরকে কি কেউ মৃত্যুর পর স্বর্গে যাবে বলে তার হাত থেকে কলা নিয়ে নিতে পারবে?

ইতিহাস শেষ করে প্রফেসর হারারি এরপর বর্তমান নিয়েও অনেকগুলো চ্যাপ্টার ব্যয় করেন। সভ্যতার চাকার সাথে সাথে মানুষ যে সুখী হতে পারেনি তার পক্ষে নানা যুক্তি দেখিয়েছেন। এরপর তিনি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও বেশ কয়েক পৃষ্ঠা ব্যয় করেন। তাঁর ধারণা জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ এক সময় তার ক্ষমতাকে অনেক গুন বাড়িয়ে ফেলবে। এবং হাজার হাজার বছর পূর্বে মানুষ যে ঈশ্বরের ধারণা আবিষ্কার করেছিল মানুষ ধীরে ধীরে সেই ঈশ্বরের কাছাকাছি ক্ষমতা অর্জন করবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বইটার প্রতি আগ্রহী হওয়ার মূল কারণ ছিল পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্যে। প্রফেসর হারারি আমার সেই আশা পূরণ করেছেন। যেটা আমার ভালো লাগেনি সেটা হলো লেখক ইতিহাসের সাথে নিজের মতামত প্রদান করাকে পরম কর্তব্য জ্ঞ্যান মনে করে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলেছেন ইতিহাসকে মূল্যায়ন করার কাজে। এই কাজটা তিনি তাঁর পাঠকদের জন্যে রেখে দিলেই ভালো করতেন।

Advertisements

নীল তারা

blue-stars-1280x800

ছেলেটি মেয়েটিকে ডাকতো নীল তারা বলে।

এক অদ্ভুত কিন্তু আশ্চর্য সুন্দর সম্পর্কের জালে জড়িয়ে ছিল ওরা দু’জন।

প্রথম যেদিন মেয়েটি ওদের বাসায় আসে, ছেলেটি মেয়েটির দিকে তাকাতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো কী যেন ঘটে গেলো ওর মনে। এরপর বেশ কয়েক মাস মেয়েটি ওদের বাসায় ছিল। সেই কয়েক মাসে ওরা একজন আরেকজনের অনেক কাছে চলে আসে। মেয়েটি ছেলেটির চেয়ে বয়সে বড়। কিন্তু ওদের মানসিক বয়স ছিল একেবারে সমান – একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বোঝার এবং ভালো লাগার জন্যে যে বয়সে থাকতে হয় ঠিক সে বয়সটি।

মেয়েটির প্রেম ছিল আরেকজনের  সাথে। সে প্রেমে কোন খুঁত ছিল না। ছিল না আবেগের কোনো ঘাটতি। কিন্তু ছেলেটির সাথে পরিচয় হবার পর তাকেও মেয়েটির ভালো লাগতে শুরু করে। সে ভালো লাগা শুধুই ভালো লাগা, ভালোবাসা বা প্রেম নয়। কিন্তু কখনো কখনো ভালো লাগার তীব্রতা ভালোবাসার তীব্রতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়। ছেলেটির প্রতি মেয়েটির ভালো লাগা সেরকম তীব্র কিনা এই প্রশ্নের উত্তর মেয়েটি তার জীবনে কখনো খুঁজে পায়নি। কাকে বেশি ভালো লাগে – নিজের প্রেমিককে (পরবর্তীতে স্বামী) নাকি ছেলেটিকে – এ প্রশ্ন নিজেকে অসংখ্যবার করেও মেয়েটি কখনো কোনো উপসংহারে পৌঁছতে পারেনি।

গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত এসে চলে যায়; পৃথিবী তার আপন কক্ষপথে আর সূর্যের চারদিকে অবিরাম ঘুরতে থাকে। সেই ঋতু চক্রের ক্লান্তিহীন চলার মাঝে ছেলেটি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ও প্রেম শুরু করে এক সুন্দরী তরুণীর সাথে। এরপর এক মায়াময় হেমন্তের রাত্রিতে ছেলেটি তার সুন্দরী প্রেমিকাকে বিয়ে করে বউ হিসেবে ঘরে তুলে আনে। মেয়েটি অবশ্য এর অনেক আগেই বিয়ে করে তার প্রেমিক পুরুষকে। গত কয়েক বছরে ওদের মধ্যে যোগাযোগ অনেক কমে গিয়েছিল। নিজেদের সংসার জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় একে অপরকে খুব বেশি মিস করার সময়ই পায়নি।

নিজেদের জীবনে নিজ জীবন সঙ্গী নিয়ে ওরা মোটামুটি সুখেই ছিল। দৈনন্দিন একঘেয়ে জীবনের টুকটাক টানাপোড়ন ছাড়া ওদের ব্যস্ত সংসার জীবনে খুব বেশি অভিযোগ অনুযোগ ছিল না। কিন্তু ভাগ্য বিধাতার মনে হয় অন্য পরিকল্পনা ছিল!

চাকরির কারণে দুজনেই এক সময় একই শহরে এসে পড়ে। ওদের যোগাযোগটা তখন আবার শুরু হয় নতুন করে। তবে এবার ওদের দেখা-সাক্ষাৎ সব হয় পারিবারিকভাবে। দু’জনের দুই পরিবার আস্তে আস্তে খুব ঘনিষ্ট হয়ে আসে। সেই সাথে ফিরে আসে প্রথমবার দেখা হওয়ার সময়কার ভালোলাগা।

মেয়েটি বৃষ্টি ভালোবাসতো। এক অঝোর ধারার শ্রাবনের বিকেলে ছেলেটি একদিন এসেছিল মেয়েটির বাসায়। মেয়েটির স্বামী বাসায় ছিল না। বাচ্চারা ছিল ঘুমে। মেয়েটি সোফা থেকে উঠে যেয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায়, বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে সেই একই প্রশ্ন, যেটা আগেও সে অসংখ্যবার জিজ্ঞেস করেছিল ছেলেটিকে – “তুমি নিশ্চয়ই আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে পুরোপুরি পরিষ্কার?” ছেলেটি সোফা থেকে উঠে এসে পেছন থেকে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটির কানে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। এরপর ফিসফিস করে বলে – “আমি আমাদের সম্পর্ক নিয়ে পুরোপুরি পরিষ্কার। আমি আমার স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসি। তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে আমি অসম্ভব রেস্পেক্ট করি। তোমরা দুজনেই আমার এবং আমার স্ত্রীর খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু…”। ছেলেটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে যায়। “কিন্তু কী?” – মেয়েটি ঘুরে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে ছেলেটির গলা জড়িয়ে ধরে, দু’চোখ রাখে ছেলেটির দু’চোখে, আর ছেলেটি দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে মেয়েটির কোমরে। ওরা দু’জনেই মোটামুটি আঁচ করতে পারে এরপর ছেলেটি কী বলবে। ছেলেটি বলে – “আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি, তুমি ভালোবাসো তোমার স্বামীকে। কিন্তু আমরা দু’জনেই জানি আমরা একজন আরেকজনের সোল-মেট। আমি তোমাকে যেরকম জানি বুঝি, তুমি আমাকে যেরকম জানো বুঝো, পৃথিবীর আর কেউই আমাদের সেরকম জানেনা, বুঝেনা।” ছেলেটি এক সেকেন্ডের জন্যে থামে। গভীর আদরে চুমু খায় মেয়েটির কপালে। বলে – “আমাদের পৃথিবীতে জীবন একটাই। কিন্তু স্রষ্টা যদি আর কোনো জন্ম আমাদের জন্যে রেখে থাকে তাহলে সে জন্মে তুমি হবা আমার, শুধুই আমার নীল তারা”।

এভাবে চলতে থাকে ওদের ভেতরের আর বাইরের জীবন। এরপর আরো অনেক শ্রাবণ এসে চলে যায়। আকাশ কালো করে মেঘ জমে, তারপর আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেটি মনে মনে ভাবে “আচ্ছা, ও কি আমাকে মিস করছে?”

কিন্তু ভাগ্য বিধাতার এর পরের পরিকল্পনাটা ছিল বড়ই নিষ্ঠুর।

এক কঠিন অসুখ এসে বাসা বাঁধে মেয়েটির শরীরে। মেয়েটিকে সিঙ্গাপুরের সেরা হাসপাতালে নেওয়া হয়। ছেলেটি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সিঙ্গাপুর যায়। হোটেল থেকে সে প্রতিদিন নিয়ম করে হাসপাতালে যায়। মাঝে মাঝে ছেলেটি যখন হাসপাতালে যায় তখন কেউ না থাকলে ছেলেটি মেয়েটিকে হাতে তুলে খাইয়ে দেয়, হাতে পায়ে হালকা মাসাজ করে দেয়। দেখতে দেখতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠে। ছেলেটি মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

এরপর ওরা আবার ফিরে যায় ওদের আগের জীবনে। যদিও বিভিন্ন কারণে ওদের আগের মতো আর দেখা হয়না, শুধু মাঝে মাঝে এসএমএস বা ফোনে দু’এক মিনিট কিছুটা কথা হতো। অবশ্য সেই দুই একটি এসএমএস কিংবা দুই এক মিনিট কথাতেই ওরা ওদের সব ভাব বিনিময় করে ফেলতে পারতো। মনে হয় ওদের একজনের মনের কথা আরেকজন ঠিকই টেলিপ্যাথি কিংবা অদৃশ্য ইথারে কান পেতে পড়ে নিতে পারে।

ছেলেটি প্রায়ই ভাবতো – পৃথিবীতে কি খুঁতহীন পারফেক্ট কিছু আছে? মেয়েটির প্রতি ওর যে ভালো লাগার  অনুভূতি, সেটা তো প্রায় পারফেক্ট। প্রকৃতি কি এই পারফেকশন মেনে নিতে পারবে?

প্রকৃতি আসলেই মেয়েটির প্রতি ছেলেটির এই অদ্ভুত সুন্দর ভালো লাগার অনুভূতি বেশিদিন সহ্য করলো না। কিছুদিন পর মেয়েটির সেই কঠিন অসুখ আবার ফিরে আসে। এবার দেখা গেল সেটা আরো ভয়ঙ্কর রূপে ফিরে এসেছে। মেয়েটির স্বামী ওকে আবার সিঙ্গাপুরের সেই হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখানকার সেরা ডাক্তাররা ওর চিকিৎসা করতে থাকে। কিন্তু ভাগ্য বিধাতা সম্ভবত পণ করে বসেছিল এবার যে কোনভাবেই মেয়েটিকে ভালো হতে দিবে না।

কয়েক সপ্তাহ জীবন মৃত্যুর মাঝামাঝি যুদ্ধ করে মেয়েটি আরেক অঝোর ধারার শ্রাবণের এক বিষণ্ণ বিকেল বেলা এই পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেয়।

মেয়েটির মৃত্যু ছেলেটির পৃথিবীকে পুরোপুরি উল্টেপাল্টে দেয়। কিন্তু ও সেটা কাউকে বলতে পারেনা, বুঝাতে পারেনা। পৃথিবীতে কেউ জানেনা ওদের কথা। জীবনের সবচেয়ে কষ্টের একটা সময় ওর শুধু অদৃশ্য অশ্রু  ঝরিয়ে পার করে দিতে হয়েছে। ওর নীল তারা আর নাই। ওর সব প্রশ্নের উত্তর যে দিতে পারতো সেই মানুষটি আর নাই। যার মুখ দেখলে ওর জীবনটাকে অনেক সুন্দর মনে হতো সেই মানুষটা আর নাই।

সেই মৃত্যুময় শ্রাবণের এক দিনে ছেলেটি অফিসের বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পুরো শহরকে ধুয়েমুছে দিচ্ছে। কিন্তু ছেলেটির মনে সারা পৃথিবীর সব কষ্ট এসে আটকে আছে। ছেলেটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখে। আর কোনো দিন নীল তারার সাথে ওর বৃষ্টি দেখা হবেনা ভেবে বুকটা এক অসীম শূন্যতায় ভরে ওঠে। ও জানে ওর নীল তারা আজ আর এই শহরে নাই, এই বৃষ্টি শুধু মিছে মিছিই ঝরে পড়ছে আজ। নীল তারা আর কোনো দিন হাসবেনা ওর চোখে চোখ রেখে, হাতে হাত রেখে। আর কোনো দিন বলবেনা বৃষ্টি সে কতো ভালোবাসে।

নীল তারা আর নাই।

নীল তারা চলে গেছে।

মানুষ কেন পৃথিবীর রাজা

yuval_harari_ted1

(Translation of the article Why humans run the world by Yuval Noah Harari)

৭০,০০০ বছর আগে মানুষ ছিল অতি তুচ্ছ এক প্রাণী। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ কথা হচ্ছে যে তারা খুব অগুরুত্মপূর্ণ ছিলো। এই পৃথিবীতে তাদের প্রভাব ছিল খুবই কম, জেলি ফিশ, কাঠ-ঠোকরা, বা মৌমাছির চেয়েও  কম।

বর্তমান সময়ে অবশ্য মানুষ পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই অবস্থা থেকে আমরা কিভাবে আজকের এই অবস্থায় এলাম? আমাদের সাফল্যের সেই গোপন রহস্য কী – যার দ্বারা আমরা আফ্রিকার এক কোণায় অতি তুচ্ছ, অগুরুত্মপূর্ণ নরবানর থেকে পৃথিবী দাবড়িয়ে বেড়ানো প্রাণীতে পরিণত হলাম?

আমরা প্রায়ই অন্য প্রাণীদের সাথে আমাদের পার্থক্য দেখার সময় শুধু শারীরিক পার্থক্যের কথা চিন্তা করি। আমরা ভাবতে ভালোবাসি যে আমাদের শরীর অথবা আমাদের মস্তিষ্ক খুবই বিশেষ কিছু যার কারণে একজন মানুষ একটা কুকুর, একটা শুয়োর, বা একটা শিম্পাঞ্জির চেয়ে অনেক মহান। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে যে – মানুষ আর শিম্পাঞ্জি প্রায় একই রকম। একজন মানুষ আর একটা শিম্পাঞ্জিকে যদি একটা দ্বীপে একাকী ছেড়ে দেওয়া হয় এটা দেখার জন্যে যে কে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে বেশি টিকে থাকতে পারবে, তাহলে আমি নিশ্চিত যে শিম্পাঞ্জিটি অনেক ভালোভাবে বেঁচে থাকবে মানুষটির চেয়ে।

মানুষের সাথে অন্য প্রাণীদের আসল পার্থক্য হচ্ছে সমষ্টিগত পর্যায়ে।

আমরা মানুষেরা পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করি কারণ আমরাই একমাত্র প্রাণী যারা অনেক বেশি সংখ্যায় এক সাথে থেকে নিজেদের মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে পারি। পিঁপড়া এবং মৌমাছিরাও অনেকে এক সাথে কাজ করতে পারে, কিন্তু তারা সেটা করে একটা অনমনীয়, ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে থেকে। একটা মৌচাকের মৌমাছিরা যদি কোন নতুন হুমকির মুখে পড়ে, কিংবা নতুন কিছু করার সুযোগ পায়, সেই মৌমাছিরা রাতারাতি তাদের সমাজব্যবস্থা পাল্টে ফেলে সেই নতুন হুমকি কিংবা সুযোগ এর সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ – তারা তাদের মৌচাকের রানীকে মেরে ফেলে একটা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। চিতা বাঘ এবং শিম্পাঞ্জিরা মৌমাছিদের চেয়ে অনেক কম ধরাবাঁধা এবং বেশি নমনীয় নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু তারা সেটি করতে পারে শুধু পরিচিত কিছু অন্য চিতা বাঘ এবং শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে। চিতা বাঘ এবং শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারটা শুধুমাত্র একই গোত্রের  পরিচিত অন্য প্রাণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমি যদি একটা শিম্পাঞ্জি হই এবং আপনি যদি আমার সাহায্য চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই আমার ব্যক্তিগতভাবে চিনতে জানতে হবেঃ আপনি কেমন শিম্পাঞ্জি? আপনি কি একটা ভালো শিম্পাঞ্জি? আপনি কি একটা খারাপ, মতলববাজ শিম্পাঞ্জি? আপনাকে না চিনলে আমি কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

শুধুমাত্র হোমো স্যাপিএন্স রাই অসংখ্য অজানা, অচেনা মানুষের সাথে কোন ধরাবাঁধা নিয়ম না মেনে এক সাথে কাজ করে যেতে পারে। একটা শিম্পাঞ্জি হয়তো একজন মানুষের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে, এমনকি দশটা শিম্পাঞ্জি হয়তো দশটা মানুষের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু এক হাজার জন মানুষ অনায়াসে এক হাজারটা শিম্পাঞ্জিকে কাবু করে দিতে পারবে – শুধুমাত্র এই কারণে যে এক হাজারটা শিম্পাঞ্জি নিজেদের মধ্যে ঠিক মতো সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারবে না। এক লাখ শিম্পাঞ্জিকে ওয়াল স্ট্রিট কিংবা ইয়াঙ্কি স্টেডিয়ামে রেখে দেখেন – সীমাহীন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। কিন্তু এক লাখ মানুষকে সেখানে রাখেন – তারা আস্ত একটা ফাইনান্স ইন্ডাস্ট্রি বানাবে আর চমৎকার একটা বেইসবল খেলা খেলবে!

একদল মানুষ এক সাথে হয়ে সহযোগিতা করা অবশ্য সবসময় ভালো কাজের জন্যে নাও হতে পারে। মানুষের দ্বারা সঙ্ঘটিত পৃথিবীর ইতিহাসের সব জঘন্য কাজও একদল মানুষের সহযোগিতারই ফসল। কারাগার, গুয়ান্তানামো বে, নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প – এগুলোও মানুষ পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে বানিয়েছিল। শিম্পাঞ্জিরা কখনো কারাগার, গুয়ান্তানামো বে, নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানায় না।

তাবৎ প্রাণীকুলের মধ্যে কেবল মানুষরাই অনেকে মিলে এক সাথে খেলে, বা ব্যবসা করে, বা খুন করে কেনো?

এর উত্তর হচ্ছে আমাদের কল্পনা শক্তি।

আমরা একসাথে অসংখ্য অজানা, অপরিচিত মানুষের সাথে কাজ করতে পারি কারণ আমরা গল্প বানাতে পারি, সেই কল্প-গল্প আমরা মানুষে মানুষে ছড়িয়ে দিতে পারি, এবং লক্ষ কোটি মানুষকে সেই গাল-গল্প সত্য কাহিনী বলে বিশ্বাস করাতে পারি। যখন সবাই একই কল্পকাহিনী বিশ্বাস করে, একই নিয়মকানুন মেনে চলে – তখন সবাই মিলে মিশে একসাথে কাজ করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

এটা শুধু মানুষেরাই করতে পারে। আপনি একটা শিম্পাঞ্জিকে কখনোই আপনাকে একটা কলা দেওয়াতে পারবেন না এই বলে যে মৃত্যুর পর শিম্পাঞ্জিটি শিম্পাঞ্জিদের বেহেশতে যাবে এবং তার ভালো কাজের পুরস্কার স্বরূপ শিম্পাঞ্জিদের বেহেশতে অসংখ্য কলা পাবে। কোন শিম্পাঞ্জিই এই ধরণের কল্প-গল্প বিশ্বাস করবে না! শুধুমাত্র মানুষই এই ধরণের কল্প-গল্প বিশ্বাস করে। এবং ঠিক সে জন্যেই আমরা মানুষেরা পৃথিবী শাসন করি। আর শিম্পাঞ্জিরা চিড়িয়াখানা কিংবা ল্যাবরেটরিতে খাঁচার মধ্যে আটকা থাকে।

একই ধর্মের মানুষের মধ্যে ঠিক এভাবেই একই ধরণের কল্প-গল্প বিশ্বাসের মাধ্যমে এক ধরণের সহযোগিতা গড়ে উঠে। অনেক মানুষ মিলে একটা গির্জা বানায়, কিংবা দল বেঁধে ক্রুসেডে (ধর্মযুদ্ধ) যায় – কারণ তারা সবাই ঈশ্বর এবং বেহেশত নিয়ে একই ধরণের গল্প বিশ্বাস করে। এটা শুধু ধর্ম নয়, বড় ধরণের সহযোগিতার সব জায়গায়ই একই ব্যাপার কাজ করে।

উদাহরণস্বরূপ – আইনের প্রতিষ্ঠানগুলোর কথাই ধরুন। বর্তমানের প্রায় সব আইনি প্রতিষ্ঠানগুলই মানবাধিকারের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু মানবাধিকার জিনিসটা একটা বায়বীয় কল্প-গল্প, ঈশ্বর আর ধর্মের ধারণার মতন। বাস্তবে মানুষের কোনো অধিকার নাই। যেমনটি নাই শিম্পাঞ্জি এবং চিতা বাঘের। একটা মানুষের শরীরকে কেটে দেখেন, সেই শরীরের ভেতরে অধিকার বলে কিছু নাই। মানবাধিকার ব্যাপারটা শুধু আমাদের কল্পনাতেই আছে, আর আছে আমরা মানবাধিকার নিয়ে যে সব কল্প-গল্প বানাই সেখানে। মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা একটা আকর্ষনীয় ব্যাপার হতে পারে – কিন্তু ব্যাপারটা শুধুমাত্র একটা কল্প-গল্প।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সত্যি। দেব-দেবী এবং মানবাধিকারের মতোই “জাতি” এবং “দেশ” এর ব্যাপারটা একটা বানানো জিনিস। একটা পাহাড়ের বাস্তব অস্তিত্ব আছে। আপনি পাহাড়কে দেখতে পারেন,স্পর্শ করতে  পারেন, এর গন্ধ নিতে পারেন। কিন্তু আমেরিকা বা ইজরায়েল এর কোন ভৌত অস্তিত্ব নাই। আপনি আমেরিকা বা ইজরায়েলকে দেখেন না, স্পর্শ করতে পারেন না, কিংবা গন্ধ নিতে পারেন না। এগুলো হচ্ছে এক ধরণের কল্প-গল্প যেটা মানুষ আবিষ্কার করেছে এবং এরপর সেই কল্প-গল্পের সাথে খুব আপন হয়ে গিয়েছে।

অর্থনৈতিক জোটগুলোর ব্যাপারটাও একই। একটা ডলারের নোট হাতে নিয়ে দেখেন। কাগজ হিসেবে এর কোন মূল্যই নাই। আপনি এটাকে খেতে পারবেন না, পরতে পারবেন না। কিন্তু বড় বড় গল্পবাজ, যেমন ফেডারাল রিজার্ভের চেয়ারম্যান অথবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, এসে আপনাকে বলবে যে এই ডলারের নোটটির বিনিময়ে আপনি পাঁচটা কলা পাবেন। যতক্ষণ লক্ষ কোটি মানুষ এই গল্পটি বিশ্বাস করবে ততক্ষণ এই ডলার নোটটির মূল্য সত্যি সত্যিই পাঁচটা কলার সমান! আমি ডলারের সেই নোটটি নিয়ে একটা ফলের দোকানে যেয়ে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত ফল বিক্রেতাকে নোটটা দিলে সে সত্যি সত্য আমাকে পাঁচটা কলা দিয়ে দিবে। এখন একটা শিম্পাঞ্জিকে এই ডলারের নোটটি দিয়ে পাঁচটা কলা নেয়ার চেষ্টা করেন দেখি।

সত্যি কথা বলতে কি, টাকা সম্ভবত মানুষের আবিষ্কার করা সবচেয়ে সফল কল্প-গল্প। পৃথিবীর সব মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, সবাই মানবাধিকারেও বিশ্বাস করে না, এমনকি অনেক মানুষ আছে যারা আমেরিকার অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু সবাই টাকায় বিশ্বাস করে, ডলারের নোট সবার কাছেই সমান প্রিয়। এমনকি ওসামা বিন লাদেনও টাকায় বিশ্বাস করে। ওসামা বিন লাদেন আমেরিকাকে ঘৃণা করতো, আমেরিকার রাজনীতি এবং আমেরিকার সংস্কৃতি সবই সে ঘৃণা করতো – কিন্তু সে আমেরিকান ডলার খুবই পছন্দ করতো। ডলার নামক কল্প-গল্পে তার কোন আপত্তি ছিল না।

উপসংহারে আবার বলি – মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্য সব প্রাণী নৈর্বক্তিক বাস্তবতায়, যেমন নদী, গাছপালা, পাহাড়, ইত্যাদিতে বাস করে। কিন্তু আমরা মানুষেরা বাস করি এক দ্বৈত পৃথিবীতে। এটা ঠিক আমাদের পৃথিবীতেও নদী, গাছপালা, পাহাড় আছে। কিন্তু সেই নৈর্বক্তিক বাস্তব জগতের উপরে আমরা দ্বিতীয় আরেকটা কল্প-গল্পের জগৎ তৈরি করেছি। যে জগতে আছে ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন, ঈশ্বর, ডলার, এবং মানবাধিকার।

সময়ের সাথে সাথে এই কল্পনার জগতের সত্তা গুলো ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে উঠতে এখন তারা বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নৈর্বক্তিক বাস্তবতার জিনিসগুলো – গাছপালা, নদী, পাহাড়, প্রাণী জগত – তাদের বেঁচে থাকাটা এখন নির্ভর করে অবাস্তব সত্তা, যেমন আমেরিকা, বিশ্বব্যাংক, ইত্যাদির উপর। অথচ আমেরিকা আর বিশ্বব্যাংক কেবলমাত্র আমাদের কল্পনাতেই আছে, বাস্তবে এদের কোন অস্তিত্বই নাই।

ভালোবাসা

What-is-love

সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা একমুখী হয়, দ্বিমুখী নয়।

ভালোবাসা দেওয়ার জিনিস, নেওয়ার জিনিস নয়। আপনি যদি ভালোবাসা দেওয়ার চেয়ে ভালোবাসা পাওয়াতে বেশি সুখ পান, তাহলে আপনি এখনো ভালোবাসার গভীরে যেতে পারেননি। গভীর ভালোবেসে যে সুখ পাওয়া যায় তার সাথে প্রায় অন্য কোনো সুখের তুলনা চলেনা!

ভালোবাসার সাথে প্রত্যাশার (expectation) কোনো সম্পর্ক নাই। সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু ভালোবাসার মানুষটিকে সুখী করতে চায়, তার থেকে কোনো প্রতিদান আশা করে না। প্রত্যাশার চাপ আস্তে আস্তে ভালোবাসাকে মেরে ফেলে। আপনার ভালোবাসার মানুষটি আপনার প্রত্যাশা পূরণের মেশিন নয়।

সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে মুক্ত করে, বেঁধে ফেলে না। ভালোবাসা আফিমের মতো, লোহার শিকল নয়। আপনার ভালোবাসার মানুষ খুব সম্ভবত আপনার কাছে ফিরে আসবে যদি আপনি তাকে মুক্ত করে দেন। লোহার শিকল দিয়ে ভালোবাসার মানুষকে আটকে রাখার চেষ্টা করলে পাখি খাঁচা ভেঙ্গে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। শেকল পরানোর চেয়ে পাখিকে ভালোবাসার আফিম খাওয়ান বরং।

প্রেম হচ্ছে আকর্ষণ (শারীরিক এবং মানসিক) + ভালোবাসা + প্রত্যাশা। প্রেমের প্রথম দিকে এই তিনটির সবগুলোই মোটামুটি সমান পরিমাণে থাকে। ভঙ্গুর প্রেমে প্রত্যাশার পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে, আকর্ষণ এবং ভালোবাসা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। শ্বাশ্বত প্রেমে প্রত্যাশা প্রায় থাকেইনা, কিন্তু থাকে তীব্র ভালোবাসা; যদিও আকর্ষণ ধরে রাখাটা যেকোনো প্রেমেই কঠিন একটা কাজ। যেকোনো কিছুতে সময়ের সাথে সাথে আকুর্ষণ কমে যাওয়াটা খুব সম্ভবত মানুষের ডিএনএতে লেখা আছে। এ ব্যাপারে আমাদের খুব বেশি কিছু করার নাই।

বিয়ে হচ্ছে প্রেম + দায়িত্ব। স্বামী হিসেবে দায়িত্ব, স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব, জামাই হিসেবে দায়িত্ব, ঘরের বউ হিসেবে দায়িত্ব। সর্বোপরি পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব। যে সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের কাছ থেকে প্রত্যাশা সর্বনিম্ন সে সম্পর্ক সাধারণত বেশিদিন টিকে। ভঙ্গুর বৈবাহিক সম্পর্কে মানুষের আকর্ষণ এবং ভালোবাসা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, আর প্রত্যাশা আর দায়িত্ব আকশের কাছাকাছি চলে যায়। শ্বাশ্বত বৈবাহিক সম্পর্ক শ্বাশ্বত প্রেমের মতোই মূলত ভালোবাসা নির্ভর – প্রত্যাশা করার আগেই ভালোবাসা থেকে একে অপরকে সুখী করে ফেলে।

নিজে অসুখী হয়ে অন্যকে ভালোবেসে সুখী করা যায়না। কেউ আপনার জীবনে সুখ এনে দেবে ভেবে কারো সাথে প্রেমে জড়াবেন না। বরং আপনি কারো জীবনে সুখ এনে দেবেন ভেবে প্রেম করুন।

যেকোনো মানুষকে, যেকেনো বস্তুকে, এমনকি যেকোনো পশুকেও ভালোবাসা যায়। ভালোবাসলে যদি সুখ না পাওয়া যায় তাহলে সে ভালোবাসা গভীর ভালোবাসা না। দেশের কথা ভেবে যদি বুকের ভেতর সুখ-আবেগের মোচড় না উঠে তাহলে দেশকে আপনার আরো ভালোবাসতে হবে।

ভালোবাসা, প্রেম, আর অবসেশন – তিনটা ভিন্ন জিনিস। অবসেশন হচ্ছে কাউকে বা কোনো কিছুকে পাওয়ার জন্যে অযৌক্তিক রকম মরিয়া হয়ে উঠা। অবসেশনকে গভীর প্রেম বলে ভুল হতে পারে। অবসেশন মূলত ভালোবাসার মানুষের মাধ্যমে নিজেকে সুখী করার একটা চেষ্টা।

ভালোবাসার সাথে যৌনতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নাই। সেক্সের জন্যে ভালোবাসার চেয়ে আকর্ষণের বেশি দরকার। তবে আকর্ষণের সাথে ভালোবাসা যোগ হলে সেটা হয় সর্বোৎকৃষ্ট সেক্স। আকর্ষন ছাড়া শুধু ভালোবাসা দিয়ে যৌন জীবনে খুব বেশি সুখী হওয়া যায়না।

পুনশ্চঃ উপরের কথাগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত ভাবনা। এই ভাবনাগুলোর কোনোটি বা সবগুলো অন্য কারো ভাবনার সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে এটা আমি আশা করি না। আর সময়ের সাথে সাথে আমার নিজের ভাবনারও পরিবর্তন হতে পারে!

রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে না তাকিয়ে যেভাবে বাংলাদেশকে উন্নত করা যায়

shahbag_candlevigil

 

শাহবাগের যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলন এর মাধ্যমে মানুষের দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের জন্যে কিছু করার ইচ্ছা দেখে আমি অভিভূত।

রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই থাকুক না কেনো সবাই মোটামুটি একটা জায়গায় এসে একমত – বাংলাদেশকে একটা সমৃদ্ধ, আধুনিক, চমৎকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই সবাই। জামাত-শিবির এবং তাদের মতো জঙ্গি দলগুলো চাইবে আমাদেরকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো বানিয়ে ফেলতে। কিন্তু আমরা চাইলেই তাদের প্রায় চোখের সামনে দিয়ে আমাদের দেশটাকে একটা উন্নত এবং আধুনিক দেশে পরিণত করে ফেলতে পারি। এমনকি আওয়ামীলীগ এবং বিএনপিও যদি আমাদের বিরুদ্ধে যায় তবু আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারি!

বাংলাদেশকে উন্নত করতে চাইলে আমাদেরকে -আমাকে এবং আপনাকে – অংশ নিতে হবে এই কাজে। দেশের প্রতি ভালোবাসার জন্যে একদিনের মধ্যে যদি শাহবাগ লক্ষ মানুষের জনসমুদ্রে পরিণত হতে পারে তাহলে এই লক্ষ মানুষই পারবে দেশকে বদলে দিতে। এটা কোনো গোপন ব্যাপার নয় যে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি ক্ষমতার যাওয়ার ব্যাপারে যতোটুকু আগ্রহী হবে দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখানোতে ততোটা আগ্রহী তারা হবে না। জামাত-শিবির এবং জঙ্গি দলগুলো ব্যস্ত দেশটাকে মধ্য যুগে ফিরিয়ে নেওয়াতে। জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র দলগুলো ব্যস্ত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বড় দলগুলোর ভাড়া খাটায়। এই অবস্থায় দেশটাকে উন্নত করার, সমৃদ্ধ করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আসলে আমাদের সাধারণ মানুষের হাতে, ছাত্র-শিক্ষক-চাকুরিজীবি-ব্যবসায়ী-শ্রমজীবি মানুষের হাতে।

মনে হতে পারে আমরা একটা তৃতীয় রাজনৈতিক দল তৈরি করতে পারি। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির মতো দলের শেকড় বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। একদিন হঠাৎ করে আমরা একটা রাজনৈতিক দল করবো আর মানুষ দলে দলে আমাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাবে সেটি হবার নয়! অনেক অনেক দিন (কয়েক দশক!) ধরে চেষ্টা করলে হয়তো একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যাবে কিন্তু সেটাও নিশ্চিত নয়, এবং এই দীর্ঘ সময়ে আসলে আমরা দেশের জন্যে অনেক বেশি কিছু করে ফেলতে পারতাম। সবচেয়ে বড় কথাঃ আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে একটা সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে পরিণত করা, ক্ষমতায় যাওয়া নয়!

তাহলে কিভাবে আমরা খুব সহজে রাজনৈতিক দলগুলোর নাকের ডগা দিয়ে আমাদের দেশটাকে একটা সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে পরিণত করতে পারবো?

বাংলাদেশকে একটা চমৎকার এবং সুখী দেশে পরিণত করতে হলে আমাদেরকে বাংলাদেশের মানুষগুলোর প্রত্যেককে একেকজন চমৎকার এবং সুখী মানুষে পরিণত করতে হবে! বাংলাদেশ মানে যতোটা না ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটা ব-দ্বীপ তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ষোল কোটি মানুষ। একটা দেশকে সঙ্গায়িত করে তার মানুষেরা। আমাদেরকে ক্ষমতায় কে আছে সেটা না ভেবে নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের এবং কাছের মানুষদের চমৎকার মানুষে পরিণত করতে হবে। দেশের জন্যে কিছু করার এই পদ্ধতির নাম আমি দিয়েছি “মুহম্মদ জাফর ইকবাল মডেল”। জাফর ইকবাল স্যার যেমন কোনো ব্যক্তিগত লোভ বা স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে, কোনো দলের দিকে না তাকিয়ে, “একজন মাহাথির” এর অপেক্ষায় না থেকে একেবারে নিজে থেকে নিজের মতো করে দেশের জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন – নিজের বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করে যাচ্ছেন, দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে উদ্দীপ্ত করে যাচ্ছেন – আমাদেরকে সেভাবেই কোনো স্বপ্নের দল বা ব্যক্তির অপেক্ষা না করে দেশের জন্যে কাজ করে যেতে হবে। প্রত্যেকে নিজের অবস্থানে থেকে কাজ করে গেলে বাংলাদেশকে একটা উন্নত দেশের পরিণত করতে খুব বেশি সময় লাগবেনা। শুধু দেশকে নিয়ে স্বপ্নটাকে জিইয়ে রাখতে হবে, কখনো হতাশ হলে চলবেনা, নিজের নাম কামাইয়ের কথা ভুলে যেতে হবে, ফেইসবুকে কয়টা লাইক পেলাম সেটার কথা ভুলে কাজ করে যেতে হবে।

দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চাইলে আমাদের প্রথমে তিনটা মূল জিনিস নিয়ে কাজ করতে হবেঃ নিজেকে এবং আশে পাশের সবাইকে একটা চমৎকার বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, মানুষের মনে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আনার জন্যে কাজ করতে হবে, এবং দেশের মানুষের শারীরীক এবং মানসিক স্বাস্থের জন্যে কাজ করতে হবে।

আসুন দেখি এই তিনটা জিনিস কিভাবে আমাদের দেশের চেহারা বদলে দিতে পারে। কিভাবে জামাত-শিবির এর মতো জঙ্গি দল এবং তাদের মদদ-দাতা দলগুলোর চোখের সামনে দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে তাদেরকে অস্তিত্বশুন্য করে দিতে পারি কোনো রকম সহিংসতা ছাড়াই।

একটা চমৎকার বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষাঃ

রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ধর্ম নিয়ে আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের কারো মধ্যে কোনো দ্বিমত নাই। মধ্যাকর্ষণ নিয়ে সবাই একমত, কার-বাস-ট্রাক চলার প্রযুক্তি নিয়ে সবাই একমত, রাস্তা বানানোর ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়েও সবাই একমত। বিজ্ঞানে কোনো হাঙ্কি-ফাঙ্কি নাই। সবকিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই এরপর কোনো কিছুকে নিশ্চিত বলে ঘোষনা করা হয়। তাই বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলে কিংবা মানুষ বিজ্ঞান মনষ্ক হলে মানুষের চিন্তা ভাবনা অনেক যৌক্তিক হয়। কোনো কিছু ভালো করে যাচাই বাছাই না করে মানুষ তখন আর বিশ্বাস করে না। বগুড়ার যে মানুষগুলো সাইদিকে চাঁদে দেখা গিয়েছে বলে রাতের বেলা ঘুম থেকে উঠে ছুটে যেয়ে থানা আক্রমণ করতে গিয়েছে তারা বিজ্ঞান মনষ্ক হলে কোনোদিন সাইদিকে চাঁদে দেখতো না। বিজ্ঞান মনষ্ক মানুষকে সাইদি তার ওয়াজ-মাহফিলে বেহেশতের টিকেট দিতে পারবেনা। মানুষ যখন ক্রিটিকাল থিঙ্কিং করে তখন কোনো গুজবে তাকে বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা যাতে আধুনিক বিজ্ঞান-ভিত্তিক হয় সে ব্যাপারে আমাদের কাজ করতে হবে। বিশ্বজগতের বিবর্তন, জীবজগতের বিবর্তন, পৃথিবীর জন্মের পর থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন বছরের বিবর্তন, মানুষের গুহা মানব থেকে উঠে এসে আজকের এই অবস্থায় আসার ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটা মুখস্ত-নির্ভর পরীক্ষার ব্যবস্থা থেকে উদ্ধার করে মস্তিষ্ককে ব্যবহার করার ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। মানুষ তার মস্তিস্কের ক্ষমতার এক ক্ষুদ্রাংশ ব্যবহার করে; আমাদেরকে মস্তিস্কের সেই ব্যবহৃত অংশের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যে কাজ করতে হবে।

এটা ঠিক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার যদি তার দায়িত্ব ঠিকভাবে না করে (ইচ্ছা এবং/অথবা যোগ্যতার অভাবে) – যেটার সম্ভাবনাই বেশি – তাহলে আমাদেরকে আমাদের মতো করে কাজ করে যেতে হবে। শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সাইদ স্যার কয়েক দশক ধরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র দিয়ে আমাদের আলোকিত করার কাজ করে যাচ্ছেন; জাফর ইকবাল স্যার, মুনীর হাসান ভাই আর তাদের সাথে শত শত তরুণ তরুণী গণিত, ভাষা, বিজ্ঞান, এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে; রাগীব হাসানের শিক্ষক ডট কম বিনামূল্যে দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স। এগুলো হচ্ছে যেগুলোর খবর আমরা জানি। আমাদের জানার বাইরে কতো অসংখ্য মানুষ তাদের মতো করে শিক্ষা বা শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বই লিখে, পত্র-পত্রিকায় লিখে, ব্লগ লিখে, কিংবা কনফারেন্স-সেমিনার-বক্তৃতা আয়োজন করেও অনেকে দেশের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। সবকিছুর উপরে, সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বাবা-মা’রা। অন্যদের জন্যে কী করছেন সেটি যতোটা না গুরুত্মপূর্ণ তার চেয়ে গুরুত্মপূর্ণ হচ্ছে নিজের ছেলেমেয়েদের একটা চমৎকার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। স্কুল-কলেজে তারা যাই শিখুক না কেনো আপনি আপনার সন্তানকে একজন মানবিকতাবোধসম্পন্ন, বিজ্ঞান মনস্ক, যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। চিন্তা করে দেখুন বাংলাদেশের সব বাবা-মা যদি তাদের সন্তানদের একজন চমৎকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে তাহলে বাংলাদেশ কতো সহজে একটা আধুনিক এবং উন্নত দেশে পরিণত হতে পারে?

মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাঃ

আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভূমিকায় আছে এই কথাগুলোঃ

“We hold these truths to be self-evident, that all men are created equal, that they are endowed by their Creator with certain unalienable Rights, that among these are Life, Liberty and the pursuit of Happiness.”

অর্থাৎ – “আমরা এই সত্যগুলিকে স্বতসিদ্ধ বলে জানিঃ সকল মানুষ সমান অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়; এবং সবাই সৃষ্টিকর্তা হতে কিছু অধিকার জন্মগতভাবে পায় যার মধ্যে আছে বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাধীনভাবে জীবন ধারণের অধিকার, এবং নিজের জীবনে সুখী হওয়ার অধিকার”।

সেই ১৭৭৬ সাল থেকে আমেরিকার শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হচ্ছে এই কথাগুলো। সব মানুষ সমান। কেউ কারো থেকে বড় বা ছোট নয়। আইন সবার জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য। খেটে খাওয়া শ্রমিক থেকে শুরু করে বিলিওনেয়ার শিল্পপতি সবার আইনের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে সমান।

আমাদের বাংলাদেশে আমরা ছোটকাল থেকে শিখি “বড়দের সম্মান করো”, “গুরুজনকে মান্য করো”, “শিক্ষকদের সম্মান করো”, “তোমার বসকে সম্মান করো”, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের কখনোই শেখানো হয়নি যে *সব* মানুষকে সম্মান করো, শ্রদ্ধা করো, ভালোবাসো! ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; খেটে খাওয়া রিকশাওয়ালাকে শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; কঠোর পরিশ্রম করা গার্মেন্টস কর্মীদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; ঘরের কাজ করার মানুষগুলোকে শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; আপনি অফিসের বড় কর্তা হলেও আপনার অধস্তনদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়। কার পকেটে বা ব্যাংকে কতো টাকা আছে কিংবা কে কতো চমৎকার বাসায় থাকে, বা কে কতো দামী জামা-কাপড় পরে এগুলো মনে না রেখে মানুষের সাথে মিশলে আমি কী হনুরে অসুখ থেকে বাঁচা যায়।

যে কারণেই হোক আমাদের সমাজে সব মানুষকে সমান করে দেখার অবস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি। প্রাচীন মুসলমান সমাজে ছিলো আশরাফ-আতরাফ ভেদাভেদ, হিন্দু সমাজে ছিলো বর্ণ সমস্যা। “সম্ভ্রান্ত বংশ” বলে একটা চরম অমানবিক শ্রেণী প্রথা এখনো চালু আছে আমাদের সমাজে।

শুধু দেশ দিয়ে নয়, সারা পৃথিবীর জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য – পৃথিবীর সকল মানুষ সমান! আমার দেশ পৃথিবীর সেরা দেশ সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি, কোনো পরম মানদন্ডে সেটি সত্যি নয়। তেমনিভাবে আমার ধর্ম পৃথিবীর সেরা ধর্ম সেটাও আমার একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতি, কোনো পরম মানদন্ডে সেটি সত্যি নয়। পৃথিবীর প্রতি এক’শ জন মানুষের মধ্যে প্রায় দুইজন আমার দেশের মানুষ, প্রতি এক’শ জন মানুষের মধ্যে প্রায় একুশ জন আমার ধর্মের মানুষ, তাই আমার দেশ বা আমার ধর্ম পৃথিবীর সবার দেশ বা ধর্মের উপরে এই ধরণের চিন্তা করা মানে পৃথিবীর একটা বড় অংশের মানুষকে আমার থেকে ছোট করা হয় (আসলে তো নিজেকেই নিজে ছোট করা হয়)!

জন্মস্থানের কারণে, ধর্মের কারণে, বংশের কারণে, গায়ের রঙ এর কারণে, পেশা’র কারণে কাউকে নিজের থেকে ছোট ভাবার মতো অমানবিক আর কিছুই হতে পারে না!

আমাদের সবার মাঝে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে কাজ করতে হবে। এই শিক্ষা সবার আগে শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যদি দেখে তাদের বাবা-মা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে, কিংবা ঘরের কাজ করার মানুষকে নির্যাতন করছে, অসম্মান করছে, তাহলে সেই ছোট ছেলেমেয়েগুলো বড় হয়ে নিজেরাও তাই করবে। বাবা-মা’র উচিৎ ছেলেমেয়েদের মধ্যে সব ধরণের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসাবোধ তৈরি করে দেওয়া।

একজন মানুষ তখনই দেশের জন্যে কিছু করতে উদবুদ্ধ হবে যখন তার মধ্যে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকবে। কেউ দেশের জন্যে কিছু করতে চায় – এই কথাটার মানে হচ্ছে সে দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চায়! তাই দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি করার পুর্বশর্ত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মানুষকে ভালোবাসে এমন মানুষ তৈরি করা!

একটা সুস্থ এবং শক্ত শরীর (এবং মন):

আমাদের দেশে সব সময় অবহেলিত একটা বিষয় হচ্ছে সুস্বাস্থ্য। পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব হচ্ছে শরীর এর মাধ্যমে অথচ আমাদের বড় হয়ে উঠার মধ্যে শরীর নিয়ে কোনো শিক্ষা বা প্রচার একেবারে নাই বললেই চলে! আমার শরীর যে একটা খুবই গুরুত্মপূর্ণ জিনিস এবং আমার যে এই শরীরকে অনেক যত্ন নেওয়া উচিৎ, অনেক শক্ত করে তোলা উচিৎ এটা আমাকে খুব বেশি কখনো বলা হয়নি। শরীরের প্রতি যত্ন ব্যাপারটা “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল” ভাবসম্প্রসারণ এর মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে আমাদের জীবনে।

শরীর যে একটা গুরুত্মপূর্ণ জিনিস এটা আমি সত্যিকারভাবে বুঝতে পারি বিদেশে পড়তে আসার পর। এখানে বেশিরভাগ মানুষেরই চমৎকার স্বাস্থ্য, রাস্তায় বেরুলেই মানুষজনকে সকাল বিকেল দৌড়াতে দেখি, জিমে গেলে দেখা যায় সবাই শরীরকে শক্ত করার জন্য নানা ব্যায়াম করছে। এখানে সত্তর-আশি বছরের মানুষকে একা একা নিজের এবং ঘরের কাজ করতে দেখি যেখানে আমাদের দেশে ষাট এর পর বেশির ভাগ মানুষ এটা সেটা নানা অসুখ-বিসুখে কুপোকাত হয়ে পড়ে।

এখানে সব হাই স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সব ধরণের খেলাধুলার দল আছে এবং সেই স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই অলিম্পিকে যেয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পদক জিতে আসে। আমাদের বাংলাদেশে আমরা কয়জন ছেলেমেয়ে নিয়মিত খেলাধুলা করে বড় হয়েছি? আমরা কয়জন নিয়মিত ব্যায়াম করি?

আমাদের দেশের মানুষজনের শরীরের দিকে তাকালেই আমাদের শরীরের দৈন্য দেখা যায়, অযত্নের ছাপ দেখা যায়। বাংলা সিনেমা দেখলে হয়তো মনে হতে পারে আমরা অনেক স্বাস্থ্যবান কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা আসলে উলটা। আমাদের ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগই বয়স ত্রিশ পেরুতে না পেরুতেই নধর একটা ভুড়ি গজিয়ে ফেলে। কেউ কেউ ভুড়ি না গজিয়ে শীর্ণকায় হয়। ব্যাপারটা নিয়ে মজা করা যায় কিন্তু এটা আমাদের শরীরের প্রতি অযত্ন আর অবহেলার প্রমাণ দেয়।

শরীরের সাথে মনের সম্পর্ক খুব নিবিড়। শরীর যদি দুর্বল হয়, চর্বির ভারে পেট যদি গড়িয়ে পড়ে তাহলে সেই শরীরে একটা চমৎকার মন থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই শরীরের একটা বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিস্ক থাকাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। শরীরের প্রতি অযত্নের কারণে মানুষ আগে আগে বুড়িয়ে যায় এবং আমাদের মতো একটা গরীব দেশের জন্যে তখন অনেক বেশি অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে হয়। আমরা যদি আমাদের শরীরের যত্ন নিই, যদি একটা শক্তিশালী শরীর এবং ব্রেইন ধরে রাখতে পারি তাহলে বেশি বুড়ো হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অনেক বেশি দিন নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে, দেশের জন্যে কাজ করে যেতে পারি!

আমাদেরকে দেশের মানুষকে শরীর ভালো রাখার, শক্ত রাখার গুরুত্ম বোঝাতে হবে। রেডিও-টিভি, পত্র-পত্রিকায় এটা নিয়ে বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। যারা স্বাস্থ্য-পুষ্টি-মেডিক্যাল বিষয়ে জানেন তাদের এটা নিয়ে লেখালেখি করতে হবে, রেডিও-টিভিতে যেয়ে বলতে হবে।

একটা শক্ত শরীরের মানুষ একটা শক্ত মনের অধিকারী হয়। তখন সে জীবনে চ্যালেঞ্জ নিতে কম ভয় পায়, বেশি ঝুঁকি নিতে পারে, বেশি পরিশ্রম করতে পারে, নিজের ব্যররথতার জন্যে অন্যকে বা ভাগ্যকে দোষ দেয় না, নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজে নিয়ে নেয়, লটারি জেতার আশায় বসে থাকে না, মানুষের দোষ ত্রুটি খঁজে বেড়ায় না।

শেষ কথাঃ

দেশের উন্নয়ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আলাদা কোর্স আছে, এমনকি অনার্স-মাস্টার্স-পিএইচডি করার বিষয় পর্যন্ত আছে। আমি উন্নয়ন বিষয়ক পন্ডিত নই, কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্যে আমাদের বাংলাদেশের মানুষের পেছনে বিনিয়োগ করতে হবে সবার আগে। যাদের দ্বারা আমরা স্বপ্ন দেখি, যাদের জন্যে আমরা স্বপ্ন দেখি, তাদেরকে উন্নত হওয়ার জন্যে আগে প্রস্তুত করতে হবে। এরপর এটা একটা পজেটিভ ফিডব্যাক লুপের মতো নিজেকে নিজে টেনে নিয়ে যাবেঃ একদল চমৎকার মানুষ আরেক দল চমৎকার মানুষ তৈরি করবে, তারা সবাই মিলে আরো চমৎকার মানুষ তৈরি করবে, এবং এভাবে এক সময় বাংলাদেশের বেশির মানুষ একেকজন স্বপ্নের মানুষে পরিণত হবে!

আর সেটি হবে তখন আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ!

যে দু’টো জিনিস আপনার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে

sky

ছোটকালে পেপারে একটা বিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখতাম, একজন জ্যোতিষের বিজ্ঞাপন – প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে ঝামেলা, স্বামী-স্ত্রীতে অমিল, মানসিক সমস্যা, কর্মস্থলে সমস্যা, যাদু-টোনা, রোগ-বালাই, জমিজমা নিয়ে ঝামেলা, মামলা-মোকদ্দমা, ইত্যাদি যেকোনো সমস্যা সেই জ্যোতিষ সাহেব সমাধান করে দিতে পারতেন। তিনি ঠিক কিভাবে সেটি করতেন সেটা জানা হয়নি কোনোদিন, কিন্তু সারাজীবন এই “প্যানাসিয়া”‘র সন্ধান করে এসেছি। যে জিনিসটি সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে সেটিকে ইংরেজীতে প্যানাসিয়া বলা হয়। প্যানাসিয়া আসলে গ্রীক পুরাণের একজন দেবীর নাম। দেবী প্যানাসিয়া একধরণের তরল পদার্থ খাইয়ে মানুষের যাবতীয় অসুখ-বিসুখ ভালো করে দিতে পারতেন!

তো সেই প্যানাসিয়ার সন্ধান পাওয়া হয়ে উঠেনি এখনও। কিন্তু পুরো পৃথিবী এখনও ব্যস্ত আছে কিভাবে মানুষের জীবনে আরো সুখ আনা যায়, আরো সাফল্য আনা যায়, রোগ-বালাইকে কিভাবে আরো দূরে রাখা যায়, ব্যক্তি এবং জাতি হিসেবে কিভাবে আরো উন্নতি করা যায়, ইত্যাদি নিয়ে।

আমি সারাজীবন নিজেকে নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট করেছি। নানা ধরণের “প্যানাসিয়া”‘ ট্রাই করেছি। নিজের জীবনের সব এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে যখন ভাবতে বসেছি তখন অনেকগুলো এক্সপেরিমেন্টকে মোটামুটি সফল মনে হয়েছে। সফল এক্সপেরিমেন্টগুলোর মধ্যে দু’টোকে আমার প্রায় প্যানাসিয়া’র কাছাকাছি পর্যায়ের বলে মনে হয়েছে। এই দু’টো জিনিস হচ্ছে – ১। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা, ২। ব্যায়াম। শুধুমাত্র এই দু’টো জিনিস অনুসরণ করে জীবনের অসংখ্য সমস্যার সমাধান করা যায়। আমি নিজে এটা করেছি – আপনিও ট্রাই করে দেখুননা!

মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা

মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার ব্যাপারটাকে পুরনো দিনের নীতিকথা মনে হতে পারে। কিন্তু এই পৃথিবীর প্রায় সাতশ কোটি মানুষের পুরো সভ্যতা টিকে আছে মূলত মানুষে মানুষে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার কারণে। একটু সময় নিয়ে নিজেকে নিয়ে একটু ভাবুন। মানুষকে কতোটুকু ভালোবাসেন আপনি? কতোটুকু শ্রদ্ধা করেন? আপনার স্বার্থ বা দরকারের উর্ধে উঠে মানুষকে ভালোবাসতে পারেন? আপনার ব্যক্তিগত চিন্তার সাথে বিপরীত বা সাংঘর্ষিক চিন্তার মানুষগুলোকে কতোটুকু শ্রদ্ধা করেন আপনি? কতোটুকু ভালোবাসেন?

আপনি রিকশায় করে যাওয়ার সময় একটা কার যদি বিপজ্জনকভাবে আপনার রিকশা’র পাশ দিয়ে চলে যায় বা রাস্তার গর্তে জমে থাকা পানি ছিটিয়ে দেয় আপনার গায়ে তখন কি আপনি দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ওই গাড়ির মালিকের মুন্ডুপাত করেন? সে ধনী হয়েছে বলে কি তাকে অভিসম্পাত করেন? কিংবা আপনি গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো রিকশার কারণে যদি আটকে যান বা রিকশার চাকা থেকে আপনার গাড়িতে আঁচড় লাগে তখন কি ছোটলোকের বাচ্চা বলে ওই রিকশাওয়ালাকে গালি দেন?

পৃথিবীতে প্রায় সাতশ কোটি মানুষ আছে। এবং মানুষ হচ্ছে প্রচন্ড সমাজবদ্ধ জীব। আমরা এতোটাই একসাথে থাকি যে একাকীত্মকে প্রায় একটা সমস্যা হিসেবে দেখি আমরা। তো যে সমাজ ছাড়া আমরা থাকতে পারিনা সেই সমাজের প্রধান উপাদানই হচ্ছে মানুষে মানুষে ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া মানুষ বেশিদিন বাঁচতে পারেনা।

তাই বলে কি পৃথিবীতে ঘৃণার অস্তিত্ত্ব নাই? হিটলারকে ঘৃণা করা কি দোষের কিছু? স্বাধীনতার সময় আমাদের বাংলাদেশীদের হত্যাকারী, খুনী ধর্ষক পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের ঘৃণা করা অপরাধ?

না, ঘৃণা করা অপরাধ নয় কোনো। ঘৃণাও ভালোবাসার মতো একটা মানবীয় গুন। কিন্তু ভালোবাসা দেওয়া এবং নেওয়া দুটোতেই সুখ আছে, আনন্দ আছে। আর ঘৃণা করা এবং ঘৃণিত হওয়া দু’টোই কষ্টের ব্যাপার। শুধু শুধু কাউকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু শুধু শুধু ঘৃণা করা যায়না!

আমাদের বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে শ্রদ্ধা ব্যাপারটা শুধু মুরুব্বি কিংবা সামাজিক/রাষ্ট্রীয় উঁচু পদে থাকা মানুষকে দেখানো হয়। শ্রদ্ধা যখন এইভাবে একমুখী হয় তখন সেটা আসলে আর শ্রদ্ধা থাকেনা, সেটা আসলে ভয় হয়ে যায়। আপনার বস কিংবা কোনো মন্ত্রীকে আপনি যে শ্রদ্ধা দেখাচ্ছেন সেও যদি আপনাকে মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা না করে তাহলে এটা হচ্ছে একধরণের শাসক এবং শোষক সম্পর্ক, শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সম্পর্ক নয়। একইভাবে আপনি শুধু আপনার থেকে বয়সে বড় মানুষকে শ্রদ্ধা করেন কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চাদের যখন তখন ধমক মারেন তাহলে সেটাও সত্যিকারের শ্রদ্ধা নয়। ছোট ছেলেমেয়েরাও মানুষ এবং তারাও আমাদের শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য!

শ্রদ্ধা-ভালোবাসা দেখানোর ক্ষেত্রে আপনার ব্যক্তিগত মতামত বা স্বার্থ সামনে এসে দাঁড়ালে সেই শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় খাদ থেকে যাবে। আপনি কোনো রাজনৈতিক দলকে দেখতে পারেননা, তাই বলে সেই রাজনৈতিক দল এবং তার কর্মী-সমর্থকদের দিনরাত গালাগাল করবেন? হাসিনা-খালেদাকে দেখতে পারেননা অতএব তাদেরকে প্রতিদিন দশবার গালাগাল করবেন? বাংলা সিনেমার কোনো নায়ক-নায়িকাকে পছন্দ করেন না, তাই তদের নিয়ে যাচ্ছেতাই বলবেন? রাস্তায়, মার্কেটে, বা অফিসে মেয়েরা আপনার মনমতো জামাকাপড় পরবেনা তাই ওদেরকে কটুক্তি করবেন?

আপনার কি মনে হয় আপনার চারদিকে সবাই স্বার্থপর? সবাই শুধু নিজের ধান্ধায় ঘুরে? সবাই নির্বোধ? বিএনপি খারাপ, আওয়ামী লীগ খারাপ? আমেরিকা খারাপ, ভারত খারাপ, পাকিস্তান খারাপ? বুদ্ধিজীবিরা সব  দালাল? পত্রিকাগুলা সব কর্পোরেট ধান্দাবাজ? বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নাই, এই দেশকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, দেশটা চোর-বাটপারে ভরে গেছে? আপনার ফেইসবুকের প্রতিদিনের স্ট্যাটাসে শুধুই মানুষের দুর্বলতা, দেশের দুর্বলতাগুলো উঠে আসে? আপনার কি শুধু মনে হয় সবকিছু ভেঙ্গে পড়ছে, সবকিছু নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছে? চারদিকের এই স্বার্থপর, নষ্ট-ভ্রষ্ট মানুষগুলোকে ভালোবাসতে এবং শ্রদ্ধা করতে কষ্ট হয় আপনার?

যদি চারদিকের পৃথিবীকে এতো স্বার্থপর, ভঙ্গুর, দুর্বল, এবং খারাপ মনে হয় তাহলে একবার ভালো করে নিজের দিকে তাকান। নিজের কথা ভাবুন। আপনি নিজে কতোটা স্বার্থহীন, কতোটা শক্ত, কতোটা ভালো? ভঙ্গুর সিস্টেম এর জন্যে আপনি কী করেছেন? আপনি ছাত্র/ছাত্রী হলে কতোটুকু ভালো ছাত্র/ছাত্রী? আপনি চাকুরিজীবি হলে আপনার চাকুরিতে আপনি কতোটুকু দক্ষ? আপনি শিক্ষক হলে কতোটুকু ভালো শিক্ষক?

আমি দেখেছি যারা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মানুষকে ভালোবাসে তারা সাধারণত ব্যক্তিজীবনে বেশি সুখী হয়। শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা খুবই সুখকর অনুভূতিদায়ক জিনিস, তাই কারো প্রতি যখন শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা প্রদর্শন করবেন তখন সেটা আপনার মনে সুখানুভূতি দিয়ে ভরিয়ে তুলবে। চিন্তা করে দেখুন প্রতিদিন কতো মানুষের সংস্পর্শে আসি আমরা। এই মানুষগুলোর সবার প্রতি যদি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা দেখান তাহলে আপনার দিনটা কতো চমৎকার হবে ভেবে দেখেছেন?

ব্যায়াম

পৃথিবীতে যদি কোনো ওষুধ না থাকতো তাহলে শুধুমাত্র ব্যায়াম দিয়েই আমরা আমাদের অর্ধেকেরও বেশি অসুখ সারিয়ে ফেলতে পারতাম।

দশ হাজার বছর আগ পর্যন্তও মানুষ ছিলো শিকারী। মানুষের শরীর বসে থাকার মতো করে বিবর্তিত হয়নি। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা আমাদেরকে ঘর এবং অফিসবন্দী করে ফেলেছে। খাবার এর প্রয়োজনে আমাদের এখন আর বের হতে হয়না। আমাদের অফিসের দৈনন্দিন কাজ আমরা শরীর দিয়ে না করে ব্রেইন দিয়ে করি। ফলশ্রুতিতে আমাদের শরীরের অংগ-প্রতংগগুলি ঠিকভাবে বেড়ে উঠে না। নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম যেভাবে আপনাকে সাহায্য করেঃ

– ওজন নিয়ন্ত্রণঃ নিয়মিত ব্যায়াম করলে আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। খাবার থেকে শরীর যে ক্যালরি পায় সেটি ব্যবহার না করলে সেটা চর্বিতে রুপান্তরিত হয়ে যায় এবং শরীরকে মোটা করে ফেলে।
– অসুখ-বিসুখকে দূরে রাখাঃ ব্যায়াম করলে আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম ভালো থাকে, তাই ব্যাক্টেরিয়া-ভাইরাস সহজে আক্রমণ করতে পারেনা।  ব্যায়াম হার্ট এর পেশিগুলোকে শক্ত করে তোলে, দরকারী কোলেস্টরেল বাড়িয়ে দেয় আর ক্ষতিকারক কোলেস্টরেল কমিয়ে দেয়, শরীরে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে।
– মনকে চাঙ্গা করেঃ ব্যায়ামের সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ অবদান সম্ভবত এটা মনকে চাঙ্গা করে তোলে। আমাদের ভালো মুড এর জন্যে যে নিউরোট্রান্সমিটারগুলো দায়ী, ব্যায়াম করার সময় সেই নিউরোট্রান্সমিটারগুলো ব্রেইনে নিঃসৃত হয় আমাদের মন প্রফুল্ল হয়ে উঠে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে দেখবেন আপনার মন সবসময় ভালো থাকে, মানুষের প্রতি আপনার ভালোবাসা বেড়ে যাবে, বিশ্বাস বেড়ে যাবে!
– ব্যায়ামের ফলে আমাদের শরীর এবং মন শক্ত হয়ে উঠে। শরীরের মাংসপেশীগুলো শক্ত হয়, আমাদের হার্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, আমরা মনের শক্তি ব্যবহার করে শারীরিক দুর্বলতা-অক্ষমতাকে অতিক্রম করি।

ব্যায়াম আমাদের মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অবস্থাকে প্রতিফলিত করে। বেঁচে থাকার জন্যে আমাদের খেতে হয়। আর খেতে হলে আমাদের খাবার এর ব্যবস্থা করতে হয়, খাবার প্রস্তুত করতে হয়। আমাদের যতোই আলস্য লাগুক না কেনো খাবার সংগ্রহ এবং প্রস্তুত এর প্রক্রিয়ার নধ্য দিয়ে আমাদের যেতেই হয়। কিন্তু খাবার খেয়ে ফেলার পর আমাদের শরীর তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি পায় এবং কর্মক্ষম হয় উঠে। ব্যায়ামের ব্যাপারটিও ঠিক তেমনি। আমাদের শরীরকে (এবং মনকে) সুস্থ রাখতে ব্যামের দরকার। ব্যায়াম করতে হয়তো আলস্য লাগতে পারে, কিন্তু একবার ব্যায়াম করে ফেলার পর আমাদের শরীর মন চাঙ্গা হয়ে উঠে!

আমি জানি ব্যায়াম যতোই ভালো জিনিস হোকনা কেন আলস্যের কারণে আমাদের বেশিরভাগেরই ব্যায়াম করা হয়ে উঠেনা। কিভাবে আলস্যকে কাটিয়ে ব্যায়াম এর অভ্যাস করা যায় সেটা নিয়ে ভবিষ্যতে একটা পোস্ট দিবো কিন্তু আপাতত শুধু দু’টো পরামর্শ দিয়ে রাখিঃ

১। যেকোনো জিনিস শুরু করাটা হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন। প্যারাশুট নিয়ে প্লেইন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার মতো, ঝাঁপ দিয়ে দিলে আর কোনো সমস্যা নাই কিন্তু ঝাঁপ দেওয়াতেই যতো ভয় এবং অনীহা। তায় ব্যায়াম করার সিদ্ধান্ত নিলে জাস্ট শুরু করে দিন। ভালো না লাগলেও শুরু করুণ। কষ্ট লাগলেও শুরু করুণ। মনে করুণ এটা একটা ওষুধ – তেতো কিন্তু আপনার কোনো ভয়ংকর অসুখ ভালো করে দিবে। কয়েক সপ্তাহ কষ্ট করে করতে থাকলে দেখবেন পরের দিকে আর তেমন সমস্যা হচ্ছে না অভ্যাসটা ধরে রাখতে।

২। অল্প অল্প করে শুরু করুণ। এই টেকনিকটার নাম হচ্ছে কাইজেন। ব্যায়াম করতে ভালো না লাগলে প্রথমদিন শুধু ২ মিনিট ব্যায়াম করুণ। হ্যাঁ, জাস্ট ২ মিনিট। এরপর প্রতিদিন ১ মিনিট করে বাড়ান। এক মাসের মাথায় দেখবেন আপনি আধ ঘন্টা করে ব্যায়াম করছেন প্রতিবারে!

ব্যায়ামের উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবেনা। আশা করি শুধু ব্যায়াম নিয়ে ভবিষ্যতে একটা লেখা লিখবো।

ব্যায়াম আমার নিজের জীবনকে অনেক বদলে দিয়েছে, আমি নিশ্চিত আপনার জীবনকেও বদলে দিতে পারে ব্যায়াম।

ব্যায়াম নিয়ে দু’টো সাইট যেগুলো আমি নিয়মিত অনুসরণ করিঃ নার্ড ফিটনেস, ব্লগ অফ ইম্পসিবল থিংস। ব্লগগুলি নিয়মিত পড়ুন, দেখবেন ব্যায়াম নিয়ে, নিজের শরীর এবং মন নিয়ে আপনার অনেক চিন্তাভাবনা বদলে যাবে!

জীবনে সুখী হতে হলে, সফল হতে হলে আসলে আরো অনেক কিছু দরকার, কিন্তু একটা চমৎকার মন এবং চমৎকার শরীর না থাকলে সুখ আর সাফল্য কখনোই আসবেনা। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আপনাকে একটা চমৎকার মন দিবে আর নিয়মিত ব্যায়াম দিবে একটা চমৎকার শরীর।

আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও

Ivy_League_Logo-Large
১। বিশ্বজিত

চব্বিশ বছর বয়সী বিশ্বজিতকে ছাত্রলীগের ছেলেরা রড-চাপাতি-ছুরি দিয়ে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে।  চব্বিশ বছর বয়সে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। চব্বিশ বছর বয়সে আমার মনে ছিলো পাহাড় সমান স্বপ্ন। বিশ্বজিত আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়নি। দারিদ্র্যের কারণে ক্লাস নাইনের পর পড়ালেখায় ক্ষান্ত দিয়েছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত বিশ্বজিতেরও আমার মতো পাহাড় সমান স্বপ্ন ছিলো। ওই বয়সে কার না স্বপ্ন থাকে? অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন, চমৎকার একটা মেয়ের সাথে জীবন কাটানোর স্বপ্ন, নিজের পরিবারের জন্যে কিছু করার স্বপ্ন, সম্ভব হলে দেশের জন্যে কিছু করার স্বপ্ন – সব মিলিয়ে একটা অর্থপূর্ণ জীবন যাপনের স্বপ্ন।

২। আমন্ত্রণ টেইলার্স

বিশ্বজিত ছয় বছর ধরে দর্জির দোকান “আমন্ত্রণ টেইলার্স” গড়ে তুলেছিলেন। বিশ্বজিতদের তো দর্জি বা এরকম কিছুই হতে হয়। বিশ্বজিত যদি দর্জি না হতো তাহলে হয়তো রিকশা চালাতো। কিংবা হতে হতো বাসের নিরীহ যাত্রী। কিংবা কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে আসা কোনো এক সাধারণ তরুণ। বিশ্বজিতের বাবা তো আর কোটিপতি রাজনীতিবিদ নয়। কোটিপতি আমলা কিংবা সামরিক অফিসারও নয়। কিংবা নয় ধনী ব্যবসায়ী। এমন না যে কোটিপতি হওয়াটা কোনো অপরাধ। কিন্তু বিশ্বজিতের বাবা কোটিপতি হতে পারবেনা। কোটিপতির ছেলে দর্জি হয়না। কোটিপতির ছেলে রিকশাওয়ালা হয়না। কোটিপতির ছেলে অবরোধের মধ্য দিয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক এর সামনে দিয়ে হেঁটে শাঁখারীবাজার এর দর্জি দোকানে একজন কাস্টমার ধরার জন্যে সকাল নয়টার সময় ঘর থেকে বের হয়না। কোটিপতির ছেলে আমেরিকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। কিংবা পড়ালেখা শেষ করে আমেরিকাতেই বড় অংকের চাকরি করে। এমন না যে আমেরিকায় থাকা কোনো অপরাধ। কিন্তু বিশ্বজিতরা আমেরিকায় থাকেনা। বিশ্বজিতদের থাকতে হয় লক্ষ্মীবাজারের ঋষিকেশ দাস রোডে।

বিশ্বজিতরা বারিধারায় থাকেনা, বনানীতে থাকেনা, ধানমন্ডিতেও নয়। বিশ্বজিতরা থাকে টঙ্গিতে কিংবা যাত্রাবাড়ি পার হয়ে ঢাকার কোনো এক কোণে। বিশ্বজিতরা মুড়ির টিন মার্কা বাস এর হ্যান্ডলে ঝুলে ঝুলে কাজ করতে যায়। হরতাল অবরোধের সময় বিশ্বজিতদের বাসে আগুন লাগানো একটা ফরজ কাজ। যাদের দিয়ে আগুন লাগানো হয় তাদের নামও হয় বিশ্বজিত। কিংবা নাহিদ। অথবা শাকিল।

৩। বারিধারা, বোস্টন, বা ভার্জিনিয়া

বারিধারা বা ডিওএইচএস বা বনানীতে বিশ্বজিতরা থাকেনা। বিশ্বজিতের খুনী নাহিদ, শাকিলরাও থাকেনা সেখানে। কিন্তু তাদেরকে যারা খুন করে কিংবা খুনীতে পরিণত করে তারা সেখানে থাকে। আর তাদের সন্তানরা থাকে বোস্টনে, কিংবা ভার্জিনিয়ায়। কিংবা লন্ডনে। কেউ কি কখনো আমাদের রাজনীতিবিদদের, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের, ব্যবসায়ীদের, বুদ্ধিজীবিদের,  কিংবা তাদের সন্তানদের দর্জি হতে দেখেছে? কেউ কি তাদের সন্তানদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেখেছে? তাদের সন্তানদের হাতে কোনোদিন চাপাতি, রড, ছুরি, রামদা দেখেছে কেউ? কেউ কি দেখেছে আমাদের নীতিনির্ধারকদের কোনো সন্তানকে তারই বয়সী কয়েকজন ছাত্র ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলছে? ভার্জিনিয়া-নিউ ইয়র্ক-বোস্টন এর আই-৯৫ হাইওয়েতে হাই স্পিডে চলতে থাকা এসইউভির ভেতরে হাই ভলিউমে যখন এই কর্তাব্যক্তিদের সন্তানরা গান শুনছে ঠিক সেই সময় তাদেরই সমবয়সী নাহিদ, শাকিলরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারছে বিশ্বজিতদের। বিশ্বজিতের শরীর থেকে ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়া রক্তের সাথে আমেরিকার দশ লেইনের রাস্তায় ড্রাইভ করতে থাকা কিংবা নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের কোনো ফার্মে কাজ করা সন্তানদের রক্তের পার্থক্য কতোটুকু?

৪। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি

দেশের কর্তাব্যক্তি যারা – রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবি – তাদের যাদের সন্তানরা বিদেশে পড়ালেখা করছে বা করেছে তারা দয়া করে একটু নিজের সন্তানদের জিজ্ঞেস করে দেখুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঠিক কী করা হয়। ব্যাপারটা হয়তো আপনাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, কিন্তু এটাই সত্যিঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করা হয়! সারপ্রাইজ! একটা ছেলে বা মেয়ে আঠারো/উনিশ বছর বয়সে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তার পছন্দের বিষয় বা বিষয়গুলোতে শিক্ষা লাভ করে, গবেষণা করে। পাশাপাশি সে খেলাধুলা করে, গান-কবিতা-অভিনয় ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কাজে জড়িত হয়, সুযোগ পেলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কোথাও কাজ করে, কেউ বা ক্লাব-সঙ্গগঠন করে নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা অর্জন করে। কোনো সভ্য দেশের সভ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাড়াটে মাস্তান হয়ে বিশ-একুশ বছরের ছেলেমেয়েরা রামদা-চাপাতি হাতে খুনাখুনি করেনা!

ছাত্রছাত্রীদের রাজনীতি নিয়ে কথা উঠলেই অবধারিতভাবে কয়েকটা জিনিস বলা হবেই! প্রথমটি হচ্ছেঃ ছাত্ররাজনীতি না থাকলে আমরা বায়ান্ন, একাত্তর, নব্বই এর মতো অধিকার আদায় এর আন্দোলন কিভাবে করবো? এর মানে কি পৃথিবীর যাবতীয় অধিকার আদায় এর উত্তর হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি? পৃথিবীর গতো কয়েক হাজারের ইতিহাসে সব অধিকার আদায় হয়েছে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে? আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেখানেই যতো সমস্যা হয়েছে সব অনাচার অবিচার বন্ধ করা হয়েছে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে?  হাই স্কুল, প্রাইমারী স্কুলেও কি আমরা রাজনীতি চালু করে দিবো যাতে ওরাও আমাদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করতে পারে? আমি বাংলাদেশের দুইটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছি, এর প্রায় কোনো সময়ই কোনো ছাত্র সঙ্গঠনকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করতে দেখিনি। সব সময় সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাই নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করেছে। এই আন্দোলন এর জন্যে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কোনো রাজনৈতিক অং সঙ্গগঠন এর সদস্য হতে হয়নি। উলটা ছাত্রলীগ/ছাত্রদল/ছাত্র শিবির সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর  নির্মমভাবে অত্যাচার করেছে। নব্বই এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন এর পর বাইশ বছর পার হয়েছে। এই বাইশ বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর হয়ে মাস্তানি-গুন্ডামি করা ছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলো আর কোনো ভালো করেছে? এমনকি ২০০৬-২০০৮ সালের মিলিটারি-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনও সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাই করেছে!

দ্বিতীয় আরেকটি কথা বলা হয় ছাত্ররাজনীতি না থাকলে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হবে কিভাবে? আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি ছাত্রলীগের শাকিল, নাহিদ এর মতো খুনী ছেলেরা আমাদের দেশের ভবিষ্যত নেতা হবে? যে দেশের অনেক বর্ষীয়ান নেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আমাদের মনে শঙ্কা জাগায় সেই দেশের পড়ালেখা না করা, সন্ত্রাস করে দিন পার করে দেওয়া ছেলেমেয়েরা আমাদের ভবিষ্যত নেতা হবে? এরচেয়ে ভালো করে লেখাপড়া করা, সত্যিকারের স্মার্ট, ট্যালেন্টেড ছেলেমেয়েরাই কি ভালো নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা?

আর কারো যদি রাজনীতি করার ইচ্ছা থাকে তাহলে সে ক্যাম্পাসের বাইরে যেয়ে মূল দলের সাথে রাজনীতি করুক। রাজনীতি করা একটা সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। কোনো ছাত্র বা ছাত্রীর যদি রাজনীতি না করলে ভালো লাগেনা, সে তো যে কোনো সময় যেয়ে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারে। কিন্তু সেটা করবে ক্যাম্পাসের বাইরে যেয়ে, মূল দলের সাথে। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় শুধুই পড়ালেখা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কাজকর্ম, আর স্বপ্ন দেখার জায়গা!

৫। আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও

আজ থেকে প্রায় পনের বছরেরও বেশি সময় আগে শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিবিদ নামক সন্ত্রাসীদের তান্ডব দেখে “আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও” শিরোনামে একটি হৃদয়-স্পর্শী লেখা লিখেছিলেন। স্যার তখন সবে দীর্ঘ আঠারো বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে দেশে ফিরেছেন, বিশ-একুশ বছরের ছেলেমেয়েদের তিনি দেখে এসেছেন ক্যাম্পাসে এসে পড়ালেখা করছে, গবেষণা করছে, সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান করছে, খেলাধুলা করছে। রামদা-চাপাতি-কাটা রাইফেল হাতে একে অপরকে নির্দয়ভাবে আক্রমণ করার ব্যাপারটি তখনও তাঁর কাছে নতুন ছিলো। যে বয়সে এই ছেলেগুলোর জীবনকে পূর্ণ উদ্দ্যমে উপভোগ করার কথা, নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করার কথা, ভবিষ্যত রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন নতুন অর্থনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে দিনভর যুক্তি-তর্ক-আলোচনা করার কথা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করার কথা, খেলাধূলা করে অলিম্পিকের সোনা জেতার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা – সেই স্বর্ণ সময়ে এই ছেলেগুলো চাপাতি-রড-রাইফেল নিয়ে তাদেরই সমবয়সী আরেক দল ছেলেকে পশুর মতো পিটিয়ে মারছে – এই হাহাকার করা কথাগুলোই উঠে এসেছিলো জাফর স্যারের সেই লেখায়। কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা জানি, জাফর স্যারের এই হাহাকার আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিদের একবিন্দু স্পর্শ করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে স্বপ্ন দেখার এবং সে স্বপ্ন পূরণের জন্যে কাজ করার জায়গা। আমেরিকায় আসার পর আমি আমেরিকার অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়েছি। যখনি কোনো নতুন জায়গায় গিয়েছি, আমি সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঘুরে বেড়িয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লনের সবুজ ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে আমি সদ্য কৈশোর পার হওয়া ছেলেমেয়েদের উচ্ছাস আর উল্লাস দেখি। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদ-সামরিক বেসামরিক আমলা-ব্যবসায়ী-বুদ্ধিজীবির সন্তানরা পড়ালেখা করে। মনে মনে ভাবি আচ্ছা বিশ্বজিত যদি এখানে পড়তে পারতো? বিশ্বজিত এখানে পড়লে সেদিন বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে দিয়ে না যেয়ে হেঁটে যেতো ভার্জিনিয়ার কোনো সাজানো পার্কে, কিংবা ডিনার করতো বোস্টনের কোনো চমৎকার রেস্টুরেন্টে, কিংবা দেখতে যেতো সান ফ্রান্সিস্কো গোল্ডেন গেইট ব্রিজ!

খুনী ছাত্রনেতা শাকিল আর নাহিদ – আহা, ওরা যদি পড়তে আসতো কোনো আইভি লিগ ইউনিভার্সিটিতে? চাপাতির বদলে শাকিল হয়তো নতুন কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতো, নাহিদ হয়তো স্ট্রিং থিওরির উপর কাজ করতো। হয়তো ওদের থাকতো একজন ভালোবাসার মানুষ, চমৎকার এক প্রেমিকা যাকে দেখে ওরা মানুষকে, জীবনকে ভালোবাসতে শিখতো!

আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা – রাজনীতিবিদ, সামরিক বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবিগণ – এদের প্রায় কারোর সন্তানই বিশ্বজিত, শাকিল, কিংবা, নাহিদের মতো অবস্থায় নাই। এর মানে তাঁরা ভালো করেই বুঝেন বিশ্বজিত, শাকিল, এবং নাহিদরা যেভাবে জীবন চালিয়েছে/চালাচ্ছে সেটা একটা অর্থবহ জীবন হতে পারেনা! তবে কেনো নিজের সন্তানদের নিরাপদে রেখে অন্যের সন্তানদের দিয়ে রাজনীতির নামে খুনাখুনি করানো হয়?

আমরা কি আমাদের সন্তানদের জন্যে রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেতে পারিনা? ফিরে পেতে পারিনা আমাদের ছেলেমেয়েদের?

মহাবিশ্বের সৃষ্টি এবং ঈশ্বর নিয়ে স্টিফেন হকিং এর সর্বশেষ বই “দি গ্র্যান্ড ডিজাইন” এর সার-সংক্ষেপ/রিভিউ

পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন সম্ভবত নিজের অস্তিত্ত্ব নিয়েঃ আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাবো, আমাদের জীবনের তাৎপর্য কী? সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে এসেছে। প্রাচীন গ্রীস থেকে শুরু করে হিন্দু ধর্ম, ইসলাম এবং খ্রিস্টান ধর্ম, চীনা এবং জাপানী ধর্মগুরুরা, ইনকা এবং মায়ান সভ্যতার মানুষগুলো – সবাই নিজেদের মতো করে মানুষ এবং বিশ্বসৃষ্টির ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছে। এখনো আফ্রিকা কিংবা আমাজনের জঙ্গলে বিভিন্ন গোত্র পাওয়া যাবে যারা বিভিন্ন গাছপালা কিংবা চাঁদ-সূর্যকে তাদের ঈশ্বর মনে করে এবং তারা তাদের এই বিশ্বাস এর জন্যে জীবন দিতেও প্রস্তুত!

ঘটনাক্রমে বিজ্ঞান বিশ্বাস এর চেয়ে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, এবং গণিতকে বেশি প্রাধান্য দেয় এবং যেকোনো প্রশ্নের উত্তর অনেক গবেষণা এবং পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বের করে। বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং ক্যালটেক পদার্থবিদ লেনার্ড মিলাডনো তাদের সর্বশেষ বই “The Grand Design” এ বিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য এবং মতামত প্রকাশ করেছেন। যেহেতু তারা বিজ্ঞানের মানুষ, তাই স্বভাবতই বইটিতে শুধু বিজ্ঞানের কথাই আছে, কারো মনগড়া কোনো বিশ্বাসের কথা সেখানে নেই! হকিং এবং মেলাডনো পদার্থবিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কার এর উপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। যে ধরণের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে সেগুলো অনেকটা এরকমঃ

১। আমাদের অস্তিত্বের কারণ কী? (Why do we exist?)
২। এই মহাবিশ্ব শূন্য না হয়ে পূর্ণ কেনো হলো? (Why is there something rather than nothing?)
৩। মহাবিশের নিয়ম-নীতিগুলো এরকম কেনো হলো? (Why this set of laws not some other?)

বইয়ের প্রথম অধ্যায়েই লেখকদ্বয় ঘোষনা করেছেন “দর্শনশাস্ত্র মরে গেছে”! মানুষের অস্তিত্ত্ব কিংবা বাস্তবতা (reality) নিয়ে আগে দর্শনশাস্ত্র অনেক বড় বড় তত্ত্ব দিতো, কিন্তু বিজ্ঞান, বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান, এর অগ্রগতির সাথে সাথে এই সব প্রশ্নের উত্তর এখন দর্শন শাস্ত্রের ধোঁয়াটে ও ঘোলাটে উত্তরের চেয়ে অনেক বেশি পরিস্কার এবং চমৎকারভাবে পাওয়া যায়। অনু পরমানুর কনা জগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্যে কোয়ান্টাম মেকানিক্স নামে পদার্থবিজ্ঞানের চমৎকার একটা শাখা আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্ভবত বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলির একটি, কিন্তু এর মাধ্যমে প্রকৃতিকে যতো ভালোভাবে জানা যায় বিজ্ঞানের অন্য কোনো শাখার মাধ্যমে ততোটা ভালোভাবে জানা যায়না। “কমন সেন্স” বলে আমরা যে জিনিসটাকে সযত্নে লালন করি, যেটা না থাকলে মানুষজনকে আমরা উজবুক বলে গালি দেই, দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সে জিনিসটার বড়ই বিপরীত! একটা উদাহরণ দেইঃ আপনি যদি একটা ফুটবলকে কিক মারেন আপনি আশা করবেন ফুটবলটি কয়েক ফুট দূরে যেয়ে একটা জায়গায় যেয়ে থামবে। ফুটবলটা একটা নির্দিষ্ট পথ দিয়ে যেয়ে তার গন্তব্যে পৌঁছাবে। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে যে ফুটবলটা আসলে ওই নির্দিষ্ট পথ ছাড়াও আরো অনেক পথে তার গন্তব্যে পৌঁছে থাকতে পারে। কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত এর একটি পথই দেখি। ফুটবল জিনিসটা অনেক বড় দেখে আমরা এর অন্য পথগুলো দেখিনা। কিন্তু ফুটবলের জায়গায় যদি একটা ইলেক্ট্রন থাকতো তাহলে আমরা একটা এক্সপেরিমেন্ট দাঁড় করিয়ে সত্যি সত্যি দেখতে পারতাম যে ইলেক্ট্রনটি একাধিক পথ পাড়ি দিয়ে তার গন্তব্যে যেয়ে পৌঁছেছে! এটা পরীক্ষিত সত্য!! (উইকি , ইউটিউব ভিডিও)।

আরেকটা আন-কমনসেন্স এর ব্যাপার হচ্ছে স্থান এবং সময় (স্পেস-টাইম), এবং এটি তৈরি করেছে আইনস্টাইন এর জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটি । আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা স্থান এবং সময়কে যেভাবে দেখি আসলে কিন্তু সেগুলি সেরকম নয়! স্থান এবং কাল বেঁকে যেতে পারে, লম্বা হতে পারে! মহাবিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বল হচ্ছে মহাকর্ষ (gravity), এবং এই বল স্থান এবং কালের বক্রতা ছাড়া কিছুই নয়। আমরা যেমন সময়কে একটা সরল রেখায় চলতে দেখি, আমাদের জীবনে সবকিছুর অতীত, বর্তমান, এবং ভবিষ্যৎকে সময়ের সাথে আবর্তিত হতে দেখি, আইনস্টাইন এর থিওরী অনুসারে সময় ব্যাপারটি সেরকম সরল রেখায় চলেনা। আমরা সেটি টের পাইনা কারণ আমাদের জীবনের প্রায় সবকিছু ঘটে এই ছোট পৃথিবীতে এবং আমাদের চারপাশের সবকিছুই মোটামুটি কাছাকাছি গতিতে চলে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবেঃ ধরুণ আমি আর আপনি টিএসসি’র সামনে একটা টং দোকানে বসে চা খাচ্ছি। এই সময় হঠাৎ আমাকে একটা জরুরী কাজে কাছের একটা গ্যালাক্সিতে ছুটে যেতে হলো (কল্পনা শক্তির পূর্ন সদব্যাবহার!)। গ্যালাক্সি বলে কথা, আমি সিএনজি বেবি ট্যাক্সি না নিয়ে আমার স্পেসশিপে করে আমার গ্যালাক্সির দিকে রওয়ানা দিলাম। আপনাকে আমি কথা দিয়ে গেলাম আমি এক ঘন্টার মধ্যে ফিরে আসবো। এক ঘন্টার মধ্যে ওই গ্যলাক্সিতে যেতে হলে আমাকে প্রায় আলোর কাছাকাছি বেগে যেতে হবে। আমি আলোর প্রায় কাছাকাছি বেগে ওই গ্যালাক্সি থেকে আমার কাজ সেরে আপনার কাছে ফিরে আসলাম। আসার পর আপনার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বললাম আমি এক ঘন্টার মধ্যেই ফিরে এসেছি। কিন্তু আপনি আপনার ঘড়িতে খেয়াল করলেন আমি প্রায় দেড় ঘন্টা সময় কাটিয়ে এসেছি! আমি আপনাকে আমার ঘড়ি দেখালাম, সত্যি সত্যিই এক ঘন্টা কাটিয়ে এসেছি আমাই আমার ঘড়ির হিসেবে। তাহলে প্যাঁচটা কোথায় লাগলো?

সমস্যাটা হয়েছে আমি যখন আলোর কাছাকাছি বেগে ট্রাভেল করেছি। কোনো কিছুর গতি যখন আলোর গতির কাছাকাছি চলে যায় তখন তার সময় ধীর গতিতে চলতে থাকে, আলোর গতিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সময় একেবারে থেমে যায়। তাই আমি যখন কাছের গ্যলাক্সিতে আলোর কাছাকাছি বেগে ভ্রমন করে এসেছি তখন আমার সময় আর আপনার সময় আসলে এক ছিলোনা। অতএব, সময় সম্পর্কে আমাদের যে দৈনন্দিন জীবনের ধারণা সেটি আসলে চরম সত্যি নয়। (দেখুনঃ টুইন প্যারাডক্স )।

হকিং এবং মেলাডনো মনে করেন যে “বিশ্ব জগতের শুরু কোথায় এবং কখন হয়েছিলো?” এই ধরণের প্রশ্ন আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক প্রশ্ন না। “কোথায়” এবং “কখন” বলতে যে স্থান এবং সময় এর কথা বুঝানো হয় সেই জায়গা এবং সময়েরই সৃষ্টি হয়েছিলো বিশ্ব সৃষ্টির সাথে সাথে। অতএব, সময় “কখন” সৃষ্টি হয়েছিলো এবং তার আগে কী ছিলো এই প্রশ্নটি হকিং এর মতে “দক্ষিন মেরুর দক্ষিনে কী আছে?” এর মতো। হকিং (এবং মেলাডনো) এর মতে সৃষ্টির শুরুতে স্থান এবং সময় এর মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিলোনা, তাই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের ব্যাপারটা সেখানে আসেনা।

প্রতিভাবান পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফিনম্যান এর মতে সব বস্তুকনার প্রায় অসীম সংখ্যক অতীত আছে। কোনো বস্তুর বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ এর সব অতীতে ইতিহাস থেকে কোয়ান্টাম সমীকরণ দিয়ে বের করা যায়। হকিং ফিনম্যান এর থিওরীকে উলটা দিক থেকে প্রয়োগ করেছেন আমাদের মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের বর্তমান থেকে এর অতীতকে বের করার চেষ্টা করছেন। ফিনম্যানের থিওরী এর সাথে আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটি মহাবিশ্বের উপর প্রয়োগ করে হকিং এবং মেলাডনো দেখেছেন মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময়ে স্থান এবং সময়ের মাত্রার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিলোনা, দুটোই একই রকম আচরণ করেছিলো সৃষ্টির সময়।

সময়ের শুরু এর ব্যাপারটির মিমাংসা হয়ে যাওয়ার পর যে প্রশ্নটি থাকে সেটি হলো “কেনো এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হলো?”। হকিং বলছেন, সেটিও বিজ্ঞানের ভেতরে থেকেই উত্তর দেওয়া যায় ঈশ্বর কিংবা দেব-দেবীর সাহায্য না নিয়ে!

পৃথিবীজুড়ে পদার্থবিজ্ঞানীদের স্বপ্ন “সবকিছুর তত্ত্ব” এর সন্ধান পাওয়া। এই তত্ত্ব দিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছু একই ধরণের সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে। কিছুদিন আগ পর্যন্তও এটা অনেকটা অধরা মনে হলেও সাম্প্রতিক কালে M-থিওরী নামে একটা তত্ত্ব (এটা আসলে অনেকগুলো তত্ত্বের একটা সেট) বিজ্ঞানীদের সেই আশার আলো দেখাচ্ছে। M-থিওরী এর শুরু স্ট্রিং থিওরী নামে, এটি বলে যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা এগারো মাত্রিক মহাবিশ্ব – দশটি স্থান এবং একটি সময়। আমরা মাত্র তিনটা স্থান মাত্রা দেখি কারণ অন্য সাতটি মাত্রা সংকুচিত হয়ে গিয়েছে মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময়। এটা কেনো হয়েছে সেটা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছেনা, কিন্তু এই M-থিওরী দিয়ে আমাদের মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করে যায় খুব চমৎকারভাবে!

আমাদের এই মহাবিশ্ব যে প্রাণ সৃষ্টির জন্যে এতো অনুকুল – মহাকর্ষ ধ্রুবক, ইলেক্ট্রন এর ভর এবং চার্জ, মৌলিক বলগুলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি কোনো কিছু একটু এদিক ওদিক হলে এই মহাবিশ্বে প্রাণের সৃষ্টি হতে পারতো না- এর মানে এই নয় যে আমরাই একমাত্র সৃষ্ট জগৎ। M-থিওরী অনুসারে কোয়ান্টাম জগতের ফ্লাকচুয়েশনের কারণে আমাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে শূন্য থেকে, এবং আমাদের মহাবিশ্বের সাথে আরো প্রায় ১০^৫০০ মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এই মহাবিশ্বের একেকটির একেক রকম পদার্থবিজ্ঞান, যেমন কোনোটার হয়তো মাত্রার সংখ্যা দুইশ, ইলেকট্রন হয়তো একটা ফুটবলের মতো, হয়তো মানুষগুলো মাথার উপর ভর করে হাঁটে (যদি মানুষ থেকে থাকে আর কি)। আমরা এখন মহাবিশ্ব নিয়ে কথা বলছি এর মানে ঘটনাক্রমে আমাদের মহাবিশ্বের পদার্থবিজ্ঞান মানুষ সৃষ্টির অনুকুল! কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন হচ্ছে ভ্যাকুয়াম (শূন্য) থেকে খুবই স্বল্প সময়ের জন্যে শক্তির তৈরি হওয়া। শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির এই ধারণা আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই বলা হচ্ছিলো।

অতএব, আমাদের পুরনো প্রশ্নে ফিরে আসিঃ কেনো আমাদের এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হলো? হকিং এর মতে, কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন এর মাধ্যমে শূন্য থেকে বস্তু তৈরি হতে পারে যার শক্তি হচ্ছে পজেটিভ। সেই পজেটিভ শক্তিকে ব্যলান্স করার জন্যে (শক্তির নিত্যতার সূত্রঃ শক্তির কোনো সৃষ্টি বা বিনাশ নেই, মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ শূন্য) আছে মহাকর্ষ বল যেটি স্থান এবং সময়ের একটা বৈশিষ্ট্য মাত্র। মহাকর্ষের নেগেটিভ শক্তি বস্তুর পজেটিভ শক্তিকে ক্যান্সেল করে দিয়ে শক্তির নিত্যতা বজায় রাখে। মহাবিশ্বের এই সৃষ্টি প্রক্রিয়া স্বতস্ফুর্ত, কোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন ছাড়াই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হতে পারে। অতএব, শূন্য থেকে ইচ্ছা মতো মহাবিশ্ব তৈরি হতে পারে, কোনো ঈশ্বরের দরকার নাই সে জন্যে! হকিং এর মতে ঈশ্বরকে দিয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি করানো মানে প্রশ্নটাকে এক ডিগ্রী উপরে উঠিয়ে দেওয়া, মহাবিশ্ব কে সৃষ্টি করেছেন সেটি প্রশ্ন না করে এখন প্রশ্ন করা হবে ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছেন। তবে সাধারণত ফার্স্ট-কজ আরগুমেন্ট নামে একটি যুক্তি – ঈশ্বর সবসময়ই ছিলো এবং থাকবে, তাকে সৃষ্টি করার প্রয়োজন পড়ে না – একটি যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। হকিং বলছেন, ঈশ্বরকে না এনে কিভাবে বিশ্ব সৃষ্টি ব্যাখ্যা করা যায় সেটাই তাদের এই বই এর উদ্দেশ্য।

বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে হকিং এবং মেলাডনো বেশ কয়েকটি অধ্যায় ব্যয় করেছেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং কজমোলজির বিভিন্ন বিষয়গুলি বুঝানোর জন্যে। একেবারে শেষ অধ্যায়ে (যেটির নাম বইয়ের নামে – দি গ্র্যান্ড ডিজাইন) একটা ছোট গেইম এর মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছেন কিভাবে কিছু সাধামাটা নিয়ম এবং সূত্র থেকে অনেক জটিল বস্তু তৈরি হতে পারে। এর উদ্দেশ্য ছিলো এটা বুঝানো যে কয়েকটি সাধারণ তত্ত্ব/সূত্র থেকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হতে পারে এবং সেখান থেকে মানুষের মতো জটিল জীবের আবির্ভাব হতে পারে যারা এধরণের জটিল প্রশ্ন করতে পারে – আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী?

সমালোচনাঃ

বইটাকে আমার সম্পূর্ণ মনে হয়নি। অনেক ভারী ভারী বিষয়ের অবতারণা করে সেগুলোর পুরো ব্যাখ্যা আসেনি বইটিতেঃ

১। M-থিওরী আসলে এখনো পুরোপুরি একটা গাণিতিক মডেল। এটি এখনো ল্যাবরোটরিতে বা অন্য কোথাও কোনো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। এর মানে এই নয় যে এটা কখনো পর্যবেকক্ষন দ্বারা প্রমাণিত হবেনা, তবে এখনই এই থিওরীর উপর এতো বড় বাজী রাখা সাহসের ব্যাপার বৈকি!
২। হকিং বলেছেন শূন্য থেকে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন এর মাধ্যমে বস্তু তৈরি হবার কথা এবং মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে সেই বস্তুর পজেটিভ শক্তিকে নিউট্রালাইজ করার কথা। এখানে দুটো জিনিস হকিং পরিষ্কার করে বলেননি। ক) শূন্য বলতে কি হকিং একেবারে শূন্য (nothing) বুঝিয়েছেন নাকি কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম (বস্তুর অনুপস্থিতি) বুঝিয়েছেন সেটি পরিষ্কার করে বলা হয়নি, খ) সৃষ্টির শুরুতে সময় স্থান এর মতো আচরণ করলেও পরবর্তীতে কিভাবে এবং কেনো সময় “সময়” এর মতো আচরণ শুরু করলো সে ব্যাপারেও কিছু বলা হয়নি বইটিতে।
৩। মহাকর্ষ বল ছাড়া মহাবিশ্ব সৃষ্ট হতো না, কিন্তু মহাকর্ষ বল এর সৃষ্টি কিভাবে হয়েছে সেটা নিয়ে হকিং কিছু বলেননি। শূন্য থেকে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের এর মাধ্যমে বস্তুর (শক্তির) সৃষ্টি হতে পারে কিন্তু সেই বস্তুর মহাকর্ষ বল এর বৈশিষ্ট্য থাকবে অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য থাকবেনা কেনো?

শেষ কথাঃ

বইটি প্রকাশ হওয়ার পর সিএনএন এর ল্যারি কিং স্টিফেন হকিং এর একটি সাক্ষাতকার নেয়। সেখানে তাকে ল্যারি সরাসরি জিজ্ঞেস করেন – “আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন”? “ঈশ্বর থাকতে পারেন, তবে বিশ্বসৃষ্টি ব্যাখ্যা করার জন্যে আমাদের তাঁকে প্রয়োজন নাই” – এটা ছিলো হকিং এর উত্তর।

নিউ ইয়র্ক!

১। যন্ত্রণা

ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া থাকে পৌনে সাতটায়। জীবনে কখনো কোনো দরকার ছাড়া এতো সকালে উঠেছি বলে মনে পড়ে না। অথচ এখন রোজ নিয়ম করে এই কাক ডাকা ভোরে (!) উঠতে হয়। উঠে বাথরুম সেরে, ব্রাশ করে, শেইভ করে, গোসল করে, ইস্ত্রি করা সাদা বা নীল রঙের স্ট্রাইপের ফর্মাল শার্ট আর কালো বা অন্য কোনো গাঢ় রঙের প্যান্ট চাপিয়ে টপাটপ একটু সিরিয়াল বা চা-বিস্কুট খেতে খেতে বেজে যায় আটটা। এরপর রীতিমতো দৌড় দিয়ে বের হই ট্রেন স্টেশন এর উদ্দেশ্যে। পাক্কা বারো মিনিটের হাঁটা পথ। ভাগ্য দেবতা সহায় থাকলে কখনো কখনো বের হয়ে বাস পাওয়া যায়। বাস ধরে বা পায়ে হেঁটে পৌঁছাই ট্রেন স্টেশন। এরপর কিউ বা এন ট্রেন ধরে লেক্সিংটন এভিনিউতে যেয়ে ট্রেন পরিবর্তন। ব্রঙ্কস থেকে ছেড়ে আসা তিন বা চার নম্বর ট্রেন ধরে এরপর ডাউনটাউন এর ফুলটন স্ট্রিট স্টেশন। ওখান থেকে দশ মিনিটের মতো হেঁটে এরপর অফিস। বাসা থেকে বের হবার পর নিজের ডেস্কএ পৌঁছাতে পাক্কা এক ঘন্টা চলে যায়। ট্রেনে বেশির ভাগ সময়ই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ডেস্কে বসার সময় দেখতে পাই আমার ম্যানেজার, তার ম্যানেজার, তার ম্যানেজার সবাই অনেক আগে অফিসে এসে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। নিজে দেরীতে আসার লজ্জায় মনে মনে বলি, ধরণী দ্বিধা হও। ধরণী দ্বিধা হয়না কোনোদিন, আমাকে বিরস মুখে আমার দিনের কাজ শুরু করতে হয়!
অফিস করতে হয় দশ/এগারো ঘন্টার মতো। আবার এক ঘন্টার যুদ্ধ করে বাসায় ফেরা। সব মিলিয়ে দিনের তেরো/চৌদ্দ ঘন্টার মতো চলে যায় অফিস এর পেছনে!
এই হোলো আমার ইদানিংকার কর্মজীবনের অবস্থা।

২। সুখ

দুই মাস আগেও ব্যাপারটা এরকম ছিলো না। ঘুম থেকে উঠতাম ইচ্ছেমতো। বাসার সামনে থাকতো গাড়ি। ড্রাইভ করে অফিসে যেতে লাগতো ঘড়ি ধরে পাঁচ মিনিট। অফিসে যেয়ে ঢুকতাম নিজের অফিস রুমে। আমি কখন এসেছি কেউই সেটা খবর রাখতোনা। বারোটা বাজতে না বাজতেই লাঞ্চ টাইম। প্রায়ই বাইরে চলে যেতাম বন্ধুদের সাথে কিংবা টিমমেটদের সাথে। আরাম করে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ধীরেসুস্থে এসে অফিসে ঢুকতাম। চারটা সাড়ে চারটার দিকে এক টিম মেট এর সাথে ফুজবল (বোর্ড এ প্লাস্টিক এর প্লেয়ার আর বল দিয়ে ফুটবল) খেলতে বের হয়ে যেতাম। পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার দিকে মনে হোতো অনেক কাজ হয়ে গেছে এবার বাসায় চলে যাইঃ)
বাসা ছিলো লেকের পাড়ে চমৎকার এক এপার্টমেন্টে। গাছগাছালিতে ভরা চারদিক, প্রায়ই পাখি এসে বসতো পেছনের গাছগুলোয়। লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে সব উঁচু উঁচু পাহাড় দেখা যেতো।

৩। নিউ ইয়র্ক

প্রায় দুই মাস আমি আমেরিকার পশ্চিম উপকুলের সিয়াটল শহর থেকে প্রায় তিন হাজার মাইল দূরে পুর্ব উপকুলের শহর নিউ ইয়র্কে চলে আসি। সিয়াটল এলাকা সম্ভবত আমারিকার সবচেয়ে সুন্দর এলাকা। বরফে ঢাকা পাহাড়, লেক, পার্ক, চারদিকে চিরসবুজ গাছের ছড়াছড়ি ইত্যাদি মিলে সিয়াটল এক অপূর্ব সুন্দর জায়গা। সেই তুলনায় নিউ ইয়র্ক অনেক বৈচিত্রহীন। নিউ ইয়র্ক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহরগুলোর একটি, যেদিকে চোখ যায় খালি ইট পাথরের বিল্ডিং। ব্রুকলিন কুইন্স এক্সপ্রেসওয়ে থেকে রাতের নিউ ইয়র্ক শহর এর দিকে তাকালে পুরো শহরটাকে এক জীবন্ত প্রাণী মনে হয়। শত শত আকাশ ছোঁয়া বিল্ডিং ম্যানহাটান এর এক প্রান্ত থেকে থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাতের ঝলমলো আলোতে পুরো শহরটাকে মানুষের তৈরি একটা বিশাল জীব মনে হয়।

৪। মানুষ
সিয়াটল এর সাথে নিউ ইয়র্ক এর সবচেয়ে বড় পার্থক্য আসলে অন্য জায়গায়। সিয়াটল এতো সুন্দর হয়েও কেমন যেনো খালি খালি। নিউ ইয়র্ক মানুষের শহর। চারদিকে খালি মানুষ আর মানুষ। সাদা-কালো-বাদামী, আমেরিকান-ইউরোপিয়ান-এশিয়ান, ওয়াল স্ট্রিট এর মিলিওনেয়ার, মেক্সিকো থেকে সাগর-নদী-জঙ্গল দিয়ে পালিয়ে আসা অবৈধ অভিবাসী, সারা পৃথিবী থেকে আসা টুরিস্ট – সব মিলিয়ে পুরো নিউ ইয়র্ক শহর সারাক্ষন থাকে সরগরম। নিউ ইয়র্ক এক অর্থে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক শহর বলা যায়। শহরের প্রান-কেন্দ্রে টাইমস স্কয়ার বলে একটা জায়গা আছে যেখানে দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা টুরিস্টদের আনাগোনা। রাত তিনটার সময় যেয়েও লাইন ধরে রাস্তার পাশে কার্টে বিক্রি করা মজাদার মধ্যপ্রাচ্যীয় খাবার “ফালাফাল” খাওয়া যায়। টাইমস স্কয়ারে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে সারা পৃথিবীর সব ভাষা শোনা যাবে নিশ্চিত!
বাংলাদেশের সবচেয়ে সক্রিয় মানুষগুলো থাকে নিউ ইয়র্কে। এখানে সব সময় কোনা না কোনো প্রোগ্রাম লেগেই থাকে। গান, নাচ, কিংবা রাস্তাঘাট বন্ধ করে মেলা, একটা না একটা কিছু সব সময় চলতে থাকে। আছে বিএনপি-আওয়ামী লীগ দলাদলিও!

৫। জ্যাকসন হাইটস

নিউ ইয়র্ক এর কথা সম্পূর্ণ হবেনা যদি না জ্যাকসন হাইটস জায়গাটার কথা না বলি। জ্যাকসন হাইটস হচ্ছে নিউ ইয়র্ক এর বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা। জ্যাকসন হাইটস এ আসলে যে কারো মনে হতে পারে সে আসলে এখন ঢাকার কোনো এলাকায় চলে এসেছে। চারদিকে বাংলা ভাষায় সাইনবোর্ড, লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পরা চাচা, বোরকা পরা ধার্মিক মহিলা – এসব দেখে জ্যাকসন হাইটসকে আমেরিকার একটা জায়গা মনেই হয়না।
জ্যাকসন হাইটসএ আছে অসংখ্য বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট। বেশিরভাগই গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। উইকএন্ডএ বন্ধুবান্ধবের সাথে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টএ বসে চা-সিঙ্গারা খেতে খেতে রাজনীতি কিংবা অন্য কোনো রসালো বিষয় নিয়ে গল্প করার মজাই সেরকম!

৬। টুইন টাওয়ার এবং স্ট্যাচু অব লিবার্টি

সারা জীবন নিউ ইয়র্ক এর ছবি দেখলেই দু’টো জিনিস দেখতাম – টুইন টাওয়ার আর স্ট্যাচু অব লিবার্টি। সবসময় ভাবতাম, আহা যদি একবার নিউ ইয়র্ক যেয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে পারতাম! লাদেন মামার কল্যানে টুইন টাওয়ার আর দেখা হোলো না, কিন্তু ভাগ্যের কারসাজিতে আজ আমার অফিস টুইন টাওয়ার এর পাশে, এবং আমার অফিস থেকে পরিস্কার স্ট্যাচু অব লিবারটি দেখা যায়! অফিস থেকে দেখে যেনো সাধ মিটে না, মাঝে মধ্যে বিকেলবেলা অফিস থেকে বের হয়ে হাডসন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্ট দেখি।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেখি কিছুক্ষণ পরপর ফেরী ছেড়ে যাচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি এর উদ্দেশ্যে, একেবারে স্ট্যাচু এর উপরে উঠা যায় নিচ থেকে। আমার আর কখনো স্ট্যাচু অব লিবার্টি এর উপরে ওঠা হোলো না। যে জিনিস চোখে দেখা যায় প্রতিদিন সেটা ফেরী করে যেয়ে দেখার দরকারটা কী? ওই যে বলে না, মক্কার লোকে হজ পায় না!

বিবর্তন এর সরল পাঠঃ বিবর্তন কী এবং কিভাবে কাজ করে?

আমরা অনেকেই বিবর্তন সম্পর্কে জানি বা শুনি। অনেকে এর কথা শুনেই আঁতকে উঠি, ভালো করে না জেনে এর সম্পর্কে অনেক মন্তব্য করি। আসুন দেখি জিনিসটা আসলে কী।

বিবর্তন বুঝতে হলে কয়েকটি জিনিস সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে আগে। এগুলো আগে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করছি।

কোষঃ
কোষ হচ্ছে প্রাণী বা উদ্ভিদের শরীরের ক্ষুদ্রতম গাঠনিক অংশ। বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক অণু দিয়ে কোষ গঠিত। আমাদের জীবন ধারণের জন্যে যাবতীয় জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া এই কোষে ঘটে থাকে। আমরা মারা গেলে কোষে আর কোনো কিছু ঘটেনা এবং কোষে রাসায়নিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া থেমে গেলে আমরা মারা যাই।

ডিএনএঃ
ডিএনএ হচ্ছে কোষ এর মধ্যে থাকা একটা জৈব-রাসায়নিক অণু। প্রাণীর জীবন-ধারণের জন্যে, বংশধারা রক্ষা এবং প্রজনন সক্ষমতার জন্যে এ অণুটির ভূমিকা অপরিসীম। একটা প্রাণীর সকল শারীরিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত তথ্য এই ডিএনএ নামক অণুতে সংরক্ষিত থাকে। যেমন ধরুণ কেউ লম্বা হবে না বেঁটে হবে সেটা এই ডিএনএ এর একটা অংশের উপর নির্ভর করে। ডিএনএ এর এই অংশকে বলে জিন।

জিনঃ
জিন হচ্ছে কোষে অবস্থিত ডিএনএ এর অংশবিশেষ যেটিতে দেহের জন্যে দরকারী প্রোটিন তৈরি করার কোড (তথ্য) থাকে। এই কোড আসলে কিছু রাসায়নিক অণুর (ফসফেট, সুগার, এবং বেইস) ক্রমাণুমিক অবস্থান ছাড়া আর কিছুই নয়। এই রাসায়নিক অণুগুলো কিভাবে সন্নিবেশিত আছে তার উপর নির্ভর করে কোষে প্রোটিন তৈরি হয়। সবচেয়ে দরকারী প্রোটিনটির নাম হচ্ছে এনজাইম। কোষে যতো ধরণের রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া হয় তার সবকিছু সম্ভব হয় এনজাইম এর উপস্থিতির কারণে। শরীরে কী ধরণের প্রোটিন তৈরি হচ্ছে সেটির উপর ভিত্তি করে প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট নির্ধারিত হয়। কোনো ডিএনএতে যদি শরীরকে লম্বা করার জন্যে দরকারী জিন না থাকে তাহলে লম্বা হওয়ার জন্যে যে প্রোটিন দরকার সেই প্রোটিনটি তৈরি হবেনা এবং ফলস্রুতিতে সেই শরীরটি লম্বা হবেনা।

অর্গানিজম/মাইক্রোওর্গানিজমঃ
যেকোনো ধরণের ক্ষুদ্রাকৃতির (অণু সদৃশ) প্রাণী/উদ্ভিদ কে মাইক্রোওর্গানিজম বলে। যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি।

বিবর্তন এর সঙ্গাঃ
বিবর্তন হচ্ছে বিভিন্ন প্রানী এবং উদ্ভিদের শারীরিক অবস্থায় ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যাকারী তত্ত্ব। বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীর সকল প্রানী এবং উদ্ভিদ একটা এক-কোষীয় মাইক্রোঅর্গানিজম থেকে এসেছে। সবচেয়ে প্রাচীন মাইক্রোঅর্গানিজম এর ফসিল যেটি পাওয়া গিয়েছে সেটি প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগের (এর মানে পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার প্রায় এক বিলিয়ন বছর পর এটার সৃষ্টি হয়েছে)। এই মাইক্রোঅর্গানিজম থেকে বিভিন্ন প্রাণী এবং উদ্ভিদ এর উৎপত্তি বিবর্তন ব্যাখ্যা করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন এই এক-কোষীয় মাইক্রোওর্গানিজমটি কিভাবে এসেছে সেটা বিবর্তনের বিষয় নয়। কিন্তু সেটারও সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিয়েছে। এই প্রাচীনতম মাইক্রোঅর্গানিজম থেকে গতো কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে প্রাণী এবং উদ্ভিদের মধ্যে ঘটে যাওয়া শারীরিক পরিবর্তন বিবর্তন ব্যাখ্যা করে। কিভাবে এতো হাজার হাজার রকমের উদ্ভিদ এবং প্রাণীর উদ্ভব হলো সেটি বিবর্তন ব্যাখ্যা করে।

বিবর্তন যেভাবে কাজ করেঃ
বিবর্তন কাজ করে দুইটি প্রধান উপায়ে। এর একটি হচ্ছে ডিএনএ পরিবর্তন(mutation), এবং আরেকটি হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচন (natural selection)।

ডিএনএ পরিবর্তনঃ
জীবকোষে অবস্থিত ডিএনএ মাঝে মাঝে পরিবর্তিত হয়। ডিএনএ যেহেতু আমাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে, তাই এর পরিবর্তন হওয়া মানে আমাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হওয়া।
প্রধানত দুটি কারণে ডিএনএ এর মধ্যে পরিবর্তন ঘটতে পারেঃ ১। কোষ বিভাজনের সময় সময় ডিএনএ এর প্রতিলিপি তৈরি করার সময়, এবং ২। তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ, অতিবেগুনি রশ্মি ইত্যাদি কারণে বাইরের পরিবেশের রাসায়নিক পদার্থ শরীরে প্রবেশ করে ডিএনএতে পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
এই পরিবর্তনগুলোর উপর যেহেতু আমাদের হাত নেই তাই ডিএনএ এর যেকোনো অংশে (জিনে) এই পরিবর্তন হতে পারে। আর জিন যেহেতু আমাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয়, তাই জিনের এই পরিবর্তন আমাদের শরীরকে প্রভাবিত করে। ডিএনএ এর এমন পরিবর্তন আমাদের জন্যে উপকারী হতে পারে আবার অপকারীও হতে পারে। উদ্ভিদ এবং প্রানীর শরীরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে পরিবর্তন আমরা দেখতে পাই সেটার কারণ হচ্ছে এই ডিএনএ অর্থাৎ জিন এর পরিবর্তন।

প্রাকৃতিক নির্বাচনঃ
ডিএনএ পরিবর্তন একটি র‌্যান্ডম প্রক্রিয়া। আগে থেকে জানার উপায় নেই যে কোনো পরিবর্তন ভালো, খারাপ, নাকি নিরপেক্ষ হবে। পরিবর্তনটি যদি খারাপ হয় তাহলে সেই প্রানী/উদ্ভিদ এর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। উদাহরণস্বরুপ, কোনো বন্য পোকার গায়ের রঙ নির্ধারণকারী জিন যদি এমনভাবে পরিবর্তন হয়ে যায় যে এর গায়ের রঙ বনের লতাপাতা বা গাছপালার রঙ এর চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে যায় যেটা সহজেই এর খাদক শিকারী প্রাণীর চোখে পড়ে, তাহলে শিকারীর পাল্লায় পড়ে সে পোকাটি আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে চলে যাবে। অন্যদিকে জিনটি যদি এমনভাবে পরিবর্তন হতো যে পোকাটির গায়ের রঙ বনের অন্যান্য গাছপালা লতাপাতার রঙের সাথে মিশে যেতো যাতে পোকাটিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তো, তাহলে পোকাটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেতো। আর এভাবেই নতুন জিনটি বংশ-পরম্পরায় প্রাবাহিত হয়ে যাবে। ডিএনএ এর মাঝে জিন এর র‌্যান্ডম পরিবর্তন থেকে বেঁচে থাকার জন্যে, পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে উপকারী জিনটিকে নির্বাচন করার প্রক্রিয়াটিকে বলে প্রাকৃতিক নির্বাচন।

লক্ষ্য করে দেখবেন, ডিএনএ পরিবর্তন এর ব্যাপারটি র‌্যান্ডম হলেও অনেকগুলি র‌্যান্ডম পরিবর্তন থেকে দরকারী বা উপকারী জিনটিই খুব যত্ন করে নির্বাচন করে প্রাকৃতিক নির্বাচন। এর মানে হচ্ছে, কোন জিনটি জীব দেহে বংশানুক্রমিকভাবে প্রবাহিত হবে সেটি খুব জেনে, শুনে, বেছে ঠিক করা হয়। আর এভাবেই জীবের বিবর্তন ঘটে আরো অধিকতর শক্তির শরীর তৈরির দিকে, দুর্বল বা অপ্রয়োজনীয় অংগগুলি আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হয় কিংবা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বিবর্তন নিয়ে করা প্রশ্নাবলীর উত্তরঃ

১। বিবর্তন কি শুধু একটা তত্ত্ব যেটি এখনো প্রমাণিত হয়নি?

উত্তরঃ বিবর্তন প্রমাণিত কিনা সেটা জানার আগে প্রমাণ ব্যাপারটা একটু ক্লিয়ার করে নেওয়া ভালো। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রমাণ সবসময় গাণিতিক নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরুপ, বিশ্ব সৃষ্টি বিগ ব্যাং তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। বিগ ব্যাং ঘটেছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে। একে কোনো গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বিং ব্যাং এর পর থেকে মহাবিশ্ব কিভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে, কিভাবে মহাবিশ্বের বিভিন্ন গ্যালাক্সি, নক্ষত্র ইত্যাদি কাজ করে এসবের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল আছে। মহাবিশ্বে ঘটে যাওয়া ঘটনা সমূহ বিগ ব্যাং দিয়ে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনা বা বস্তু পাওয়া যায়নি মহাবিশ্বে যেটা বিগ ব্যাং দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবেনা।
বিবর্তনের ব্যাপারটা তেমনি। জিনতও্ব, ফসিল রেকর্ড, বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীর শারীরিক পরিবর্তন ইত্যাদি সবকিছু বিবর্তন দিয়ে খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ল্যাবরেটরিতে সীমিত পর্যায়ে বিবর্তনকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত বিবর্তন তত্ত্বের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যাওনি।
বিজ্ঞানের কোনো সম্ভান্ত জার্নালে বিবর্তনের বিরুদ্ধে কোনো লেখা কখনো ছাপা হয়নি, বরং নেচার, সায়েন্টিফিক আমেরিকান, এবং জীব বিজ্ঞানের প্রায় সব জার্নালে বিবর্তন এর পক্ষে অহরহই লেখা ছাপানো হয়।

২। বিবর্তন এর প্রমাণ কী?

উত্তরঃ বিবর্তন নিয়ে করা সব ধরনের পর্যবেক্ষণ এবং এক্সপেরিমেন্ট বিবর্তনকেই সাপোর্ট করে। শত কোটি বছর আগে থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের সব ফসিলগুলোকে কালানুক্রমিকভাবে সাজালে পরিষ্কারভাবে বংশ থেকে বংশে ঘটে যাওয়া শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রানীর মধ্যে শারীরিক এবং জিনগত সাদৃশ্য এবং পার্থক্য থেকেও বিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ফসিল রেকর্ড দেখে যেসব প্রাণীকে অতীতে একই পুর্বপুরুষ থেকে আগত মনে করা হয়েছিলো পরবর্তীতে জিন বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে তাদের মধ্যে জিনগত মিল প্রচুর। এর মানে ফসিল রেকর্ড সঠিকভাবে বিবর্তন এর প্রক্রিয়াকে সাপোর্ট করে।

৩। বিবর্তন কি প্রমাণ করে ঈশ্বর এর অস্তিত্ত্ব নেই?

উত্তরঃ বিবর্তন আর দশটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মতোই একটি তত্ত্ব। বিগ ব্যাং তত্ত্ব, মধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব ইত্যাদির সাথে যেমন ঈশ্বর এর কোনো সম্পর্ক নেই বিবর্তন এর সাথেও ঈশ্বর এর কোনো সম্পর্ক নেই।

৪। কিন্তু বানর থেকে মানুষ এসেছে এতে আমাদের মর্যাদা ছোট হয়ে যাচ্ছে না?

উত্তরঃ প্রথমত, মানুষ বানর থেকে আসে নাই। মানুষ এবং বানর জাতীয় প্রাণী লক্ষ কোটি বছর আগে শিম্পাঞ্জীর মতো দেখতে একটি প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে। আর এতে আমাদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা কমে যাওয়ার কিছু নেই। মানুষ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী, মানুষের সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ, মানুষের চিন্তা-চেতনা অনেক উন্নত – এগুলোর কিছুই তো মিথ্যা হয়ে যাচ্ছেনা বিবর্তনের কারণে।

৫। বিবর্তন কিভাবে সত্যি হতে পারে? প্রাণহীন নির্জীব বস্তু থেকে মানুষের মতো এতো জটিল প্রাণী কিভাবে তৈরি হতে পারে? এটা কি ঝড়ের কবলে পড়ে লোহা আর প্লাস্টিকের স্তুপ থেকে একটা বোয়িং প্লেন তৈরি হওয়ার মতো না?

উত্তরঃ ব্যাপারটা আপাত দৃষ্টিতে তাই মনে হতে পারে। একটা জিনিস চিন্তা করে দেখুন, আমরা সবাই কিন্তু মায়ের পেটে একটা নির্জীব অণু থেকে মাত্র নয় মাসে একটা জটিল মানব শিশুতে পরিণত হই! সেখানে বিবর্তন ঘটেছে কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে। আর প্রাকৃতিক নির্বাচন সবসময় উপকারী পরিবর্তনটি গ্রহণ করার ফলে বিবর্তন আরো ত্বরাণ্বিত হয়। সব ধরণের পর্যবেক্ষণ যেখানে বিবর্তনকে সমর্থন করছে সেখানে শুধু “সত্যি ভাবতে কষ্ট হয়” ভেবে একটা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে ফেলে দেওয়ার কোনো মানে হয়না।

তথ্যসূত্রঃ
১। Understanding Evolution (http://evolution.berkeley.edu/evolibrary/home.php)
২। How Evolution Works (http://science.howstuffworks.com/evolution/evolution.htm)
৩। The Greatest Show on Earth – Richard Dawkins
৪। Evolution – where we are from (http://www.pbs.org/wgbh/evolution/)
৫। Galileo’s Finger – Ten great ideas of science, Peter Atkins