কাছের মানুষগুলো


আমেরিকান লেখক এবং মোটিভেশনাল বক্তা জিম রন (http://en.wikipedia.org/wiki/Jim_Rohn) একটা চমৎকার কথা বলেছিলেনঃ “যে পাঁচ জন মানুষের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান আপনি সেই পাঁচজন মানুষের গড় (You are the average of the five people you spend the most time with.)”। এর মানে হচ্ছে আপনার বুদ্ধি হচ্ছে আপনার সবচেয়ে কাছের পাঁচ জন মানুষের গড় বুদ্ধির সমান। কথাটার মানে অবশ্য শুধু বুদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় – মানুষের চিন্তা-ভাবনার অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই কথাটা খাটে (যেমন রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি ব্যাপারে আমরা কাছাকাছি ভাবনার মানুষের সাথেই বেশি মিশে – আওয়ামীলীগ-মনা মানুষ আওয়ামীলীগারদের সাথে মিশে বেশি, বিএনপি-মনারা বিএনপি সমর্থকদের সাথে মিশে বেশি, রাজাকার এর ছানারা অন্য রাজাকার ছানাদের সাথে বেশি মিশে, হেফাজতপন্থীরা অন্য তালেবানী কাঠমোল্লাদের সাথে মিশে, ইত্যাদি ইত্যাদি)।

কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার দরকার নেই, তবে এটা বাস্তবতার প্রায় কাছাকাছি একটা সত্যি কথা! আমরা যাদের সাথে আমাদের জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটাই – আমাদের পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, অফিসের সহকর্মী – তাদের দ্বারা আমরা সব সময়ই প্রভাবিত হতে থাকি। যার সাথে যতো বেশি সময় কাটাবো তার দ্বারা ততো বেশি প্রভাবিত হবো। প্রভাব অবশ্য উভয় দিকেই যায় – আপনি প্রভাবিত হওয়ার পাশাপাশি আপনিও অন্যজনকে প্রভাবিত করবেন। তবে যার ব্যক্তিত্ব বেশি দৃঢ় তিনি বেশি প্রভাবিত করতে পারেন অন্যদেরকে।

এই কারণে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিখ্যাত প্রযুক্তি কম্পানী, সিলিকন ভ্যালী ইত্যাদি জায়গায় বুদ্ধিমান, সৃজনশীল মানুষের আনাগোনা বেশি। একবার কোনো কারণে স্মার্ট, ট্যালেন্টেড মানুষের সমাগম শুরু হলে সেখানে তাদের কারণে আরো বেশি স্মার্ট এবং ট্যালেন্টেড মানুষের আসা শুরু হয়। এইভাবে একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সিলিকন ভ্যালী’র মতো জায়গা গড়ে উঠে।

গুগল, ফেইসবুকের মতো বড় বড় টেক কম্পানীগুলোর নতুন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নেওয়ার সময় একটা লক্ষ্য থাকে নতুন ইঞ্জিনিয়ারের মেধা এবং দক্ষতা যাতে কম্পানীর গড় মেধা এবং দক্ষতার চেয়ে বেশি হয়। এভাবে এক এক জন নতুন ইঞ্জিনিয়ার নেওয়ার মাধ্যমে কম্পানীর ওভারঅল মেধা এবং দক্ষতা বাড়তে থাকে।

আমরা মানুষেরা সাধারণত প্রশংসার কাঙ্গাল (ফেইসবুকের লাইক বাটন উঠে গেলে আমাদের স্ট্যাটাসের সংখ্যা দশ ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে বলে আমার ধারণা!)। এটা দোষের কিছু নয় – প্রশংসা আমাদেরকে ভালো কিছু করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু প্রশংসার পাশাপাশি আমাদেরকে সমালোচনা গ্রহণ করার জন্যেও প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু আমরা প্রশংসার জন্যে যতোটা উদগ্রীব সমালোচনা শোনারা জন্যে আমরা প্রায়ই ততোটা প্রস্তুত থাকিনা। কিন্তু আমাদের বুদ্ধি, মেধা, এবং সৃজনশীলতার উন্নতি ঘটাতে হলে প্রশংসার চেয়ে সমালোচনা (গঠনমূলক সমালোচনা – নির্বিচার গালাগালি নয়!) বেশি জরুরী। আমরা যখন আমাদেরকে কম চিন্তাশীল, গাধা টাইপের মানুষ দিয়ে ঘিরে রাখি তখন আমরা প্রচুর প্রশংসা শুনতে পাই। কিন্তু আমরা যতোই মেধাবী, স্মার্ট, এবং সৃজনশীল মানুষ দিয়ে নিজেদের ঘিরে রাখবো ততোই আমাদের চিন্তার এবং কাজের সমালোচনা বাড়তে থাকবে। এবং এই সমালোচনার মাধ্যমেই আমাদের চিন্তা এবং কাজের মান আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে। আর মানুষ হিসেবেও আমরা চমৎকার মানুষ হয়ে উঠতে থাকবো।

কেউ এক গাদা প্রশংসা করলেই সে আমার খুব ভালো বন্ধু, আর কেউ আমার কোনো একটা ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিলে সে আমার বন্ধু নয় – এই ধরণের সস্তা টাইপের চিন্তা করলে কোনো দিন নিজের ব্যক্তিগত উন্নতি সাধন করা যাবে না।

কাছের প্রিয় মানুষগুলোর ভালো হওয়া জরুরী, স্মার্ট এবং সৃজনশীল হলে আরো ভালো। কিন্তু আপনি যদি শুধু নিজের গুনগান শোনার জন্যে তোষামোদ টাইপের মানুষ দিয়ে আপনার চারপাশ ভরে রাখেন (আমাদের অনেক নেতা/নেত্রীর মতো!) তাহলে আপনি যে মানুষ হিসেবে খুব ভালো, চমৎকার, দক্ষ একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারবেন না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত!

2 thoughts on “কাছের মানুষগুলো

  1. আপনার লেখা সবসময়ই আমার ভালো লাগে। এই লেখাটিও চমৎকার এবং গঠনমূলক। ধন্যবাদ।

  2. bilash says:

    Thanks Shoeb!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: