বুক রিভিউ – সেপিঅ্যান্সঃ মানব (প্র)জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

Sapiens-book

 

ইতিহাসের প্রফেসর ইউভাল হারারির Sapiens: A Brief History of Humankind বইটা গত বছর বের হওয়ার কয়েক মাস আগেই আমাজন ডট কমে প্রি-অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু নানা ব্যস্ততায় গত এক বছরে বইটা আর পড়া হয়ে ওঠেনি। তাই গত কয়েক সপ্তায় একেবারে পণ করে প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা করে পড়ে বইটা অবশেষে শেষ করেছি! এত পছন্দের একটা বই আর এত কষ্ট (!) করে পড়লাম তাই ভাবলাম একটা রিভিউ লিখে ফেলি!

বইটা চারশ পৃষ্ঠার চেয়ে সামান্য কয়েক পৃষ্ঠা বেশি, কিন্তু এর মধ্যে প্রফেসর হারারি মানুষের গত ৭০,০০০ বছরের ইতিহাসকে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন।

আমাদের মানুষের যেই প্রজাতি যাকে জীববিজ্ঞানের ভাষায় হোমো সেপিঅ্যান্স (Homo Sapiens) বলা হয় তার উদ্ভব গঠে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে। কিন্তু আমাদের সত্যিকারের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি শুরু হয় প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে। হারারি এটার নাম দিয়েছেন “বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব” (Cognitive Revolution)। ইতিহাস নামক যে বিষয়টা আমরা পড়ি বা জানি তার শুরু এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের সময় থেকেই। এর আগের মানুষের যে আমাদের মানুষের মত বুদ্ধি ছিল এর তেমন কোন প্রমাণও পাওয়া যায়না।

এই সময় আমরা ভাষার সৃষ্টি করি। মানুষের মাঝে যোগাযোগ অনেক দৃঢ় হয় ভাষার কারণে। মানুষ দল বেঁধে চলা শুরু করে। এবং পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বারের মত মানুষ আফ্রিকার জঙ্গল থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

মজার ব্যাপার হলো এই সময় মানুষের শুধু একটা প্রজাতি ছিল না। মানুষের প্রায় পাঁচ/ছয়টা প্রজাতি ছিল তখন। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল নিয়ান্ডারথাল (Neandarthal) মানুষেরা। কিভাবে নিয়ান্ডারথাল এবং অন্যান্য মানুষ প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হলো সেটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো একমত নয়।

প্রায় ১১,০০০ বছর আগে শুরু হয় “কৃষি বিপ্লব”। কৃষি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত মানুষ ছিল মূলত শিকারি (Hunter-gatherer)। মানুষ নানা জায়গায় ঘুরে ফিরে পশুপাখি শিকার কিংবা বিভিন্ন ধরণের পাতা-লতা-ফল-মূল খেয়ে বেঁচে থাকতো এবং এক জায়গায় বেশি দিন থাকতো না। কিন্তু কৃষি কাজ আবিষ্কারের পর থেকে মানুষ চাষের জমি নির্ধারণ করে এর চারপাশে বসতি গড়া শুরু করে। প্রফেসর হারারির মতে কৃষি বিপ্লব মানুষকে আগের চেয়ে অসুখী এবং দুর্বল করে দেয়। আগে মানুষ বিভিন্ন ধরণের পুষ্টিকর খাবার খেতে পারতো, শিকার করার কারণে মানুষের শরীর অনেক শক্ত ছিল। কিন্তু কৃষি কাজ করতে যেয়ে মানুষ এক ধরণের খাবার খেতে অভ্যস্ত হওয়া শুরু করে। আর কৃষি কাজের জন্যে ঝুঁকে ঝুঁকে কাজ করার ফলে মানুষের শারীরিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রায় ৫০০ বছর আগে শুরু হয় “বৈজ্ঞানিক বিপ্লব”। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের হাত ধরে আসে “শিল্প বিপ্লব” এবং গত কয়েক দশকে শুরু হয় “তথ্য বিপ্লব” এবং “জৈব-প্রযুক্তি বিপ্লব”।

বইটির মূল বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে মানুষ কিভাবে পৃথিবীতে রাজত্ব করতে পেরেছে যেখানে ৭০,০০০ বছরের আগেও মানুষের চেয়ে বন-মানব বা শিম্পাঞ্জির শক্তি অনেক বেশি ছিল এবং বুদ্ধিও প্রায় সমান পর্যায়ে ছিল। মানুষের কী সেই গুণ যার দ্বারা মানুষ অন্য সব পশু পাখি এবং পুরো পৃথিবীকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে?

এর উত্তর হারারি দিয়েছেন এভাবেঃ মানুষের রূপকথা (myth – মিথ) বা গল্প বানানো এবং সেই মিথ অন্যদের বিশ্বাস করানোর ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে মানুষের সাফল্যের মূলমন্ত্র। পুরো বই জুড়ে হারারি অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছেন মানুষের বানানো মিথের। যেমন – আমেরিকা একটা মিথ। বাংলাদেশ একটা মিথ। ফেইসবুক একটা মিথ। আমেরিকা, বাংলাদেশ, বা ফেইসবুক এই সব গুলোর অস্তিত্ব কিন্তু আমাদের মনে। আমেরিকা এবং বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে যেই মানুষগুলো থাকে তারা আমেরিকা এবং বাংলাদেশ নামক “দেশ” এর ধারণাকে মেনে নিয়ে এই মিথ তৈরি করেছে। কয়েক’শ বছর আগেও পৃথিবীতে কোন দেশ ছিল না। তখন ছিল সাম্রাজ্য – মিশরীয় সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য, অটোমান সাম্রাজ্য, অ্যাজটেক সাম্রাজ্য, ইনকা সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ইত্যাদি। তখন মিথ ছিল সাম্রাজ্য কেন্দ্রিক। এর আগের মিথ ছিল ধর্ম কেন্দ্রিক। এর আগে ছিল সারা পৃথিবী জুড়ে ছোট ছোট নানা গোত্র এবং গোষ্টি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সাম্রাজ্য, গোত্র, ধর্ম, কোম্পানি, দেশ, ইত্যাদি নানা ধারণার তৈরি করে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে।

তেমনিভাবে ফেইসবুক, গুগল, মাইক্রোসফট ইত্যাদি কম্পানী কিন্তু কিছু ধারণা ছাড়া আর কিছু নয়। এদের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নাই। সরকার নামে একটা মিথের মাধ্যমে আমরা কম্পানী নামের একটা মিথ এর আইনগত একটা অস্তিত্ব বজায় রাখি। সেই আইনও আরেকটা মিথ!

একটা খুব পরিচিত মিথ হচ্ছে টাকা। টাকা জিনিসটা বাস্তবে শুধু একটা কাগজ। কিন্তু আমরা সবাই টাকায় বিশ্বাস করি বলেই টাকার এত মূল্য। আগেকার দিনে সোনা ছিল টাকার মত বিনিময়ের মাধ্যম। এরও আগে ছিল রুপা।

প্রফেসর হারারির মতে আমরা মানুষেরা যে এক সাথে মিলে মিশে কাজ করতে পারি এর মূল কারণ হচ্ছে আমরা একদল অপরিচিত মানুষ মিলে একটা মিথ বানিয়ে বিশ্বাস করতে পারি এবং সেই বিশ্বাসের ছায়াতলে সবাই এক সাথে মিলে মিশে কাজ করতে পারি। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, কম্পানী ইত্যাদি হচ্ছে শক্তিশালী কিছু মিথের উদাহরণ। মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণী এভাবে গল্প বানিয়ে সেটাকে অন্যদের দ্বারা বিশ্বাস করাতে পারে না। একটা বানরকে কি কেউ মৃত্যুর পর স্বর্গে যাবে বলে তার হাত থেকে কলা নিয়ে নিতে পারবে?

ইতিহাস শেষ করে প্রফেসর হারারি এরপর বর্তমান নিয়েও অনেকগুলো চ্যাপ্টার ব্যয় করেন। সভ্যতার চাকার সাথে সাথে মানুষ যে সুখী হতে পারেনি তার পক্ষে নানা যুক্তি দেখিয়েছেন। এরপর তিনি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও বেশ কয়েক পৃষ্ঠা ব্যয় করেন। তাঁর ধারণা জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ এক সময় তার ক্ষমতাকে অনেক গুন বাড়িয়ে ফেলবে। এবং হাজার হাজার বছর পূর্বে মানুষ যে ঈশ্বরের ধারণা আবিষ্কার করেছিল মানুষ ধীরে ধীরে সেই ঈশ্বরের কাছাকাছি ক্ষমতা অর্জন করবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বইটার প্রতি আগ্রহী হওয়ার মূল কারণ ছিল পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্যে। প্রফেসর হারারি আমার সেই আশা পূরণ করেছেন। যেটা আমার ভালো লাগেনি সেটা হলো লেখক ইতিহাসের সাথে নিজের মতামত প্রদান করাকে পরম কর্তব্য জ্ঞ্যান মনে করে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলেছেন ইতিহাসকে মূল্যায়ন করার কাজে। এই কাজটা তিনি তাঁর পাঠকদের জন্যে রেখে দিলেই ভালো করতেন।

নীল তারা

blue-stars-1280x800

ছেলেটি মেয়েটিকে ডাকতো নীল তারা বলে।

এক অদ্ভুত কিন্তু আশ্চর্য সুন্দর সম্পর্কের জালে জড়িয়ে ছিল ওরা দু’জন।

প্রথম যেদিন মেয়েটি ওদের বাসায় আসে, ছেলেটি মেয়েটির দিকে তাকাতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো কী যেন ঘটে গেলো ওর মনে। এরপর বেশ কয়েক মাস মেয়েটি ওদের বাসায় ছিল। সেই কয়েক মাসে ওরা একজন আরেকজনের অনেক কাছে চলে আসে। মেয়েটি ছেলেটির চেয়ে বয়সে বড়। কিন্তু ওদের মানসিক বয়স ছিল একেবারে সমান – একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বোঝার এবং ভালো লাগার জন্যে যে বয়সে থাকতে হয় ঠিক সে বয়সটি।

মেয়েটির প্রেম ছিল আরেকজনের  সাথে। সে প্রেমে কোন খুঁত ছিল না। ছিল না আবেগের কোনো ঘাটতি। কিন্তু ছেলেটির সাথে পরিচয় হবার পর তাকেও মেয়েটির ভালো লাগতে শুরু করে। সে ভালো লাগা শুধুই ভালো লাগা, ভালোবাসা বা প্রেম নয়। কিন্তু কখনো কখনো ভালো লাগার তীব্রতা ভালোবাসার তীব্রতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়। ছেলেটির প্রতি মেয়েটির ভালো লাগা সেরকম তীব্র কিনা এই প্রশ্নের উত্তর মেয়েটি তার জীবনে কখনো খুঁজে পায়নি। কাকে বেশি ভালো লাগে – নিজের প্রেমিককে (পরবর্তীতে স্বামী) নাকি ছেলেটিকে – এ প্রশ্ন নিজেকে অসংখ্যবার করেও মেয়েটি কখনো কোনো উপসংহারে পৌঁছতে পারেনি।

গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত এসে চলে যায়; পৃথিবী তার আপন কক্ষপথে আর সূর্যের চারদিকে অবিরাম ঘুরতে থাকে। সেই ঋতু চক্রের ক্লান্তিহীন চলার মাঝে ছেলেটি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ও প্রেম শুরু করে এক সুন্দরী তরুণীর সাথে। এরপর এক মায়াময় হেমন্তের রাত্রিতে ছেলেটি তার সুন্দরী প্রেমিকাকে বিয়ে করে বউ হিসেবে ঘরে তুলে আনে। মেয়েটি অবশ্য এর অনেক আগেই বিয়ে করে তার প্রেমিক পুরুষকে। গত কয়েক বছরে ওদের মধ্যে যোগাযোগ অনেক কমে গিয়েছিল। নিজেদের সংসার জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় একে অপরকে খুব বেশি মিস করার সময়ই পায়নি।

নিজেদের জীবনে নিজ জীবন সঙ্গী নিয়ে ওরা মোটামুটি সুখেই ছিল। দৈনন্দিন একঘেয়ে জীবনের টুকটাক টানাপোড়ন ছাড়া ওদের ব্যস্ত সংসার জীবনে খুব বেশি অভিযোগ অনুযোগ ছিল না। কিন্তু ভাগ্য বিধাতার মনে হয় অন্য পরিকল্পনা ছিল!

চাকরির কারণে দুজনেই এক সময় একই শহরে এসে পড়ে। ওদের যোগাযোগটা তখন আবার শুরু হয় নতুন করে। তবে এবার ওদের দেখা-সাক্ষাৎ সব হয় পারিবারিকভাবে। দু’জনের দুই পরিবার আস্তে আস্তে খুব ঘনিষ্ট হয়ে আসে। সেই সাথে ফিরে আসে প্রথমবার দেখা হওয়ার সময়কার ভালোলাগা।

মেয়েটি বৃষ্টি ভালোবাসতো। এক অঝোর ধারার শ্রাবনের বিকেলে ছেলেটি একদিন এসেছিল মেয়েটির বাসায়। মেয়েটির স্বামী বাসায় ছিল না। বাচ্চারা ছিল ঘুমে। মেয়েটি সোফা থেকে উঠে যেয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায়, বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে সেই একই প্রশ্ন, যেটা আগেও সে অসংখ্যবার জিজ্ঞেস করেছিল ছেলেটিকে – “তুমি নিশ্চয়ই আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে পুরোপুরি পরিষ্কার?” ছেলেটি সোফা থেকে উঠে এসে পেছন থেকে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটির কানে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। এরপর ফিসফিস করে বলে – “আমি আমাদের সম্পর্ক নিয়ে পুরোপুরি পরিষ্কার। আমি আমার স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসি। তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে আমি অসম্ভব রেস্পেক্ট করি। তোমরা দুজনেই আমার এবং আমার স্ত্রীর খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু…”। ছেলেটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে যায়। “কিন্তু কী?” – মেয়েটি ঘুরে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে ছেলেটির গলা জড়িয়ে ধরে, দু’চোখ রাখে ছেলেটির দু’চোখে, আর ছেলেটি দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে মেয়েটির কোমরে। ওরা দু’জনেই মোটামুটি আঁচ করতে পারে এরপর ছেলেটি কী বলবে। ছেলেটি বলে – “আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি, তুমি ভালোবাসো তোমার স্বামীকে। কিন্তু আমরা দু’জনেই জানি আমরা একজন আরেকজনের সোল-মেট। আমি তোমাকে যেরকম জানি বুঝি, তুমি আমাকে যেরকম জানো বুঝো, পৃথিবীর আর কেউই আমাদের সেরকম জানেনা, বুঝেনা।” ছেলেটি এক সেকেন্ডের জন্যে থামে। গভীর আদরে চুমু খায় মেয়েটির কপালে। বলে – “আমাদের পৃথিবীতে জীবন একটাই। কিন্তু স্রষ্টা যদি আর কোনো জন্ম আমাদের জন্যে রেখে থাকে তাহলে সে জন্মে তুমি হবা আমার, শুধুই আমার নীল তারা”।

এভাবে চলতে থাকে ওদের ভেতরের আর বাইরের জীবন। এরপর আরো অনেক শ্রাবণ এসে চলে যায়। আকাশ কালো করে মেঘ জমে, তারপর আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেটি মনে মনে ভাবে “আচ্ছা, ও কি আমাকে মিস করছে?”

কিন্তু ভাগ্য বিধাতার এর পরের পরিকল্পনাটা ছিল বড়ই নিষ্ঠুর।

এক কঠিন অসুখ এসে বাসা বাঁধে মেয়েটির শরীরে। মেয়েটিকে সিঙ্গাপুরের সেরা হাসপাতালে নেওয়া হয়। ছেলেটি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সিঙ্গাপুর যায়। হোটেল থেকে সে প্রতিদিন নিয়ম করে হাসপাতালে যায়। মাঝে মাঝে ছেলেটি যখন হাসপাতালে যায় তখন কেউ না থাকলে ছেলেটি মেয়েটিকে হাতে তুলে খাইয়ে দেয়, হাতে পায়ে হালকা মাসাজ করে দেয়। দেখতে দেখতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠে। ছেলেটি মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

এরপর ওরা আবার ফিরে যায় ওদের আগের জীবনে। যদিও বিভিন্ন কারণে ওদের আগের মতো আর দেখা হয়না, শুধু মাঝে মাঝে এসএমএস বা ফোনে দু’এক মিনিট কিছুটা কথা হতো। অবশ্য সেই দুই একটি এসএমএস কিংবা দুই এক মিনিট কথাতেই ওরা ওদের সব ভাব বিনিময় করে ফেলতে পারতো। মনে হয় ওদের একজনের মনের কথা আরেকজন ঠিকই টেলিপ্যাথি কিংবা অদৃশ্য ইথারে কান পেতে পড়ে নিতে পারে।

ছেলেটি প্রায়ই ভাবতো – পৃথিবীতে কি খুঁতহীন পারফেক্ট কিছু আছে? মেয়েটির প্রতি ওর যে ভালো লাগার  অনুভূতি, সেটা তো প্রায় পারফেক্ট। প্রকৃতি কি এই পারফেকশন মেনে নিতে পারবে?

প্রকৃতি আসলেই মেয়েটির প্রতি ছেলেটির এই অদ্ভুত সুন্দর ভালো লাগার অনুভূতি বেশিদিন সহ্য করলো না। কিছুদিন পর মেয়েটির সেই কঠিন অসুখ আবার ফিরে আসে। এবার দেখা গেল সেটা আরো ভয়ঙ্কর রূপে ফিরে এসেছে। মেয়েটির স্বামী ওকে আবার সিঙ্গাপুরের সেই হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখানকার সেরা ডাক্তাররা ওর চিকিৎসা করতে থাকে। কিন্তু ভাগ্য বিধাতা সম্ভবত পণ করে বসেছিল এবার যে কোনভাবেই মেয়েটিকে ভালো হতে দিবে না।

কয়েক সপ্তাহ জীবন মৃত্যুর মাঝামাঝি যুদ্ধ করে মেয়েটি আরেক অঝোর ধারার শ্রাবণের এক বিষণ্ণ বিকেল বেলা এই পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেয়।

মেয়েটির মৃত্যু ছেলেটির পৃথিবীকে পুরোপুরি উল্টেপাল্টে দেয়। কিন্তু ও সেটা কাউকে বলতে পারেনা, বুঝাতে পারেনা। পৃথিবীতে কেউ জানেনা ওদের কথা। জীবনের সবচেয়ে কষ্টের একটা সময় ওর শুধু অদৃশ্য অশ্রু  ঝরিয়ে পার করে দিতে হয়েছে। ওর নীল তারা আর নাই। ওর সব প্রশ্নের উত্তর যে দিতে পারতো সেই মানুষটি আর নাই। যার মুখ দেখলে ওর জীবনটাকে অনেক সুন্দর মনে হতো সেই মানুষটা আর নাই।

সেই মৃত্যুময় শ্রাবণের এক দিনে ছেলেটি অফিসের বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পুরো শহরকে ধুয়েমুছে দিচ্ছে। কিন্তু ছেলেটির মনে সারা পৃথিবীর সব কষ্ট এসে আটকে আছে। ছেলেটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখে। আর কোনো দিন নীল তারার সাথে ওর বৃষ্টি দেখা হবেনা ভেবে বুকটা এক অসীম শূন্যতায় ভরে ওঠে। ও জানে ওর নীল তারা আজ আর এই শহরে নাই, এই বৃষ্টি শুধু মিছে মিছিই ঝরে পড়ছে আজ। নীল তারা আর কোনো দিন হাসবেনা ওর চোখে চোখ রেখে, হাতে হাত রেখে। আর কোনো দিন বলবেনা বৃষ্টি সে কতো ভালোবাসে।

নীল তারা আর নাই।

নীল তারা চলে গেছে।

মানুষ কেন পৃথিবীর রাজা

yuval_harari_ted1

(Translation of the article Why humans run the world by Yuval Noah Harari)

৭০,০০০ বছর আগে মানুষ ছিল অতি তুচ্ছ এক প্রাণী। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ কথা হচ্ছে যে তারা খুব অগুরুত্মপূর্ণ ছিলো। এই পৃথিবীতে তাদের প্রভাব ছিল খুবই কম, জেলি ফিশ, কাঠ-ঠোকরা, বা মৌমাছির চেয়েও  কম।

বর্তমান সময়ে অবশ্য মানুষ পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই অবস্থা থেকে আমরা কিভাবে আজকের এই অবস্থায় এলাম? আমাদের সাফল্যের সেই গোপন রহস্য কী – যার দ্বারা আমরা আফ্রিকার এক কোণায় অতি তুচ্ছ, অগুরুত্মপূর্ণ নরবানর থেকে পৃথিবী দাবড়িয়ে বেড়ানো প্রাণীতে পরিণত হলাম?

আমরা প্রায়ই অন্য প্রাণীদের সাথে আমাদের পার্থক্য দেখার সময় শুধু শারীরিক পার্থক্যের কথা চিন্তা করি। আমরা ভাবতে ভালোবাসি যে আমাদের শরীর অথবা আমাদের মস্তিষ্ক খুবই বিশেষ কিছু যার কারণে একজন মানুষ একটা কুকুর, একটা শুয়োর, বা একটা শিম্পাঞ্জির চেয়ে অনেক মহান। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে যে – মানুষ আর শিম্পাঞ্জি প্রায় একই রকম। একজন মানুষ আর একটা শিম্পাঞ্জিকে যদি একটা দ্বীপে একাকী ছেড়ে দেওয়া হয় এটা দেখার জন্যে যে কে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে বেশি টিকে থাকতে পারবে, তাহলে আমি নিশ্চিত যে শিম্পাঞ্জিটি অনেক ভালোভাবে বেঁচে থাকবে মানুষটির চেয়ে।

মানুষের সাথে অন্য প্রাণীদের আসল পার্থক্য হচ্ছে সমষ্টিগত পর্যায়ে।

আমরা মানুষেরা পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করি কারণ আমরাই একমাত্র প্রাণী যারা অনেক বেশি সংখ্যায় এক সাথে থেকে নিজেদের মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে পারি। পিঁপড়া এবং মৌমাছিরাও অনেকে এক সাথে কাজ করতে পারে, কিন্তু তারা সেটা করে একটা অনমনীয়, ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে থেকে। একটা মৌচাকের মৌমাছিরা যদি কোন নতুন হুমকির মুখে পড়ে, কিংবা নতুন কিছু করার সুযোগ পায়, সেই মৌমাছিরা রাতারাতি তাদের সমাজব্যবস্থা পাল্টে ফেলে সেই নতুন হুমকি কিংবা সুযোগ এর সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ – তারা তাদের মৌচাকের রানীকে মেরে ফেলে একটা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। চিতা বাঘ এবং শিম্পাঞ্জিরা মৌমাছিদের চেয়ে অনেক কম ধরাবাঁধা এবং বেশি নমনীয় নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু তারা সেটি করতে পারে শুধু পরিচিত কিছু অন্য চিতা বাঘ এবং শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে। চিতা বাঘ এবং শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারটা শুধুমাত্র একই গোত্রের  পরিচিত অন্য প্রাণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমি যদি একটা শিম্পাঞ্জি হই এবং আপনি যদি আমার সাহায্য চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই আমার ব্যক্তিগতভাবে চিনতে জানতে হবেঃ আপনি কেমন শিম্পাঞ্জি? আপনি কি একটা ভালো শিম্পাঞ্জি? আপনি কি একটা খারাপ, মতলববাজ শিম্পাঞ্জি? আপনাকে না চিনলে আমি কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

শুধুমাত্র হোমো স্যাপিএন্স রাই অসংখ্য অজানা, অচেনা মানুষের সাথে কোন ধরাবাঁধা নিয়ম না মেনে এক সাথে কাজ করে যেতে পারে। একটা শিম্পাঞ্জি হয়তো একজন মানুষের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে, এমনকি দশটা শিম্পাঞ্জি হয়তো দশটা মানুষের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু এক হাজার জন মানুষ অনায়াসে এক হাজারটা শিম্পাঞ্জিকে কাবু করে দিতে পারবে – শুধুমাত্র এই কারণে যে এক হাজারটা শিম্পাঞ্জি নিজেদের মধ্যে ঠিক মতো সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারবে না। এক লাখ শিম্পাঞ্জিকে ওয়াল স্ট্রিট কিংবা ইয়াঙ্কি স্টেডিয়ামে রেখে দেখেন – সীমাহীন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। কিন্তু এক লাখ মানুষকে সেখানে রাখেন – তারা আস্ত একটা ফাইনান্স ইন্ডাস্ট্রি বানাবে আর চমৎকার একটা বেইসবল খেলা খেলবে!

একদল মানুষ এক সাথে হয়ে সহযোগিতা করা অবশ্য সবসময় ভালো কাজের জন্যে নাও হতে পারে। মানুষের দ্বারা সঙ্ঘটিত পৃথিবীর ইতিহাসের সব জঘন্য কাজও একদল মানুষের সহযোগিতারই ফসল। কারাগার, গুয়ান্তানামো বে, নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প – এগুলোও মানুষ পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে বানিয়েছিল। শিম্পাঞ্জিরা কখনো কারাগার, গুয়ান্তানামো বে, নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানায় না।

তাবৎ প্রাণীকুলের মধ্যে কেবল মানুষরাই অনেকে মিলে এক সাথে খেলে, বা ব্যবসা করে, বা খুন করে কেনো?

এর উত্তর হচ্ছে আমাদের কল্পনা শক্তি।

আমরা একসাথে অসংখ্য অজানা, অপরিচিত মানুষের সাথে কাজ করতে পারি কারণ আমরা গল্প বানাতে পারি, সেই কল্প-গল্প আমরা মানুষে মানুষে ছড়িয়ে দিতে পারি, এবং লক্ষ কোটি মানুষকে সেই গাল-গল্প সত্য কাহিনী বলে বিশ্বাস করাতে পারি। যখন সবাই একই কল্পকাহিনী বিশ্বাস করে, একই নিয়মকানুন মেনে চলে – তখন সবাই মিলে মিশে একসাথে কাজ করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

এটা শুধু মানুষেরাই করতে পারে। আপনি একটা শিম্পাঞ্জিকে কখনোই আপনাকে একটা কলা দেওয়াতে পারবেন না এই বলে যে মৃত্যুর পর শিম্পাঞ্জিটি শিম্পাঞ্জিদের বেহেশতে যাবে এবং তার ভালো কাজের পুরস্কার স্বরূপ শিম্পাঞ্জিদের বেহেশতে অসংখ্য কলা পাবে। কোন শিম্পাঞ্জিই এই ধরণের কল্প-গল্প বিশ্বাস করবে না! শুধুমাত্র মানুষই এই ধরণের কল্প-গল্প বিশ্বাস করে। এবং ঠিক সে জন্যেই আমরা মানুষেরা পৃথিবী শাসন করি। আর শিম্পাঞ্জিরা চিড়িয়াখানা কিংবা ল্যাবরেটরিতে খাঁচার মধ্যে আটকা থাকে।

একই ধর্মের মানুষের মধ্যে ঠিক এভাবেই একই ধরণের কল্প-গল্প বিশ্বাসের মাধ্যমে এক ধরণের সহযোগিতা গড়ে উঠে। অনেক মানুষ মিলে একটা গির্জা বানায়, কিংবা দল বেঁধে ক্রুসেডে (ধর্মযুদ্ধ) যায় – কারণ তারা সবাই ঈশ্বর এবং বেহেশত নিয়ে একই ধরণের গল্প বিশ্বাস করে। এটা শুধু ধর্ম নয়, বড় ধরণের সহযোগিতার সব জায়গায়ই একই ব্যাপার কাজ করে।

উদাহরণস্বরূপ – আইনের প্রতিষ্ঠানগুলোর কথাই ধরুন। বর্তমানের প্রায় সব আইনি প্রতিষ্ঠানগুলই মানবাধিকারের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু মানবাধিকার জিনিসটা একটা বায়বীয় কল্প-গল্প, ঈশ্বর আর ধর্মের ধারণার মতন। বাস্তবে মানুষের কোনো অধিকার নাই। যেমনটি নাই শিম্পাঞ্জি এবং চিতা বাঘের। একটা মানুষের শরীরকে কেটে দেখেন, সেই শরীরের ভেতরে অধিকার বলে কিছু নাই। মানবাধিকার ব্যাপারটা শুধু আমাদের কল্পনাতেই আছে, আর আছে আমরা মানবাধিকার নিয়ে যে সব কল্প-গল্প বানাই সেখানে। মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা একটা আকর্ষনীয় ব্যাপার হতে পারে – কিন্তু ব্যাপারটা শুধুমাত্র একটা কল্প-গল্প।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সত্যি। দেব-দেবী এবং মানবাধিকারের মতোই “জাতি” এবং “দেশ” এর ব্যাপারটা একটা বানানো জিনিস। একটা পাহাড়ের বাস্তব অস্তিত্ব আছে। আপনি পাহাড়কে দেখতে পারেন,স্পর্শ করতে  পারেন, এর গন্ধ নিতে পারেন। কিন্তু আমেরিকা বা ইজরায়েল এর কোন ভৌত অস্তিত্ব নাই। আপনি আমেরিকা বা ইজরায়েলকে দেখেন না, স্পর্শ করতে পারেন না, কিংবা গন্ধ নিতে পারেন না। এগুলো হচ্ছে এক ধরণের কল্প-গল্প যেটা মানুষ আবিষ্কার করেছে এবং এরপর সেই কল্প-গল্পের সাথে খুব আপন হয়ে গিয়েছে।

অর্থনৈতিক জোটগুলোর ব্যাপারটাও একই। একটা ডলারের নোট হাতে নিয়ে দেখেন। কাগজ হিসেবে এর কোন মূল্যই নাই। আপনি এটাকে খেতে পারবেন না, পরতে পারবেন না। কিন্তু বড় বড় গল্পবাজ, যেমন ফেডারাল রিজার্ভের চেয়ারম্যান অথবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, এসে আপনাকে বলবে যে এই ডলারের নোটটির বিনিময়ে আপনি পাঁচটা কলা পাবেন। যতক্ষণ লক্ষ কোটি মানুষ এই গল্পটি বিশ্বাস করবে ততক্ষণ এই ডলার নোটটির মূল্য সত্যি সত্যিই পাঁচটা কলার সমান! আমি ডলারের সেই নোটটি নিয়ে একটা ফলের দোকানে যেয়ে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত ফল বিক্রেতাকে নোটটা দিলে সে সত্যি সত্য আমাকে পাঁচটা কলা দিয়ে দিবে। এখন একটা শিম্পাঞ্জিকে এই ডলারের নোটটি দিয়ে পাঁচটা কলা নেয়ার চেষ্টা করেন দেখি।

সত্যি কথা বলতে কি, টাকা সম্ভবত মানুষের আবিষ্কার করা সবচেয়ে সফল কল্প-গল্প। পৃথিবীর সব মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, সবাই মানবাধিকারেও বিশ্বাস করে না, এমনকি অনেক মানুষ আছে যারা আমেরিকার অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু সবাই টাকায় বিশ্বাস করে, ডলারের নোট সবার কাছেই সমান প্রিয়। এমনকি ওসামা বিন লাদেনও টাকায় বিশ্বাস করে। ওসামা বিন লাদেন আমেরিকাকে ঘৃণা করতো, আমেরিকার রাজনীতি এবং আমেরিকার সংস্কৃতি সবই সে ঘৃণা করতো – কিন্তু সে আমেরিকান ডলার খুবই পছন্দ করতো। ডলার নামক কল্প-গল্পে তার কোন আপত্তি ছিল না।

উপসংহারে আবার বলি – মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্য সব প্রাণী নৈর্বক্তিক বাস্তবতায়, যেমন নদী, গাছপালা, পাহাড়, ইত্যাদিতে বাস করে। কিন্তু আমরা মানুষেরা বাস করি এক দ্বৈত পৃথিবীতে। এটা ঠিক আমাদের পৃথিবীতেও নদী, গাছপালা, পাহাড় আছে। কিন্তু সেই নৈর্বক্তিক বাস্তব জগতের উপরে আমরা দ্বিতীয় আরেকটা কল্প-গল্পের জগৎ তৈরি করেছি। যে জগতে আছে ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন, ঈশ্বর, ডলার, এবং মানবাধিকার।

সময়ের সাথে সাথে এই কল্পনার জগতের সত্তা গুলো ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে উঠতে এখন তারা বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নৈর্বক্তিক বাস্তবতার জিনিসগুলো – গাছপালা, নদী, পাহাড়, প্রাণী জগত – তাদের বেঁচে থাকাটা এখন নির্ভর করে অবাস্তব সত্তা, যেমন আমেরিকা, বিশ্বব্যাংক, ইত্যাদির উপর। অথচ আমেরিকা আর বিশ্বব্যাংক কেবলমাত্র আমাদের কল্পনাতেই আছে, বাস্তবে এদের কোন অস্তিত্বই নাই।

কাছের মানুষগুলো

আমেরিকান লেখক এবং মোটিভেশনাল বক্তা জিম রন (http://en.wikipedia.org/wiki/Jim_Rohn) একটা চমৎকার কথা বলেছিলেনঃ “যে পাঁচ জন মানুষের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান আপনি সেই পাঁচজন মানুষের গড় (You are the average of the five people you spend the most time with.)”। এর মানে হচ্ছে আপনার বুদ্ধি হচ্ছে আপনার সবচেয়ে কাছের পাঁচ জন মানুষের গড় বুদ্ধির সমান। কথাটার মানে অবশ্য শুধু বুদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় – মানুষের চিন্তা-ভাবনার অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই কথাটা খাটে (যেমন রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি ব্যাপারে আমরা কাছাকাছি ভাবনার মানুষের সাথেই বেশি মিশে – আওয়ামীলীগ-মনা মানুষ আওয়ামীলীগারদের সাথে মিশে বেশি, বিএনপি-মনারা বিএনপি সমর্থকদের সাথে মিশে বেশি, রাজাকার এর ছানারা অন্য রাজাকার ছানাদের সাথে বেশি মিশে, হেফাজতপন্থীরা অন্য তালেবানী কাঠমোল্লাদের সাথে মিশে, ইত্যাদি ইত্যাদি)।

কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার দরকার নেই, তবে এটা বাস্তবতার প্রায় কাছাকাছি একটা সত্যি কথা! আমরা যাদের সাথে আমাদের জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটাই – আমাদের পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, অফিসের সহকর্মী – তাদের দ্বারা আমরা সব সময়ই প্রভাবিত হতে থাকি। যার সাথে যতো বেশি সময় কাটাবো তার দ্বারা ততো বেশি প্রভাবিত হবো। প্রভাব অবশ্য উভয় দিকেই যায় – আপনি প্রভাবিত হওয়ার পাশাপাশি আপনিও অন্যজনকে প্রভাবিত করবেন। তবে যার ব্যক্তিত্ব বেশি দৃঢ় তিনি বেশি প্রভাবিত করতে পারেন অন্যদেরকে।

এই কারণে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিখ্যাত প্রযুক্তি কম্পানী, সিলিকন ভ্যালী ইত্যাদি জায়গায় বুদ্ধিমান, সৃজনশীল মানুষের আনাগোনা বেশি। একবার কোনো কারণে স্মার্ট, ট্যালেন্টেড মানুষের সমাগম শুরু হলে সেখানে তাদের কারণে আরো বেশি স্মার্ট এবং ট্যালেন্টেড মানুষের আসা শুরু হয়। এইভাবে একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সিলিকন ভ্যালী’র মতো জায়গা গড়ে উঠে।

গুগল, ফেইসবুকের মতো বড় বড় টেক কম্পানীগুলোর নতুন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নেওয়ার সময় একটা লক্ষ্য থাকে নতুন ইঞ্জিনিয়ারের মেধা এবং দক্ষতা যাতে কম্পানীর গড় মেধা এবং দক্ষতার চেয়ে বেশি হয়। এভাবে এক এক জন নতুন ইঞ্জিনিয়ার নেওয়ার মাধ্যমে কম্পানীর ওভারঅল মেধা এবং দক্ষতা বাড়তে থাকে।

আমরা মানুষেরা সাধারণত প্রশংসার কাঙ্গাল (ফেইসবুকের লাইক বাটন উঠে গেলে আমাদের স্ট্যাটাসের সংখ্যা দশ ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে বলে আমার ধারণা!)। এটা দোষের কিছু নয় – প্রশংসা আমাদেরকে ভালো কিছু করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু প্রশংসার পাশাপাশি আমাদেরকে সমালোচনা গ্রহণ করার জন্যেও প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু আমরা প্রশংসার জন্যে যতোটা উদগ্রীব সমালোচনা শোনারা জন্যে আমরা প্রায়ই ততোটা প্রস্তুত থাকিনা। কিন্তু আমাদের বুদ্ধি, মেধা, এবং সৃজনশীলতার উন্নতি ঘটাতে হলে প্রশংসার চেয়ে সমালোচনা (গঠনমূলক সমালোচনা – নির্বিচার গালাগালি নয়!) বেশি জরুরী। আমরা যখন আমাদেরকে কম চিন্তাশীল, গাধা টাইপের মানুষ দিয়ে ঘিরে রাখি তখন আমরা প্রচুর প্রশংসা শুনতে পাই। কিন্তু আমরা যতোই মেধাবী, স্মার্ট, এবং সৃজনশীল মানুষ দিয়ে নিজেদের ঘিরে রাখবো ততোই আমাদের চিন্তার এবং কাজের সমালোচনা বাড়তে থাকবে। এবং এই সমালোচনার মাধ্যমেই আমাদের চিন্তা এবং কাজের মান আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে। আর মানুষ হিসেবেও আমরা চমৎকার মানুষ হয়ে উঠতে থাকবো।

কেউ এক গাদা প্রশংসা করলেই সে আমার খুব ভালো বন্ধু, আর কেউ আমার কোনো একটা ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিলে সে আমার বন্ধু নয় – এই ধরণের সস্তা টাইপের চিন্তা করলে কোনো দিন নিজের ব্যক্তিগত উন্নতি সাধন করা যাবে না।

কাছের প্রিয় মানুষগুলোর ভালো হওয়া জরুরী, স্মার্ট এবং সৃজনশীল হলে আরো ভালো। কিন্তু আপনি যদি শুধু নিজের গুনগান শোনার জন্যে তোষামোদ টাইপের মানুষ দিয়ে আপনার চারপাশ ভরে রাখেন (আমাদের অনেক নেতা/নেত্রীর মতো!) তাহলে আপনি যে মানুষ হিসেবে খুব ভালো, চমৎকার, দক্ষ একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারবেন না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত!

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কেনো আমাদের বারবার হতাশ করে কিংবা আমরা কেনো বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলতে পারিনা

work-harder

প্রতি বার বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন প্রচন্ড আশা জাগিয়ে আমাদের হতাশ করে – আমাদের বুকটা ভেঙ্গে যায় কষ্টে, আমরা অবাক হয়ে ভাবি কেনো সাকিব-তামিম-মুশফিকের মতো মেধাবী ক্রিকেটাররা আমাদের বারবার হতাশ করে!

এটা একবার নয়, বার বার ঘটছে।  এবং খুব একটা ভুল হওয়ার আশঙ্কা না করেও বলা যায় এটা অদূর ভবিষ্যতেও ঘটতে থাকবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল বাংলাদেশে আসে রীতিমতো ঝড় হয়ে। সারাদেশে কেউ যেন এড্রেনালিন হরমোন ঢেলে দেয় এই সময়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ কখনো এই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। আগামী কয়েক দশকে পারবে তেমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। আহা, বাংলাদেশ যদি মেসি-নেইমার-রোনাল্ডোদের সাথে বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলতে পারতো!

কিন্তু কেনো আমাদের ক্রিকেট এবং ফুটবলের এই দুরাবস্থা?

প্রিয় পাঠক, আপনি এ লেখাটি হয়তো পড়ছেন ঢাকায় বসে, কিংবা অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা-ইউরোপে বসে, কিংবা বাংলাদেশের অন্য যেকোনো জেলায় বসে। আপনি হয়তো একজন ছাত্র, কিংবা হয়তো একজন গৃহিনী, কিংবা একজন চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, কিংবা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক। হয়তোবা আপনি একজন কর্মহীন বেকার। আপনি হয়তো একজন সংস্কৃতিকর্মী – গায়ক, গায়িকা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, মডেল, চিত্রশীল্পি। হয়তো আপনি একজন সাংবাদিক, লেখক, বা ফটোগ্রাফার।

আমাদের অবস্থান যেখানেই হোক না কেনো, আমাদের পেশা যেটাই হোক না কেনো, দেশের ক্রিকেট এবং ফুটবল দল এর কাছে আমাদের সবারই চাওয়া একটা – বিশ্বের সেরা দলগুলোর সম-মানের পারফরম্যান্স! আমরা চাই আমাদের ক্রিকেট দল বীর বিক্রমে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মতো দলগুলোকে গুঁড়িয়ে দিক (আহা – সত্যিই যদি সেটি ওরা করতে পারতো!), আমাদের ফুটবল দল নিয়মিত বিশ্বকাপে যেয়ে বিশ্বসেরা দলগুলোকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করুক।

কিন্তু আমরা সবাই জানি সেটি কখনো ঘটেনা। আমাদের ক্রিকেট দল আমাদের নিয়মিত মন খারাপ করে দেয়, নিজ দেশের ফুটবলারদের পরিবর্তে আমরা মেসি-নেইমার-রোনাল্ডোদের নিয়ে মেতে উঠি। আমাদের ঘরে ঘরে উড়ে ব্রাজিল-আর্জেনটিনার পতাকা।

আমাদের ক্রিকেট বা ফুটবল দলের এই ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণ(গুলো) কী?

এই প্রশ্নের উত্তর আরেকটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।

প্রিয় পাঠক, আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর কারণ(গুলো) কী?

আপনার পেশা যাই হোক না কেনো আপনি সেটাতে কতোটুকু সফল, কতোটুকু তৃপ্ত? আপনার কাজ কতোটুকু বিশ্বমানের? আপনার পেশায় আপনি কি অস্ট্রেলিয়া-ইউরোপ-আমেরিকা-ভারতের একজনের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারবেন?

তামিম-সাকিব-মুশফিকরা আমার আপনার মতোই বাংলাদেশের আলো-বাতাস-পানি খেয়ে বড় হয়েছে, হচ্ছে। যে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিবেশ বাংলাদেশে বিরাজমান সেটাই তাদের কাজ করার ভিত্তি। আপনি খেলোয়াড়দের যতোই কোটি টাকা বেতন/স্পন্সরশিপ দেননা কেনো, যতো বড় বিদেশী কোচ দিয়ে প্রশিক্ষণ দেননা কেনো – দিনের শেষে তারা বাংলাদেশেই থাকে। তাদের বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিতজন সবাই বাংলাদেশী। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ এর মধ্য দিয়েই তাদের দিন কাটাতে হয়। এই পরিবেশ-পরিস্থিতি এর মধ্য দিয়ে আপনি অনেক চেষ্টা করে যতোটুকু সফল হতে পেরেছেন, আমাদের ক্রিকেটার ফুটবলাররাও ততোটুকুই হয়েছেন এবং হচ্ছেন।

আমরা উঠতে বসতে রাজনীতিবিদিদের গালি দিই – এটা সত্য তারা এর বেশিরভাগই ডিজার্ভ করে – কিন্তু রাজনীতিবিদরা কিন্তু আমাদের থেকেই উঠে আসা মানুষ। রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে আমাদের নিজেদের দিকে আগে তাকানো উচিৎ। আমরা কি আমাদের নিজেদের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করছি?

আমরা বাংলাদেশীরা দিনের একটা বড় সময় ব্যয় করি অন্যের সমালোচনা করতে। রাজনীতিবিদরা খারাপ, আওয়ামীলীগ খারাপ, বিএনপি খারাপ। সিভিল সোসাইটি ধান্দাবাজ, প্রথম আলো খারাপ, ডক্টর ইউনুস খারাপ। পুলিশ, সরকারী কর্মকর্তারা ঘুখখোর। ব্যবসায়ীরা মুনাফাখোর। এই লিস্টের শেষ নেই! (সমালোচনা নিয়ে কিছুদিন আগে একটা লিখেছিলামঃ http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29344027)

শেষ কবে কারো প্রশংসা করেছেন মনে আছে?

আমার মনে হয় আমাদের প্রশংসা করা শিখতে হবে আরো বেশি। প্রশংসা করার মানুষ খুব বেশি না খুঁজে পেলে একটা কাজ করুণঃ নিজে এমন একটা কিছু করূন যাতে মানুষ আপনার প্রশংসা করবে! মুশফিক-সাকিব-তামিমরা হতাশ করছে? নিজে একজন বিশ্বমানের ছাত্র, ছাত্রী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী, ব্যবসায়ী হয়ে যান। তখন সবাই প্রশংসা করার মতো, গর্ব করার মতো একজন নতুন মানুষ পাবে।

কে না চায় তার দেশের দল বিশ্বসেরা পারফরম্যান্স করুক। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা আমাদের ক্রিকেট দল থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা করে ফেলছি। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে – বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট, কিংবা অলিম্পিকে – সাফল্য পেতে হলে আমাদের দেশের ওভারঅল পারিবারিক, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে “প্রাণ” এর সঞ্চার করতে হবে। আমার মনে হয় আমাদের সবার জীবনে বড্ড বেশি “প্রাণ” এর অভাবঃ http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28989710

“প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষ কৌতুহলী হয়, আগ্রহী হয়, সবসময় কিছু একটা করতে চায়, যেকোনো জিনিসের ভালো দিকটা দেখে প্রথমে, নিজের ভুল/দোষ হলে সেটা স্বীকার নেয় সহজে, অন্যের সফলতা দেখে হিংসা করেনা, সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ায়না, অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে নিজেই এগিয়ে আসে যেকোনো কাজে, ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকেনা, এবং আশেপাশের সবার মধ্যে নিজের প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করে। একজন সফল মানুষ আরেকজন সফল মানুষকে হিংসা করবেনা। যে ছেলেগুলো হরতাল-বিক্ষোভ এর সময় নির্বিচারে অন্যের গাড়ি ভাংগে, সেই ছেলেগুলোর প্রত্যেকের একটা করে গাড়ি থাকলে ওরা কখনো এই কাজটি করতো না। অসফল মানুষ স্বভাবতই কিছুটা হীনমন্যতাবোধে ভোগে, এবং সুযোগ পেলেই তার দুঃখ-কষ্টের কারণ অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।”

ভালো ফুটবলার এবং ক্রিকেটার এর আগে আমাদের দরকার ষোল কোটি ভালো মানুষ, লক্ষ লক্ষ ভালো ছাত্র-ছাত্রী, হাজার হাজার ভালো শিক্ষক, দক্ষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, পরিচালক। আমাদের সমালোচনা করার এবং সমালোচনাকারী মানুষের অভাব নাই – কিন্তু আমাদের দরকার বেশি বেশি প্রশংসা করার এবং প্রশংসাকারী মানুষ। ব্লগ-ফেইসবুকে দুনিয়ার সবার সমালোচনা করে করে নিজের ওয়াল  এবং মানুষের নিউজ ফিড ভরিয়ে ফেলে নেগেটিভিটি ছাড়ানোর পাশাপাশি অন্যের প্রশংসা ছড়ান, নিজে ভালো কিছু করে অন্যকে আপনার প্রশংসা করার সুযোগ করে দিন।

যে দেশের সাধারণ মানুষ ভালো, ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষকগণ মেধাবী, সাধারণ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-সাংবাদিক-পুলিশ-সরকারী কর্মকর্তারা দক্ষ, শিল্পী-পরিচালকরা উঁচু মানের, সেই দেশের ক্রিকেটাররা যখন তখন ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দিতে পারে, আর সেই দেশের ফুটবল টিম প্রতি বিশ্বকাপে খেলতে পারবে – এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

elevator-success-stairs

অপরাজিত – ২

Boat_in_river,_Bangladesh

Image source: http://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/6/66/Boat_in_river%2C_Bangladesh.jpg

(বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর “অপরাজিত” উপন্যাস থেকে নেওয়া)

ইছামতী এই চঞ্চল জীবনধারার প্রতীক। ওর দু’পাড় ভরিয়া প্রতি চৈত্র বৈশাখে কত বনকুসুম, গাছপালা, পাখি-পাখালি, গাঁয়ে গাঁয়ে গ্রামের ঘাট – শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া কত ফুল ঝরিয়া পড়ে, কত পাখির দল আসে যায়, ধারে ধারে কত জেলেরা জাল ফেলে, তীরবর্তী গৃহস্তবাড়িতে হাসি-কান্নার লীলাখেলা হয়, কত গৃহস্ত আসে, কত গৃহস্ত যায় – কত হাসিমুখ শিশু মায়ের সঙ্গে নাহিতে নামে, আবার বৃদ্ধাবস্থায় তাহাদের নশ্বর দেহের রেণু কলস্বনা ইছামতীর স্রোতোজলে ভাসিয়া যায় – এমন কত মা, কত ছেলেমেয়ে, তরুণতরুণী মহাকালের বীথিপথে আসে যায় – অথচ নদী দেখায় শান্ত, স্নিগ্ধ, ঘরোয়া, নিরীহ…

আজকাল নির্জনে বসিলেই তাহার মনে হয়, এই পৃথিবীর একটা আধ্যাত্মিক রুপ আছে, এর ফুলফল, আলোছায়ার মধ্যে জন্মগ্রহণ করার দরুণ এবং শৈশব হইতে এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার দরুণ এর প্রকৃত রুপটি আমাদের চোখে পড়ে না। এ আমাদের দর্শন ও শ্রবণগ্রাহ্য জিনিসে গড়া হইলেও আমাদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও ঘোর রহস্যময়, এর প্রতি রেণু যে  অসীম জটিলতায় আচ্ছন্ন – যা কিনা মানুষের বুদ্ধি ও কল্পনার অতীত, এ সত্যটা হঠাৎ চোখে পড়ে না। যেমন সাহেব বন্ধুটি বলিত, “ভারতবর্ষের একটা রুপ আছে, সে তোমরা জান না। তোমরা এখানে জন্মেছ কিনা, অতি পরিচয়ের দোষে সে চোখ ফোটে নি তোমাদের।”

আকাশের রঙ আর এক রকম – দূরের সে গহন হিরাকসের সমুদ্র ঈষৎ কৃষ্ণাভ হইয়া উঠিয়াছে – তার তলায় সারা সবুজ মাঠটা, মাধবপুরের বাঁশবনটা কি অপূর্ব, অদ্ভুত, অপার্থিব ধরনের ছবি ফুটাইয়া তুলিয়াছে!… ও যেন পরিচিত পৃথিবীটা নয়, অন্য কোনো অজানা জগতের কোনো অজ্ঞাত দেবলোকের…

প্রকৃতির একটা যেন নিজস্ব ভাষা আছে। অপু দেখিয়াছে, কতদিন বক্রতোয়ার উপল-ছাওয়া-তটে শাল ঝাড়ের নিচে ঠিক দুপুরে বসিয়া – দূরে নীল আকাশের পটভূমিতে একটা পত্রশূন্য প্রকান্ড কি গাছ – সেদিকে চাহিলেই এমন সব কথা মনে আসিত যা অন্য সময় আসার কল্পনাও করিতে পারিত না – পাহাড়ের নিচে বনফলের জঙ্গলেরও একটা কি বলিবার ছিল যেন। এই ভাষাটা ছবির ভাষা – প্রকৃতি এই ছবির ভাষায় কথা বলেন – এখানেও সে দেখিল গাছপালায়, উইঢিপির পাশে শুকনো খড়ের ঝোপে, দূরের বাঁশবনের সারিতে – সেই সব কথাই বলে – সেই সব ভাবই মনে আনে। প্রকৃতির এই ছবির ভাষাটা সে বোঝে। তাই নির্জন মাঠে, প্রান্তরে, বনের ধারে একা বেড়াইয়া সে যত প্রেরণা পায় – যে পুলক অনুভব করে তা অপূর্ব – সত্যিকার Joy of Life – পায়ের তলার শুকনো লতা-কাটি, দেয়াড়ের চরে রাঙ্গা-রোদ-মাখানো কষাড় ঝোপ, আকন্দের বন, ঘেঁটুবন – তার আত্মাকে এরা ধ্যানের খোরাক যোগায়, এ যেন অদৃশ্য স্বাতী নক্ষত্রের বারি, তারই প্রাণ মুক্তার দানা বাঁধে।

সন্ধার পুরবী কি গৌরীরাগিণীর মতো বিষাদ-ভরা আনন্দ, নির্লিপ্ত ও নির্বিকার – বহুদূরের ওই নীল কৃষ্ণাভ মেঘরাশি, ঘন নীল, নিথর, গহন আকাশটা মনে যে ছবি আঁকে, যে চিন্তা যোগায়, তার গতি গোমুখী-গঙ্গার মতো অনন্তের দিকে, সে সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কথা বলে, মৃত্যুপারের দেশের কথা কয়, ভালবাসা-বেদনা-ভালবাসিয়া হারানো – বহুদূরের এক প্রীতিভরা পুনর্জন্মের বাণী…

এইসব শান্ত সন্ধ্যায় ইছামতীর তীরের মাঠে বসিলেই রক্তমেঘস্তুপ ও নীলাকাশের দিকে চাহিয়া চারিপাশের সেই অনন্ত বিশ্বের কথাই মনে পড়ে। মনে পড়ে বাল্যে এই কাঁটাভরা সাঁইবাবলার ছায়ায় বসিয়া মাছ ধরিতে ধরিতে সে দূর দেশের স্বপ্ন দেখিত – আজকাল চেতনা তাহার বাল্যের সে ক্ষুদ্র গন্ডি পার হইয়া ক্রমেই দূরে আলোকের পাখায় চলিয়াছে – এই ভাবিয়া এক এক সময় সে আনন্দ পায় – কোথাও না যাক – যে বিশ্বের সে একজন নাগরিক, তা ক্ষুদ্র, দীন বিশ্ব নয়। লক্ষ কোটি আলোক-বর্ষ যার গণনার মাপকাঠি, দিকে দিকে অন্ধকারে ডুবিয়া ডুবিয়া নক্ষত্রপুঞ্জ, নীহারিকাদের দেশ, অদৃশ্য ইথারের বিশ্ব যেখানে মানুষের চিন্তাতীত, কল্পনাতীত দূরত্বের ক্রমবর্ধমান পরিধিপানে বিস্তৃত – সেই বিশ্বে সে জন্মিয়াছে…

milky-way

ঐ অসীম শূন্য কত জীবলোকে ভরা – কি তাদের অদ্ভুত ইতিহাস! অজানা নদীতটে প্রণয়ীদের কত অশ্রুভরা আনন্দতীর্থ – সারা শূন্য ভরিয়া আনন্দস্পন্দনের মেলা – ইথারের নীল সমুদ্র বাহিয়া বহু দূরের বৃহত্তর বিশ্বের সে-সব জীবনধারার ঢেউ প্রাতে, দুপুরে, রাতে, নির্জনে একা বসিলেই তাহার মনের বেলায় আসিয়া লাগে – অসীম আনন্দ ও গভীর অনুভূতিতে মন ভরিয়া ওঠে – পরে সে বুঝিতে পারে শুধু প্রসারতার দিকে নয় – যদিও তা বিপুল ও অপরিমেয় – কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চেতনা-স্তরের আর একটা Dimension যেন তার মন খুঁজিয়া পায় – এই নিস্তব্দ শরত-দুপুর যখন অতীতকালের এমনি এক মধুর মুগ্ধ শৈশব-দুপুরের ছায়াপাতে স্নিগ্ধ ও করূণ হইয়া ওঠে তখনই সে বুঝিতে পারে চেতনার এ স্তর বাহিয়া সে বহুদূর যাইতে পারে – হয়তো কোনো অজ্ঞাত সৌন্দর্যময় রাজ্যে, দৈনন্দিন ঘটনার গতানুগতিক অনুভূতিরাজি ও একঘেয়ে মনোভাব যে রাজ্যের সন্ধান দিতে পারিতই না কোনোদিন…

নদীর ধারে আজিকার এই আসন্ন সন্ধ্যায় মৃত্যুর নব রুপ সে দেখিতে পাইল। মনে হইল, যুগে যুগে এ জন্মমৃত্যুচক্র কোন বিশাল-আত্মা দেবশিল্পীর হাতে আবর্তিত হইতেছে – তিনি জানেন কোন জীবনের পর কোন অবস্থার জীবনে আসিতে হয়, কখনো বা বৈষম্য – সবটা মিলিয়া অপূর্ব রসসৃষ্টি – বৃহত্তর জীবনসৃষ্টির আর্ট-

ছ’হাজার বছর আগে হয়তো সে জন্মিয়াছিল প্রাচীন ঈজিপ্টে – সেখানে নলখাগড়া প্যাপিরাসের বনে, নীলনদের রৌদ্রদীপ্ত তটে কোন দরিদ্র ঘরের মা বোন বাপ ভাই বন্ধুবান্ধবদের দলে কবে সে এক মধুর শৈশব কাটাইয়া গিয়াছে – আবার হয়তো জন্ম নিয়াছিল রাইন নদীর ধারে – কর্ক-ওক, বার্চ ও বীচবনের শ্যামল ছায়ায় বনেদি ঘরের প্রাচীন প্রাসাদে, মধ্যযুগের আড়ম্বরপূর্ণ আবহাওয়ায়, সুন্দরমুখ সখীদের দল। হাজার হাজার বছর পর হয়তো সে আবার ফিরিয়া আসিবে – তখন কি মনে পড়িবে এবারকার জীবনটা? – কিংবা কে জানে আর হয়তো এ পৃথিবীতে আসিবে না – ওই যে বটগাছের সারির মাথায় সন্ধ্যার ক্ষীণ প্রথম তারকাটি – ওদের জগতে অজানা জীবনধারার মধ্যে হয়তো এবার নবজন্ম! – কতবার যেন সে আসিয়াছে… জন্ম হইতে জন্মান্তরে, মৃত্যু হইতে মৃত্যুর মধ্য দিয়া… বহু দূর অতীতে ও ভবিষ্যতে বিস্তৃত সে পথটা যেন সে বেশ দেখিতে পাইল… কত নিশ্চিন্দিপুর, কত অপর্ণা, কত দুর্গা দিদি – জীবনের ও জন্মমৃত্যুর বীথিপথ বাহিয়া ক্লান্ত ও আনন্দিত আত্মার সে কি অপরুপ অভিযান… শুধু আনন্দে, যৌবনে, পুণ্যে ও দুঃখে, শোকে ও শান্তিতে…। এই সবটা লইয়া যে আসল বৃহত্তর জীবন – পৃথিবীর জীবনটুকু যার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র – তার স্বপ্ন যে শুধুই কল্পনাবিলাস, এ যে হয় তা কে জানে – বৃহত্তর জীবনচক্র কোন দেবতার হাতে আবর্তিত হয় তা কে জানে?… হয়তো এমন সব প্রাণী আছেন যাঁরা মানুষের মতো ছবিতে, উপন্যাসে, কবিতায় নিজেদের শিল্পসৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করেন না – তাঁরা এক এক বিশ্ব সৃষ্টি করেন – তার মানুষের সুঝে-দুঃখে উখথানে-পতনে আত্মপ্রকাশ করাই তাঁদের পদ্ধতি – কোন মহান বিবর্তনের জীব তাঁর অচিন্ত্যনীয় কলাকুশলতাকে গ্রহে গ্রহে নক্ষত্রে নক্ষত্রে এ-রকম রুপ দিয়াছেন – কে তাঁকে জানে?…

একটি অবর্ণনীয় আনন্দে, আশায়, অনুভূতিতে, রহস্যে মন ভরিয়া উঠিল। প্রাণবন্ত তার আশা, সে অমর ও অনন্ত জীবনের বাণী বনলতার রৌদ্রদগ্ধ শাখাপাত্রের তিক্ত গন্ধ আনে – নীলশূন্যে বালিহাঁসের সাঁই সাঁই রব শোনায়। সে জীবনের অধিকার হইতে তাহাকে কাহারো বঞ্চনা করিবার শক্তি নাই – তার মনে হইল সে দীন নয়, দুঃখী নয়, তুচ্ছ নয় – ওটুকু শেষ নয়, এখানে আরম্ভও নয়। সে জন্মজন্মান্তরের পথিক আত্মা, দূর হইতে কোন সুদূরের নিত্য নূতন পথহীন পথে তার গতি, এই বিপুল নীল আকাশ, অগণ্য জ্যোতির্লোক, সপ্তর্ষিমন্ডল, ছায়াপথ, বিশাল অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার জগৎ, বহির্ষদ পিতৃলোক, – এই শত সহস্র শতাব্দী, তার পায়ে-চলার পথ – তার ও সকলের মৃত্যুদ্বারা অস্পৃষ্ট সে বিরাট জীবনটা নিউটনের মহাসমুদ্রের মতো করলেই পুরোভাগে অক্ষুন্নভাবে বর্তমান – নিঃসীম সময় বাহিয়া সে গতি সারা মানব যুগে বাধাহীন হউক।…

অপু তাহাদের ঘাটের ধারে আসিল। ওইখানটিতে এমন এক সন্ধ্যার অন্ধকারে বনদেবী বিশালাক্ষী স্বরুপ চক্রবর্তীকে দেখা দিয়াছিলেন কতকাল আগে!

আজ যদি আবার তাহাকে দেখা দেন!

– তুমি কে?
– আমি অপু।
– তুমি বড় ভালো ছেলে। তুমি কি বর চাও?
– অন্য কিছু চাই নে, এ গাঁয়ের বনঝোপ, নদী, মাঠ, বাঁশবনের ছায়ায় অবোধ, উদ্গ্রীব,  স্বপ্নময় আমার সেই যে দশ বৎসর বয়সের শৈশবটি – তাকে আর একটি বার ফিরিয়ে দেবে দেবী? –

“You enter it by the Ancient way
Through Ivory Gate and Golden”

অপরাজিত…

Le-Meridien-Bora-Bora---Aerial
প্রথম জীবনের সে-সব মাধুরীভরা মুহূর্তগুলি যৌবনের কলকোলাহলে কোথায় মিলাইয়া গেল? কোথায় সে নীল আকাশ, মাঠ, আমের বউলের গন্ধভরা জ্যোৎস্নারাত্রি? পাখি আর ডাকে না, ফুল আর ফোটে না, আকাশ আর সবুজ মাঠের সঙ্গে মেশে না – ঘেঁটুফুলের ঝোপে ফোটা সদ্যফোটা ফুলের তেতো গন্ধ আর বাতাসকে তেতো করে না। জীবনে সে যে রোমান্সের স্বপ্ন দেখিয়াছিল – যে স্বপ্ন তাহাকে একদিন শত দুঃখের মধ্য দিয়া টানিয়া আনিয়াছে, তার সন্ধান তো কই এখনো মিলিল না? এ তো একরঙ্গা ছবির মতো বৈচিত্রহীন, কর্মব্যস্ত, একঘেয়ে জীবন – সারাদিন এখানে অফিসের বদ্ধ জীবন, রোকড়, খতিয়ান, মর্টগেজ, ইনকামট্যাক্সের কাগজের বোঝার মধ্যে পক্ককেশ প্রবীন ঝুনো সংসারাভিজ্ঞ ব্যক্তিগণের সঙ্গে সপিনা ধরানোর প্রকৃষ্ট উপায় সম্বন্ধে পরামর্শ করা, এটর্নিদের নামে বড় বড় চিঠি মুসাবিদা করা – সন্ধ্যায় পায়রার খোপের মতো অপরিষ্কার নোংরা বাসাবাড়িতে ফিরিয়াই তখনি আবার ছেলে পড়াইতে ছোটা।

অফিসে সে নানা স্থানের ভ্রমণকাহিনী পড়ে, ডেস্কের মধ্যে পুরিয়া রাখে। পুরোনো বইয়ের দোকান হইতে নানা দেশের ছবিওয়ালা বর্ণনাপূর্ণ বই কেনে – নানা দেশের রেলওয়ে বা স্টিমার কোম্পানি যে সব দেশে যাইতে সাধারণকে প্রলুব্ধ করিতেছে – কেহ বলিতেছে, হাওয়াই দ্বীপে এসো একবার – এখানকার নারকেল কুন্জে, ওয়াকিকির বালুময় সমুদ্রবেলায় জোৎস্নারাত্রে যদি তারাভিমুখী ঊর্মিমালার সঙ্গীত না শুনিয়া মর, তবে তোমার জীবন বৃথা।

এল পাশো দেখ নাই। দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়ার চুনাপাথরের পাহাড়ের ঢালুতে, শান্ত রাত্রির তারাভরা আকাশের তলে কম্বল বিছাইয়া একবারটি ঘুমাইয়া দেখিও।।। শীতের শেষে নুড়িভরা উঁচুনিচু প্রান্তরে কর্কশ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে দু-এক ধরণের মাত্র বসন্তের ফুল প্রথম ফুটিতে শুরু করে, তখন সেখানকার সোডা-আলকালির পলিমাটিপড়া রৌদ্রদীপ্ত মুক্ত তরুবলয়ের রহস্যময় রুপ – কিংবা ওয়ালোয়া হ্রদের তীরে উন্নত পাইন ও ডগলাস ফারের ঘন অরণ্য, হ্রদের স্বচ্ছ বরফগলা জলে তুষারকিরীট মাজামা আগ্নেয়গিরির প্রতিচ্ছায়ার কম্পন – উত্তর আমেরিকার ঘন, স্তব্দ্ধ, নির্জন অরণ্যভূমির নিয়ত পরিবর্তনশীল দৃশ্যরাজি, কর্কশ বন্ধুর পর্বতমালা, গম্ভীরনিনাদী জলপ্রপাত, ফেনিল পাহাড়ি নদীতীরে বিচরণশীল বলগা হরিণের দল, ভালুক, পাহাড়ি ছাগল, ভেড়ার দল, উষ্ন প্রস্রবণ, তুষারপ্রবাহ, পাহাড়ের ঢালুর গায়ের সিডার ও মেপল গাছের বনের মধ্যে বুনো ভ্যালোরিয়ান ও ভায়োলেট ফুলের বিচিত্র বর্ণসমাবেশ – দেখ নাই এসব? এস এস!

টাহিটি! টাহিটি! কোথায় কত দূরে, কোন জোৎস্নালোকিত রহস্যময় কূলহীন স্বপ্নসমুদ্রের পারে, শুভরাত্রে গভীর জলের তলায় যেখানে মুক্তার জন্ম হয়, সাগরগুহায় প্রবালের দল ফুটিয়া থাকে, কানে শুধু দূরশ্রুত সংগীতের মতো তাহাদের অপূর্ব আহবান ভাসিয়া আসে। অফিসের ডেস্কে বসিয়া এক-একদিন সে স্বপ্নে বিভোর হইয়া থাকে – এই সবের স্বপ্নে। এই রকম নির্জন স্থানে, যেখানে লোকালয় নাই, ঘন নারিকেল কুন্জের মধ্যে ছোট কুটিরে, খোলা জানালা দিয়া দূরের নীল সমুদ্র চোখে পড়িবে – তার ওপারে মরকতশ্যাম ছোট ছোট দ্বীপ, বিচিত্র পক্ষীরাজি, অজানা দেশের অজানা আকাশের তলে তারায় আলোয় উজ্জ্বল মাঠটা একটা রহস্যের বার্তা বহিয়া আনিবে – কুটিরের ধারে ফুটিয়া থাকিবে ছোট ছোট বনফুল – শুধু সে আর অপর্ণা।

(বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর “অপরাজিত” উপন্যাস থেকে নেওয়া)

Tagged , ,

ভালোবাসা

What-is-love

সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা একমুখী হয়, দ্বিমুখী নয়।

ভালোবাসা দেওয়ার জিনিস, নেওয়ার জিনিস নয়। আপনি যদি ভালোবাসা দেওয়ার চেয়ে ভালোবাসা পাওয়াতে বেশি সুখ পান, তাহলে আপনি এখনো ভালোবাসার গভীরে যেতে পারেননি। গভীর ভালোবেসে যে সুখ পাওয়া যায় তার সাথে প্রায় অন্য কোনো সুখের তুলনা চলেনা!

ভালোবাসার সাথে প্রত্যাশার (expectation) কোনো সম্পর্ক নাই। সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু ভালোবাসার মানুষটিকে সুখী করতে চায়, তার থেকে কোনো প্রতিদান আশা করে না। প্রত্যাশার চাপ আস্তে আস্তে ভালোবাসাকে মেরে ফেলে। আপনার ভালোবাসার মানুষটি আপনার প্রত্যাশা পূরণের মেশিন নয়।

সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে মুক্ত করে, বেঁধে ফেলে না। ভালোবাসা আফিমের মতো, লোহার শিকল নয়। আপনার ভালোবাসার মানুষ খুব সম্ভবত আপনার কাছে ফিরে আসবে যদি আপনি তাকে মুক্ত করে দেন। লোহার শিকল দিয়ে ভালোবাসার মানুষকে আটকে রাখার চেষ্টা করলে পাখি খাঁচা ভেঙ্গে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। শেকল পরানোর চেয়ে পাখিকে ভালোবাসার আফিম খাওয়ান বরং।

প্রেম হচ্ছে আকর্ষণ (শারীরিক এবং মানসিক) + ভালোবাসা + প্রত্যাশা। প্রেমের প্রথম দিকে এই তিনটির সবগুলোই মোটামুটি সমান পরিমাণে থাকে। ভঙ্গুর প্রেমে প্রত্যাশার পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে, আকর্ষণ এবং ভালোবাসা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। শ্বাশ্বত প্রেমে প্রত্যাশা প্রায় থাকেইনা, কিন্তু থাকে তীব্র ভালোবাসা; যদিও আকর্ষণ ধরে রাখাটা যেকোনো প্রেমেই কঠিন একটা কাজ। যেকোনো কিছুতে সময়ের সাথে সাথে আকুর্ষণ কমে যাওয়াটা খুব সম্ভবত মানুষের ডিএনএতে লেখা আছে। এ ব্যাপারে আমাদের খুব বেশি কিছু করার নাই।

বিয়ে হচ্ছে প্রেম + দায়িত্ব। স্বামী হিসেবে দায়িত্ব, স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব, জামাই হিসেবে দায়িত্ব, ঘরের বউ হিসেবে দায়িত্ব। সর্বোপরি পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব। যে সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের কাছ থেকে প্রত্যাশা সর্বনিম্ন সে সম্পর্ক সাধারণত বেশিদিন টিকে। ভঙ্গুর বৈবাহিক সম্পর্কে মানুষের আকর্ষণ এবং ভালোবাসা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, আর প্রত্যাশা আর দায়িত্ব আকশের কাছাকাছি চলে যায়। শ্বাশ্বত বৈবাহিক সম্পর্ক শ্বাশ্বত প্রেমের মতোই মূলত ভালোবাসা নির্ভর – প্রত্যাশা করার আগেই ভালোবাসা থেকে একে অপরকে সুখী করে ফেলে।

নিজে অসুখী হয়ে অন্যকে ভালোবেসে সুখী করা যায়না। কেউ আপনার জীবনে সুখ এনে দেবে ভেবে কারো সাথে প্রেমে জড়াবেন না। বরং আপনি কারো জীবনে সুখ এনে দেবেন ভেবে প্রেম করুন।

যেকোনো মানুষকে, যেকেনো বস্তুকে, এমনকি যেকোনো পশুকেও ভালোবাসা যায়। ভালোবাসলে যদি সুখ না পাওয়া যায় তাহলে সে ভালোবাসা গভীর ভালোবাসা না। দেশের কথা ভেবে যদি বুকের ভেতর সুখ-আবেগের মোচড় না উঠে তাহলে দেশকে আপনার আরো ভালোবাসতে হবে।

ভালোবাসা, প্রেম, আর অবসেশন – তিনটা ভিন্ন জিনিস। অবসেশন হচ্ছে কাউকে বা কোনো কিছুকে পাওয়ার জন্যে অযৌক্তিক রকম মরিয়া হয়ে উঠা। অবসেশনকে গভীর প্রেম বলে ভুল হতে পারে। অবসেশন মূলত ভালোবাসার মানুষের মাধ্যমে নিজেকে সুখী করার একটা চেষ্টা।

ভালোবাসার সাথে যৌনতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নাই। সেক্সের জন্যে ভালোবাসার চেয়ে আকর্ষণের বেশি দরকার। তবে আকর্ষণের সাথে ভালোবাসা যোগ হলে সেটা হয় সর্বোৎকৃষ্ট সেক্স। আকর্ষন ছাড়া শুধু ভালোবাসা দিয়ে যৌন জীবনে খুব বেশি সুখী হওয়া যায়না।

পুনশ্চঃ উপরের কথাগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত ভাবনা। এই ভাবনাগুলোর কোনোটি বা সবগুলো অন্য কারো ভাবনার সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে এটা আমি আশা করি না। আর সময়ের সাথে সাথে আমার নিজের ভাবনারও পরিবর্তন হতে পারে!

ডিম

(অ্যান্ডি উইয়ার এর লেখা “দি এগ” গল্পের বাংলা অনুবাদ। মূল রচনাঃ http://www.galactanet.com/oneoff/theegg_mod.html)

Chicken_egg

*image source: http://commons.wikimedia.org/wiki/File:Chicken_egg.png

যেদিন তুমি মারা গেলে সেদিন তুমি তোমার বাড়ি ফিরছিলে।

তুমি একটা কার দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলে। সাধারণ একটা দূর্ঘটনা, কিন্তু তোমার আঘাতটা মারাত্মক ছিলো। তুমি স্ত্রী এবং দুই সন্তান রেখে গিয়েছিলে। মৃত্যুর সময় তুমি খুব বেশি ব্যথা পাওনি। হাসপাতালের ডাক্তার এবং নার্সরা মিলে তোমাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বিশ্বাস করো – তোমার শরীর এমনভাবে ভেঙ্গে গিয়েছিলো যে তোমার জন্যে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাই ভালো হয়েছে।

এরপরই তোমার সাথে আমার দেখা হয়।

“কী… কী হয়েছে?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “আমি কোথায়?”
“তুমি মারা গিয়েছো,” আমি নিরাবেগভাবে বললাম। এটা কথা নিয়ে খেলার সময় ছিলোনা।
“একটা… একটা ট্রাক আসছিলো এবং সেটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এগিয়ে আসছিলো…”
“হ্যাঁ,” আমি বলেছিলাম।
“আমি… আমি মারা গিয়েছিলাম?”
“হ্যাঁ। কিন্তু এটা নিয়ে মন খারাপ কোরো না। সবাইকেই মরতে হয়,” আমি বলেছিলাম।

তুমি চারদিকে একবার চোখ বুলালে। চারদিকে ছিলো শুধু শুন্যতা। শুধু তুমি আর আমিই ছিলাম সেখানে। “এটা কোন জায়গা?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “এটাই কি মৃত্যুর পরের জীবন?”
“সেটা বলতে পারো,” আমি বলেছিলাম।
“তুমি কি ঈশ্বর?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে?
“হ্যাঁ,” আমি জবাব দিয়েছিলাম। “আমি ঈশ্বর।”
“আমার সন্তানরা… আমার স্ত্রী,” তুমি বলেছিলে।
“কেন, তাদের কী হয়েছে?”
“ওরা কি ভালো আছে? ওরা আমাকে ছাড়া ভালো থাকবে?”
“আমি এটাই দেখতে চেয়েছি,” আমি বলেছিলাম। “তুমি এই মাত্র মারা গেলে আর তোমার প্রথম চিন্তা হচ্ছে তোমার পরিবার নিয়ে। চমৎকার।”
তুমি খুশি হয়ে আমার দিকে তাকালে। তোমার কাছে আমাকে ঈশ্বর মনে হচ্ছিলো না। আমাকে একজন সাধারন মানুষ মনে হচ্ছিলো তোমার কাছে। হয়তো পুরুষ, কিংবা মহিলা। কোনো শক্তিশালী কেউ যাকে তুমি চেননা। কিংবা একজন স্কুল শিক্ষক, কিন্তু কোনোভাবেই ঈশ্বর নয়।
“চিন্তা কোরোনা,” আমি বলেছিলাম। “তারা ভালো থাকবে। তোমার সন্তানদের কাছে তুমি একজন চমৎকার মানুষ হয়ে থাকবে। তারা এখনো মানুষ হিসেবে তোমার দোষত্রুটি বুঝার মতো বড় হয়নি। তোমার স্ত্রী তোমার জন্যে অনেক কাঁদবে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে আসলে একটা বিশাল ভারমুক্ত হবে। সত্যি কথা বলতে কি – তোমাদের স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কটা আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়ছিলো। জানিনা এটা শুনে কি তুমি খুশি হবে কিনা – কিন্তু তোমার স্ত্রী ভারমুক্ত হবার কারণে নিজেকে দোষী ভাববে।”
“ওহ্‌,” তুমি বলেছিলে। “তাহলে এখন কী হবে আমার? আমি কি বেহেশতে যাবো নাকি দোজখে যাবো?”
“তুমি বেহেশত বা দোজখ এর কোনোটাতেই যাবা না,” আমি বলেছিলাম। “তোমাকে আবার জন্ম দেয়া হবে।”
“ওহ্‌,” তুমি বলেছিলে। “তাহলে হিন্দু ধর্মের কথাই ঠিক,”
“সব ধর্মই আসলে তাদের মতো করে সত্যি,” আমি বলেছিলাম। “হাঁটো আমার সাথে।”

তুমি আমার সাথে সাথে হাঁটতে শুরু করেছিলে। “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“বিশেষ কোথাও না,” আমি বলেছিলাম। “আমার হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে ভালো লাগে।”
“তাহলে ঘটনা কী দাঁড়ালো?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “আমি যদি আবার জন্ম নিই তাহলে সবকিছুই আবার শুন্য থেকে শুরু হবে? একটা নবজাতক শিশু হয়ে আমি জন্ম নিবো। অতএব আমার এই জীবনের সব অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য থাকবেনা।”
“সেটা ঠিক না,” আমি বলেছিলাম। “তোমার মধ্যে এই মুহুর্তে তোমার অতীত সব জীবনের অর্জিত সব জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা আছে। শুধু তুমি এই মুহুর্তে সেগুলো মনে করতে পারছোনা।”
আমি হাঁটা থামিয়ে তোমার কাঁধে হাত রাখলাম। “তোমার আত্মা আসলে তোমার কল্পনার চাইতেও অনেক বড়, সুন্দর, এবং মহান। মানুষের মন আসলে তার সম্পূর্ণ সত্ত্বার একটা ক্ষুদ্র অংশ ধারণ করতে পারে। এটা অনেকটা একটা গ্লাসে একটা আঙ্গুল রেখে দেখার মতো যে গ্লাসের পানি ঠান্ডা না গরম। তুমি তোমার একটা ক্ষুদ্র অংশ সেখানে ছোঁয়াও, এবং এরপর যখন তুমি সেটা বের করে আনো এর সবকিছু ততক্ষনে তুমি জেনে যাও।
গতো ৪৮ বছর ধরে একজন মানুষের জীবন যাপন করছো কিন্তু তুমি এখনো তোমার অস্তিত্বের একটা বড় অংশ দেখতে পাওনি। আমরা যদি এখানে দীর্ঘ সময় ধরে থাকি, তাহলে তুমি আস্তে আস্তে সব মনে করতে পারবা। কিন্তু তোমার বিভিন্ন জীবনের মাঝখানে এটা করার কোনো মানে হয়না।”
“আমাকে কতোবার জন্ম দেওয়া হয়েছে?”
“অনেক বার। অসংখ্য বার। একেক বার একে ধরণের জীবন তোমাকে দেয়া হয়েছে।” আমি বলেছিলাম। “এবার তোমাকে ৫৪০ খ্রিস্টাব্দের এক চীনা কৃষক মেয়ে হিসেবে জন্ম দেওয়া হবে।”
“দাঁড়াও, কী বললে?” তুমি তোতলাতে তোতলাতে বলেছিলে। “তুমি আমাকে সুদূর অতীতে পাঠিয়ে দিচ্ছো?”
“টেকনিকালি সেটা তুমি বলতে পারো। তোমরা যেটাকে সময় বলো সেটা শুধু তোমাদের জগতেই আছে। আমি যেখান থেকে আসছি সেখানে সময়ের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।”
“তুমি কোথা থেকে আসছো?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে।
“আমি কোনো এক জায়গা থেকে আসছি। অন্য কোনো জায়গা থেকে। এবং আমার মতো আরো অনেকে আছে। আমি জানি তোমার জানতে ইচ্ছা করবে আমাদের জায়গাটা কেমন কিন্তু বিশ্বাস করো তুমি সেটা বুঝবেনা।”
“ওহ্‌,” একটু মন খারাপ করে তুমি বলেছিলে। “কিন্তু… আমি যদি বিভিন্ন সময়ে এভাবে জন্ম নিয়ে থাকি তাহলে হয়তো এক সময় আমার নিজের সাথে আমার দেখা হয়েছে?”
“অবশ্যই। এটা প্রায়ই ঘটে থাকে। কিন্তু যেহেতু তোমার সেই জীবনগুলো প্রত্যেকে নিজের জীবনকাল এর বাইরে কিছু জানেনা তারা জানেওনা যে তারা আসলে একই ব্যক্তি।”
“কিন্তু এসব কিছুর মানে কী?”
“হাহা, তুমি আমাকে জীবনের মানের কথা জিজ্ঞেস করছো?” আমি বলেছিলাম। “সবাই কি জানতে চায়না তাদের জীবনের মানে কী? উদ্দেশ্য কী?”
“কিন্তু এটা একটা খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন,” তুমি তোমার প্রশ্নে অনড় থাকলে।
আমি তোমার চোখের দিকে তাকালাম। “জীবনের মানে হচ্ছে, এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে তুমি পরিণত একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারো।”
“তুমি বলতে চাচ্ছো মানবজাতির কথা? তুমি চাও পুরো মানবজাতি পরিণত হোক, বুদ্ধিমান হয়ে উঠুক?”
“না, শুধুমাত্র তুমি। আমি এই পুরো বিশ্বজগৎ শুধুমাত্র তোমার জন্যে বানিয়েছি। একেকটা জীবন পার হওয়ার পর তুমি আরো পরিণত হয়ে উঠো, আরো বুদ্ধিমান, এবং প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠো।”
“কেবল আমি? বাকি সবার কী হোলো?”
“আর কেউ বাকি নাই,” আমি বলেছিলাম। “এই বিশ্বজগতে আছি শুধু আমি আর তুমি।”
তুমি হতবুদ্ধের মতো আমার দিকে তাকালে। “কিন্তু পৃথিবীর আর সব মানুষ…”
“তারা সবাই আসলে তুমি। তোমার ভিন্ন ভিন্ন জন্ম।”
“দাঁড়াও… পৃথিবীর সবাই আসলে আমি?”
“এইতো তুমি বুঝতে পারছো,” আমি বলেছিলাম তোমার পিঠ চাপড়ে।
“পৃথিবীতে যতো মানুষ জন্ম নিয়েছে তারা সবাই আমি?”
“এবং ভবিষ্যতে যারা নিবে তারাও…”
“আমি আব্রাহাম লিংকন?”
“এবং তুমিই তার আততায়ী জন ওয়াইলক্স বুথ,” আমি যোগ করেছিলাম।
“আমি হিটলার?” তুমি অবিশ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলে।
“এবং তুমিই সেই লক্ষ লক্ষ মানুষ যাদেরকে হিটলার মেরেছিলো।”
“আমি যিশু খ্রিস্ট?”
“এবং তুমিই তার সব অনুসারী খ্রিস্টান মানুষ।”

তুমি কথা হারিয়ে ফেলেছিলে। “যতোবার তুমি কাউকে আঘাত করেছো তুমি আসলে নিজেকেই নিজে আঘাত করেছো। মানুষের প্রতি দেখানো তোমার সব ভালোবাসা আসলে তুমি তোমার প্রতিই দেখিয়েছো। পৃথিবীতে জন্ম নেয়া প্রতিটি মানুষের সব সুখ আর দুঃখের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এক সময় তুমিও যাবে।”
তুমি দীর্ঘ সময় নিয়ে ভাবলে।
“কেনো?” তুমি জিজ্ঞেস করলে। “এসব কিছু করার কী দরকার ছিলো?”
“কারণ – একদিন তুমি আমার মতো হয়ে যাবে। সেটাই তোমার আসল পরিচয়। তুমি আমাদেরই দলের। তুমি আমার সন্তান।”
“কী বললে?” তুমি চরম অবিশ্বাস নিয়ে তাকালে। “তুমি বলছো আমি ঈশ্বর?”
“না, এখনো না। তুমি এখনো একটা ভ্রূণ। সে ভ্রূণ এখনো বড় হচ্ছো। যখন তুমি সব কালের সব মানব জন্ম পার করবে, তখন তোমার জন্ম নেয়ার সময় হবে।”
“তাহলে এই পুরো বিশ্বজগৎ,” তুমি বলেছিলে, “এটা শুধু…”
“একটা ডিম।” আমি বলেছিলাম। “এখন তোমার পরবর্তী জীবন শুরু করার সময় হয়েছে।”

এবং এরপর আমি তোমাকে তোমার গন্তব্যের পথে পাঠিয়ে দিলাম।

রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে না তাকিয়ে যেভাবে বাংলাদেশকে উন্নত করা যায়

shahbag_candlevigil

 

শাহবাগের যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলন এর মাধ্যমে মানুষের দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের জন্যে কিছু করার ইচ্ছা দেখে আমি অভিভূত।

রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই থাকুক না কেনো সবাই মোটামুটি একটা জায়গায় এসে একমত – বাংলাদেশকে একটা সমৃদ্ধ, আধুনিক, চমৎকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই সবাই। জামাত-শিবির এবং তাদের মতো জঙ্গি দলগুলো চাইবে আমাদেরকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো বানিয়ে ফেলতে। কিন্তু আমরা চাইলেই তাদের প্রায় চোখের সামনে দিয়ে আমাদের দেশটাকে একটা উন্নত এবং আধুনিক দেশে পরিণত করে ফেলতে পারি। এমনকি আওয়ামীলীগ এবং বিএনপিও যদি আমাদের বিরুদ্ধে যায় তবু আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারি!

বাংলাদেশকে উন্নত করতে চাইলে আমাদেরকে -আমাকে এবং আপনাকে – অংশ নিতে হবে এই কাজে। দেশের প্রতি ভালোবাসার জন্যে একদিনের মধ্যে যদি শাহবাগ লক্ষ মানুষের জনসমুদ্রে পরিণত হতে পারে তাহলে এই লক্ষ মানুষই পারবে দেশকে বদলে দিতে। এটা কোনো গোপন ব্যাপার নয় যে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি ক্ষমতার যাওয়ার ব্যাপারে যতোটুকু আগ্রহী হবে দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখানোতে ততোটা আগ্রহী তারা হবে না। জামাত-শিবির এবং জঙ্গি দলগুলো ব্যস্ত দেশটাকে মধ্য যুগে ফিরিয়ে নেওয়াতে। জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র দলগুলো ব্যস্ত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বড় দলগুলোর ভাড়া খাটায়। এই অবস্থায় দেশটাকে উন্নত করার, সমৃদ্ধ করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আসলে আমাদের সাধারণ মানুষের হাতে, ছাত্র-শিক্ষক-চাকুরিজীবি-ব্যবসায়ী-শ্রমজীবি মানুষের হাতে।

মনে হতে পারে আমরা একটা তৃতীয় রাজনৈতিক দল তৈরি করতে পারি। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির মতো দলের শেকড় বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। একদিন হঠাৎ করে আমরা একটা রাজনৈতিক দল করবো আর মানুষ দলে দলে আমাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাবে সেটি হবার নয়! অনেক অনেক দিন (কয়েক দশক!) ধরে চেষ্টা করলে হয়তো একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যাবে কিন্তু সেটাও নিশ্চিত নয়, এবং এই দীর্ঘ সময়ে আসলে আমরা দেশের জন্যে অনেক বেশি কিছু করে ফেলতে পারতাম। সবচেয়ে বড় কথাঃ আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে একটা সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে পরিণত করা, ক্ষমতায় যাওয়া নয়!

তাহলে কিভাবে আমরা খুব সহজে রাজনৈতিক দলগুলোর নাকের ডগা দিয়ে আমাদের দেশটাকে একটা সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে পরিণত করতে পারবো?

বাংলাদেশকে একটা চমৎকার এবং সুখী দেশে পরিণত করতে হলে আমাদেরকে বাংলাদেশের মানুষগুলোর প্রত্যেককে একেকজন চমৎকার এবং সুখী মানুষে পরিণত করতে হবে! বাংলাদেশ মানে যতোটা না ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটা ব-দ্বীপ তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ষোল কোটি মানুষ। একটা দেশকে সঙ্গায়িত করে তার মানুষেরা। আমাদেরকে ক্ষমতায় কে আছে সেটা না ভেবে নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের এবং কাছের মানুষদের চমৎকার মানুষে পরিণত করতে হবে। দেশের জন্যে কিছু করার এই পদ্ধতির নাম আমি দিয়েছি “মুহম্মদ জাফর ইকবাল মডেল”। জাফর ইকবাল স্যার যেমন কোনো ব্যক্তিগত লোভ বা স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে, কোনো দলের দিকে না তাকিয়ে, “একজন মাহাথির” এর অপেক্ষায় না থেকে একেবারে নিজে থেকে নিজের মতো করে দেশের জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন – নিজের বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করে যাচ্ছেন, দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে উদ্দীপ্ত করে যাচ্ছেন – আমাদেরকে সেভাবেই কোনো স্বপ্নের দল বা ব্যক্তির অপেক্ষা না করে দেশের জন্যে কাজ করে যেতে হবে। প্রত্যেকে নিজের অবস্থানে থেকে কাজ করে গেলে বাংলাদেশকে একটা উন্নত দেশের পরিণত করতে খুব বেশি সময় লাগবেনা। শুধু দেশকে নিয়ে স্বপ্নটাকে জিইয়ে রাখতে হবে, কখনো হতাশ হলে চলবেনা, নিজের নাম কামাইয়ের কথা ভুলে যেতে হবে, ফেইসবুকে কয়টা লাইক পেলাম সেটার কথা ভুলে কাজ করে যেতে হবে।

দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চাইলে আমাদের প্রথমে তিনটা মূল জিনিস নিয়ে কাজ করতে হবেঃ নিজেকে এবং আশে পাশের সবাইকে একটা চমৎকার বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, মানুষের মনে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আনার জন্যে কাজ করতে হবে, এবং দেশের মানুষের শারীরীক এবং মানসিক স্বাস্থের জন্যে কাজ করতে হবে।

আসুন দেখি এই তিনটা জিনিস কিভাবে আমাদের দেশের চেহারা বদলে দিতে পারে। কিভাবে জামাত-শিবির এর মতো জঙ্গি দল এবং তাদের মদদ-দাতা দলগুলোর চোখের সামনে দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে তাদেরকে অস্তিত্বশুন্য করে দিতে পারি কোনো রকম সহিংসতা ছাড়াই।

একটা চমৎকার বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষাঃ

রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ধর্ম নিয়ে আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের কারো মধ্যে কোনো দ্বিমত নাই। মধ্যাকর্ষণ নিয়ে সবাই একমত, কার-বাস-ট্রাক চলার প্রযুক্তি নিয়ে সবাই একমত, রাস্তা বানানোর ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়েও সবাই একমত। বিজ্ঞানে কোনো হাঙ্কি-ফাঙ্কি নাই। সবকিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই এরপর কোনো কিছুকে নিশ্চিত বলে ঘোষনা করা হয়। তাই বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলে কিংবা মানুষ বিজ্ঞান মনষ্ক হলে মানুষের চিন্তা ভাবনা অনেক যৌক্তিক হয়। কোনো কিছু ভালো করে যাচাই বাছাই না করে মানুষ তখন আর বিশ্বাস করে না। বগুড়ার যে মানুষগুলো সাইদিকে চাঁদে দেখা গিয়েছে বলে রাতের বেলা ঘুম থেকে উঠে ছুটে যেয়ে থানা আক্রমণ করতে গিয়েছে তারা বিজ্ঞান মনষ্ক হলে কোনোদিন সাইদিকে চাঁদে দেখতো না। বিজ্ঞান মনষ্ক মানুষকে সাইদি তার ওয়াজ-মাহফিলে বেহেশতের টিকেট দিতে পারবেনা। মানুষ যখন ক্রিটিকাল থিঙ্কিং করে তখন কোনো গুজবে তাকে বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা যাতে আধুনিক বিজ্ঞান-ভিত্তিক হয় সে ব্যাপারে আমাদের কাজ করতে হবে। বিশ্বজগতের বিবর্তন, জীবজগতের বিবর্তন, পৃথিবীর জন্মের পর থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন বছরের বিবর্তন, মানুষের গুহা মানব থেকে উঠে এসে আজকের এই অবস্থায় আসার ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটা মুখস্ত-নির্ভর পরীক্ষার ব্যবস্থা থেকে উদ্ধার করে মস্তিষ্ককে ব্যবহার করার ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। মানুষ তার মস্তিস্কের ক্ষমতার এক ক্ষুদ্রাংশ ব্যবহার করে; আমাদেরকে মস্তিস্কের সেই ব্যবহৃত অংশের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যে কাজ করতে হবে।

এটা ঠিক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার যদি তার দায়িত্ব ঠিকভাবে না করে (ইচ্ছা এবং/অথবা যোগ্যতার অভাবে) – যেটার সম্ভাবনাই বেশি – তাহলে আমাদেরকে আমাদের মতো করে কাজ করে যেতে হবে। শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সাইদ স্যার কয়েক দশক ধরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র দিয়ে আমাদের আলোকিত করার কাজ করে যাচ্ছেন; জাফর ইকবাল স্যার, মুনীর হাসান ভাই আর তাদের সাথে শত শত তরুণ তরুণী গণিত, ভাষা, বিজ্ঞান, এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে; রাগীব হাসানের শিক্ষক ডট কম বিনামূল্যে দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স। এগুলো হচ্ছে যেগুলোর খবর আমরা জানি। আমাদের জানার বাইরে কতো অসংখ্য মানুষ তাদের মতো করে শিক্ষা বা শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বই লিখে, পত্র-পত্রিকায় লিখে, ব্লগ লিখে, কিংবা কনফারেন্স-সেমিনার-বক্তৃতা আয়োজন করেও অনেকে দেশের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। সবকিছুর উপরে, সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বাবা-মা’রা। অন্যদের জন্যে কী করছেন সেটি যতোটা না গুরুত্মপূর্ণ তার চেয়ে গুরুত্মপূর্ণ হচ্ছে নিজের ছেলেমেয়েদের একটা চমৎকার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। স্কুল-কলেজে তারা যাই শিখুক না কেনো আপনি আপনার সন্তানকে একজন মানবিকতাবোধসম্পন্ন, বিজ্ঞান মনস্ক, যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। চিন্তা করে দেখুন বাংলাদেশের সব বাবা-মা যদি তাদের সন্তানদের একজন চমৎকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে তাহলে বাংলাদেশ কতো সহজে একটা আধুনিক এবং উন্নত দেশে পরিণত হতে পারে?

মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাঃ

আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভূমিকায় আছে এই কথাগুলোঃ

“We hold these truths to be self-evident, that all men are created equal, that they are endowed by their Creator with certain unalienable Rights, that among these are Life, Liberty and the pursuit of Happiness.”

অর্থাৎ – “আমরা এই সত্যগুলিকে স্বতসিদ্ধ বলে জানিঃ সকল মানুষ সমান অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়; এবং সবাই সৃষ্টিকর্তা হতে কিছু অধিকার জন্মগতভাবে পায় যার মধ্যে আছে বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাধীনভাবে জীবন ধারণের অধিকার, এবং নিজের জীবনে সুখী হওয়ার অধিকার”।

সেই ১৭৭৬ সাল থেকে আমেরিকার শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হচ্ছে এই কথাগুলো। সব মানুষ সমান। কেউ কারো থেকে বড় বা ছোট নয়। আইন সবার জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য। খেটে খাওয়া শ্রমিক থেকে শুরু করে বিলিওনেয়ার শিল্পপতি সবার আইনের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে সমান।

আমাদের বাংলাদেশে আমরা ছোটকাল থেকে শিখি “বড়দের সম্মান করো”, “গুরুজনকে মান্য করো”, “শিক্ষকদের সম্মান করো”, “তোমার বসকে সম্মান করো”, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের কখনোই শেখানো হয়নি যে *সব* মানুষকে সম্মান করো, শ্রদ্ধা করো, ভালোবাসো! ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; খেটে খাওয়া রিকশাওয়ালাকে শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; কঠোর পরিশ্রম করা গার্মেন্টস কর্মীদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; ঘরের কাজ করার মানুষগুলোকে শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; আপনি অফিসের বড় কর্তা হলেও আপনার অধস্তনদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়। কার পকেটে বা ব্যাংকে কতো টাকা আছে কিংবা কে কতো চমৎকার বাসায় থাকে, বা কে কতো দামী জামা-কাপড় পরে এগুলো মনে না রেখে মানুষের সাথে মিশলে আমি কী হনুরে অসুখ থেকে বাঁচা যায়।

যে কারণেই হোক আমাদের সমাজে সব মানুষকে সমান করে দেখার অবস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি। প্রাচীন মুসলমান সমাজে ছিলো আশরাফ-আতরাফ ভেদাভেদ, হিন্দু সমাজে ছিলো বর্ণ সমস্যা। “সম্ভ্রান্ত বংশ” বলে একটা চরম অমানবিক শ্রেণী প্রথা এখনো চালু আছে আমাদের সমাজে।

শুধু দেশ দিয়ে নয়, সারা পৃথিবীর জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য – পৃথিবীর সকল মানুষ সমান! আমার দেশ পৃথিবীর সেরা দেশ সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি, কোনো পরম মানদন্ডে সেটি সত্যি নয়। তেমনিভাবে আমার ধর্ম পৃথিবীর সেরা ধর্ম সেটাও আমার একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতি, কোনো পরম মানদন্ডে সেটি সত্যি নয়। পৃথিবীর প্রতি এক’শ জন মানুষের মধ্যে প্রায় দুইজন আমার দেশের মানুষ, প্রতি এক’শ জন মানুষের মধ্যে প্রায় একুশ জন আমার ধর্মের মানুষ, তাই আমার দেশ বা আমার ধর্ম পৃথিবীর সবার দেশ বা ধর্মের উপরে এই ধরণের চিন্তা করা মানে পৃথিবীর একটা বড় অংশের মানুষকে আমার থেকে ছোট করা হয় (আসলে তো নিজেকেই নিজে ছোট করা হয়)!

জন্মস্থানের কারণে, ধর্মের কারণে, বংশের কারণে, গায়ের রঙ এর কারণে, পেশা’র কারণে কাউকে নিজের থেকে ছোট ভাবার মতো অমানবিক আর কিছুই হতে পারে না!

আমাদের সবার মাঝে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে কাজ করতে হবে। এই শিক্ষা সবার আগে শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যদি দেখে তাদের বাবা-মা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে, কিংবা ঘরের কাজ করার মানুষকে নির্যাতন করছে, অসম্মান করছে, তাহলে সেই ছোট ছেলেমেয়েগুলো বড় হয়ে নিজেরাও তাই করবে। বাবা-মা’র উচিৎ ছেলেমেয়েদের মধ্যে সব ধরণের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসাবোধ তৈরি করে দেওয়া।

একজন মানুষ তখনই দেশের জন্যে কিছু করতে উদবুদ্ধ হবে যখন তার মধ্যে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকবে। কেউ দেশের জন্যে কিছু করতে চায় – এই কথাটার মানে হচ্ছে সে দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চায়! তাই দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি করার পুর্বশর্ত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মানুষকে ভালোবাসে এমন মানুষ তৈরি করা!

একটা সুস্থ এবং শক্ত শরীর (এবং মন):

আমাদের দেশে সব সময় অবহেলিত একটা বিষয় হচ্ছে সুস্বাস্থ্য। পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব হচ্ছে শরীর এর মাধ্যমে অথচ আমাদের বড় হয়ে উঠার মধ্যে শরীর নিয়ে কোনো শিক্ষা বা প্রচার একেবারে নাই বললেই চলে! আমার শরীর যে একটা খুবই গুরুত্মপূর্ণ জিনিস এবং আমার যে এই শরীরকে অনেক যত্ন নেওয়া উচিৎ, অনেক শক্ত করে তোলা উচিৎ এটা আমাকে খুব বেশি কখনো বলা হয়নি। শরীরের প্রতি যত্ন ব্যাপারটা “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল” ভাবসম্প্রসারণ এর মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে আমাদের জীবনে।

শরীর যে একটা গুরুত্মপূর্ণ জিনিস এটা আমি সত্যিকারভাবে বুঝতে পারি বিদেশে পড়তে আসার পর। এখানে বেশিরভাগ মানুষেরই চমৎকার স্বাস্থ্য, রাস্তায় বেরুলেই মানুষজনকে সকাল বিকেল দৌড়াতে দেখি, জিমে গেলে দেখা যায় সবাই শরীরকে শক্ত করার জন্য নানা ব্যায়াম করছে। এখানে সত্তর-আশি বছরের মানুষকে একা একা নিজের এবং ঘরের কাজ করতে দেখি যেখানে আমাদের দেশে ষাট এর পর বেশির ভাগ মানুষ এটা সেটা নানা অসুখ-বিসুখে কুপোকাত হয়ে পড়ে।

এখানে সব হাই স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সব ধরণের খেলাধুলার দল আছে এবং সেই স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই অলিম্পিকে যেয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পদক জিতে আসে। আমাদের বাংলাদেশে আমরা কয়জন ছেলেমেয়ে নিয়মিত খেলাধুলা করে বড় হয়েছি? আমরা কয়জন নিয়মিত ব্যায়াম করি?

আমাদের দেশের মানুষজনের শরীরের দিকে তাকালেই আমাদের শরীরের দৈন্য দেখা যায়, অযত্নের ছাপ দেখা যায়। বাংলা সিনেমা দেখলে হয়তো মনে হতে পারে আমরা অনেক স্বাস্থ্যবান কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা আসলে উলটা। আমাদের ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগই বয়স ত্রিশ পেরুতে না পেরুতেই নধর একটা ভুড়ি গজিয়ে ফেলে। কেউ কেউ ভুড়ি না গজিয়ে শীর্ণকায় হয়। ব্যাপারটা নিয়ে মজা করা যায় কিন্তু এটা আমাদের শরীরের প্রতি অযত্ন আর অবহেলার প্রমাণ দেয়।

শরীরের সাথে মনের সম্পর্ক খুব নিবিড়। শরীর যদি দুর্বল হয়, চর্বির ভারে পেট যদি গড়িয়ে পড়ে তাহলে সেই শরীরে একটা চমৎকার মন থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই শরীরের একটা বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিস্ক থাকাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। শরীরের প্রতি অযত্নের কারণে মানুষ আগে আগে বুড়িয়ে যায় এবং আমাদের মতো একটা গরীব দেশের জন্যে তখন অনেক বেশি অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে হয়। আমরা যদি আমাদের শরীরের যত্ন নিই, যদি একটা শক্তিশালী শরীর এবং ব্রেইন ধরে রাখতে পারি তাহলে বেশি বুড়ো হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অনেক বেশি দিন নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে, দেশের জন্যে কাজ করে যেতে পারি!

আমাদেরকে দেশের মানুষকে শরীর ভালো রাখার, শক্ত রাখার গুরুত্ম বোঝাতে হবে। রেডিও-টিভি, পত্র-পত্রিকায় এটা নিয়ে বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। যারা স্বাস্থ্য-পুষ্টি-মেডিক্যাল বিষয়ে জানেন তাদের এটা নিয়ে লেখালেখি করতে হবে, রেডিও-টিভিতে যেয়ে বলতে হবে।

একটা শক্ত শরীরের মানুষ একটা শক্ত মনের অধিকারী হয়। তখন সে জীবনে চ্যালেঞ্জ নিতে কম ভয় পায়, বেশি ঝুঁকি নিতে পারে, বেশি পরিশ্রম করতে পারে, নিজের ব্যররথতার জন্যে অন্যকে বা ভাগ্যকে দোষ দেয় না, নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজে নিয়ে নেয়, লটারি জেতার আশায় বসে থাকে না, মানুষের দোষ ত্রুটি খঁজে বেড়ায় না।

শেষ কথাঃ

দেশের উন্নয়ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আলাদা কোর্স আছে, এমনকি অনার্স-মাস্টার্স-পিএইচডি করার বিষয় পর্যন্ত আছে। আমি উন্নয়ন বিষয়ক পন্ডিত নই, কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্যে আমাদের বাংলাদেশের মানুষের পেছনে বিনিয়োগ করতে হবে সবার আগে। যাদের দ্বারা আমরা স্বপ্ন দেখি, যাদের জন্যে আমরা স্বপ্ন দেখি, তাদেরকে উন্নত হওয়ার জন্যে আগে প্রস্তুত করতে হবে। এরপর এটা একটা পজেটিভ ফিডব্যাক লুপের মতো নিজেকে নিজে টেনে নিয়ে যাবেঃ একদল চমৎকার মানুষ আরেক দল চমৎকার মানুষ তৈরি করবে, তারা সবাই মিলে আরো চমৎকার মানুষ তৈরি করবে, এবং এভাবে এক সময় বাংলাদেশের বেশির মানুষ একেকজন স্বপ্নের মানুষে পরিণত হবে!

আর সেটি হবে তখন আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ!

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.