আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও


Ivy_League_Logo-Large
১। বিশ্বজিত

চব্বিশ বছর বয়সী বিশ্বজিতকে ছাত্রলীগের ছেলেরা রড-চাপাতি-ছুরি দিয়ে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে।  চব্বিশ বছর বয়সে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। চব্বিশ বছর বয়সে আমার মনে ছিলো পাহাড় সমান স্বপ্ন। বিশ্বজিত আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়নি। দারিদ্র্যের কারণে ক্লাস নাইনের পর পড়ালেখায় ক্ষান্ত দিয়েছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত বিশ্বজিতেরও আমার মতো পাহাড় সমান স্বপ্ন ছিলো। ওই বয়সে কার না স্বপ্ন থাকে? অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন, চমৎকার একটা মেয়ের সাথে জীবন কাটানোর স্বপ্ন, নিজের পরিবারের জন্যে কিছু করার স্বপ্ন, সম্ভব হলে দেশের জন্যে কিছু করার স্বপ্ন – সব মিলিয়ে একটা অর্থপূর্ণ জীবন যাপনের স্বপ্ন।

২। আমন্ত্রণ টেইলার্স

বিশ্বজিত ছয় বছর ধরে দর্জির দোকান “আমন্ত্রণ টেইলার্স” গড়ে তুলেছিলেন। বিশ্বজিতদের তো দর্জি বা এরকম কিছুই হতে হয়। বিশ্বজিত যদি দর্জি না হতো তাহলে হয়তো রিকশা চালাতো। কিংবা হতে হতো বাসের নিরীহ যাত্রী। কিংবা কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে আসা কোনো এক সাধারণ তরুণ। বিশ্বজিতের বাবা তো আর কোটিপতি রাজনীতিবিদ নয়। কোটিপতি আমলা কিংবা সামরিক অফিসারও নয়। কিংবা নয় ধনী ব্যবসায়ী। এমন না যে কোটিপতি হওয়াটা কোনো অপরাধ। কিন্তু বিশ্বজিতের বাবা কোটিপতি হতে পারবেনা। কোটিপতির ছেলে দর্জি হয়না। কোটিপতির ছেলে রিকশাওয়ালা হয়না। কোটিপতির ছেলে অবরোধের মধ্য দিয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক এর সামনে দিয়ে হেঁটে শাঁখারীবাজার এর দর্জি দোকানে একজন কাস্টমার ধরার জন্যে সকাল নয়টার সময় ঘর থেকে বের হয়না। কোটিপতির ছেলে আমেরিকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। কিংবা পড়ালেখা শেষ করে আমেরিকাতেই বড় অংকের চাকরি করে। এমন না যে আমেরিকায় থাকা কোনো অপরাধ। কিন্তু বিশ্বজিতরা আমেরিকায় থাকেনা। বিশ্বজিতদের থাকতে হয় লক্ষ্মীবাজারের ঋষিকেশ দাস রোডে।

বিশ্বজিতরা বারিধারায় থাকেনা, বনানীতে থাকেনা, ধানমন্ডিতেও নয়। বিশ্বজিতরা থাকে টঙ্গিতে কিংবা যাত্রাবাড়ি পার হয়ে ঢাকার কোনো এক কোণে। বিশ্বজিতরা মুড়ির টিন মার্কা বাস এর হ্যান্ডলে ঝুলে ঝুলে কাজ করতে যায়। হরতাল অবরোধের সময় বিশ্বজিতদের বাসে আগুন লাগানো একটা ফরজ কাজ। যাদের দিয়ে আগুন লাগানো হয় তাদের নামও হয় বিশ্বজিত। কিংবা নাহিদ। অথবা শাকিল।

৩। বারিধারা, বোস্টন, বা ভার্জিনিয়া

বারিধারা বা ডিওএইচএস বা বনানীতে বিশ্বজিতরা থাকেনা। বিশ্বজিতের খুনী নাহিদ, শাকিলরাও থাকেনা সেখানে। কিন্তু তাদেরকে যারা খুন করে কিংবা খুনীতে পরিণত করে তারা সেখানে থাকে। আর তাদের সন্তানরা থাকে বোস্টনে, কিংবা ভার্জিনিয়ায়। কিংবা লন্ডনে। কেউ কি কখনো আমাদের রাজনীতিবিদদের, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের, ব্যবসায়ীদের, বুদ্ধিজীবিদের,  কিংবা তাদের সন্তানদের দর্জি হতে দেখেছে? কেউ কি তাদের সন্তানদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেখেছে? তাদের সন্তানদের হাতে কোনোদিন চাপাতি, রড, ছুরি, রামদা দেখেছে কেউ? কেউ কি দেখেছে আমাদের নীতিনির্ধারকদের কোনো সন্তানকে তারই বয়সী কয়েকজন ছাত্র ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলছে? ভার্জিনিয়া-নিউ ইয়র্ক-বোস্টন এর আই-৯৫ হাইওয়েতে হাই স্পিডে চলতে থাকা এসইউভির ভেতরে হাই ভলিউমে যখন এই কর্তাব্যক্তিদের সন্তানরা গান শুনছে ঠিক সেই সময় তাদেরই সমবয়সী নাহিদ, শাকিলরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারছে বিশ্বজিতদের। বিশ্বজিতের শরীর থেকে ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়া রক্তের সাথে আমেরিকার দশ লেইনের রাস্তায় ড্রাইভ করতে থাকা কিংবা নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের কোনো ফার্মে কাজ করা সন্তানদের রক্তের পার্থক্য কতোটুকু?

৪। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি

দেশের কর্তাব্যক্তি যারা – রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবি – তাদের যাদের সন্তানরা বিদেশে পড়ালেখা করছে বা করেছে তারা দয়া করে একটু নিজের সন্তানদের জিজ্ঞেস করে দেখুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঠিক কী করা হয়। ব্যাপারটা হয়তো আপনাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, কিন্তু এটাই সত্যিঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করা হয়! সারপ্রাইজ! একটা ছেলে বা মেয়ে আঠারো/উনিশ বছর বয়সে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তার পছন্দের বিষয় বা বিষয়গুলোতে শিক্ষা লাভ করে, গবেষণা করে। পাশাপাশি সে খেলাধুলা করে, গান-কবিতা-অভিনয় ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কাজে জড়িত হয়, সুযোগ পেলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কোথাও কাজ করে, কেউ বা ক্লাব-সঙ্গগঠন করে নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা অর্জন করে। কোনো সভ্য দেশের সভ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাড়াটে মাস্তান হয়ে বিশ-একুশ বছরের ছেলেমেয়েরা রামদা-চাপাতি হাতে খুনাখুনি করেনা!

ছাত্রছাত্রীদের রাজনীতি নিয়ে কথা উঠলেই অবধারিতভাবে কয়েকটা জিনিস বলা হবেই! প্রথমটি হচ্ছেঃ ছাত্ররাজনীতি না থাকলে আমরা বায়ান্ন, একাত্তর, নব্বই এর মতো অধিকার আদায় এর আন্দোলন কিভাবে করবো? এর মানে কি পৃথিবীর যাবতীয় অধিকার আদায় এর উত্তর হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি? পৃথিবীর গতো কয়েক হাজারের ইতিহাসে সব অধিকার আদায় হয়েছে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে? আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেখানেই যতো সমস্যা হয়েছে সব অনাচার অবিচার বন্ধ করা হয়েছে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে?  হাই স্কুল, প্রাইমারী স্কুলেও কি আমরা রাজনীতি চালু করে দিবো যাতে ওরাও আমাদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করতে পারে? আমি বাংলাদেশের দুইটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছি, এর প্রায় কোনো সময়ই কোনো ছাত্র সঙ্গঠনকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করতে দেখিনি। সব সময় সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাই নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করেছে। এই আন্দোলন এর জন্যে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কোনো রাজনৈতিক অং সঙ্গগঠন এর সদস্য হতে হয়নি। উলটা ছাত্রলীগ/ছাত্রদল/ছাত্র শিবির সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর  নির্মমভাবে অত্যাচার করেছে। নব্বই এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন এর পর বাইশ বছর পার হয়েছে। এই বাইশ বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর হয়ে মাস্তানি-গুন্ডামি করা ছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলো আর কোনো ভালো করেছে? এমনকি ২০০৬-২০০৮ সালের মিলিটারি-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনও সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাই করেছে!

দ্বিতীয় আরেকটি কথা বলা হয় ছাত্ররাজনীতি না থাকলে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হবে কিভাবে? আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি ছাত্রলীগের শাকিল, নাহিদ এর মতো খুনী ছেলেরা আমাদের দেশের ভবিষ্যত নেতা হবে? যে দেশের অনেক বর্ষীয়ান নেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আমাদের মনে শঙ্কা জাগায় সেই দেশের পড়ালেখা না করা, সন্ত্রাস করে দিন পার করে দেওয়া ছেলেমেয়েরা আমাদের ভবিষ্যত নেতা হবে? এরচেয়ে ভালো করে লেখাপড়া করা, সত্যিকারের স্মার্ট, ট্যালেন্টেড ছেলেমেয়েরাই কি ভালো নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা?

আর কারো যদি রাজনীতি করার ইচ্ছা থাকে তাহলে সে ক্যাম্পাসের বাইরে যেয়ে মূল দলের সাথে রাজনীতি করুক। রাজনীতি করা একটা সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। কোনো ছাত্র বা ছাত্রীর যদি রাজনীতি না করলে ভালো লাগেনা, সে তো যে কোনো সময় যেয়ে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারে। কিন্তু সেটা করবে ক্যাম্পাসের বাইরে যেয়ে, মূল দলের সাথে। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় শুধুই পড়ালেখা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কাজকর্ম, আর স্বপ্ন দেখার জায়গা!

৫। আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও

আজ থেকে প্রায় পনের বছরেরও বেশি সময় আগে শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিবিদ নামক সন্ত্রাসীদের তান্ডব দেখে “আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও” শিরোনামে একটি হৃদয়-স্পর্শী লেখা লিখেছিলেন। স্যার তখন সবে দীর্ঘ আঠারো বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে দেশে ফিরেছেন, বিশ-একুশ বছরের ছেলেমেয়েদের তিনি দেখে এসেছেন ক্যাম্পাসে এসে পড়ালেখা করছে, গবেষণা করছে, সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান করছে, খেলাধুলা করছে। রামদা-চাপাতি-কাটা রাইফেল হাতে একে অপরকে নির্দয়ভাবে আক্রমণ করার ব্যাপারটি তখনও তাঁর কাছে নতুন ছিলো। যে বয়সে এই ছেলেগুলোর জীবনকে পূর্ণ উদ্দ্যমে উপভোগ করার কথা, নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করার কথা, ভবিষ্যত রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন নতুন অর্থনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে দিনভর যুক্তি-তর্ক-আলোচনা করার কথা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করার কথা, খেলাধূলা করে অলিম্পিকের সোনা জেতার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা – সেই স্বর্ণ সময়ে এই ছেলেগুলো চাপাতি-রড-রাইফেল নিয়ে তাদেরই সমবয়সী আরেক দল ছেলেকে পশুর মতো পিটিয়ে মারছে – এই হাহাকার করা কথাগুলোই উঠে এসেছিলো জাফর স্যারের সেই লেখায়। কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা জানি, জাফর স্যারের এই হাহাকার আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিদের একবিন্দু স্পর্শ করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে স্বপ্ন দেখার এবং সে স্বপ্ন পূরণের জন্যে কাজ করার জায়গা। আমেরিকায় আসার পর আমি আমেরিকার অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়েছি। যখনি কোনো নতুন জায়গায় গিয়েছি, আমি সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঘুরে বেড়িয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লনের সবুজ ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে আমি সদ্য কৈশোর পার হওয়া ছেলেমেয়েদের উচ্ছাস আর উল্লাস দেখি। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদ-সামরিক বেসামরিক আমলা-ব্যবসায়ী-বুদ্ধিজীবির সন্তানরা পড়ালেখা করে। মনে মনে ভাবি আচ্ছা বিশ্বজিত যদি এখানে পড়তে পারতো? বিশ্বজিত এখানে পড়লে সেদিন বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে দিয়ে না যেয়ে হেঁটে যেতো ভার্জিনিয়ার কোনো সাজানো পার্কে, কিংবা ডিনার করতো বোস্টনের কোনো চমৎকার রেস্টুরেন্টে, কিংবা দেখতে যেতো সান ফ্রান্সিস্কো গোল্ডেন গেইট ব্রিজ!

খুনী ছাত্রনেতা শাকিল আর নাহিদ – আহা, ওরা যদি পড়তে আসতো কোনো আইভি লিগ ইউনিভার্সিটিতে? চাপাতির বদলে শাকিল হয়তো নতুন কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতো, নাহিদ হয়তো স্ট্রিং থিওরির উপর কাজ করতো। হয়তো ওদের থাকতো একজন ভালোবাসার মানুষ, চমৎকার এক প্রেমিকা যাকে দেখে ওরা মানুষকে, জীবনকে ভালোবাসতে শিখতো!

আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা – রাজনীতিবিদ, সামরিক বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবিগণ – এদের প্রায় কারোর সন্তানই বিশ্বজিত, শাকিল, কিংবা, নাহিদের মতো অবস্থায় নাই। এর মানে তাঁরা ভালো করেই বুঝেন বিশ্বজিত, শাকিল, এবং নাহিদরা যেভাবে জীবন চালিয়েছে/চালাচ্ছে সেটা একটা অর্থবহ জীবন হতে পারেনা! তবে কেনো নিজের সন্তানদের নিরাপদে রেখে অন্যের সন্তানদের দিয়ে রাজনীতির নামে খুনাখুনি করানো হয়?

আমরা কি আমাদের সন্তানদের জন্যে রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেতে পারিনা? ফিরে পেতে পারিনা আমাদের ছেলেমেয়েদের?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: