Category Archives: Uncategorized

হ্যাক ইয়োরসেলফ – জীবনে সুখী হোন!

কিছুদিন আগে একটা চমৎকার লেখা পড়ি একটা ওয়েবইটে। সুখী হবার জন্যে কিছু সহজ উপায় বাতলে দিয়েছেন ভদ্রলোক। কথাগুলির বেশিরভাগই আমাদের সবার জানা, কিন্তু এরপরও আমরা এগুলো মানিনা।

মূল লেখাটি পাওয়া যাবে এখানে

আপনি চাইলেই সুখী হতে পারেন। আপনি যে ধরণের জীবন চান সেটাই চাইলে পেতে পারেন। আপনি যে ধরণের মানুষ হতে চান সেটাও আপনি হতে পারেন।

আজ পর্যন্ত আমি আমার জীবনে যা যা শিখেছিঃ

১।

অপরকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুণ। এটাই হবে প্রথম পদক্ষেপ। অপরকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুণ এবং অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যান।

আপনি জানেন কাদের জন্যে আপনার জীবনে এতো সমস্যা। আপনার বস। আপনার স্বামী বা স্ত্রী। প্রেমিক বা প্রেমিকা। আপনার পরিবার। রাজনীতিবিদরা। যারা আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে, ঝামেলায় ফেলেছে। কিংবা হয়তো আপনি নিজেই।
সারা জীবন নিজেকে বলে এসেছেন “অমুকের” কারণে আজ আপনার জীবনে এতো সমস্যা। অন্যের উপর নিজের জীবনের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের দায় চাপিয়ে দিয়ে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজে নেওয়া থেকে চমৎকারভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়!

আমার কথা শুনুন – ভুলে যান সব। অতীত অতীতই, এই মুহুর্তে সেটার কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। আপনার অতীত হারিয়ে গেছে সময়ের অতল গহবরে। যেটার অস্তিত্ত্বই নাই, সেটা আপনার বর্তমান জীবনে খুব বেশি ম্যাটার করে না। অতীত নিয়ে আপনার কিছুই করার নেই। আর যেটা নিয়ে আপনার কিছুই করার নেই সেটা নিয়ে সময় ও শক্তি নষ্ট করার কোনো মানে হয়না – আপনার আরো গুরুত্মপূর্ণ কাজ পড়ে আছে!

আমার কথা হয়তো নিষ্টুর শোনাতে পারে, বেশি সরলীকরণ মনে হতে পারে। আমি দুঃখিত সেজন্যে, কিন্তু আপনি অতীত নিয়ে পড়ে থাকলেও আপনার জীবন কিন্তু থেমে থাকবেনা। জীবন ছুটে চলছে মিনিটে ষাট সেকেন্ড গতিতে। হাত-পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ান। গতোকাল কী ঘটে গেছে সেটা নিয়ে আপনি কিছু করতে পারবেননা।

২।

“আমার লেখালেখির সময় নাই।” “আমি গাইতে পারিনা।” “মানুষের সাথে কথা বলতে আমার সমস্যা হয়।” “আমি দেখতে সুন্দর না।”

এগুলো আমি সবসময় শুনি। আমার চারদিকে আমি মানুষজনকে নিজের চারদিকে না পারার দেয়াল তৈরি করে বসে থাকতে দেখি, নিজেকে পিছিয়ে দিতে দেখি।

আমি তাদের জন্যে বলতে চাই – লেখালেখির জন্যে সময় তৈরি করো। কোনোকিছু না ভেবে গান গাও, মানুষের সাথে যেয়ে কথা বলো। নিজেকে সুন্দর বানাও!

হ্যাঁ, আমার কথাগুলো অতি সরলীকরণ মনে হতে পারে, কিন্তু আপনি “পারি না” বলেও কিন্তু অতি সরলীকরণ করছেন!

আমরা আমাদের জীবনে চমৎকার প্যাটার্ন তৈরি করতে পারি। মানুষ এটা অহরহই করে চলেছে। আমরা আমাদের জীবনের দিকে তাকাই, অতীতের দিকে তাকাই, অতীত কর্মকান্ডের দিকে তাকাই, এবং এগুলোর মধ্যে সরলরেখা টানি। আমরা ধরে নিই যেহেতু অতীতে আমরা কোনো কাজ একভাবে করেছি অতএব আমাদের বাকী জীবনেও একইভাবে কাজটি করে যেতে হবে। আমরা যেহেতু অতীতে ব্যর্থ হয়েছি, আমরা ভবিষ্যতেও ব্যর্থ হবো।

এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসুন।

নিজেকে চমকে দিন। না – নিজেকে মুগ্ধ করুণ।

যে কাজগুলি পছন্দ করেন না সেগুলি প্রতিনিয়ত করে যাওয়ার কোনো মানে হয়? একজনকে আপনার পছন্দ হচ্ছে, অথচ ভয়ে কিংবা লজ্জায় বলতে পারছেন না। প্রতিদিন তার কাছাকাছি যাচ্ছেন, কিন্তু কিছু বলছেন না, করছেন না। এরপর বাসায় ফিরে এসে কষ্ট পাচ্ছেন। কেনো? যে কাজটি আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে, কেনো সে কাজটি প্রতিদিন করে চলেছেন? একবার সাহস করে তাকে মুখ ফুটে বলে ফেললেই তো আপনি এই কষ্ট থেকে বেঁচে যেতেন। সে যদি আপনাকে প্রত্যাখ্যানও করে সেটা কি এই প্রতিদিনের কষ্টের চেয়ে বেশি হতো?

মনে সাহস আনুন, যা করতে চান করে ফেলুন। প্রতিদিন একটা অশান্তি নিয়ে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার কোনো মানে হয়না। নতুন ব্যবসা করতে চান, শুরু করে দিন। কোনো কোর্সে ভর্তি হতে চান, ভর্তি হয়ে যান। কারো কোনো আচরণ আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে, তার সাথে এটা নিয়ে কথা বলে ফেলুন। কিছু লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে, লিখে ফেলুন। গান গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে, গেয়ে ফেলুন। নিজেকে সুন্দর দেখতে ইচ্ছে করছে, শরীরের যত্ন নিন।

৩।

নিজের ভেতরের দানবটাকে বের করুণ।

আমি কার কথা বলছি বুঝতে পারছেন? এটা হচ্ছে আপনার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কন্ঠটি যেটি আপনি কিছু করতে গেলেই সবসময় পেছন থেকে বলতে থাকে – “তুমি এই কাজটা করতে পারবেনা।” আপনি এই দানবটাকে চেনেন। আপনি মনে করতে পারেন আপনি এই দানদটাকে ঘৃণা করেন, আসলে কিন্তু তা নয়। আপনি একে ভালোবাসেন। এমনকি আপনি এই দানবটাকে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতেও দিচ্ছেন। এটা যা বলে আপনি তাই করেন। যখনি আপনি কিছু করতে চান, পেতে চান আপনি আগে আপনার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা দানবটির পরামর্শ নেন, দেখতে চান সে কি এটা বলে কিনা – “তুমি এটা করতে পারবেনা, এটা পেতে পারবেনা!”

যেটা আপনি বুঝতে পারছেননা তা হলো এই দানব আসলে কিছুই জানেনা। এটা একটা আহাম্মক। এটা একটা তোতা পাখি ছাড়া আর কিছু নয়। অতীতে আপনার ব্যর্থতাগুলোর কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ছাড়া এর আর কনো কাজ নেই। অতীতে আপনার বাবা-মা, শিক্ষক কিংবা অন্য কেউ আপনাকে যখনি বলেছে আপনি কিছু করতে পারবেন না, তখনি এই দানব সেই কথাগুলো জমা করে ফেলেছে। এবং যখনি আপনি নতুন কিছু করতে যাবেন এই দানবটি সেই নেগেটিভ কথাগুলো আপনার দিকে ছুঁড়ে দিবে। আপনাকে পিছিয়ে দেয়াই এর লক্ষ্য।

দানবটাকে ঝেড়ে ফেলুন।

এরপর যখনি আপনি আপনার ভেতর থেকে কাউকে বলতে শুনবেন যে আপনি কোনো একটি কাজ করতে পারবেন না, কোনো কিছু চেয়ে পাবেন না, তখনি এই দানবটিকে আপনার সামনে কল্পনা করবেন। এরপর কল্পনায় একে মেরে কেটে ধ্বংস করে দিন। আপনার ভেতর থেকে যে কোনো ধরণের নেগেটিভ কন্ঠকে বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিন। আপনার উপর আপনি ছাড়াআর কেউ যাতে কোনো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করুণ।

আপনি অবশ্যই যা চান তাই করতে পারবেন। আপনার ভেতরের দানবটি আপনাকে বলবে আপনি পারবেন না। আমাকে বিশ্বাস করুণ, আপনি পারবেন!

৪।

আপনার অস্তিত্ত্বই নেই।

আপনি ভাবছেন আপনার অস্তিত্ত্ব আছে। আপনার অস্তিত্ত্ব আসলে আপনার মনের ভেতর!

আসলে নিজেদেরকে নিজের সম্পর্কে যা বলি আমরা তাই। আমরা মনে মনে জানি আমরা কেমন মানুষ, আমরা কী করতে পারি, আমরা কী করতে পারিনা। যেহেতু আমরা মনে মনে সবসময় বলে এসছি আমরা কী পারি আর কী পারিনা, আমরা আসলে শক্তি এবং দূর্বলতার একটা লিস্ট। উদাহরণস্বরুপ, আত্মবিশ্বাস এর মতো বায়বীয় জিনিস আপনি শুধুমাত্র ভেবে ভেবেই নিজের মধ্যে নিয়ে আসতে পারবেন!

আপনার নিজের সম্পর্কে নিজের যেসব ধারণা আপনাকে কষ্ট দেয়, আপনার ক্ষতি করে, সেসব ধারণা যে আপনাকে ধরে রাখতে হবেই তার কোনো মানে নেই। যদি নিজের সম্পর্কে কোনো ধারণা আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে সেটা বাদ দিয়ে আরেকটা ভালো ধারণা পছন্দ করে নিন নিজের জন্যে!

ব্যাপারটা ছেলেমানুষী মনে হতে পারে, কিন্তু এটা খুবই কার্যকর একটা জিনিস! আপনি যে ধরণের মানুষ হতে চান সেরকম অভিনয় করুণ। নিজেকে সেই কল্পনার মানুষ ভাবুন। তার মতো চিন্তা করুণ। তার মতো কাজ করুণ, না পারলে বানিয়ে বানিয়ে অভিনয় করুণ।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আপনি যখন আপনার কল্পনার মানুষটির মতো অভিনয় করা শুরু করবেন, তখন চারপাশের সবাই ধীরে ধীরে আপনার সাথে সেই মানুষটির মতোই ব্যবহার করবে।

এবং আপনিও ধীরে ধীরে সেটা বিশ্বাস করা শুরু করবেন। এবং এক সময় আপনি সেই মানুষে পরিণত হবেন।

আপনার নতুন “আমি”তে স্বাগতম!

৫।

আপনি আসলে আপনার পরিবেশের একটা প্রডাক্ট।

প্রায় সবাই এটা জানে, তবে সাধারণত নিজের ভাগ্যের জন্যে পরিবেশকে দায়ী করেন। কিন্তু তারা একটা গুরুত্মপূর্ণ কথা ভুলে যানঃ

মানুষ তার পরিবেশ নিজের মতো করে ভেঙ্গে গড়তে পারে!

এর মানে হচ্ছে, যদি পরিবেশ আমাদের প্রভাবিত করতে পারে এবং আমরা পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারি তাহলে আমরা আমাদের নিজেকে প্রভাবিত করতে পারি।

– আপনার পরিবেশে মানুষ আছে। ভেবে দেখুন কাদেরকে আপনি পছন্দ করেন এবং কাদেরকে আপনি অপছন্দ করেন। যারা আপনার জীবনে নেগেটিভ প্রভাব তৈরি করেন তাদের থেকে দূরে সরে যান। হতে পারে তাদের কেউ কেউ আপনার কলিগ, বস, আপনার বন্ধু, কিংবা আপনার আত্মীয়, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনা। আপনার জীবনে ক্ষতির কারণ হয়ে যদি কেউ দাঁড়ায় তাহলে তাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকাই আপনার জন্যে ভালো। হয় আপনি তাদের সাথে আপনার সম্পর্ক আগাগোড়া বদলে ফেলবেন না হয় তাদেরকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাবেন।

– আপনার পরিবেশে আছে লক্ষ্য! জীবনের লক্ষ্যগুলি খুব বেশি যাতে অসম্ভব না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। এমন সব লক্ষ্য ঠিক করবেন যেগুলো আপনি অর্জন করতে পারবেন। লক্ষ্য ঠিক করুণ এবং সেগুলো অর্জন করুণ। একবারের জন্যেও নিজেকে বলবেন না যে আপনি আপনার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন না। সেটা হচ্ছে পুরনো আপনি। নতুন আপনি যেকোনো যৌক্তিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন। পুরনো আপনি ছিলেন আপনার দানবের নিয়ন্ত্রণে, যে সবসময় আপনাকে পেছনে টেনে ধরে রাখতো, সবসময় আপনাকে বলতো আপনি কিছু করতে পারবেন না। আপনার ভেতরের দানবটিকে আপনি মেরে ফেলেছেন, আপনার নতুন ব্যক্তিত্বে “পারবো না” কথাটি আর নেই!

বাসা কিংবা রুম গোছানো দরকার? কাপড় চোপড় অনেক দিন ধরে ধোয়া হচ্ছে না? যান কাজটি আজই করে ফেলুন। একটা পরিষ্কার ঘর এবং পরিষ্কার কাপড় চোপড় আপনার মনকে অনেক প্রফুল্ল রাখে। কিন্তু তাই বলে একসাথে পুরো বাসা ধুয়ে মুছে ফেলা, কিংবা সব কাপড় চোপড় ধুয়ে ফেলার চিন্তা করবেন না। যতোটুকু কাজ করতে পারবেন একেবারে সেটারই দায়িত্ব নিবেন, বেশি কিছু করতে গেলে আবার কিছুই করা হয়ে উঠবেনা। কোনোভাবেই আপনার ভেতরের দানবটিকে সুযোগ দিবেন না।

একেবারে পুরো একটী বই লিখে ফেলার প্ল্যান করবেন না। বরং ঠিক করুণ আজকে আমি প্রথম পাঁচ পৃষ্ঠা লিখবো। এবং সেটা করে ফেলুন, প্রথম পাঁচ পৃষ্ঠা লিখে ফেলুন। আপনার স্বপ্ন ঠিক করুণ এবং একে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুণ। এরপর ছোট ছোট অংশগুলোকে অর্জনের জন্যে কাজ শুরু করে দিন।

এবং যখন আপনি আপনার ছোট ছোট লক্ষ্যগুলো অর্জন করা শুরু করবেন, দেখবেন আপনি এটা পছন্দ করছেন। ছোট অর্জগুলো আপনাকে সুখী করছে, আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। এবং স্বপ্ন পুরণের জন্যে কাজ করার প্রতি আপনার এক ধরণের আকর্ষন তৈরি হবে।

– আপনার পরিবেশের মধ্যে আপনিও আছেন। নিজের যত্ন নিন। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করুণ, ব্যায়াম করুণ।আমি বলছিনা যে মাঝে মধ্যে রাত জাগা যাবেন, চকলেট খাওয়া যাবেনা, আরাম করে বসে টিভি দেখা যাবেনা, আড্ডা দেওয়া যাবেনা। মূল ব্যাপারটি হচ্ছে যে কাজগুলো আপনাকে সুখী করে, আপনার জন্যে একটা নিরাপদ বর্তমান আর ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেয় সে কাজগুলো করা শুরু করুণ। শরীরের যত্ন নিন বেশি করে, কারণ একটা সুস্থ সবল শরীর থাকলে আপনার মনও সুস্থ থাকবে। আর মন সুস্থ থাকলে আপনি আপনার চারপাশকে সুস্থ সুন্দর করার জন্যে কাজ করার উদ্দীপনা পাবেন।

– নিজের চেহারার যত্ন নিন। আপনি যদি নিজেকে নিয়ে খুশি না হন, যদি আয়নায় আপনার চেহারা দেখে আপনি বিরক্ত হন, তাহলে আপনার চেহারা নিয়ে কিছু করাটা আপনার জন্যে জরুরী। আপনার চেহারাকে সুন্দর করার চেষ্টা করুণ – চুলের একটা নতুন স্টাইল ট্রাই করুণ, একটা নতুন চশমা পরে দেখুন, নতুন জুয়েলারি, নতুন ফ্যাশনের জামা পরে দেখুন। খুব যে দামী কিছু পরতে হবে তা না, সাধারণ দামে অনেক ভালো চমৎকার পোষাক পাওয়া যায় মার্কেটে। নিজে যে ধরণের মানুষ হতে চান ঠিক করুণ সেই মানুষটি দেখতে কেমন হবে। সেই মানুষটির পোষাক কেমন হবে। সে ধরণের পোষাক পরুণ। এটা সঙ্কীর্ণতা নয়, আত্মম্ভরিতাও নয়। এতা হচ্ছে নিজেকে বদলে দেওয়া, নিজের স্বপ্নের মানুষটিতে রুপ নেওয়া। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আদিবাসী গোত্রও জানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, নতুন পরিবেশে, নতুন দায়িত্বে মানুষের নতুন ধরণের সাজ-সজ্জা গুরুত্মপূর্ণ।

মানুষ কোনো নির্জীব বস্তু না। মানুষ একটা সিস্টেম। যেকোনো সিস্টেম এর মতোই, যদি ইনপুট পরিবর্তন করে দেন তাহলে আউটপুটও পরিবর্তন হয়ে যাবে!

৬।

শেষ কথাঃ

আত্ম-বিশ্লেষণ অনেক সময় কাজে নাও লাগতে পারে।

আপনাকে নিশ্বাস নিতে হবে – এটা মনে করে নিশ্বাস নেওয়ার দরকার নাই। জাস্ট নিশ্বাস নিন। এটা টাও দর্শন।

সবকিছুর মূলে হচ্ছে এই প্যারাডক্স। “আমি কি আমি যেই মানুষটি হতে চাই সেই মানুষের মতো জীবন যাপন করছি?” – যেদিন আপনার নিজেকে আর এই প্রশ্ন করার প্রয়োজন পড়বেনা, সেদিন বুঝবেন আপনি আপনার স্বপ্নের মানুষে পরিনোত হয়েছেন।

সবশেষে, যদি আমি আপনাকে একটা শেষ কথা বলে বিদায় নিতে চাই সেটি হবেঃ

নিজেকে সুখী দেখতে না পেয়ে অশান্তি করা বন্ধ করুণ। জাস্ট সুখী হয়ে যান।

Advertisements

দেশের বাইরে দেশ

মানুষ হিসেবে আমি ভয়াবহ রকমের কৌতুহলী। সেই ছোটবেলা থেকেই চারপাশের পৃথিবী নিয়ে আমার হাজারো প্রশ্ন। খুব ছোটবেলায়, যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম, তখন একটা প্রশ্ন প্রায়ই আমার মাথায় ঘুরতো – এই পৃথিবীর শেষ সীমানা কোথায়? কাউকে তখন প্রশ্নটা করা হয়নি সম্ভবত, তাই আমি নিজে নিজে এর একটা উত্তর বের করে নিয়েছিলাম। আমি ভেবে ভেবে বের করেছিলাম পৃথিবীর শেষ দেশটির নাম আমেরিকা এবং সেই দেশটির সীমানা যেখানে শেষ সেখানে থেকে এরপর শুধু পানি, অথৈ সমুদ্র যতোদূর চোখ যায়! আশির দশকের কথা, আমেরিকা আর রাশিয়ার মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধ তখন তুঙ্গে, নোয়াখালির প্রত্যন্ত অঞ্চল আমাদের গ্রামে বসেও আমি আমেরিকা আর রাশিয়ার নাম জানতাম! এবং কী করে যেনো আমার ধারণা হয়ে গিয়েছিলো আমেরিকা হচ্ছে পৃথিবীর শেষ সীমানায় অবস্থিত একটি দেশ, এরপর খালি দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি…

সেই পৃথিবীর শেষ সীমানার দেশ(!) আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো সবসময়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় এর পড়ালেখা শেষ করে আমেরিকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়এ উচ্চশিক্ষার জন্যে ভর্তির আবেদন করি। ভাগ্যক্রমে কয়েকটি থেকে অফারও পেয়ে যাই। এবং অবশেষে ২০০৬ সালে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে চলে আসি।

আমেরিকা বিশাল দেশ। এর পূর্ব দিকে আটলান্টিক আর পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগর। এ দুই মহাসাগর এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার মাইল কিংবা সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত আমেরিকা। উত্তর দক্ষিনেও প্রায় দেড় হাজার মাইল লম্বা এই দেশ। পূর্ব দিকে নিউ ইয়র্ক শহরে যখন সকাল নয়টা বাজে পশ্চিমের সিয়াটল শহর তখনো ঘুমিয়ে আছে ভোর ছয়টায়। আমি যে জায়গাটায় এসেছি তার নাম ওহাইও, শহরের নাম কলাম্বাস। ওহাইও স্টেইট ইউনিভার্সিটি আমেরিকার বৃহত্তম ইউনিভার্সিটি, পঞ্চাশ হাজার এর বেশি ছাত্রছাত্রী এখানে লেখাপড়া করে।

আমার প্রফেসর আমাকে নির্ধারিত সময়ের এক সেমিস্টার আগে গ্রীষ্মকালীন সেমেস্টারে নিয়ে এসে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের একটা ন্যাশনাল ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জীবনে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় পড়তে এসেছি, ঠিকমতো ইংরেজী বলতে পারিনা, এর মধ্যে প্রায় মরুভূমির মতো (পুরো ওয়াশিংটন এর ওই অংশটুকুই বৈচিত্র্যহীন মরুভূমির মতো) জায়গায় ওই ল্যাবটরিতে যেয়ে পড়লাম মহা ফাঁপরে। উঠলাম ওই ল্যাবের গেস্ট হাউজে। অফিস এর সময় চারদিকে অনেক মানুষ থাকে, কিন্তু বিকেল হয়ে গেলে একটা কাকপক্ষীও চোখে পড়েনা। নতুন বিদেশে এসেছি, গাড়ি কেনার প্রশ্নই ওঠেনা অথচ গাড়ি ছাড়া এককদম চলারও উপায় নাই। এখানে আসার আগে ইন্টারনেট ঘেঁটে এখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছিলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমার ল্যাবের পাশেই অবস্থিত ওয়াশিংটন স্টেইট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে একজন বাংলাদেশী অধ্যাপক এর নাম পেয়েছিলাম। ওনাকে ইমেইল করে এসেছিলাম আমি আসার আগে। তাই একদিন বিকেল বেলায় যখন উনি গাড়ি নিয়ে আমার গেস্ট হাউজের সামনে এসে হাজির হলেন তখন আমার মনে হলো স্রষ্টা আকাশ থেকে ফেরেশতা পাঠিয়েছেন! কয়েকদিন ভাত খেতে না পেরে আমার অবস্থা হালুয়া টাইট। উনি আমাকে ওনার বাসায় নিয়ে যেয়ে ঘরে রান্না করা তরকারী দিয়ে পেট ভরে খাইয়ে দিলেন। গরম গরুর মাংশের ঝোল দেখে আমার চোখ চকচক করে উঠেছিলো! এরপর উনি আমাকে প্রায়ই গাড়ি করে ওনার বাসায় নিয়ে যেতেন, মজার মজার খাবার খাওয়াতেন। গ্রোসারী স্টোরএ নিয়ে যেতেন। সেখানকার ছোটখাট বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। প্রায় মাস তিনেক ওই ল্যাবে কাটিয়ে ফিরে আসি বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যিকারের ক্লাস করার জন্যে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সেমিস্টারে একদিন অ্যালগরিদম ক্লাস থেকে বের হয়ে লিফটএ উঠেছি। আমার সাথে কয়েকটি ভারতীয় ছেলেমেয়েও ঢুকলো লিফটে। আমাকে অবাক করে দিয়ে দেখি ওরা বাংলায় কথা বলা শুরু করলো নিজেদের মধ্যে! আমি সাথে সাথেই ওদের জিজ্ঞেস করলাম – “তোমরা বাংগালী?” “হ্যাঁ, আমরা কোলকাতার” – ওদের উত্তর। এরপর আমি আমার পরিচয় দিলাম, বললাম আমি বাংলাদেশের ছেলে। সেই থেকে ওদের সাথে আমার বন্ধুত্ব। ঘটনাক্রমে ওরা আমার পাশের অ্যাপার্টমেন্টএ থাকতো, তাই ওদের সাথেই হতো আমার যাবতীয় ওঠাবসা।

আরেকদিন হাই পারফরমেন্স কম্পিউটিং ক্লাস থেকে বের হয়েছি, একটা ছেলে এসে জিজ্ঞেস করলো ওই ক্লাসের একটা টপিক আমার কাছে আছি কিনা। আমি জবাব দেওয়ার পর ও জিজ্ঞেস করলো “হয়ার আর ইউ ফ্রম?” আমি বললাম, “আই এম ফ্রম বাংলাদেশ”। আমাকে প্রচন্ড অবাক করে দিয়ে ও তখন বললো সেও বাংলাদেশের ছেলে! যদিও ও বড় হয়েছে আমেরিকায়, ওরা বাবা-মা বাংলাদেশের। কাকতাল আর কাকে বলে!

কলাম্বাস শহরে প্রায় হাজারখানেক বাংলাদেশীর বসবাস। আমেরিকার খুব কম শহরেই এতো ফ্রেন্ডলি এবং আন্তরিক মানুষ দেখেছি আমি। আমেরিকায় নতুন হিসেবে আমার যেসব সমস্যা হতে পারতো সেটি অনেক কম হয়েছে কলাম্বাস শহরের কিছু চমৎকার মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিক সাহায্যের কারণে।

আমেরিকায় সামারের (গ্রীষ্মকাল) সময়ে সাধারণত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ থাকে। ছাত্রছাত্রীরা তখন বিভিন্ন কম্পানীতে ইন্টার্নশীপ করার চেষ্টা করে থাকে। ভাগ্যক্রমে আমি মাইক্রোসফটএ একটা ইন্টার্ণশীপ পেয়ে যাই। মাইক্রোসফট এর প্রধান অফিস ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটলে অবস্থিত। তাই আমার দ্বিতীয় সামারও কাটে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে। ওয়াশিংটন অপূর্ব সুন্দর একটা জায়গা। আমি ইন্টার্ণশীপ করার জন্যে সিয়াটল যাচ্ছি এটা শুনে জাফর ইকবাল স্যার লিখেছিলেন – “ওয়াশিংটন আমেরিকার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা, ভালো করে ঘুরে ফিরে দেখো জায়গাটা। একটা ভালো ম্যাপ বই কিনে পাহাড়-পর্বত, বনভূমি সব ঘুরে দেখো”। জাফর ইকবাল স্যার আঠারো বছর আমেরিকায় ছিলেন, অতএব স্যারের কথা যে ভুল হবেনা সেটা আমি নিশ্চিত ছিলাম। ওয়াশিংটন এর সৌন্দর্য্য দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম! ঘরের কাছেই বরফে ঢাকা পর্বতমালা, চমৎকার সব পার্ক, মনমুগ্ধকর লেক, চারদিকে খালি সবুজ আর সবুজ!

ওয়াশিংটনে পা রাখার দু’একদিনের মধ্যেই ছুটলাম উইনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন এর উদ্দেশ্যে। জাফর ইকবাল স্যার এখান থেকেই পিএইচডি করেছেন কিনা! ক্যাম্পাসে হাঁটছি আর ভাবছিলাম এই ক্যাম্পাস দিয়ে আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে জাফর স্যার হেঁটেছিলেন! খুঁজে খুঁজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগটি বের করে সেখানে যেয়ে হাজির হলাম। জাফর স্যার এর সময়কার প্রফেসরদের বের করার চেষ্টা করলাম। একজনের অফিস রুমও খুঁজে পেলাম! ফটাফত কয়েকটি ছবিও তুলে নেওয়া হলো!

আমেরিকার মন্টানা আর ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের মাঝে অবস্থিত ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক। ওয়াশিংটন এর সিয়াটল শহর থেকে এটি প্রায় নয়’শ মাইল বা পনের’শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইন্টার্ণশীপের সময় আমি আর আমার স্ত্রী মিলে ইয়েলোস্টোন পার্ক দেখতে গেলাম। আশি থেকে নব্বই মাইল বেগে ড্রাইভ করার পরেও মন্টানার বোজম্যান শহরে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় ১২ ঘন্টা লেগে গেলো। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ একটানা ড্রাইভ করার রেকর্ড। পথে যদিও মাঝে মাঝে থেমেছিলাম। বোজম্যানে আমাদের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন পিএইচডি স্টুডেন্ট ছিলেন। বোজম্যান পৌঁছার পরদিন সকালবেলা আমাদের পাঁচজনের দল নিয়ে বের হয়ে পড়লাম ইয়েলোস্টোন পার্ক এর উদ্দেশ্যে। বোজম্যান থেকে এটি প্রায় এক/দেড় ঘন্টার রাস্তা। বোজম্যান থেকে ইয়েলোস্টোন যাওয়ার রাস্তাটা খুবই সুন্দর। আমরা পথে একটা সুন্দর লেক এর পাড়ে থেমে ছবি তুললাম বেশ কিছু। এরপর পার্কে ঢুকে আমি রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। একটা জায়গা কি করে এতো সুন্দর হতে পারে আমার মাথা ঢুকে না। বিখ্যাত ওল্ড ফেইথফুল গেইসার বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো প্রতি আশি-নব্বই মিনিট পরপর প্রায় দেড়শ ফুট উপরে ছুঁড়ে মারছে ভূগর্ভস্ত পানি। এর সামনে গেলেই দেখা যাবে পরবর্তী কখন এটি ফুঁসে উঠবে সেটা লেখা আছে। একটা জায়গায় যেয়ে দেখলাম পানির বিচিত্র সব রঙ। নিজের চোখে না দেখলে সেটি বিশ্বাস করা কষ্টকর, পানি আর মাটির যে এতো বিচিত্র রঙ হতে পারে সেটা এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার!

ইয়েলোস্টোন পার্কে আছে অপরুপ সুন্দর ইয়েলোস্টোন লেক। আমার জীবনে আমি এতো স্বচ্ছ পানির জলাধার দেখিনি কখনো। লেক এর পেছনে দিগন্ত বিস্তৃত বরফে মোড়া পর্বতমালা। সে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য! লেক এর পাড়ে যেয়ে আমার শুধু মনে হচ্ছিলো “আহা, এখানে বসে যদি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতাম”!

ভাগ্যের পরিক্রমায় পড়ালেখা শেষ করার পর আমার জীবনের প্রথম চাকুরীটি পাই ওয়াশিংটন এর একটি কম্পানীতে। সুযোগ পাই জাফর স্যার এর কথামতো জায়গাটা ভালো করে ঘুরে ফিরে দেখার! ওয়াশিংটন এর বিভিন্ন জায়গা নিয়ে লিখতে গেলে অনেকগুলো লেখা লিখতে হবে। সেটা আগামী পর্বগুলোর জন্যে তোলা থাকলো।

লাইফ ইজ এ গেইম অফ ইঞ্চেস

১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া “এনি গিভেন সানডে” তে আল পাচিনো একটা ফুটবল দলের কোচ এর চরিত্রে অভিনয় করেন। ফাইনাল খেলার আগে কোচ হিসেবে তিনি একটি অসাধারণ বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতাটি যেকোনো প্রতিযোগিতার জন্যে প্রচন্ড অনুপ্রেরণামূলক। হয়তো আমাদের ক্রিকেট দলকে এই বক্তৃতার ভিডিওটি দেখানো উচিৎ!
মূল ইংরেজীটি পাওয়া যাবে এখানে
ইউটিউব ভিডিওঃ

ইউটিউবে ভিডিওটি দেখলে বুঝা যাবে তাঁর এক বক্তৃতায় খেলোয়াড়রা কিভাবে জেতার জন্যে পাগল হয়ে উঠে!

=============================

আমি আসলেই জানিনা কী বলবো।
আর মাত্র তিন মিনিট পরেই আমাদের খেলোয়াড় জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শুরু হচ্ছে।
হয় আমরা সবাই টিম হিসেবে জয়ী হবো, অথবা প্রতিপক্ষ আমাদের ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে –
ইঞ্চি ইঞ্চি করে, কৌশলের মাধ্যমে ওরা আমাদের ধূলোয় মিশিয়ে দিবে।
বিশ্বাস করো, আমরা এই মুহুর্তে একটা নরকে আছি।
এখন আমরা প্রতিপক্ষের মার খেয়ে খেয়ে এই নরকে আটকা পড়ে থাকতে পারি, অথবা –
আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারি।
একটু একটু করে, ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে যেয়ে।

এখন কথা হচ্ছে, আমি তোমাদের জন্যে এই যুদ্ধটা করে দিতে পারবো না।
আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে।
চারদিকে তাকিয়ে এতো তরুণ বয়সীদের দেখে আমি বুঝতে পারি আমি জীবনে কতো ভুল করেছি –
আমি আমার সব টাকাকড়ি নষ্ট করেছি এবং আপনজনদের দূরে ঠেলে দিয়েছি।
এবং ইদানিং আয়নার সামনে দাঁড়ালে যে মানুষটিকে আমি দেখতে পাই তাকে কেনো যেনো সহ্য করতে পারিনা।
আসলে যখন তুমি বুড়ো হতে শুরু করো তখন তোমার জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যায়।
কিন্তু বুড়ো হবার আগে এই জিনিসটা তেমন চোখে পড়েনা।

একসময় তুমি বুঝতে পারো জীবনটা হচ্ছে একটা ইঞ্চির খেলা।
এবং ফুটবলও তাই।
কারণ, ফুটবল কিংবা জীবন, দুটোতেই ভুল করার সুযোগ খুবই কম।
ফুটবলে তুমি বলের কাছে আধা কদম আগে বা পরে আসলে বলটা মিস করে ফেলো।
আধা সেকেন্ড আগে বা পরে পৌঁছালে প্রতিপক্ষের পায়ে চলে যায় তোমার বল।
এই যে একটুর জন্যে, এক বা আধা ইঞ্চির জন্যে হেরে যাওয়া, এটা জীবনের সবক্ষেত্রে সত্যি।
পুরো খেলাজুড়ে, প্রতিটি সেকেন্ড জুড়ে এই ইঞ্চির ব্যাপারে তোমাকে সচেতন থাকতে হবে।

আজকের এই খেলায়, আমরা আমাদের টিম নিয়ে এই এক ইঞ্চির জন্যে যুদ্ধ করবো।
এই ইঞ্চির জন্যে আমরা আমাদের প্রতিপক্ষকে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলবো।
আমরা আমাদের হাতের থাবা এবং বজ্রমুষ্টি শক্ত করে সেই ইঞ্চি ছিনিয়ে নেবো।
কারণ আমরা জানি – এই ইঞ্চিগুলোর সমষ্টিই নির্ধারণ করবে জয় পরাজয়।
এই ইঞ্চিগুলোই নির্ধারণ করবে কে বাঁচবে কে মরবে।

শুনো –
যেকোনো যুদ্ধে এই ইঞ্চি সেই পাবে যে এটা পাওয়ার জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত।
এবং আমি জানি, আমি বেঁচে থাকতে চাই এই জন্যে যে আমি সেই ইঞ্চির জন্যে যুদ্ধ করতে এবং জীবন দিতে প্রস্তুত।
কারণ এটাকেই বলে সত্যিকারের বেঁচে থাকা।

কথা হচ্ছে, আমি তোমাদের জোর করে এই যুদ্ধ করাতে পারবো না।
তোমাকে তোমার চারদিকে তাকাতে হবে।
তোমার টিমমেটদের চোখের মধ্যে যুদ্ধে জয়ী হবার আগুন দেখতে হবে।
আর এটা তখুনি দেখবা যখন তোমার টিমমেটরা তোমার মধ্যে সেই আগুন দেখতে পায়।
এবং এটাকেই বলে সত্যিকারের টিম।
অতএব, আমরা হয় একটা টিম হিসেবে আজকের খেলায় জয়ী হবো, অথবা –
আমরা প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে পরাজয়ের লজ্জায় ডুবে মরবো।
আর এটাই হচ্ছে ফুটবল।

এখন বলো – তোমরা কী জয়ের জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত?

বোধ – জীবনের নতুন মানে

কিছুদিন আগে একটা ওয়েব সাইটে চমৎকার একটা লেখা পড়েছিলাম। লেখাটা ভালো লেগে যাওয়ায় ভাবলাম অনুবাদ করে ফেলি। যথারীতি অনুবাদটায় লেখাটির মূল ভাব পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা যায়নি। তারপরও যদি এটা পড়ে কেউ উপকৃত হন ভেবে অনুবাদটা করে ফেললাম!

মূল ইংরেজীটি পাওয়া যাবে এখানে

===========================================

জীবনে একটা সময় আসে যখন তোমার সত্যিকারের একটা বোধ জন্ম নেয়, যখন তুমি জীবনকে সত্যিকারভাবে বুঝতে পারো। তীব্র হতাশা আর দুঃখের একটা পর্যায়ে একসময় তোমার ভেতরের “আমি” জেগে ওঠে এবং চিৎকার দিয়ে বলে – যথেষ্ট হয়েছে! নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করতে করতে একসময় তুমি শান্ত হয়ে আসো, তোমার কান্না থেমে যায়, তুমি আয়নায় তোমাকে দেখো, তুমি জানালা খুলে বাইরের আকাশটাকে দেখো। আর তখন আস্তে আস্তে তুমি জীবনকে আবিষ্কার করো একটু অন্যরকমভাবে, পৃথিবীটাকে দেখো একটু অন্য চোখে।

এটা হচ্ছে তোমার নতুন জীবন বোধঃ

তুমি বুঝতে পারো তোমার চারপাশের সবকিছু বদলে যেয়ে তোমার সব আশা আর স্বপ্নগুলি সত্যি করে দিবে এটা কখনোই হবার নয়। তুমি যে সুখ, শান্তি, আর নিরাপত্তা চাচ্ছো সেটা এমনি এমনি তোমার কাছে ছুটে আসবেনা। তুমি মেনে নিতে শেখো যে তুমি কোন রাজপুত্র কিংবা রাজকন্যা না এবং বাস্তব জীবনে “দি এন্ড” সবসময় সুখকর হয়না। “অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বাস করিতে লাগিলো” এই ব্যাপারটা শুরু করতে হবে তোমার নিজের কাজের মাধ্যমে এবং এটা মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই শান্তি ও সুখ আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তুমি আনুধাবন করতে পারো যে তুমি নিজে পারফেক্ট না এবং সবাই সবসময় তোমাকে পছন্দ নাও করতে পারে, তোমার সব কাজে খুশি নাও হতে পারে – এবং এতে দোষের কিছু নেই। সবার নিজস্ব দৃষ্টিকোন এবং মতামত থাকতে পারে। তখন তুমি নিজের অবস্থানকে শক্ত করার জন্য, নিজেকে আরো পরিপূর্ণ করার জন্য কাজ শুরু করো। এভাবে তোমার মধ্যে তৈরি হয় এক নতুন আত্মবিশ্বাস।

অন্যরা তোমার জন্য কী করলো কিংবা কী করে নাই সেটা নিয়ে তুমি অভিযোগ অনুযোগ করা বন্ধ করো। এবং তুমি বুঝতে পারো জীবনে অনিশ্চয়তার উপর ভর করেই তোমার এগিয়ে যেতে হবে। তুমি আবিষ্কার করো যে মানুষ সবসময় যা বুঝাতে চায় তা বলেনা এবং যা বলে তা বুঝাতে চায়না এবং তোমার প্রয়োজনের সময় সবাই তোমার পাশে নাও থাকতে পারে। সবার নিজের জীবনে ব্যস্ত থাকার অনেক জিনিস আছে, অতএব তোমাকে নিজের উপর নির্ভর করা শিখতে হবে। আর স্বনির্ভর হওয়ার মাধ্যমে তোমার নিজের জীবনে নিরাপত্তাবোধ আসবে।

তুমি মানুষের দিকে আঙ্গুল তাক করা বন্ধ করো এবং তাদের দুর্বলতা ও ভুলত্রুটি মেনে নিতে শেখো। আর এভাবে মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করার মাধ্যমে তোমার মনে একধরণের প্রশান্তি জন্ম নেয়।

তুমি বুঝতে পারো যে তুমি নিজেকে এবং তোমার চারপাশের পৃথিবীকে যেভাবে মূল্যায়ন করো সেটা এসেছে তোমার মনের মধ্যে চারপাশ থেকে ঢুকানো অসংখ্য তথ্য ও তত্ত্বের মাধ্যমে। তুমি তখন তোমার মগজে ঢুকানো এইসব হাজার হাজার তথ্য ও তত্ত্বের যাচাই বাছাই করতে থাকো। তোমার নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন, তোমার কী পরা উচিৎ কী পরা উচিৎ না, তোমার কী ভালো লাগে কী ভালো লাগেনা, তোমার কী বিশ্বাস করা উচিৎ কী বিশ্বাস করা উচিৎ না, তুমি কোথায় থাকবা কোথায় থাকবানা, কী পেশা হবে তোমার, কাকে বিয়ে করবে, বাব-মা কিংবা সন্তানের সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন হবে – এই সবকিছু নিয়ে তুমি নতুন করে ভাবতে বসো। তুমি তোমার চিন্তাভাবনার বদ্ধ পৃথিবীকে খুলে দাও এবং নতুন ধরণের, ভিন্ন ধরণের দৃষ্টিকোন এবং মতামতকে গুরুত্ম দিতে শেখো। তুমি জীবনের মানেকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করো।

জীবনে তোমার কী লাগবে এবং তুমি কী চাও এটা তুমি আরো ভালোভাবে বুঝতে পারো, এবং পুরনো, ভুল বিশ্বাস এবং তত্ত্ব থেকে তুমি বের হয়ে আসো। আর এভাবেই তুমি অন্যের মতামত ও কন্ঠ থেকে বের হয়ে এসে তোমার সত্যিকারের সত্ত্বার কথা শুনো।

তুমি শেখো যে দানের মধ্যে বড় প্রাপ্তি থাকে এবং সৃজনশীলতা এবং অন্যদের সাহায্য করা একটা চমৎকার মর্যাদাকর ব্যাপার।

তুমি শেখো যে সততা এবং সত্যবাদিতা পুরনো যুগের নীতিকথা নয় শুধু। জীবনের মূল ভিত্তি হতে হবে সততা এবং সত্যবাদিতা।

তুমি বুঝতে শেখো যে সবকিছু তোমাকে জানতে হবে এমন কোনো কথা নেই; পৃথিবীকে বাঁচানো তোমার একার দায়িত্ব নয়, এবং গাধা পিটিয়ে মানুষ করাও তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি দোষ এবং দায়িত্ব এর মধ্যে পার্থক্য করতে শেখো, বিভিন্ন জিনিসের সীমারেখা টানতে শেখো, এবং অন্যকে প্রয়োজনে “না” বলতে শেখো।

এরপর তুমি ভালোবাসা সম্পর্কে জানতে পারো – রোমান্টিক ভালোবাসা এবং পারিবারিক ভালোবাসা। তুমি শেখো কতোটুকু ভালোবাসা উচিৎ, কতোটুকু স্যাক্রিফাইস করা উচিৎ, কখন স্যাক্রিফাইস বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ, কখন ভালোবাসাবাসি বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ।

তুমি সম্পর্ককে যেমন আছে তেমনই দেখতে শেখো, কল্পনায় তুমি কী চাও তেমনভাবে নয়। তুমি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ না করা শেখো। তুমি শেখো যে মানুষ সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়, তাদের ভালোবাসাও কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। তুমি তোমার মতো করে, শুধু মাত্র নিজেকে সুখী করার জন্যে নিজের মতো করে ভালোবাসা দাবী করতে পারোনা।

তুমি বুঝতে শেখো নির্জনতা মানেই একাকীত্বতা নয়। আয়নার দিকে তাকিয়ে তুমি অনুধাবন করো তুমি কখনোই তোমার মনমতো সুন্দর হতে পারবেনা; অতএব তুমি তোমার মাথার ভেতরে থাকা তোমার মডেল চেহারাটি সরিয়ে ফেলো।

তুমি তোমার শরীরের মূল্য বুঝতে শেখো। তুমি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে শুরু করো, ব্যায়াম করা শুরু করো। তুমি বুঝতে শেখো যে ক্লান্তি আমাদের প্রানশক্তি কমিয়ে দেয় এবং আমাদের মনে দূর্বলতা এবং ভয় ঢুকিয়ে দেয়। অতএব তুমি প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেয়া শুরু করো। খাবার যেমন শরীরকে চালু রাখে, হাসি তেমনি আত্মাকে চালু রাখে। তাই তুমি আরো বেশি বেশি হাসো এবং খেলাধুলা করো।

তুমি বুঝো যে নিজেকে যতোটা যোগ্য মনে করো ঠিক ততোটাই তুমি পাও। জীবনে পরিশ্রম না করলে কিছু পাওয়া যায়না, অতএব তুমি চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য বোঝ এবং চাওয়াগুলিকে পাওয়ার জন্যে সত্যিকারের পরিশ্রম করো। সফলতার জন্যে সঠিক লক্ষ্য ঠিক করে কাজ করে যেতে হয় এবং দরকার হলে অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া যায়।

তুমি জানতে পারো পৃথিবীতে যদি কিছুকে ভয় করতে হয় সেটা হবে ভয়কে। যে মুহুর্তে তুমি কোনো কিছুকে ভয় পাওয়া শুরু করবে সেই মুহুর্তে আসলে তুমি নিজের মতো করে বেঁচে থাকার সুযোগ হারাচ্ছো। তোমাকে ভাবতে হবে যে যাই ঘটুকনা কেনো তুমি এটা সামলে নিতে পারবে এবং তুমি যা সিদ্ধান্ত নিবে তোমার জীবনে তাই ঘটবে।

তুমি জীবনে যুদ্ধ করতে এবং জীবনটাকে দুশ্চিন্তা এবং ভয় এর মধ্য দিয়ে পার না করে দিতে শেখো। তুমি মেনে নিতে শেখো যে জীবন সবসময় ফেয়ার না এবং মাঝে মাঝেই সবচেয়ে ভালো মানুষগুলোকে অনেক দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর জন্যে তুমি ভাবো না যে ঈশ্বর তোমাকে শাস্তি দিচ্ছে অথবা তিনি তোমার প্রার্থনা শুনছেন না। এই ঘটনাগুলো জীবনেরই অংশ।

তুমি এ জীবনের ছোটখাট সুখগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞ হতে শেখো। তোমার জন্ম আফ্রিকার কোনো যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বা দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশে হয়নি এটা ভেবে তুমি শান্তি পাও। ধীরে ধীরে তুমি নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নেয়া শুরু করো। তুমি কান পেতে তোমার মনের কথা শুনো এবং মন যা চায় তাই পাবার জন্যে পরিশ্রম করতে শুরু করো। তুমি জানালা খুলে বুক ভরে শ্বাস নাও এবং মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলো। তুমি জীবনকে নতুন করে শুরু করার প্রস্তুতি নাও এবং সবসময় পজিটিভ চিন্তাভাবনা করার সিদ্ধান্ত নাও।

“সান্সক্রীন ব্যবহার করুন” – একটি চমৎকার মোটিভেশনমূলক ভিডিও

মেরি শ্মিক (Mary Schmich) ছিলেন একজন কলামিস্ট। ১৯৯৭ সালে তিনি শিকাগো ট্রিবিউনএ “উপদেশ তারুণ্যের মতোই তরুণদের কাছে অপচয় হয়েছে” নামে একটি বিখ্যাত কলাম লিখেন। এই কলামটি পরে “সানস্ক্রিন ব্যবহার করো ” নামে ব্যাপক পরিচিত পায়। কলামটির পরিচিতি পর্বে মেরি শ্মিক লিখেছিলেন যে তাকে যদি কখনো কেউ সমাবর্তন বক্তৃতা দিতে বলতেন তাহলে তিনি তার এই কলামটি বক্তৃতা আকারে দিতেন। কলামটি প্রকাশিত হবার পরপরই এটা ইন্টারনেট এর মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এবং এটা প্রচারিত হয়ে পড়ে যে কেউ একজন ১৯৯৭ সালের এমাআইটি (MIT) এর সমাবর্তনে এই বক্তৃতাটি দেন। আসলে এটা ছিলো একটা ভুল প্রচারণা, ওই বছর এমআইটি এর সমাবর্তন বক্তা ছিলেন তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান।

আমি বক্তৃতাটি প্রথম দেখি ইউটিউবে। ভিডিওটি দেখেই আমার প্রচন্ড ভালো লেগে যায়। জীবন নিয়ে এতো উৎসাহমূলক বক্তৃতা আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি/শুনেছি। ইংরেজী থেকে অনুবাদ করার সময় প্রায় সবসময়ই ভাবটা অনেকটাই হারিয়ে যায়, কিংবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকার কারণে আমাদের দেশের সাথে অনেক কিছুই মিলেনা, তবু মূল কথাগুলি এতো চমৎকার যে ভাবলাম অনুবাদটা করেই ফেলিঃ

১৯৯৭ সালে পাশ করা ছাত্রছাত্রীগণঃ

সানস্ক্রিন ব্যবহার করো।

সানস্ক্রিনের দীর্ঘমেয়াদী উপকারীতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা প্রায় নিশ্চিত, কিন্তু আমি যে উপদেশ দিতে যাচ্ছি সেটি আমার জীবন চলার পথে অর্জন করা
অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই না।

এখন আমি আমার উপদেশগুলো দিবো।

তারুণ্যের শক্তি এবং সৌন্দর্য্যকে পুরোপুরি উপভোগ করো। তারুণ্যের শক্তি আর সৌন্দর্য্যের মূল্য তোমাদের পরিণত বয়স হবার আগে বুঝবেনা। কিন্তু বিশ্বাস করো, আজ থেকে বিশ বছর পর যখন তোমার আজকের ছবির দিকে ফিরে তাকাবা তখন মনে হবে কী প্রচন্ড সম্ভাবনা ছিলো তোমার মধ্যে, কী চমৎকার ছিলো তোমার চেহারা। তুমি নিজেকে যতোটা মোটা ভাবো আসলে তুমি ততোটা মোটা না।

ভবিষ্যতের কথা ভেবে খুব বেশি দুশ্চিন্তা কোরোনা। আর দুশ্চিন্তা আসলে মনে রাখবে দুশ্চিন্তা হচ্ছে চুইংগাম চিবুতে চিবুতে বীজগণিতের অংক সমাধান করার মতো। জীবনের সত্যিকারের বড় সমস্যাগুলো কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে আসেনা, ওগুলো যখন আসে তখন তোমার দুশ্চিন্তা করার সুযোগই থাকবেনা!

প্রতিদিন একটা করে কাজ করো যেটা তোমাকে ভয় পাইয়ে দেয়।

গান গাও।

মানুষের মন নিয়ে খেলা কোরোনা, এবং যারা তোমার মন নিয়ে খেলে তাদের সংস্পর্শে থেকোনা।

দাঁতের যত্ন নিও।

অন্যের সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের সময় নষ্ট কোরো না। জীবনে কখনো তুমি এগিয়ে থাকবে, কখনো পিছিয়েঃ দিনের শেষে প্রতিযোগিতা আসলে নিজের সাথেই!

প্রশংসাগুলোর কথা মনে রেখো, অপমানের কথা ভুলে যেও। আর এটা সত্যি সত্যি করতে পারলে আমাকে জানিও কিভাবে করলে।

পুরনো প্রেমপত্রগুলো রেখে দিও। পুরনো ব্যাংক স্টেটমেন্টগুলো ফেলে দিও।

নিয়মিত ব্যায়াম কোরো।

জীবনে কী করতে চাও সেটা এখনো না জানলেও কোনো চিন্তা কোরোনা। আমার দেখা সবচেয়ে চমৎকার মানুষগুলোর অনেকেই তোমাদের বয়সে

জানতোনা তারা তাদের জীবন নিয়ে কী করতে চায়। এমনকি অনেক চমৎকার মানুষ যাদের বয়স চল্লিশ হয়ে গিয়েছে তারাও জানেনা জীবনে তারা কী করতে চায়।

বেশি করে ক্যালসিয়াম খেও। হাঁটুর প্রতি যত্ন নিও। না হলে বয়সকালে ওগুলো অনেক ভোগাবে।

একদিন হয়তো তুমি বিয়ে করবে, হয়তো করবেনা। হয়তো একদিন তোমার সন্তান হবে, কিংবা হয়তো কোনোদিন তোমার সন্তান হবেনা। হয়তো চল্লিশ বছর বয়সে তোমার ডিভোর্স হয়ে যাবে, কিংবা হয়তো একদিন তুমি তোমার পঁচাত্তরতম বিয়ে বার্ষিকী পালন করবে। যাওই করোনা কেন, নিজেকে খুব বেশি অভিনন্দিত কোরোনা, কিংবা ছোটও কোরোনা। তোমার জীবনের প্রায় সব সিদ্ধান্তই ৫০/৫০ সম্ভাবনার মাধ্যমে নেওয়া। অনেকগুলো সম্ভাব্য ঘটনার মধ্যে অন্য ঘটনাগুলিও তোমার জীবনে ঘটতে পারতো। এবং এটা সবার জন্যই সত্যি।

নিজের শরীরকে উপভোগ কোরো। যতোরকমভাবে সম্ভব ব্যবহার কোরো নিজের শরীরকে। অন্যরা কী ভাববে বা বলবে এটা নিয়ে ভেবোনা। তোমার শরীর হচ্ছে পৃথিবীতে তোমার প্রতি দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।

নাচো। যদি কোথাও নাচার সুযোগ না পাও তাহলে নিজের ড্রয়িং রুমে কিংবা বেডরুমে একা একা নাচো।

সৌন্দর্য্য ম্যাগাজিন পড়ার দরকার নাই। ওগুলো পড়লে নিজের চেহারাকে কুৎসিত মনে হবে, যেটা কখনোই সত্যি নয়।

বাবা-মা’র সাথে ভালো যোগাযোগ রেখো। তুমি জানতেও পারবেনা ওরা কখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। তোমার ভাই-বোনদের সাথে চমৎকার
সম্পর্ক রেখো। ওরা তোমার অতীতের সাথে তোমার সবচেয়ে বড় যোগসূত্র, এবং তোমার ভবিষ্যতে ওরাই তোমার সবচেয়ে কাছে থাকবে।

জীবনে অনেক বন্ধু হবে এবং হারিয়েও যাবে, কিন্তু কয়েকজন খুব কাছের বন্ধুর সাথে তোমার সবসময় একটা ভালো সম্পর্ক রাখা উচিৎ। ভৌগলিক
কিংবা সামাজিক দূরত্ব ঘুচিয়ে বন্ধুদের কাছে থেকো, কারণ তোমার যতোই বয়স হবে, ততোই তোমার চিরপরিচিত মানুষগুলোকে তোমার কাছে দেখতে মন চাইবে।

একবারের জন্য হলেও নিউ ইয়র্ক শহরে থেকো। কিন্তু এই শহর তোমার মনকে কঠিন করে দেওয়ার আগেই অন্য কোথাও চলে যেও। উত্তর
ক্যালিফোর্নিয়ায় থেকো একবার। কিন্তু তোমার মন খুব নরম হয়ে পড়ার আগেই সরে পড়ো।

নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণ কোরো।

কিছু সত্যকে চিরন্তন বলে জেনোঃ দ্রব্যমূল্য সবসময় বাড়বে; রাজনীতিবিদরা সবসময় নারীসং পছন্দ করবে; তুমিও একদিন বুড়ো হবে। এবং যখন তুমি বুড়ো হবে তখন তুমি অতীতের কথা ভেবে নস্টালজিক হবে এবং ভাববেঃ দ্রব্যমূল্য অনেক কম ছিলো; রাজনীতিবিদরা ছিলেন অনেক মহান; এবং ছোটরা বড়দের অনেক সম্মান করতো।

বড়দের সম্মান কোরো।

অন্য কেই তোমার জীবনধারণের ব্যয় বহন করবে এটা আশা কোরোনা। হয়তো তোমার জমানো টাকা আছে, কিংবা হয়তো তোমার স্বামী বা স্ত্রী
অনেক ধনী। কিন্তু এগুলো যেকোনো সময় শেষ হয়ে যেতে পারে।

চুল নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি কোরোনা। পরে দেখা যাবে চুল পড়ে চল্লিশ বছর বয়সেই তোমাকে পঁচাশির মতো লাগছে।

কার উপদেশ গ্রহণ করছো সেটা নিয়ে সজাগ থেকো। কিন্তু যারা উপদেশ দিতে আসেন তাদের ব্যাপারে ধৈর্যশীল থেকো। উপদেশ এক ধরণের
নস্টালজিয়া। আর অন্যকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে আসলে অতীতকে ধুয়ে মুছে, রংচং দিয়ে, ভুল অংশ বাদ দিয়ে, চকমকে করে এর প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যের হিসেবে চালিয়ে দেওয়া।

কিন্তু সানস্ক্রিন এর ব্যাপারটায় আমাকে বিশ্বাস কোরো!

প্রাণ

“জীবন পরিমাপ করা হয় এর তীব্রতা দিয়ে, দৈর্ঘ্য দিয়ে নয়”

দুখী স্বদেশঃ

আমরা সবাই জানি বাংলাদেশ কেনো উন্নত নয়, ধনী নয়।

এটা আমেরিকার ষড়যন্ত্র। ভারতের ষড়যন্ত্র। ইসরায়েলী জায়নিস্টদের ষড়যন্ত্র, যারা কোনো মুসলিম দেশকে উপরে উঠতে দিবেনা। আমাদের সব দুঃখ কষ্ট শুরু হয়েছে যেদিন বৃটিশরা আমাদের দেশ দখল করেছিলো। আমাদের ছিলো গোলাভরা ধান, দীঘিভরা মাছ, বৃটিশরা এসে সব নিয়ে গেছে বিলেতে। বৃটিশরা রেখে গেছে কেরাণী বানানোর শিক্ষা ব্যবস্থা যাতে আমরা আর কখনো উপরে উঠতে না পারি। পুঁজিবাদী সামন্তবাদী শক্তিগুলো আমাদের কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে দিবেনা।

আমাদের দেশ এতো অসুখী কারণ আমরা ইসলামকে ঠিকভাবে মানিনা। একমাত্র সত্যিকারের ইসলামী শাসন-ব্যবস্থাই পারে আমাদের একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে। একটি ইসলামী দেশে সব ধর্মের মানুষের অধিকার রক্ষা হবে চমৎকারভাবে। সৌদি আরব, পাকিস্তান, কিংবা আফগানিস্তানের তালেবান, কেউই সত্যিকারের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চালু করে নাই। আমাদের সেই সত্যিকারের আসল ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেখানে পরকালের অনন্ত জীবন হবে আমাদের সকল কর্মকান্ডের মূল লক্ষ ও উদ্দেশ্য।

আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা আসলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙ্গন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের দেশের মতো আর কোথাও নেই। এগুলো না থাকলে আমরা নিশ্চই আরো এগিয়ে যেতে পারতাম। এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমাদের বিশাল শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়, যেটা অন্যথায় আমরা আমাদের উন্নতির কাজে লাগাতে পারতাম।

কিংবা হয়তো আমাদের মূল সমস্যা অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ। এতোটুকুন একটা দেশে এতো মানুষের দরকারী খাদ্য এবং জীবন ধারণের রসদ যোগাতে সমস্যা তো হবেই। আমরা যে বেঁচে আছি এটাই কি কম না?

আমাদের সমস্যা আসলে দেশপ্রেমের অভাব। বিশেষ করে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের। আমাদের রাজনীতিবিদরা, সামরিক-বেসামরিক আমলারা, শীর্ষ ব্যবসায়ীরা, সুশীল সমাজ আর পা-চাটা বুদ্ধিজীবিরা যদি দেশের প্রতি আরো মমতাময়ী হতো তাহলে নিশ্চয়ই দেশটা এতোদিনে অনেক বদলে যেতো! তার খালি নিজেদের দিকটাই দেখেন, দেশের সাধারণ মানুষের দিকটা দেখেননা। এদের সীমাহীন দুর্নীতি আর অসততা আমাদেরকে দিন দিন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দেশটা জলে যাচ্ছে আসলে জঙ্গীবাদ আর রাজাকারদের কারণে কারণে। জঙ্গী, কাঠমোল্লারা দেশটাকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনাকে প্রতিরোধ করতে পারলে দেশটা হয়ে উঠতো অনেক সুখী আর সমৃদ্ধশালী। দেশটাকে উন্নত করতে হলে জঙ্গীবাদের এর এই অন্ধকার টানেল থেকে বের হতে হবে আমাদের।

প্রাণঃ

আমার মনে হয় আমাদের মূল সমস্যা অন্য কোথাও। আমাদের মূল সমস্যা আমাদের প্রাণ এর অভাব। “প্রাণ” শব্দটা এখানে কতোটুকু যথার্থ আমি জানিনা, কিন্তু ইংরেজীতে একে বলে যায় “স্পিরিট”, কিংবা “স্ট্যামিনা”, কিংবা “এনার্জি”। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য দরকার অদম্য প্রাণশক্তি, জীবনের প্রতি দরকার সীমাহীন ভালোবাসা।

প্রাণ এর সাথে চলে আসে কয়েকটি জিনিস। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে আনন্দ উপভোগ করা। আমরা যে কতোটা প্রাণহীন জাতি এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে আমাদের দেশে “উপভোগ” কিংবা ইংরেজীতে “enjoy” শব্দটিকে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হয়না। কেউ যদি তার জীবন “enjoy” করে তাহলে তাকে কেমন যেন বাঁকা চোখে দেখা হয় আমাদের দেশে। অবধারিতভাবে “উপভোগ” শব্দটাকে শারীরিক সুখের বাইরে ভেবে অভ্যস্ত নই আমরা। জীবনকে কতোরকম করে উপভোগ করা যায়, জীবনে কতো রকমের আনন্দ করা যায়। পশ্চিমের মানুষেরা কতোভাবে তাদের জীবন উপভোগ করে, জীবনে কতো রকম আরাম আয়েশের আয়োজন করে রাখে। আমরা ওদের মতো জীবন উপভোগ করিনা এর মানে এই নয় যে আগামী একশ বছর আমাদের এভাবে থাকতে হবে। আমাদেরকে জীবনটাকে উপভোগ করা শিখতে হবে। বিদেশের মাটিতে “have fun” কথাটা উঠতে বসতে ব্যবহার করা হয়। খাঁটি বাংলায় যার মানে “মজা করো, আনন্দ করো”। আমাদের রক্তে এই “মজা করা” ব্যাপারটি তেমন তীব্রভাবে নেই। প্রতিদিন এর কাজে, শপিংএ, বাসায়, রাস্তাঘাটে, গাড়িতে, সব কাজে যে মজা করা যায় এই ধারণাটাই আমাদের নাই। আমি এটা বলতে চাচ্ছিনা যে মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট নেই কিংবা উন্নত দেশের মানুষেরা দিনরাত শুধু মজাই করে। আমি বলতে চাচ্ছি জীবনকে উপভোগ করা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা খুবই সীমিত। আমাদের কাছে জীবনকে উপভোগ করা একটা ভালো চাকুরী এবং সন্তান লালন করার জন্য যথেষ্ট টাকা উপার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

যেহেতু আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ হয় একটা ভালো চাকুরী এবং ব্যাংকে কিছু টাকা, তাই এটা অর্জন করার পর আমাদের জীবনটা মোটামুটি থেমে যায়। আমাদের স্বপ্নের দৌড় ওই পর্যন্তই। একটা চমৎকার জীবন যাপন করা, স্ত্রী কিংবা প্রেমিকাকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড কিংবা নিদেনপক্ষে কাছের সিংগাপুর-মালেয়শিয়া ঘুরে আসা (সাধারণত ছেলেরাই এটা করে দেখে এভাবে লিখেছি), একটা ভালো গাড়ী আর একটা ভালো বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কেনা, সপ্তাহান্তের ছুটিতে নিজের গাড়িতে করে কক্সবাজার কিংবা নেপাল ঘুরে আসা – এসবই আমাদের কাছে রাতের স্বপ্ন, দিনেও এই স্বপ্ন দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই। আর এই স্বপ্নের দৈন্যতা সৃষ্টি করে আমাদের চেষ্টার দৈন্যতা। আমরা ভাবি শুধুমাত্র যাদের বাবার কিংবা মামার কিংবা চাচার টাকা আছে শুধু তারাই উপভোগ করবে এই পৃথিবীটা আর আমরা বাকীরা শুধু একটা ভালো চাকুরী আর ব্যাংকে লাখখানেক টাকা নিয়ে জীবনটা পার করে দিবে। এটা ভুল। বড় ভুল।

এই পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষ সমানভাবে সমান অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়। এটা ঠিক, ভালো পরিবেশে এবং/অথবা ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া সন্তানেরা অনেক বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে জীবন চলার পথে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাকীরা সারা জীবন পিছিয়ে থাকবে। কিন্তু সে জন্য সবার আগে স্বপ্ন দেখতে হবে। ঠুনকো প্রাণ নিয়ে জীবনে কিছু অর্জন করা যায়না। আমাদের প্রাণে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আমরা হয়তো টিউশনি করে জীবন চালাচ্ছি, কিংবা হয়তো একটা ছোট চাকুরী করে সংসার চালাচ্ছি – কিন্তু এটাকে আমাদের নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়ার কোনো মানে নাই। আমাদের ক্রমাগত চেষ্টা করে যেতে হবে আরো ভালো এবং উপভোগ্য একটা জীবন পাওয়ার জন্য। আমেরিকাতে কতো সাধারণ মানের ভারতীয় এবং চাইনিজ ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করতে চলে আসে। পড়ালেখা শেষ করে এখানেই চাকুরী শুরু করে যার বেতন ভারতে কিংবা চায়নাতে যা পেতো তার কমপক্ষে দশগুন! আমাদের ভিসা পেতে ওদের চেয়ে বেশি সমস্যা হয় এটা সত্যি, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের উদ্যোগের অভাব। আমাদের সাহসের অভাব। আমাদের ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ ভারতীয় এবং চাইনিজ ছেলেমেয়েদের চেয়ে কোনো অংশেই কম মেধাবী নয়, কিন্তু আমাদের উদ্যোগ এবং সাহস ওদের চেয়ে এক’শগুন কম। একটু উদ্যোগ আর সাহস নিয়ে চেষ্টা করলে আমেরিকাতে পড়তে আসা কোনো ব্যাপারই হবার কথা না। ভারতীয় আর চাইনিজদের মতো লাখে লাখে বাংলাদেশী ছেলেমেয়ে আমেরিকাতে পড়তে আসলে এবং এরপর চাকুরী করলে কী পরিমাণ টাকা এবং বিভিন্ন ধরণের জ্ঞান এবং প্রযুক্তি আমাদের দেশে ট্রান্সফার করা যেতো সেটা ভেবে দেখেছে কেউ?

প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষ কৌতুহলী হয়, আগ্রহী হয়, সবসময় কিছু একটা করতে চায়, যেকোনো জিনিসের ভালো দিকটা দেখে প্রথমে, নিজের ভুল/দোষ হলে সেটা স্বীকার নেয় সহজে, অন্যের সফলতা দেখে হিংসা করেনা, সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ায়না, অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে নিজেই এগিয়ে আসে যেকোনো কাজে, ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকেনা, এবং আশেপাশের সবার মধ্যে নিজের প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করে। একজন সফল মানুষ আরেকজন সফল মানুষকে হিংসা করবেনা। যে ছেলেগুলো হরতাল-বিক্ষোভ এর সময় নির্বিচারে অন্যের গাড়ি ভাংগে, সেই ছেলেগুলোর প্রত্যেকের একটা করে গাড়ি থাকলে ওরা কখনো এই কাজটি করতো না। অসফল মানুষ স্বভাবতই কিছুটা হীনমন্যতাবোধে ভোগে, এবং সুযোগ পেলেই তার দুঃখ-কষ্টের কারণ অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।

আমাদের প্রাণের বড়ই অভাব। এ অভাব মনে যেমন, শরীরেও তেমন। আমাদের সাধারণত মিলিটারির লোকজন ছাড়া অন্যদের স্বাস্থ্য তেমন ভালো হয়না, অথচ ইওরোপ আমেরিকায় সবার কি চমৎকার স্বাস্থ্য! আমরা দশ কদম দৌড়ালে হাঁপাতে শুরু করি; অথচ এখানে জিমে, পার্কে, এমনকি রাস্তাঘাটে লোকজনকে ঘন্টার পর ঘন্টা দৌড়াতে দেখি, সাইকেল চালাতে দেখি। আমেরিকার একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ তাদের জীবনে বিভিন্ন দৈর্ঘের ম্যারাথন দৌড় দিয়ে থাকেন এবং এটা বেশি ঘটে ওদের মধ্য বয়সের পর থেকে। আর আমাদের বয়স চল্লিশ ছাড়িয়ে পঞ্চাশ হতে না হতেই আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া শুরু করি। আমাদের তিনটা কথার একটা হয় মৃত্যু নিয়ে, দোজখ নিয়ে কিংবা বেহেশত নিয়ে। অথচ বিদেশে দেখি ষাট, সত্তর, এমনকি আশিতে পড়া বৃদ্ধরা প্রখর রৌদ্রে জগিং করছেন, কিংবা ফিশিং করছেন, কিংবা বাড়ির পেছনের উঠানে বাগানের কাজ করছেন। কিছুদিন আগে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশ তার পঁচাশিতম জন্মদিন পালন করেছেন একটি প্লেইন থেকে ঝাঁপ দিয়ে স্কাই ডাইভিং এর মাধ্যমে! এখানে মানুষের শরীরের বয়স বাড়ে কিন্তু মনের দিক থেকে মানুষ থাকে তরুণ। আর এটা সম্ভব হয় শুধুমাত্র যখন মানুষ তরুণ বয়সে সত্যিকারের তরুণ থাকে – জীবনটাকে যতোটা সম্ভব উপভোগ করে।

কার্ণেগী মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরলোকগত অধ্যাপক র‌্যান্ডি পশ ক্যান্সারে অকালমৃত্যুর আগে একটি শেষ লেকচার (পিডিএফ লিঙ্ক) দেন। তাঁর কয়েকটি লাইন ছিলো এমনঃ “ঠিক করো তুমি কি টিগার নাকি ইওর । টিগাররা হচ্ছে প্রাণশক্তিতে ভরপুর, প্রচন্ড আশাবাদী, চরম কৌতুহলী, প্রায় সব ব্যাপারে প্রচন্ড আগ্রহী, এবং ওরা জীবনে অনেক আনন্দ করে। জীবনে আনন্দ করাকে কখনোই কম গুরুত্মপুর্ণ মনে কোরোনা। আমি কিছুদিনের মধ্যে মারা যাচ্ছি কিন্তু আমি এখনো প্রতিদিন জীবনে আনন্দ করতে চাচ্ছি। আমি আজ আনন্দ করতে চাই, কাল করতে চাই, এবং আমার বাকী জীবনের প্রতিটি দিন আনন্দ করতে চাই”।

প্রাণের মাধ্যমে সুখী স্বদেশঃ

আমি জানি আমরা একাত্তরে আমাদের প্রাণশক্তির প্রমাণ দিয়েছি, আমরা বছরের পর বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, গ্রীষ্মের ভয়াবহ দাবদাহ মোকাবেলা করে চলছি। একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমাদের গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো, আমরা আমাদের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সে হায়েনাকে পরাজিত করেছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায় প্রায় প্রতি বছর, সেই ধ্বংস্তুপ থেকে আমরা আবার উঠে দাঁড়াই। আমাদের কই মাছের প্রাণ, এতো সহজে মরতে রাজী নই আমরা।

কিন্তু না মরে বেঁচে থাকাই একমাত্র বেঁচে থাকা নয়। এখানেই আসে “প্রাণ”। এখানেই আসে জীবনের প্রতি পরম ভালোবাসা। আমাদের খুব ভালোভাবে বেঁচে থাকতে হবে। আমাদের বেঁচে থাকাকে উদযাপন করতে হবে। যতোদিন বেঁচে থাকবো এই পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে খুব ভালোভাবে। নিদেন পক্ষে আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে।

একাত্তরে যুদ্ধ করে পাকিস্তানীদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়াই জীবনের শেষ কথা নয়। আর ১৯৭১ পৃথিবীর শেষ বছর নয়। ১৯৭১ এর পর প্রায় চল্লিশটি বছর চলে গিয়েছে কিন্তু আমরা এখনো ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারছিনা। আমারা ভালোভাবে বাঁচতে চাই কিন্তু সেটি আমরা যে অর্জন করতে পারিনি আমাদের দেশে তার একটি প্রমাণ হচ্ছে আমরা অনেকেই বিভিন্ন কারণে দেশ ছাড়ার জন্য উদ্গ্রীব। ডিভি লটারীতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে বাংলাদেশ থেকে। নৌকা দিয়ে অবৈধ পথে স্পেইন যাওয়ার পথে অথৈ সাগরে মরে পড়ে থাকে আমাদের লাশ। মধ্যপ্রাচ্যে, মালেয়শিয়াতে আমরা লক্ষে লক্ষে পাড়ি জমাই গায়ের শ্রম বিক্রি করতে। সেই শ্রমের টাকায় বেঁচে থাকে আমাদের দেশ। আজকে এই মধ্যপ্রাচ্য আর মালেয়শিয়ার রক্ত ঝরা টাকা বন্ধ হয়ে গেলে দুর্ভিক্ষে পড়বে বাংলাদেশ।

জাপানও যুদ্ধ করেছিলো। বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু সেই যুদ্ধের ধ্বংস্তুপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওরা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি। আমেরিকা সেদিনের একটা দেশ। মাত্র কয়েকশ বছরে আজ ওরা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী আর ধনী দেশ। ইউরোপ পনের’শ ষোড়শ শতকের শিল্প বিপ্লব এর পর থেকেই সভ্যতাকে নিয়ে গিয়েছে এর আধুনিকতম পর্যায়ে।

আর আমরা সেই শত শত বছর থেকে পিছিয়ে আছি তো আছিই। আমাদের কিসের অভাব? আমাদের প্রাণ এর অভাব। শীত আমাদের কাবু করে ফেলে। আমরা শীত থেকে বাঁচার জন্য ঘরে ঘরে হিটার লাগাতে পারিনা। গরমে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়, কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে শীতাতপ যন্ত্র কেনার মতো অর্থনৈতিক অবস্থা আমরা তৈরি করতে পারিনি। আমাদের আশি ভাগ মানুষ কখনো বিদ্যুৎ পায়নি। বাকি বিশ ভাগ দিনের মাত্র কয়েক ঘন্টা বিদ্যুৎ পায়। কে যেনো একজন বলেছিলেন, “গণতন্ত্রের চেয়ে বিদ্যুৎ বেশি দরকার আমাদের”। আহা, কতো খাঁটি কথা। বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ বাঁচবে কেমন করে। এতো আর গুহাযুগ না যে আমরা গুহায় বাস করি। সবকিছু এখন বিদ্যুতে চলে।

কিন্তু এ বিদ্যুৎ আমাদের কে দিবে? যাদের আমরা ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠাই, তারা। কিন্তু তারা তো আমাদেরই অংশ। আমরা যেমন প্রানহীন, স্বপ্নহীন; তারাও তেমনি! হাসিনা, খালেদা, সৈয়দ আশরাফ, খন্দকার দেলোয়ার, তারেক, জয়, হাজী সেলিম, পিন্টু, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মওদুদ, সব মন্ত্রী আর এমপি – এরা সবাই তো সেই আমাদেরই লোক। এরা দুর্নীতি করে এটা বড় সমস্যা না, বড় সমস্যাটি হচ্ছে এদের প্রাণ এর অভাব। প্রাণ নেই বলে এরা এখন এক’শ টাকার একটা অর্থনীতি বানিয়ে সেখান থেকে নব্বই টাকা নিজেরা মেরে দেয়, বাকী দশ টাকা জনগণের জন্য রাখে। প্রাণ থাকলে এরা দেশের অর্থনীতির আকার বানাতো এক লক্ষ টাকার, আর সেখান থেকে নব্বই হাজার টাকা ওরা মেরে দিলেও আমরা এরপরও দশ হাজার টাকা পেতাম জনগনের জন্য! যেটা দশ টাকার থেকে অনেক অনেক ভালো!

আমাদের বিদ্যুৎ পেতে হলে বিদ্যুৎ চাইতে হবে, পার্ক পেতে হলে পার্ক চাইতে হবে; একইভাবে আমাদের লেক চাইতে হবে, গাড়ি চাইতে হবে, বাড়ি চাইতে হবে, ফ্ল্যাট চাইতে হবে, সুইজারল্যান্ড-হাওয়াই বেড়াতে যাতে চাইতে হবে, রকেট সায়েন্টিস্ট হতে চাইতে হবে, মহাকাশে উপগ্রহ পাঠাতে চাইতে হবে, নোবেল পুরস্কার পেতে চাইতে হবে, ফিল্ডস মেডাল/টুরিং পুরস্কার পেতে চাইতে হবে। মোটকথা, পাওয়ার প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে চাওয়া। এই পাওয়ার স্বপ্ন দিয়েই সব কিছু শুরু হয়। আমরা অবশ্য অনেক কিছুই চাই, কিন্তু আমরা চাওয়ার সাথে সাথে মনে মনে হাসি আমাদের চাওয়া দেখে। কারণ আমরা মনে মনে নিশ্চিত এই চাওয়া শুধু চাওয়াই, কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। আর এখানেই আমরা ভুলটা করি। আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে এটা ভেবে যে এই স্বপ্নের বেশিরভাগই পূরণ হবে। এবং সে অনুযায়ী প্রচুর প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে সে স্বপ্ন পূরণের জন্য।

আমাদের জীবন যখন প্রাণশক্তিতে ভরপুর হবে, আমরা যখন আমাদের জীবনকে আরো বেশি ভালোবাসবো, আমরা যখন আরো বেশি সাহসী আর অ্যাডভেঞ্চারাস হয়ে উঠবো তখন আমরা সবাই ধীরে ধীরে একটা সুখকর, আরামদায়ক, এবং উপভোগ্য জীবন পাবো। আর এভাবে আমরা একটা ধনী আর সমৃদ্ধশালী সমাজ এবং দেশ পাবো। তখন হরতাল-ভাংচুর করার জন্য আর টোকাই কিংবা রাজনৈতিক কর্মী পাওয়া যাবেনা, ছাত্ররাজনীতির নামে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর দুর্বৃত্ত তৈরি হবেনা, কোনো কাজ না থাকায় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বখাটে ছেলেরা মেয়েদের আর উত্যক্ত করবেনা, রাজনীতিবিদরা দলীয় গুন্ডা-মাস্তান দিয়ে প্রতিপক্ষকে আর ঠেঙ্গাতে পারবেনা। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদ হবে এই প্রাণশক্তিসম্পন্ন টগবগে তরুণ-তরুণীরা, যারা জীবনকে ভালোবাসে, মৃত্যকে নয়। তাই জীবনকে সুন্দর ও সুখী করার জন্য ওরা ছাত্রজীবনে নিজেদের প্রচন্ড প্রাণশক্তি নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করবে এবং ছাত্রজীবন শেষ করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজের মেধা ও মননের চমৎকার ব্যবহার করে দেশকে এগিয়ে নিবে সামনের দিকে।

জীবনের প্রতি পরম ভালোবাসাঃ

একটা উন্নত সমাজ পেতে হলে, দেশ পেতে হলে, আমাদের জীবনকে ভালোবাসতে হবে। জীবনকে উপভোগ করা শিখতে হবে। জীবনের অধিকারী মানুষগুলোকে ভালোবাসতে হবে, শ্রদ্ধা করতে হবে। জীবনকে প্রচন্ড ভালোবাসে এবং উপভোগ করে এরকম প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটা জাতিই পারে একটা উন্নত দেশ উপহার দিতে। অন্যথায় পৃথিবীর প্রাণশক্তিতে টগবগ করা অংশ যখন পারমানবিক যুগ, রকেট যুগ পার করে ক্লোনিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদির যুগে চলে যাবে, আমরা তখনো আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে এক কদম এগিয়ে আরেক কদম পিছিয়ে পড়তেই থাকবো।

মাইক্রোসফট এর সাতকাহন – পর্ব ৩ (মাইক্রোসফট এর সেকাল একাল)

শুরুর ঘটনাঃ

মাইক্রোসফট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কম্পিউটার সফটওয়ার প্রস্তুতকারী কম্পানী। এবং এটি সবচেয়ে পুরনো সফটওয়ার কম্পানীগুলোরও একটি।
মাইক্রোসফট এর শুরু হয় ১৯৭৫ সালে আমেরিকার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবাকার্কি শহরে। যদিও মাইক্রোসফট এর মূল প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এর বাড়ি ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে (যেখানে মাইক্রোসফট এর বর্তমান প্রধান অফিস), তিনি এর শুরুটা করেন প্রায় পনের’শ মাইল দূরের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি শহরে। এর কারণ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর প্রথম সফটওয়ারটি ছিলো আসলে একটি BASIC ইন্টারপ্রিটার যেটা প্রথমে কাজ করতো আল্টেয়ার নামক একটি কম্পিউটারএ। আল্টেয়ার এর অফিস ছিলো নিউ মেক্সিকোতে। বিল গেটস ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এর লেখাপড়া ছেড়ে নিউ মেক্সিকো চলে যান আল্টেয়ার এর মালিক কম্পানীকে তার ইন্টারপ্রিটার কেনার জন্য রাজী করাতে। আল্টেয়ার এর মালিক ইন্টারপ্রিটারটি কিনতে রাজী হওয়ার পর গেটস সেখানেই মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন তার বন্ধু পল অ্যালেনকে সাথে নিয়ে। আমার ধারণা বিল গেটস তখনো ভাবতে পারেননি তার এই কম্পানীটি একদিন পৃথিবীর সভ্যতার তথ্য যুগে প্রবেশএ একটা বড় ভূমিকা রাখবে।

সফটওয়ার সাম্রাজ্যঃ

চৌত্রিশ বছর পর আজ ২০০৯ সালে এসে মাইক্রোসফট হয়ে উঠেছে এক প্রযুক্তি সাম্রাজ্য। কিছু হার্ডওয়ার বাদ দিলে কম্পিউটারের এমন কোনো দিক নেই যেটা তারা প্রস্তুত করে না। বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত অপারেটিং সিস্টেম, সর্বাধিক ব্যবহৃত অফিস প্রডাক্টিভিটি সফটওয়ার, সর্বাধিক ব্যবহৃত চ্যাট মেসেঞ্জার, সর্বাধিক ব্যবহৃত ওয়েব ইমেইল, সর্বাধিক ব্যবহৃত ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট ইত্যাদি ছাড়াও অন্যান্য অসংখ্য সফটওয়ার পণ্য আছে মাইক্রোসফট এর যেগুলো প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে সারা পৃথিবীর কোটি কোটি কম্পিউটারএ। মাইক্রোসফট এর মোট কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৯৫,০০০। এর একটা বড় অংশ হচ্ছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।

ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের রেডমন্ড শহরের বিশাল এক এলাকা জুড়ে মাইক্রোসফট এর অফিস। প্রায় এক’শ এর মতো বিল্ডিং জুড়ে চলে এর কাজকর্ম। কম্পানীর ইঞ্জিনিয়ারিং কাজকর্ম করা হয় পাঁচটি বড় ডিভিশন এর মাধ্যমে – উইন্ডোজ এবং উইন্ডোজ লাইভ ডিভিশন, অনলাইন সার্ভিসেস ডিভিশন, ডিভাইস এবং এন্টারটেইন্টমেন্ট ডিভিশন, মাইক্রোসফট বিজনেস ডিভিশন, এবং সার্ভার এবং টুলস ডিভিশন। এছাড়াও আইন, এইচআর, মার্কেটিং, ফাইন্যান্স ইত্যাদি আরো অনেক গ্রুপ তো আছেই।

প্রত্যেকটি ডিভিশন এর রয়েছে একজন প্রেসিডেন্ট যারা সরাসরি সিইও স্টিভ বালমার এর কাছে রিপোর্ট করেন। উইন্ডোজ এবং উইন্ডোজ লাইভ ডিভিশন কাজ করে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম এবং এর অনলাইন ফিচার নিয়ে। উইন্ডোজকে বলা হয় মাইক্রোসফট এর ফ্ল্যাগশিপ পণ্য। মাইক্রোসফট এর সবচেয়ে বেশি আয় হয় এর মাধ্যমে। ২০০৭ সালের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটল করা কম্পিউটার এর সংখ্যা এক বিলিয়ন হয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীতে রাস্তাঘাটে যতো কার চলাচল করে তার চেয়ে বেশি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম চলে দুনিয়াজোড়া কম্পিউটারগুলোতে। বিজনেস ডিভিশন এর পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফট অফিস (ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, এক্সেল ইত্যাদি), সার্ভার ডিভিশন এর প্রধান পণ্যগুলো হচ্ছে উইন্ডোজ সার্ভার, এসকিউএল সার্ভার, ডট নেট ইত্যাদি। অনলাইন সার্ভিসেস এর প্রধান পণ্য (বা সেবা) হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন বিং, অনলাইন পোর্টাল এমএসএন ইত্যাদি। ডিভাইস এবং এন্টারটেইনমেন্ট ডিভিশন এর প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আইপড এর প্রতিদ্বন্ধী জুন মিউজিক প্লেয়ার, উইন্ডোজ মোবাইল, এক্সবক্স গেইম কনসোল ইত্যাদি। এই ডিভিশনগুলির প্রত্যকটিই অন্য অনেক স্বয়ংসম্পূর্ণ কম্পানীর চেয়ে অনেক বড়।

মাইক্রোসফট এর রয়েছে বিশাল গবেষণা গ্রুপ। “মাইক্রোসফট রিসার্চ” হচ্ছে কম্পিউটার বিজ্ঞান এর সবচেয়ে নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ২০০৯ সালে এর বাজেট এর পরিমাণ ছিলো ৯ বিলিয়ন ডলার এর বেশি! গবেষণার পেছনে এ পরিমাণ টাকা পৃথিবীর খুব কম্পানীই খরচ করে। এমনকি গতো এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও মাইক্রোসফট তার গবেষণা বরাদ্দ কমায়নি। এখানে কাজ করেছেন এবং করছেন টুরিং এবং ফিল্ডস মেডাল প্রাপ্ত বিজ্ঞানীরা!

মাইক্রোসফট এর অফিসগুলিকে চিহ্নিত করা হয় নাম্বার দিয়ে (ইদানিং অবশ্য এই রীতি থেকে বের হয়ে এসে অন্যান্য নাম দিয়েও বিল্ডিং চিহ্নিত করা হচ্ছে)। সাধারণত একই ডিভিশন এর বিল্ডিংগুলো কাছাকাছি থাকে। আমাদের উইন্ডোজ ডিভিশনের অফিসগুলো বেশির ভাগই বিল্ডিং ২৬, ২৭, ২৮, এবং ৩৭ এ অবস্থিত। তবে অন্যান্য বিল্ডিংএও উইন্ডোজ এর অফিস আছে। মাইক্রোসফট এর অফিসগুলো সাধারণত দরজাওয়ালা ব্যক্তিগত অফিস রুম টাইপের। কিউবিকল অফিস মাইক্রোসফটএ নাই বললেই চলে। আমি এখানকার অনেকের সাথেই এটা নিয়ে কথা বলেছি, এবং প্রায় সবাই বলেছে যে প্রোগ্রামিং কাজের জন্য কিউবিকলের চেয়ে ব্যক্তিগত অফিস রুমই ভালো। প্রত্যেক রুমেই থাকে কমপক্ষে দুটি সাদা বোর্ড, এক বা একাধিক বইএর সেলফ, এবং অফিস ডেস্ক। কিউবিকলে এই সাদা বোর্ড টানানোর সুবিধা থাকেনা। যেকোনো ধরণের ডিজাইন আলোচনার জন্য সাদা বোর্ডের বিকল্প নেই। এখানকার যে কারো অফিস রুমে ঢুকলেই অবধারিতভাবে সাদা বোর্ডটিতে নানারকম ফ্লোচার্ট কিংবা কোড দেখা যাবেই। অনেক বিল্ডিংএ রুম এর বাইরে করিডোরএও সাদা বোর্ড থাকে। কিংবা চা-কফি খাওয়ার, আড্ডা দেওয়ার জায়গাটিতেও সাদা বোর্ড থাকে। এর ফলে যে কোনো অবস্থাতেই ইঞ্জিনিয়াররা কোনো আইডিয়া কিংবা ডিজাইন নিয়ে ততক্ষণাৎ একটা ব্রেইন স্টর্মিং করতে পারে।

বহুমাত্রিক যুদ্ধঃ

বহু ধরণের সফটওয়ার পণ্য থাকার কারণে মাইক্রোসফটকে বহুমুখী যুদ্ধ করতে হচ্ছে দুনিয়ার সেরা সব কম্পানীর সাথে। মাইক্রোসফট এর চির প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে স্টিভ জবস এর অ্যাপল। অ্যাপল এর পণ্য সমূহের নয়নাভিরাম এবং নিখুঁত ডিজাইন এর জন্য কম্পিউটার মার্কেট এর বিশাল একটা অংশ দখল করে নিয়েছে। এবং এই অংশ দিন দিন বাড়ছে। অ্যাপল এর সম্প্রসারণশীল বাজার মাইক্রোসফটকে যারপরনাই ভাবাচ্ছে। এ যুদ্ধে সর্বশেষ সংযোজন বিজ্ঞাপন যুদ্ধ । অ্যাপল এবং মাইক্রোসফট উভয়েই একে অপরকে সরাসরি আক্রমন করে বিজ্ঞাপন বানিয়ে প্রচার করছে সম্প্রতি। উইন্ডোজ এর আরেক প্রতিদ্বন্ধী ওপেন সোর্স অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স। যদিও বাজার দখলের দিক থেকে লিনাক্স এখনো অনেক পিছিয়ে উইন্ডোজ কিংবা অ্যাপল এর থেকে। কিন্তু লিনাক্স এর উৎসাহীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় মাইক্রোসফট এর শংকা একেবারে কম নয়।

সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট এর দিক থেকে মাইক্রোসফট এর মূল প্রতিদ্বন্ধী জাভা প্রস্তুতকারী সান কর্পোরেশন (সম্প্রতি ওরাকল সানকে কিনে নিয়েছে)। মাইক্রোসফট এর ভিজুয়াল স্টুডিও নির্ভর ডট নেট ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট এর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সান এর জাভা প্লাটফর্ম। ডেটাবেজ এর দিক থেকে মাইক্রোসফট এর এসকিউএল সার্ভার এর শক্ত প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে ওরাকল এর ওরাকল ডেটাবেজ এবং আইবিএম এর ডিবি২ ডেটাবেজ সিস্টেম।

কিন্তু সব প্রতিদ্বন্ধীকে ছাড়িয়ে ইন্টারনেট যুগে মাইক্রোসফট এর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে গুগল। গুগল এর ব্যবসার ধরণ, সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং মেধা, মাইক্রোসফট এর চেয়ে বেশি ইন্টারনেটভিত্তিক পণ্য এবং সেবায় বিনিয়োগ করা ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে গুগল হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইক্রোসফট এর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্ধী। মাইক্রোসফট ইন্টারনেট এর গুরুত্ম অনেক আগে বুঝলেও এতে বিনিয়োগ করতে অনেক দেরি করে ফেলে। গুগল যেখানে ১৯৯৮ সালে সার্চ নিয়ে কাজ শুরু করে, মাইক্রোসফট সেখানে সত্যিকারের সার্চ নিয়ে আসে ২০০৬ সালে (“লাইভ” সার্চ নাম নিয়ে)। এতো দেরীতে শুরু করার ফল মাইক্রোসফটকে হাড়ে হাড়ে দিতে হচ্ছে – সার্চ এর বাজার দখলের ক্ষেত্রে মাইক্রোসফট গুগল থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে!

সিইও স্টিভ বালমার ভালো করেই জানেন দিন দিন মানুষ ইন্টারনেটএ বেশি বেশি সময় ব্যয় করছে এবং ওয়েব সাইটে বিজ্ঞাপনের পরিমাণও প্রতি বছর বাড়ছে দ্রুত গতিতে। তাই ইন্টারনেটেও মাইক্রোসফটকে ভালো করতে হবে। সার্চ হচ্ছে ইন্টারনেটএ প্রবেশদ্বার। তাই সার্চ এর শক্ত খেলোয়াড় হওয়ার জন্য মাইক্রোসফট মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে বিং. একই সাথে সার্চএ দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইয়াহুকে কিনে নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালায় মাইক্রোসফট। গতো বছর পুরো ইয়াহুকে কিনতে না পেরে এখন ইয়াহু এর সার্চ অংশটুকু কিনতে আগ্রহী মাইক্রোসফট। দেখা যাক গুগলকে মোকাবেলার মাইক্রোসফট এর এই চেষ্টা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

অ্যাপল, সান, ওরাকল, লিনাক্স, গুগল ইত্যাদি ছাড়াও আরো অসংখ্য ছোটবড় কম্পানী এবং পণ্য এর সাথে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে মাইক্রোসফটকে। সিসকো এর সাথে কমিউনিকেশন সফটওয়ার নিয়ে, ভিএমওয়ার এর সাথে ভার্চুয়াল অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে, অ্যামাজন এবং সেলসফোর্সের সাথে ক্লাউড কম্পিউটিং নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছেই!

বিল গেটস এবং স্টিভ বালমারঃ

২০০৮ সালের জুন পর্যন্ত কম্পানীর প্রধান ছিলেন চেয়ারম্যান বিল গেটস। কিন্তু তারপর থেকে তিনি অবসরে যাওয়ার কারণে সিইও স্টিভ বালমার এখন মাইক্রোসফট এর প্রধান কর্ণধার। বিল গেটস এখনো চেয়ারম্যান, কিন্তু তিনি এখন আর পুরো কম্পানীর দায়িত্বে নেই। তিনি শুধু মাত্র উইন্ডোজ এবং সার্চ এর মতো দুএকটি প্রধান পণ্য এর সাথে পরামর্শদাতা হিসেবে জড়িত থাকেন। বিল গেটস এখন মূলত তার বিল এন্ড মেলিন্ড গেটস ফাউন্ডেশন নিয়ে ব্যস্ত। তার ফাউন্ডেশনটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতব্য প্রতিষ্ঠান। বিল গেটস তার বন্ধু স্টিভ বালমারকে মাইক্রোসফটএ নিয়ে আসেন ১৯৮০ সালে। ২০০০ সালে বিল গেটস সিইও পদ থেকে সরে গিয়ে স্টিভ বালমারকে সে পদে নিয়োগ দেন। বিল গেটস হচ্ছে মাইক্রোসফট এর টেকনিকাল গুরু আর স্টিভ বালমার হচ্ছেন মার্কেটিং গুরু। তবে অনেকেই মনে করেন স্টিভ বালমার মাইক্রোসফটকে বিল গেটস এর মতো ভালোভাবে পরিচালিত করতে পারছেননা।

বিল গেটস এর প্রথম দিককার মন্ত্র ছিলো “বিশ্বের প্রতিটি ডেস্কে একটি করে কম্পিউটার যেটিতে মাইক্রোসফট এর সফটওয়ার চলবে”। বলা যায়, গেটস তার এ স্বপ্ন পূরণে মোটামুটি সার্থক হয়েছেন। ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাইক্রোসফটকে একটু একটু করে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য বিল গেটস এবং তার বিশাল কর্মী বাহিনী অবশ্যই কৃতিত্বের দাবীদার। তাদের এই ক্রমাগত প্রযুক্তি আবিষ্কার আর উদ্ভাবন তথ্য প্রযুক্তিকে দিন দিন আরো সমৃদ্ধ করছে, মানুষের জীবনকে করছে আরো আরামদায়ক।

মাইক্রোসফট এর সাতকাহন – পর্ব ২ (ইন্টার্ণশীপ অভিজ্ঞতা)

মাইক্রোসফটএ যারা ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জয়েন করে তাদের ওরিয়েন্টেশন হয় সোমবারে আর যারা ইন্টার্ণ হিসেবে জয়েন করে তাদের ওরিয়েন্টেশন হয় মঙ্গলবারে। গতো বছরের (এবং এই বছরেরও) অর্থনৈতিক মন্দার আগ পর্যন্ত সাধারণত এই ছিলো রেওয়াজ এবং সেই জন্য দেখা যেতো প্রতি সপ্তাহের সোম এবং মঙ্গলবার মাইক্রোসফট এর বিল্ডিং ৪৩ এর একতলার বড় কনফারেন্স রুমটি সবসময় নতুন জয়েন করা ইন্টার্ণ এবং ফুল টাইমারদের দ্বারা গিজগিজ করতো। (প্রসঙ্গক্রমে, গুগলেরও একটি বিল্ডিং ৪৩ আছে, এবং সম্প্রতি বিখ্যাত প্রযুক্তি ব্লগার রবার্ট স্কবল তার নতুন ব্লগ এর নাম রেখেছেন বিল্ডিং ৪৩। গতো বছর এবং এই বছরের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মাইক্রোসফট এর হায়ারিং অনেক কমে গেছে, তাই হয়তো সেখানে এখন আর অতো বেশি নতুন ইন্টার্ণ আর ফুল টাইমারদের দেখা যাবেনা।

তো ২০০৭ সালের জুন মাসের ১২ তারিখ মঙ্গলবার সকাল ৯ টায় আমাদের ওরিয়েন্টশনে যোগ দেওয়ার জন্য বিল্ডিং ৪৩ এর নির্ধারিত কনফারেন্স রুমটিতে যেয়ে পৌঁছাই। আলরেডি সেখানে হুলস্থূল অবস্থা। অসংখ্য ইন্টার্ণ এর ভিড়ে গিজগিজ অবস্থা। হরেক রকম লাইন সেখানে। কেউ হয়তো প্রাথমিক ফর্ম পূরণ করছে, কেউ হয়তো ব্যাংক সম্পর্কিত ফর্ম পূরণ করছে, কেউ কেউ আইডি কার্ড বানানোর জন্য ছবি তুলছে। আমিও একটার পর একটা লাইনে দাঁড়িয়ে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করছিলাম। আমরা যারা বিদেশী ছাত্র/ছাত্রী ছিলাম তাদের কিছু অতিরিক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয়েছিলো। ফর্ম পূরণের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাদের মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো।

মাইক্রোসফটএ একটা টিমই থাকে ওরিয়েন্টশন করার জন্য। তারা একে একে মাইক্রোসফট এর কম্পানী পলিসি, নিরাপত্তা, বিভিন্ন বেনেফিট (স্বাস্থ্য/বীমা/জিম/স্টক ইত্যাদি), এম্পলয়ীদের দায়িত্ব, আধিকার এবং তার সীমা, কম্পানী কালচার, ম্যানেজার এর সাথে সম্পর্ক, ক্যারিয়ার এডভান্সমেন্ট, ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে বলে যান এবং অংশগ্রহনকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে খাবার-দাবার চলতে থাকে। নতুন আগতরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হন। নতুন আসার কারণে সবারই মনে অসংখ্য প্রশ্ন থাকে, এবং আয়োজনকারীরা ধৈর্য ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দেন।

ওরিয়েন্টেশন সাধারণত দেড়দিন এর মতো হয়। আমার ওরিয়েন্টেশন শেষে পরদিন দুপুরে আমি আমার নির্ধারিত অফিস বিল্ডিং ৪০ এ গেলাম। নিচে রিসেপশনিস্টকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম আমি আমার ম্যানেজার ক্যারেন এর সাথে দেখা করতে চাই। ঘটনাক্রমে আমার ম্যানেজার ক্যারেন অফিস এ ছিলো না। তখন আমাদের টিম এর আরেকজন আ্যলেক্স (গতো পর্বে যার কথা উল্লেখ করেছিলাম – আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার!) এসে আমাকে উপরে নিয়ে গেলো। এখানকার সব অফিস ইলেক্ট্রনিক আইডি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, দরজার সাথে লাগানো ছোট মডিউলটাতে নিজের আইডি মেলে ধরলে ক্লিক করে দরজা খুলে যায়। যেহেতু তখনো আমার আইডি হয়নি তাই কী একজন এসে আমাকে নিয়ে যেতে হয়েছিলো।

আ্যলেক্স হচ্ছে আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে মজার মানুষদের একজন। সবসময় হাসিখুশি, প্রায় সময়ই চিৎকার চেঁচামেচি করে কথা বলে। আমাকে নিয়ে ও আমার রুম দেখিয়ে দিলো। সৌভাগ্যক্রমে সেই রুমটি তখন খালি ছিলো এবং রুমটি ছিলো জানালার ধারে। এখানে নতুনদের সিঙ্গেল অফিস রুম পাওয়া একটা বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার, আর পেলেও সেটি যে জানালার পাশে হবেনা সেটি প্রায় নিশ্চিত! মাইক্রোসফট অফিস এর ব্যাপারে কিউবিকল এর চেয়ে ব্যক্তিগত অফিস রুম এর পক্ষে। আমিও প্রোগ্রামারদের জন্য কিউবিকল এর চেয়ে ব্যক্তিগত রুম বেশি পছন্দ করি। কিউবিকলএ শব্দ বেশি হয় এবং সূক্ষ কাজে মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে আমার ধারণা। তাই জীবনের প্রথম ব্যক্তিগত রুম পেয়ে আমি যারপরনাই খুশি হয়ে উঠি!

আ্যলেক্স আমাকে টিম এর অন্য সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। এরপর আমাদের নেটওয়ার্কিং টিম এর এডমিনিস্ট্রেটিভ এসিসট্যান্ট এসে আমার কম্পিউটার দিয়ে গেলো। আ্যলেক্স এর সাহায্য নিয়ে আমি আমার কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক ইতাদি সেটাপ করলাম। একটু পরেই আমার ম্যানেজার ক্যারেন আসলো আমার রুমএ। মাইক্রোসফটএ যেকোনো এম্পলয়ী (ইন্টার্ণ বা ফুল টাইমার) এর একজন ম্যানেজার থাকে। সোজা বাংলায় বস! তবে এখানে বস শব্দটির চল নেই। সবাই সবার নাম ধরে ডাকে। শুধু অপিরিচিত কেউ হলে Mr অমুক বলে ডাকে। আ্যলেক্স এর মতো আমার ম্যানেজার ক্যারেনকেও আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেলো। আমাদের গ্রুপটি http নিয়ে কাজ করার কারণে ক্যারেন আমার জন্য http প্রোটকল এর উপর একটা বই নিয়ে এসেছিলো আমার জন্য।

এর পরের কয়েকদিন ক্যারেন আর আমার মেন্টর (mentor) আরি এসে আমার কাজ ঠিক করে দিলো। মাইক্রোসফটএ প্রত্যেক ইন্টার্ণ এর একজন ম্যানেজার এবং একজন মেন্টর থাকে। ম্যানেজার দেখেন ক্যারিয়ার এর দিকটা, আর মেন্টর দেখেন টেকনিকাল দিকটা। আমার মেন্টর আরি হচ্ছে আমার দেখা সবচেয়ে প্রতিভাবান সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের একজন। উইন্ডোজ এর এমন কোন দিক নেই যেটা সম্পর্কে ওর ভালো ধারণা নেই। আমার ভাগ্য ভালো আমি ওর মতো একজনকে আমার মেন্টর হিসেবে পেয়েছি। ও আমার সাথে প্রতিদিন সকাল নয়টায় আধঘন্টার একটা মিটিং করতো, যেটা প্রায়ই আধঘন্টার জায়গায় দুই/তিন ঘন্টা ধরে চলতো। আমার কাজের অংশ হিসেবে আমি ডাউনলোড ম্যানেজারের মতো একটি আ্যপলিকেশন লিখছিলাম, যেটির কী করতে হবে সেটা বলে দিতো আরি, আর কিভাবে করতে হবে সেটা আমি ঠিক করতাম। কিন্তু আমার অনভিজ্ঞতার কারণে প্রায় সময়ই আরি আমার ডিজাইনটি করে দিতো। ওর (এবং আমার) রুম এর সাদা বোর্ডটিতে কতো যে আঁকিজুঁকি করেছি আ্যপলিকেশন এর ডিজাইন এর বিভিন্ন দিক নিয়ে! ঘন্টার পর ঘন্টা চলতো আমাদের ব্রেইন স্টর্মিং। আ্যপলিকেশনটির ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট এর বিভিন্ন পর্যায়ে আরি টিম মিটিংএ আমাকে দিয়ে তখন পর্যন্ত যা যা করেছি সেটা উপস্থাপন করাতো।

যেহেতু সময়টা ছিলো গ্রীষ্মকাল তাই সবসময় এটা সেটা প্রোগ্রাম লেগে থাকতো ওখানে। সবচেয়ে সেরা প্রোগ্রামটি ছিলো বিল গেটস এর বাসায় একটা ডিনারের দাওয়াত। সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছি এখানে। এছাড়া প্রডাক্ট ফেয়ার হয়েছিলো যেখানে মাইক্রোসফট এর সব প্রডাক্ট গ্রুপ তাদের প্রডাক্ট উপস্থাপন করেছিলো। প্রত্যেকটি গ্রুপ তাদের প্রডাক্ট এর টেকনিকাল এবং বাণিজ্যিক দিক সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলো। প্রডাক্ট ফেয়ার এর একটা প্রোগ্রাম ছিলো সিইও স্টিভ বালমার এর বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব। মনে পড়ে এই প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন ইন্টার্ণ স্টিভ বালমারকে প্রশ্ন করেছিলো মাইক্রোসফট এর এম্পলয়ীদের ফ্রি লাঞ্চ দেওয়া যায় কিনা। প্রশ্ন শুনে সবাই হেসে উঠেছিলো কারণ প্রশ্নটি করা হয়েছে গুগলের কথা মাথায় রেখে – গুগল তাদের এম্পলয়ীদের ফ্রি লাঞ্চ এবং ডিনার দেয়! স্টিভ বালমার বেশ স্মার্টলি উত্তর দিয়ে বলেছিলো মাইক্রোসফট এম্পলয়ীদের যথেষ্ট বেতন দেয় এবং তারা ঠিক করবে তারা কোথায় লাঞ্চ করবে এবং কী লাঞ্চ করবে। এরপর তিনি ইন্টার্ণদের প্রশ্ন করেন কারা চায় তাদের বেতন কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া হোক আর কারা চায় বেতন ঠিক রেখে ফ্রি লাঞ্চ দেওয়া হোক! দেখা গেলো সবাই হাত তুলেছে বেতন বাড়ানোর পক্ষে! তিনি প্রমাণ করে ছাড়লেন এম্পলয়ীরা ফ্রি লাঞ্চ এর চেয়ে বেশি বেতন পছন্দ করে। মাইক্রোসফট এর বার্ষিক টেকনোলজি টাউনহল কনফারেন্সগুলি গ্রীষ্মকালে হয়। এই কনফারেন্সগুলির মূল বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর প্রযুক্তি কোন দিকে যাচ্ছে এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে মাইক্রোসফট কী কী পণ্য কিংবা সেবা আনছে, অথবা মাইক্রোসফট এর সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা। এইসব কনফারেন্সএ প্রায়শই মাইক্রোসফট এর উপরের দিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্টরা উপস্থিত থাকেন এবং মাইক্রোসফট এর ব্যবসায়িক এবং টেকনিকাল বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। আরেকদিন মাইক্রোসফট সারফেইস টিম একটি সারফেইস কম্পিউটার নিয়ে এসে ডেমোনেস্ট্রেশন করে গেলো ইন্টার্ণদের জন্য। সারফেইস কম্পিউটার তখনো সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি (এখন অল্প কিছু কম্পানী এটি ব্যবহার করে), তাই বাইরের মানুষের আগে এটি দেখতে পেরে বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম! যারা সারফেইস সম্পর্কে জানতে চান তারা এখানে ক্লিক করুণ।

আগস্ট এর ৩১ তারিখ ছিলো আমার ইন্টার্ণশিপ এর শেষ দিন। তার প্রায় এক সপ্তাহ আগে আমাকে আমার কাজের পূর্ণ ডেমন্সট্রেশন করতে হয় আমাদের টিম এর সামনে এবং উইন্ডোজ ডিভিশন এর কয়েকজন ভাইস প্রেসিডেন্টদের সামনে। টিম এর সাথে আগে থেকে পরিচয় থাকায় সহজেই ডেমন্সট্রেশন করতে পারি। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্টদের সামনে যেয়ে রীতিমতো ঘাম ছুটে যাবার অবস্থা! ভাগ্যিস আরি আমার পক্ষে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাকে অনাবশ্যক লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো!

মাইক্রোসফটএ সাধারণত গ্রুপএ খালি পজিশন থাকলে এবং ইন্টার্ণশীপ এর সময় ইন্টার্ণদের কাজ পছন্দ হলে তাদেরকে ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকুরীর অফার দেওয়া হয়। এবং এটা করা হয় কোনো ধরণের নতুন ইন্টারভিউ নেওয়া ছড়াই। সেজন্যই মাইক্রোসফট এর ইন্টার্ণশীপ ইন্টারভিউ প্রায় ফুল টাইম ইঞ্জিনিয়ারদের ইন্টারভিউ এর মতো হয়ে থাকে। চাকুরীর অফার দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে ইন্টার্নশীপ এর শেষ সপ্তাহে।কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার সারা জীবনের স্বপ্ন মাইক্রোসফট বা এ জাতীয় কোনো কম্পানীতে চাকুরী করা। তাই ইন্টার্ণশীপ এর শেষ সপ্তাহে এসে আমার হার্ট বিট নিয়ম করে অনিয়মিত হয়ে গেলো! কাজেই আমার সাথে যোগ দেওয়া ইন্ডিয়ান ছাত্রটিকে ফুল টাইম জব অফার দেওয়ার পর আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। আমার ম্যানেজারকে ইমেইল করলাম এই বলে – “আমি আমার ইন্টার্ণশীপ এর শেষ সপ্তাহে এসে পড়েছি। আমি জানিনা তোমরা আমাকে ফুল টাইম জব অফার দিবে কিনা। না দিলে কোনো সমস্যা নাই, আমি জানি মাইক্রোসফট এর মতো কম্পানীতে টেকনিকাল স্কিলস ছাড়াও অনেক কিছু দেখে ফুল টাইম জব অফার দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তত আমাকে জানিয়ে দাও অফার না দিলেও। তাহলে আমি এই সপ্তাহে অন্যান্য গ্রুপ যারা হায়ার করছে তাদের সাথে ইন্টারভিউ দিবো”। ইমেইল দেওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরও কোনো উত্তর না পেয়ে ভাবলাম ছোট মুখে বড় কথা বলে ফেললাম নাতো! কিন্তু আরো কিছুক্ষণ পর আমাকে অবাক করে দিয়ে ক্যারেন ইমেইল করলো – “আমরা তোমাকে আমাদের গ্রুপ এ ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জয়েন করার জন্য অফার দিচ্ছি! শীঘ্রই তোমার রিক্রুটার এ ব্যাপারে তোমার সাথে যোগাযোগ করবে।”

এর পরদিন আমার নতুন রিক্রুটার ড্যানিয়েল আমাকে বিল্ডিং ১৯ এ ডেকে নিয়ে মাক্রোসফটএ ফুল টাইম এম্পলয়মেন্ট এর জব অফার দেয়। যদিও এখানকার আবহাওয়া আমার একেবারে অপছন্দ (গ্রীষ্মকাল ছাড়া প্রায় সারাবছর গুঁড়িগঁড়ি বৃষ্টি কিংবা মেঘলা আকাশ থাকে), কিন্তু মাইক্রোসফট এর অফার বলে কথা! অফার এর সময় কম্পানীর নানারকম প্রশংসা ছাড়াও অন্যান্য কম্পানী থেকে যে কতো বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে ইত্যাদি নানা রকম কথাবর্তা বললো রিক্রুটার। আমার শেষ দিনটিতে ক্যারেন আমার জন্য ছোটখাটো একটা কেক-আইসক্রিম এর পার্টি দিয়েছিলো আমাদর অফিস এর বারান্দায়। গ্রুপ এর সবাই এসে আমাকে বিদায় জানালো আর কবে জয়েন করছি এইসব খোঁজখবর নিলো। আগস্ট মাসের ৩১ তারিখে প্রায় পৌনে তিনমাস ইন্টার্ণশীপ শেষে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসি।

মাইক্রোসফটএ ফুল টাইম এম্পলয়ী হিসেবে জয়েন করি ২০০৮ সালের জানুয়ারীতে এক প্রচন্ড তুষারপাত এর সকালে। পরের পর্বগুলোতে থাকবে মাইক্রোসফট ব্যবসা, প্রযুক্তি, এবং কম্পানী কালচার নিয়ে টুকিটাকি – ব্যক্তিগত কথাকে এখানেই বিদায়!

আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা এমন এক বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছি, যা বসবাসযোগ্য নয়, যা একটি নর্দমায় পরিণত হয়েছে।

আমরা জনগণকে কোনো অধিকার দিই নি।

তাদের জীবিকার, শিক্ষার, চিকিতসার ব্যবস্থা করি নি।

গণতন্ত্রের নামে আমরা স্বৈরাচার চালিয়ে যাচ্ছি।

দুর্নীতিতে আমরা বারবার প্রথম স্থান অধিকার করছি।

এই আমাদের বাংলাদেশ, এই আমাদের সোনার বাংলা।

কিন্তু আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?

এমন দুস্থ, দুর্নীতিকবলিত, মানুষের অধিকারহীন, পঙ্কিল, বিপদসঙ্কুল, সন্ত্রাসীশাসিত, অতীতমুখী, প্রতিক্রিয়াশীল, ধর্মান্ধ, সৃষ্টিশীলতাহীন, বর্বর, স্বৈরাচারী বাংলাদেশ, যেখানে প্রতি মুহূর্তে দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়?

(হুমায়ূন আজাদের “আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?” হতে নেওয়া)

Advertisements