Monthly Archives: November 2009

আনফেয়ার লাইফ, বিউটিফুল লাইফ

এমন একটা জীবন আমরা যাপন করি যে জীবনে প্রবেশের আগে আমাদেরকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি এই জীবন আমরা চাই কি চাইনা। আমাদের ইচ্ছার কোনো খবর না নিয়েই আমাদেরকে এ জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

শুধু যে আমাদের অজান্তে আমাদেরকে এ জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তাই নয়, আমাদেরকে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যে দৌড়ের উপর রাখারও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এবং সেটা যাতে যথেষ্ঠ না হয়, তার সাথে দেওয়া হয়েছে রোগ-বালাই, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, নদী ভাঙ্গন, সুনামি ইত্যাদি। ভয়ংকর সব ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে, যেকোনো সময় আঘাত করে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে অনেক কষ্টে গড়ে তোলা একটা জীবন!

একটা শিশুর জন্ম হয় খুবই অসহায়ভাবে। বাবা-মা এবং অন্যান্য আপনজনের আদর-যত্ন ছাড়া শিশুটি বেড়ে উঠতে পারেনা। এক দেড় যুগ ধরে বাবা-মা’কে অনেক কষ্ট স্বীকার করে বড় করতে হয় একটা সন্তানকে। সেই অনেক যত্ন করে বড় করা মানুষটিকে তখন প্রবেশ করতে হয় বড় মানুষদের জীবনে, যুদ্ধ করতে হয় জীবনের পদে পদে। পড়ালেখায় ভালো করার যুদ্ধ। ভালো একটা চাকুরী কিংবা ব্যবসা করার যুদ্ধ। পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলা/এড়িয়ে চলার যুদ্ধ। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রোগজীবানুর সাথে যুদ্ধ। এইডস, ক্যান্সার, হার্টের অসুখ, চোখের অসুখ, দাঁতের অসুখ, প্যারালিসিস, পঙ্গুত্ব – কতো রকম অসুখ আর দূর্ঘটনা ওঁত পেতে আছে মানুষের জীবনটা দুর্বিষহ করে দেওয়ার জন্যে।

এরপর আছে সামাজিক এবং মানসিক কতো অসংখ্য যন্ত্রণা। স্বামীর অত্যাচার, স্ত্রীর সীমাহীন আবদার, নানারকম সম্পর্কের নানারকম টানাপোড়ন, এর ওর এটাসেটা কতো রকম চাওয়া পাওয়া পূরণের চাপ। আছে সমাজের বেঁধে দেওয়া নানান নিয়ম। আছে ধর্মের এটা করো ওটা কোরোনা। পরিবার এর ব্যাপারগুলি মোটামুটি সবজায়গায় দেখা গেলেও সমাজ এবং ধর্মের নিয়মকানুনগুলি মূলত জন্মের স্থান এর উপরই নির্ভর করে। একজনের জন্ম আফ্রিকার জঙ্গলে নাকি আমেরিকায় নাকি আফগানিস্তানে – এর উপর নির্ভর করে সমাজ এবং ধর্ম তার জীবনে কতোটা সুখ কিংবা কতোটা যন্ত্রণা দিবে। এই নিয়মগুলিও আমাদের জন্মের আগেই ঠিক হয়ে থাকে, আমাদেরকে কেউ জিজ্ঞেস করেনা কখনো আমরা সেগুলো চাই কিনা! এবং আমাদের চাওয়ার উপর ভিত্তি করে আমাদের জন্মস্থান নির্ধারণ করা হয়না।

অবশ্যই জীবনে অনেক সুখও আছে। আনন্দ আছে। কিন্তু জীব হিসেবে আমার মনে হয় সুখের তীব্রতার চেয়ে যন্ত্রণার তীব্রতা অনেক বেশি। একটা মানুষ সারা জীবন অনেক সুখ পেয়ে যদি পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে অসুখে কিংবা দূর্ঘটনায় বিকলাঙ হয়ে যায় তাহলে তার সেই সারা জীবনের সুখের কোনো মূল্য আছে তার জীবনে? আমাদের গ্রামের অসংখ্য মানুষ – নারীরা বিশেষ করে – সারা জীবন যে কষ্ট সংগ্রাম করে জীবন যাপন করে এবং সেভাবেই সংগ্রাম করতে করতে নিদারুণ দারিদ্র্যে মৃত্যুবরন করে পরিণত বয়সে, সেটা তো আমার নিজের চোখে দেখা। সেইসব মানুষের জীবনের কী মূল্য? জন্মের আগে তাদেরকে যদি বলা হতো “তোমরা এইভাবে দুঃখ-কষ্টে তোমাদের জীবন অতিবাহিত করবে, তোমরা কি এই জীবন নিতে চাও?”, কয়জন সেই জীবন নিতে রাজী হতো?

এরকম একটা অযাচিত, অজিজ্ঞাসিত জীবন আমরা যাপন করি। যে জীবনের বড় বড় নিয়মগুলি বেশিরভাগই আমাদের জন্মের আগে কিংবা জন্মের স্থানের সাথে ঠিক হয়ে যায়। জন্মের আগের সময় অথবা জন্মের স্থান – কোনোটির উপরই আমাদের কোনো ধরণের নিয়ন্ত্রণ নেই। রোগ-ব্যাধির উপর নিয়ন্ত্রণের অনন্ত চেষ্টায় আছে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান। কিন্তু দূর্ঘটনার উপর কতোটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে আমাদের? সুনামি কিংবা ভূমিকম্পের উপর?

পুরো ব্যাপারটিকে সবচেয়ে জটিল করে দেওয়া হয়েছে জীবনের প্রতি আমাদের সীমাহীন ভালোবাসা দিয়ে। এতো কষ্ট, এতো অনিশ্চয়তা, সমাজ আর ধর্মের এতো নিয়মের বেড়াজাল, জীবানুরুপী ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার এতো আক্রমণ, সুনামি আর ভূমিকম্পের আঘাত – এতো কিছুর পরও বেঁচে থাকার সেকি আকুলতা আমাদের, বেঁচে থাকতে কি যে সুখ! যতো যাই ঘটুক, “লাইফ ইজ বিউটিফুল” বলে এগিয়ে যাই আমরা। সব শক্তি একত্র করে যুদ্ধ করে যাই বেঁচে থাকার জন্যে, জীবনকে “বিউটিফুল” করার জন্যে।

হ্যাঁ, লাইফ মে নট বি ফেয়ার। বাট ইট ইজ বিউটিফুল। অন্তত আমরা সে চেষ্টাই করে যাই অবিরাম। আনফেয়ার প্রকৃতির বিরুদ্ধে অসহায়, ভঙ্গুর মানুষের জীবনকে বিউটিফুল করার যুদ্ধে মানুষ যাতে জয়ী হয় সবসময় সেজন্যে সবার জন্যে অনেক অনেক শুভকামনা।

Advertisements
Advertisements