রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে না তাকিয়ে যেভাবে বাংলাদেশকে উন্নত করা যায়


shahbag_candlevigil

 

শাহবাগের যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলন এর মাধ্যমে মানুষের দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের জন্যে কিছু করার ইচ্ছা দেখে আমি অভিভূত।

রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই থাকুক না কেনো সবাই মোটামুটি একটা জায়গায় এসে একমত – বাংলাদেশকে একটা সমৃদ্ধ, আধুনিক, চমৎকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই সবাই। জামাত-শিবির এবং তাদের মতো জঙ্গি দলগুলো চাইবে আমাদেরকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো বানিয়ে ফেলতে। কিন্তু আমরা চাইলেই তাদের প্রায় চোখের সামনে দিয়ে আমাদের দেশটাকে একটা উন্নত এবং আধুনিক দেশে পরিণত করে ফেলতে পারি। এমনকি আওয়ামীলীগ এবং বিএনপিও যদি আমাদের বিরুদ্ধে যায় তবু আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারি!

বাংলাদেশকে উন্নত করতে চাইলে আমাদেরকে -আমাকে এবং আপনাকে – অংশ নিতে হবে এই কাজে। দেশের প্রতি ভালোবাসার জন্যে একদিনের মধ্যে যদি শাহবাগ লক্ষ মানুষের জনসমুদ্রে পরিণত হতে পারে তাহলে এই লক্ষ মানুষই পারবে দেশকে বদলে দিতে। এটা কোনো গোপন ব্যাপার নয় যে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি ক্ষমতার যাওয়ার ব্যাপারে যতোটুকু আগ্রহী হবে দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখানোতে ততোটা আগ্রহী তারা হবে না। জামাত-শিবির এবং জঙ্গি দলগুলো ব্যস্ত দেশটাকে মধ্য যুগে ফিরিয়ে নেওয়াতে। জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র দলগুলো ব্যস্ত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বড় দলগুলোর ভাড়া খাটায়। এই অবস্থায় দেশটাকে উন্নত করার, সমৃদ্ধ করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আসলে আমাদের সাধারণ মানুষের হাতে, ছাত্র-শিক্ষক-চাকুরিজীবি-ব্যবসায়ী-শ্রমজীবি মানুষের হাতে।

মনে হতে পারে আমরা একটা তৃতীয় রাজনৈতিক দল তৈরি করতে পারি। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির মতো দলের শেকড় বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। একদিন হঠাৎ করে আমরা একটা রাজনৈতিক দল করবো আর মানুষ দলে দলে আমাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাবে সেটি হবার নয়! অনেক অনেক দিন (কয়েক দশক!) ধরে চেষ্টা করলে হয়তো একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যাবে কিন্তু সেটাও নিশ্চিত নয়, এবং এই দীর্ঘ সময়ে আসলে আমরা দেশের জন্যে অনেক বেশি কিছু করে ফেলতে পারতাম। সবচেয়ে বড় কথাঃ আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে একটা সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে পরিণত করা, ক্ষমতায় যাওয়া নয়!

তাহলে কিভাবে আমরা খুব সহজে রাজনৈতিক দলগুলোর নাকের ডগা দিয়ে আমাদের দেশটাকে একটা সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে পরিণত করতে পারবো?

বাংলাদেশকে একটা চমৎকার এবং সুখী দেশে পরিণত করতে হলে আমাদেরকে বাংলাদেশের মানুষগুলোর প্রত্যেককে একেকজন চমৎকার এবং সুখী মানুষে পরিণত করতে হবে! বাংলাদেশ মানে যতোটা না ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটা ব-দ্বীপ তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ষোল কোটি মানুষ। একটা দেশকে সঙ্গায়িত করে তার মানুষেরা। আমাদেরকে ক্ষমতায় কে আছে সেটা না ভেবে নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের এবং কাছের মানুষদের চমৎকার মানুষে পরিণত করতে হবে। দেশের জন্যে কিছু করার এই পদ্ধতির নাম আমি দিয়েছি “মুহম্মদ জাফর ইকবাল মডেল”। জাফর ইকবাল স্যার যেমন কোনো ব্যক্তিগত লোভ বা স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে, কোনো দলের দিকে না তাকিয়ে, “একজন মাহাথির” এর অপেক্ষায় না থেকে একেবারে নিজে থেকে নিজের মতো করে দেশের জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন – নিজের বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করে যাচ্ছেন, দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে উদ্দীপ্ত করে যাচ্ছেন – আমাদেরকে সেভাবেই কোনো স্বপ্নের দল বা ব্যক্তির অপেক্ষা না করে দেশের জন্যে কাজ করে যেতে হবে। প্রত্যেকে নিজের অবস্থানে থেকে কাজ করে গেলে বাংলাদেশকে একটা উন্নত দেশের পরিণত করতে খুব বেশি সময় লাগবেনা। শুধু দেশকে নিয়ে স্বপ্নটাকে জিইয়ে রাখতে হবে, কখনো হতাশ হলে চলবেনা, নিজের নাম কামাইয়ের কথা ভুলে যেতে হবে, ফেইসবুকে কয়টা লাইক পেলাম সেটার কথা ভুলে কাজ করে যেতে হবে।

দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চাইলে আমাদের প্রথমে তিনটা মূল জিনিস নিয়ে কাজ করতে হবেঃ নিজেকে এবং আশে পাশের সবাইকে একটা চমৎকার বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, মানুষের মনে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আনার জন্যে কাজ করতে হবে, এবং দেশের মানুষের শারীরীক এবং মানসিক স্বাস্থের জন্যে কাজ করতে হবে।

আসুন দেখি এই তিনটা জিনিস কিভাবে আমাদের দেশের চেহারা বদলে দিতে পারে। কিভাবে জামাত-শিবির এর মতো জঙ্গি দল এবং তাদের মদদ-দাতা দলগুলোর চোখের সামনে দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে তাদেরকে অস্তিত্বশুন্য করে দিতে পারি কোনো রকম সহিংসতা ছাড়াই।

একটা চমৎকার বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষাঃ

রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ধর্ম নিয়ে আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের কারো মধ্যে কোনো দ্বিমত নাই। মধ্যাকর্ষণ নিয়ে সবাই একমত, কার-বাস-ট্রাক চলার প্রযুক্তি নিয়ে সবাই একমত, রাস্তা বানানোর ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়েও সবাই একমত। বিজ্ঞানে কোনো হাঙ্কি-ফাঙ্কি নাই। সবকিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই এরপর কোনো কিছুকে নিশ্চিত বলে ঘোষনা করা হয়। তাই বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলে কিংবা মানুষ বিজ্ঞান মনষ্ক হলে মানুষের চিন্তা ভাবনা অনেক যৌক্তিক হয়। কোনো কিছু ভালো করে যাচাই বাছাই না করে মানুষ তখন আর বিশ্বাস করে না। বগুড়ার যে মানুষগুলো সাইদিকে চাঁদে দেখা গিয়েছে বলে রাতের বেলা ঘুম থেকে উঠে ছুটে যেয়ে থানা আক্রমণ করতে গিয়েছে তারা বিজ্ঞান মনষ্ক হলে কোনোদিন সাইদিকে চাঁদে দেখতো না। বিজ্ঞান মনষ্ক মানুষকে সাইদি তার ওয়াজ-মাহফিলে বেহেশতের টিকেট দিতে পারবেনা। মানুষ যখন ক্রিটিকাল থিঙ্কিং করে তখন কোনো গুজবে তাকে বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা যাতে আধুনিক বিজ্ঞান-ভিত্তিক হয় সে ব্যাপারে আমাদের কাজ করতে হবে। বিশ্বজগতের বিবর্তন, জীবজগতের বিবর্তন, পৃথিবীর জন্মের পর থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন বছরের বিবর্তন, মানুষের গুহা মানব থেকে উঠে এসে আজকের এই অবস্থায় আসার ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটা মুখস্ত-নির্ভর পরীক্ষার ব্যবস্থা থেকে উদ্ধার করে মস্তিষ্ককে ব্যবহার করার ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। মানুষ তার মস্তিস্কের ক্ষমতার এক ক্ষুদ্রাংশ ব্যবহার করে; আমাদেরকে মস্তিস্কের সেই ব্যবহৃত অংশের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যে কাজ করতে হবে।

এটা ঠিক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার যদি তার দায়িত্ব ঠিকভাবে না করে (ইচ্ছা এবং/অথবা যোগ্যতার অভাবে) – যেটার সম্ভাবনাই বেশি – তাহলে আমাদেরকে আমাদের মতো করে কাজ করে যেতে হবে। শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সাইদ স্যার কয়েক দশক ধরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র দিয়ে আমাদের আলোকিত করার কাজ করে যাচ্ছেন; জাফর ইকবাল স্যার, মুনীর হাসান ভাই আর তাদের সাথে শত শত তরুণ তরুণী গণিত, ভাষা, বিজ্ঞান, এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে; রাগীব হাসানের শিক্ষক ডট কম বিনামূল্যে দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স। এগুলো হচ্ছে যেগুলোর খবর আমরা জানি। আমাদের জানার বাইরে কতো অসংখ্য মানুষ তাদের মতো করে শিক্ষা বা শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বই লিখে, পত্র-পত্রিকায় লিখে, ব্লগ লিখে, কিংবা কনফারেন্স-সেমিনার-বক্তৃতা আয়োজন করেও অনেকে দেশের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। সবকিছুর উপরে, সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বাবা-মা’রা। অন্যদের জন্যে কী করছেন সেটি যতোটা না গুরুত্মপূর্ণ তার চেয়ে গুরুত্মপূর্ণ হচ্ছে নিজের ছেলেমেয়েদের একটা চমৎকার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। স্কুল-কলেজে তারা যাই শিখুক না কেনো আপনি আপনার সন্তানকে একজন মানবিকতাবোধসম্পন্ন, বিজ্ঞান মনস্ক, যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। চিন্তা করে দেখুন বাংলাদেশের সব বাবা-মা যদি তাদের সন্তানদের একজন চমৎকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে তাহলে বাংলাদেশ কতো সহজে একটা আধুনিক এবং উন্নত দেশে পরিণত হতে পারে?

মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাঃ

আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভূমিকায় আছে এই কথাগুলোঃ

“We hold these truths to be self-evident, that all men are created equal, that they are endowed by their Creator with certain unalienable Rights, that among these are Life, Liberty and the pursuit of Happiness.”

অর্থাৎ – “আমরা এই সত্যগুলিকে স্বতসিদ্ধ বলে জানিঃ সকল মানুষ সমান অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়; এবং সবাই সৃষ্টিকর্তা হতে কিছু অধিকার জন্মগতভাবে পায় যার মধ্যে আছে বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাধীনভাবে জীবন ধারণের অধিকার, এবং নিজের জীবনে সুখী হওয়ার অধিকার”।

সেই ১৭৭৬ সাল থেকে আমেরিকার শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হচ্ছে এই কথাগুলো। সব মানুষ সমান। কেউ কারো থেকে বড় বা ছোট নয়। আইন সবার জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য। খেটে খাওয়া শ্রমিক থেকে শুরু করে বিলিওনেয়ার শিল্পপতি সবার আইনের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে সমান।

আমাদের বাংলাদেশে আমরা ছোটকাল থেকে শিখি “বড়দের সম্মান করো”, “গুরুজনকে মান্য করো”, “শিক্ষকদের সম্মান করো”, “তোমার বসকে সম্মান করো”, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের কখনোই শেখানো হয়নি যে *সব* মানুষকে সম্মান করো, শ্রদ্ধা করো, ভালোবাসো! ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; খেটে খাওয়া রিকশাওয়ালাকে শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; কঠোর পরিশ্রম করা গার্মেন্টস কর্মীদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; ঘরের কাজ করার মানুষগুলোকে শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; আপনি অফিসের বড় কর্তা হলেও আপনার অধস্তনদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়। কার পকেটে বা ব্যাংকে কতো টাকা আছে কিংবা কে কতো চমৎকার বাসায় থাকে, বা কে কতো দামী জামা-কাপড় পরে এগুলো মনে না রেখে মানুষের সাথে মিশলে আমি কী হনুরে অসুখ থেকে বাঁচা যায়।

যে কারণেই হোক আমাদের সমাজে সব মানুষকে সমান করে দেখার অবস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি। প্রাচীন মুসলমান সমাজে ছিলো আশরাফ-আতরাফ ভেদাভেদ, হিন্দু সমাজে ছিলো বর্ণ সমস্যা। “সম্ভ্রান্ত বংশ” বলে একটা চরম অমানবিক শ্রেণী প্রথা এখনো চালু আছে আমাদের সমাজে।

শুধু দেশ দিয়ে নয়, সারা পৃথিবীর জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য – পৃথিবীর সকল মানুষ সমান! আমার দেশ পৃথিবীর সেরা দেশ সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি, কোনো পরম মানদন্ডে সেটি সত্যি নয়। তেমনিভাবে আমার ধর্ম পৃথিবীর সেরা ধর্ম সেটাও আমার একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতি, কোনো পরম মানদন্ডে সেটি সত্যি নয়। পৃথিবীর প্রতি এক’শ জন মানুষের মধ্যে প্রায় দুইজন আমার দেশের মানুষ, প্রতি এক’শ জন মানুষের মধ্যে প্রায় একুশ জন আমার ধর্মের মানুষ, তাই আমার দেশ বা আমার ধর্ম পৃথিবীর সবার দেশ বা ধর্মের উপরে এই ধরণের চিন্তা করা মানে পৃথিবীর একটা বড় অংশের মানুষকে আমার থেকে ছোট করা হয় (আসলে তো নিজেকেই নিজে ছোট করা হয়)!

জন্মস্থানের কারণে, ধর্মের কারণে, বংশের কারণে, গায়ের রঙ এর কারণে, পেশা’র কারণে কাউকে নিজের থেকে ছোট ভাবার মতো অমানবিক আর কিছুই হতে পারে না!

আমাদের সবার মাঝে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে কাজ করতে হবে। এই শিক্ষা সবার আগে শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যদি দেখে তাদের বাবা-মা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে, কিংবা ঘরের কাজ করার মানুষকে নির্যাতন করছে, অসম্মান করছে, তাহলে সেই ছোট ছেলেমেয়েগুলো বড় হয়ে নিজেরাও তাই করবে। বাবা-মা’র উচিৎ ছেলেমেয়েদের মধ্যে সব ধরণের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসাবোধ তৈরি করে দেওয়া।

একজন মানুষ তখনই দেশের জন্যে কিছু করতে উদবুদ্ধ হবে যখন তার মধ্যে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকবে। কেউ দেশের জন্যে কিছু করতে চায় – এই কথাটার মানে হচ্ছে সে দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চায়! তাই দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি করার পুর্বশর্ত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মানুষকে ভালোবাসে এমন মানুষ তৈরি করা!

একটা সুস্থ এবং শক্ত শরীর (এবং মন):

আমাদের দেশে সব সময় অবহেলিত একটা বিষয় হচ্ছে সুস্বাস্থ্য। পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব হচ্ছে শরীর এর মাধ্যমে অথচ আমাদের বড় হয়ে উঠার মধ্যে শরীর নিয়ে কোনো শিক্ষা বা প্রচার একেবারে নাই বললেই চলে! আমার শরীর যে একটা খুবই গুরুত্মপূর্ণ জিনিস এবং আমার যে এই শরীরকে অনেক যত্ন নেওয়া উচিৎ, অনেক শক্ত করে তোলা উচিৎ এটা আমাকে খুব বেশি কখনো বলা হয়নি। শরীরের প্রতি যত্ন ব্যাপারটা “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল” ভাবসম্প্রসারণ এর মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে আমাদের জীবনে।

শরীর যে একটা গুরুত্মপূর্ণ জিনিস এটা আমি সত্যিকারভাবে বুঝতে পারি বিদেশে পড়তে আসার পর। এখানে বেশিরভাগ মানুষেরই চমৎকার স্বাস্থ্য, রাস্তায় বেরুলেই মানুষজনকে সকাল বিকেল দৌড়াতে দেখি, জিমে গেলে দেখা যায় সবাই শরীরকে শক্ত করার জন্য নানা ব্যায়াম করছে। এখানে সত্তর-আশি বছরের মানুষকে একা একা নিজের এবং ঘরের কাজ করতে দেখি যেখানে আমাদের দেশে ষাট এর পর বেশির ভাগ মানুষ এটা সেটা নানা অসুখ-বিসুখে কুপোকাত হয়ে পড়ে।

এখানে সব হাই স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সব ধরণের খেলাধুলার দল আছে এবং সেই স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই অলিম্পিকে যেয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পদক জিতে আসে। আমাদের বাংলাদেশে আমরা কয়জন ছেলেমেয়ে নিয়মিত খেলাধুলা করে বড় হয়েছি? আমরা কয়জন নিয়মিত ব্যায়াম করি?

আমাদের দেশের মানুষজনের শরীরের দিকে তাকালেই আমাদের শরীরের দৈন্য দেখা যায়, অযত্নের ছাপ দেখা যায়। বাংলা সিনেমা দেখলে হয়তো মনে হতে পারে আমরা অনেক স্বাস্থ্যবান কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা আসলে উলটা। আমাদের ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগই বয়স ত্রিশ পেরুতে না পেরুতেই নধর একটা ভুড়ি গজিয়ে ফেলে। কেউ কেউ ভুড়ি না গজিয়ে শীর্ণকায় হয়। ব্যাপারটা নিয়ে মজা করা যায় কিন্তু এটা আমাদের শরীরের প্রতি অযত্ন আর অবহেলার প্রমাণ দেয়।

শরীরের সাথে মনের সম্পর্ক খুব নিবিড়। শরীর যদি দুর্বল হয়, চর্বির ভারে পেট যদি গড়িয়ে পড়ে তাহলে সেই শরীরে একটা চমৎকার মন থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই শরীরের একটা বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিস্ক থাকাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। শরীরের প্রতি অযত্নের কারণে মানুষ আগে আগে বুড়িয়ে যায় এবং আমাদের মতো একটা গরীব দেশের জন্যে তখন অনেক বেশি অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে হয়। আমরা যদি আমাদের শরীরের যত্ন নিই, যদি একটা শক্তিশালী শরীর এবং ব্রেইন ধরে রাখতে পারি তাহলে বেশি বুড়ো হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অনেক বেশি দিন নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে, দেশের জন্যে কাজ করে যেতে পারি!

আমাদেরকে দেশের মানুষকে শরীর ভালো রাখার, শক্ত রাখার গুরুত্ম বোঝাতে হবে। রেডিও-টিভি, পত্র-পত্রিকায় এটা নিয়ে বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। যারা স্বাস্থ্য-পুষ্টি-মেডিক্যাল বিষয়ে জানেন তাদের এটা নিয়ে লেখালেখি করতে হবে, রেডিও-টিভিতে যেয়ে বলতে হবে।

একটা শক্ত শরীরের মানুষ একটা শক্ত মনের অধিকারী হয়। তখন সে জীবনে চ্যালেঞ্জ নিতে কম ভয় পায়, বেশি ঝুঁকি নিতে পারে, বেশি পরিশ্রম করতে পারে, নিজের ব্যররথতার জন্যে অন্যকে বা ভাগ্যকে দোষ দেয় না, নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজে নিয়ে নেয়, লটারি জেতার আশায় বসে থাকে না, মানুষের দোষ ত্রুটি খঁজে বেড়ায় না।

শেষ কথাঃ

দেশের উন্নয়ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আলাদা কোর্স আছে, এমনকি অনার্স-মাস্টার্স-পিএইচডি করার বিষয় পর্যন্ত আছে। আমি উন্নয়ন বিষয়ক পন্ডিত নই, কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্যে আমাদের বাংলাদেশের মানুষের পেছনে বিনিয়োগ করতে হবে সবার আগে। যাদের দ্বারা আমরা স্বপ্ন দেখি, যাদের জন্যে আমরা স্বপ্ন দেখি, তাদেরকে উন্নত হওয়ার জন্যে আগে প্রস্তুত করতে হবে। এরপর এটা একটা পজেটিভ ফিডব্যাক লুপের মতো নিজেকে নিজে টেনে নিয়ে যাবেঃ একদল চমৎকার মানুষ আরেক দল চমৎকার মানুষ তৈরি করবে, তারা সবাই মিলে আরো চমৎকার মানুষ তৈরি করবে, এবং এভাবে এক সময় বাংলাদেশের বেশির মানুষ একেকজন স্বপ্নের মানুষে পরিণত হবে!

আর সেটি হবে তখন আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ!

2 thoughts on “রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে না তাকিয়ে যেভাবে বাংলাদেশকে উন্নত করা যায়

  1. Jamil Kawsar says:

    Bilash vai, well written.

  2. Md. Mizanur Rahman says:

    Same to jamil….Bilash vai, well written.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: