Category Archives: Science

কর্পোরেটকে ঘৃণার সংস্কৃতি – এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং কর্পোরেট না থাকলে কি সভ্যতার চাকা ঘুরতো?

আমাদের অনেকেই কিছু শব্দ আওড়াতে বেশ পছন্দ করি – সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, পুঁজিবাদ-সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা বিশ্বের ষড়যন্ত্র, বস্তুবাদ, পরজীবি বুদ্ধিজীবি ইত্যাদি ইত্যাদি। ইদানিং এর সাথে যোগ হয়েছে কর্পোরেট থাবা, কর্পোরেট দখল, কর্পোরেট লোভ বা এই জাতীয় কিছু শব্দ। মোট কথা বড় কম্পানীগুলোর ব্যবসা-বানিজ্যের ধরণের বিরুদ্ধে এক ধরণের ঘৃণা বা অপছন্দতা। দেশে বড় কিছু ঘটলেই যেমন কিছু মানুষ অবধারিতভাবে ধরে নেয় এটা ইন্দো-মার্কিন-ইজরায়েল এর চক্রান্ত, তেমনি দেশের বড় বড় কম্পানীগুলো তাদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কোন নতুন কিছু করলেই গেলো গেলো রব উঠে যায়। ভাবখানা এমন এই কম্পানীগুলোর সিইও হচ্ছে স্বয়ং ইবলিশ শয়তান আর তাদের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের এই গরীব দেশটাকে চুষে নিঃশেষিত করে দেওয়া।

কর্পোরেট বলতে আমরা সাধারণত বড় কম্পানীগুলোকেই বুঝাই। এগুলোর অনেকগুলোই আবার বহুজাতিক কম্পানী। কর্পোরেট এর প্রতি আমাদের ঘৃণা যতোই হোক না কেনো, আমাদের একটা মুহুর্তও কর্পোরেট এর উৎপাদিত পণ্য ছাড়া চলবেনা। আঠারো শতকের দিকে যে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিলো ইউরোপে, আজকের কর্পোরেট তারই বিশ শতকীয় সংস্করণ। এই যে আমি যেই কম্পিউটার ব্যবহার করে এই লেখাটি লিখছি সেটি ডেল নামক বহুজাতিক কম্পানীর তৈরি, ইন্টারনেট কানেকশন নেওয়া হয়েছে আরেক বিশাল কম্পানী কমকাস্ট থেকে, আমার ঘরের প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসপত্র কোনো না কোনো কম্পানীর তৈরি। পানি, বাতাস, আর মাটি ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার তার সবই আসে কর্পোরেট থেকে। আমার নিজের চাকুরীটাও একটা বহুজাতিক কম্পানীতে! এবং এ চাকুরী পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি! এবং সেটাই কি আমাদের সবার জন্য সত্যি নয়? আমাদের সবাই কি একটা ভালো কম্পানীতে একটা ভালো চাকুরী পেলে নিজেদের ধন্য মনে করি না?

পৃথিবীর সভ্যতার চাকা ঘুরানোর মূল রসদগুলো আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এঁরা। কিন্তু এগুলো পৃথিবীর ছয় বিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে তাদের ব্যবহারের মতো পণ্য বা সেবা হিসেবে প্রস্তুত করে নিয়ে যায় মূলত বিভিন্ন বেসরকরারী প্রতিষ্ঠান এবং কম্পানীগুলো (কিছু ক্ষেত্রে সরকারও এই কাজটি করে থাকে)। কম্পানীগুলো এই কাজটি কোনো জনসেবার চিন্তা থেকে নয়, বরং পুরোপুরি মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই মুনাফা লাভ করতে গিয়ে ওরা অসংখ্য মানুষকে চাকুরী দেয় আর মানুষের জীবনকে করে দেয় অনেক বেশি আরামদায়ক। এখন ওরা কতোটুকু লাভ করবে, কিংবা কী প্রক্রিয়ায় ব্যবসা করবে এই আইনগুলি ঠিক করে দিবে দেশের সরকার, যেই সরকারকে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আনবে সেই দেশের জনগন। জনগন যেহেতু সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, তাই সরকার এমনভাবে আইন করবে যাতে জনগনের স্বার্থ সবার আগে রক্ষা হয়। এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে যারা ওই কম্পানীগুলোর মালিক/অংশীদার তারাও এই জনগনের অংশ, এবং তারাও অসংখ্য মানুষের চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখছে।

আমরা যারা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়এ পড়ছি বা পড়ে পাশ করে বের হয়েছি, আমাদের সবার লক্ষ্য কী? প্রায় সবাই কি একটা ভালো চাকুরী করতে চাই না? বড় বড় টেলিকম কম্পানীগুলো, কিংবা বড় বড় বুহুজাতিক কম্পানী-ব্যাঙ্কগুলো হয় আমাদের প্রথম টার্গেট, কারণ সেগুলো সবচেয়ে বেশি বেতন দেয়। একটা স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য সবারই টাকা দরকার হয়, টাকা নিয়ে যতোই বড় কথা বলি না কেনো আমরা। আর সেই টাকার একটা বড় অংশ অর্থনীতিতে পাম্প করে এই কম্পানীগুলো। অর্থনীতিকে সচল রাখতে কম্পানীগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

উন্নত দেশগুলিতে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে প্রচন্ড উৎসাহ দেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক বাল্বসহ অসংখ্য আবিষ্কারের জনক থমাস আলভা এডিসন ছিলেন একজন সফল উদ্দোক্তা (এন্ট্রাপ্রেনিউর)। মাইক্রোসফট এর বিল গেটস, গুগলের ল্যারি এবং সের্গেই, এইচপি এর হিউলেট এবং প্যাকার্ড – এরকম অনেক কম্পানীর প্রতিষ্ঠাতারা আক্ষরিক অর্থেই জিনিয়াস পর্যায়ের মানুষ। এই কম্পানীগুলো বিংশ এবং একবিংশ শতকের সভ্যতার পরিবর্তনের অন্যতম চালক। তেমনি করে সারা পৃথিবী জুড়ে খেলাধুলা, ইলেক্ট্রনিক্স, কম্পিউটার, টেলিকম, পেট্রোলিয়াম, কসমেটিক্স, খাদ্যদ্রব্য, যানবাহন, উড়োজাহাজ, স্বাস্থ্য – ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্ভর কম্পানী নানারকম পন্য এবং সেবা দিয়ে পৃথিবীতে আমাদের জীবন যাপনকে করে দিয়েছে অনেক বেশি সুবিধাজনক আর আরামদায়ক। আমাদের আজকের এই মোবাইল ফোন বিপ্লব, মিডিয়া বিপ্লব এগুলোর পেছনেও রয়েছে কর্পোরেট। মোবাইল ফোন ছাড়া কি একটা দিনও থাকার কথা ভাবা যায়? আর কর্পোরেটকে বাদ দিয়ে সরকারীভাবে ফোন সেবা দিতে চাইলে যে কী অবস্থা হয় সেটা টিএন্ডটি আর টেলিটককে দেখলেই বুঝা যায়!

দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য অনেকাংশেই নির্ভর করে এই কম্পানীগুলোর স্বাস্থের উপর। কম্পানীগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে টাকা কামানো, সরকার সঠিক আইনের মাধ্যমে এই কম্পানীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কম্পানীগুলোকে ঘৃণা করে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। দুঃখের বিষয় এমনকি বিয়ে করার সময় পাত্র ব্যবসা করে এমন কথা শুনলে আমাদের অভিভাবকরা তাদের মেয়ে বিয়ে দিতে চায়না অনেক সময় সেই পাত্রের কাছে। ব্যবসা মানেই মুদির দোকানী বা এরকম কিছু, কিংবা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে না পেরে কিছু একটা করার চেষ্টা – এই ধারণা থেকে আমাদের বের হতে হবে। মেধাবী ছেলেমেয়েরাও ব্যবসা করে, এবং সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনেক মেধাবী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যবসা প্রশাসন গ্র্যাজুএট কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে – এটাকে একটা বাস্তবতা হিসেবে আমাদের মেনে নিতে হবে।

আমাদের দরকার অনেক অনেক ব্যবসায়ী উদ্দোক্তা, অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। সিলিকন ভ্যালীর মতো সভ্যতা পরিবর্তনকারী ব্যবসা’র জায়গা তৈরী হয়েছে শুধুমাত্র উদ্দোক্তাদের মাধ্যমে। সিলিকন ভ্যালীর উদ্দোক্তারা প্রায় সবাই কোটিপতি, কিন্তু তাদের পন্য ব্যবহার করে আরো বেশি মানুষ কোটিপতি হয়েছে এবং তার চেয়েও বেশি মানুষ আরামদায়ক জীবন যাপন করছে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। “কর্পোরেট” শব্দটাকে একটা ভালো শব্দ হিসেবে দেখতে হবে। কর্পোরেটএ চাকুরী পাবার জন্য একের পর সিভি জমা দিবো কিন্তু ব্লগে বসে কর্পোরেটকে গালি দিবো সেটা হওয়া উচিত নয়। এরচেয়ে গণহারে সমালোচনা না করে স্পেসিফিক সমালোচনা করলে ব্যাপারটা অনেক বেশি ঠিক হয়। কর্পোরেট যেনো আমেরিকার মতো হয়ে না পড়ে – আমেরিকাকে সবাই গালি দেয় কিন্তু সবাই সেখানে যেতে চায়, ডিভি লটারিতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে বাংলাদেশ থেকে! কর্পোরেট যেনো একটা আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়, এন্ট্রাপ্রেনিউর হওয়া ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ম্যানেজার হওয়ার চেয়ে কম স্মার্ট ব্যাপার না। একটি সফল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা এবং সেটিকে সবার নিত্যদিনের ব্যবহার্য করে তোলা একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার, এবং এই কাজের জন্য দরকার ভিশন এবং এক্সিকিউশন। আজকের দিনের সেরা ব্র্যান্ডগুলি তৈরির পেছনে অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের অনেক বছরের পরিকল্পনা আর পরিশ্রম রয়েছে। এই পরিশ্রমকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

তবে কর্পোরেট যেনো মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য থাকতে হবে শক্ত আইন এবং তার শক্ত প্রয়োগ। বন উজাড় করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, চাষাবাদের জমি এবং নদী দখল করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলা, সেবার তুলনায় টাকা বেশি নেওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে সরকারকে থাকতে হবে তৎপর। কিন্তু এসব যাতে কর্পোরেট এর বিরুদ্ধে নির্বিচার ঘৃণার কারণ না হয়ে উঠে সেটি খেয়াল রাখতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কর্পোরেট এর বিকল্প নেই। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বছর বছর যে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিবিএ, অর্থনীতি, রাজনীতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, ইত্যাদি অসংখ্য বিষয় থেকে পাশ করে বের হচ্ছে তাদের পর্যাপ্ত চাকুরীর জন্য দরকার অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। শুধু খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সরকার যেনো দেশের আইনটা ঠিকমতো প্রয়োগ করে আর সাধারণ মানুষের স্বার্থের দিকটা ঠিক রাখে।

Advertisements

ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েব – ইন্টারনেট প্রযুক্তি কোন দিকে যাচ্ছে?

আশি’র দশকের শেষের দিকে টিম বার্নার্স-লি যে ওয়েব (Web) নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, সেই ওয়েব যে আজকে এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়াবে সেটা তিনি নিজেই ভেবেছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। ওয়েব প্রযুক্তি দিনদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে, আমাদের জীবনের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর প্রায় সবকিছুই এখন ওয়েবএ পাওয়া যায়। মানুষের সাথে মানুষের এতো সহজ যোগা্যোগ এবং তথ্যের আদান-প্রদান পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি।

আমরা অনেকেই ইন্টারনেট বলতে যা বুঝি সেটা হচ্ছে আসলে ওয়েব। ওয়েব হচ্ছে ইন্টারনেট এর অনেকগুলো আ্যপ্লিকেশন এর একটি। অন্যান্য আরো কিছু আ্যপ্লিকেশন হচ্ছে ইমেইল, এফটিপি (ফাইল ট্রান্সফার প্রোটোকল), এসএসএইচ (SSH) ইত্যাদি। ইন্টারনেট বলতে বস্তুত এই পৃথিবীব্যাপী নেটওয়ার্কেই বুঝায়। ওয়েবই আসলে সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং সবচেয়ে বেশি ব্যাবহৃত ইন্টারনেট আ্যপ্লিকেশন। ওয়েব এর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে তথ্যের সহজলভ্যতা। তথ্য বলতে যে শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয় বুঝায় তা কিন্তু নয়। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের যাকিছু জানার প্রয়োজন তাই তথ্য। আমার বন্ধু সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বেড়াতে গেছে সেটি একটি তথ্য, সেখানে ও অনেক ছবি তুলেছে সেই ছবিগুলোও একধরণের তথ্য, সেখানে কোথায় ভালো খাবার পাওয়া যায় সেটাও তথ্য। তথ্যের এই বহুমাত্রিকতা শুরু হয় বিশেষ করে সোশাল নেটওয়ার্কগুলোর প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে।

তথ্য আদান-প্রদানই হয়ে উঠছে ওয়েব ভিত্তিক কম্পানীগুলোর মূল ব্যবসা। গুগলের মূল মিশন হচ্ছে বিশ্বজগতের সব তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ওয়েব এর প্রথম দিকে ব্যাপারটি ছিলো আমাদের নিজেদের দরকারী তথ্য খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে ব্যাপারটি এমন হতে চলেছে যে দরকারী তথ্য আমাদেরকে খুঁজে নিবে। গুগল, মাইক্রোসফট, ইয়াহু, ফেইসবুক, টুইটার, উইকিপিডিয়া, ফ্রেণ্ডফিড, মাইস্পেস, অরকুট, ডিগ, টেকমিম সবাই এই তথ্য প্রবাহ এবং যোগাযোগকে মানুষের আরো কাছে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আরএসএস এবং রিয়াল টাইম আপডেট এর মতো প্রযুক্তিগুলো আবিষ্কার হয়েছে এধরণের সেবা দেওয়ার জন্য। গতো কয়েক বছরে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মানুষ সংবাদের জন্য টেলিভিশন-সংবাদপত্র ইত্যাদির চেয়ে ওয়েব এর কাছেই বেশি যাচ্ছে। সংবাদ পড়ার জন্য আগে মানুষ সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, গুগল নিউজ ইত্যাদি সাইটে গেলেও ইদানিং সোশাল নেটওয়ার্ক এবং ব্লগ হয়ে উঠছে সংবাদের নতুন উৎস।

এ ব্যাপারটা প্রথম আমি খেয়াল করি গতো মার্চ মাসে আমেরিকান এয়ারলাইন্স এর একটি প্লেইন নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীতে জরুরী অবতরণ করার পর। এই ঘটনার খবর সবার আগে জনসম্মুখে আসে টুইটারের মাধ্যমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের (এবং উদ্ধারকারীদের) মধ্যে অনেকেই টুইটার ব্যবহারকারী ছিলেন এবং তারা প্রতিনিয়ত ছোট ছোট টুইট (১৪০ শব্দের ভেতর এসএমএস এর মতো অনলাইন মেসেজ) দিয়ে ঘটনার আপডেট দিচ্ছিলেন। টুইটারের সুবিধা হলো এটি ব্যবহার করে রিয়াল টাইম সংবাদ দেয়া যায়। এটাকে বলা যায় এসএমএস এর অনলাইন ভার্শন। কিন্তু এসএমএস দিয়ে যেখানে একসাথে একজনকে মেসেজ পাঠানো যায়, টুইটারের সাহায্যে সেখানে আক্ষরিক অর্থেই কয়েক মিলিয়ন মানুষের কাছে মেসেজ পাঠানো যায়। টুইটারের এমন উত্থানের পর সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস এর মতো সংবাদ মাধ্যমগুলো অনেক দুশ্চিন্তায় আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সিএনএন (@cnnbrk) এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস (@nytimes) দুটি’রই টুইটার একাউন্ট আছে! টুইটারকে অনেকেই বলছে গুগল এবং ফেইসবুকের নতুন প্রতিদ্বন্ধী। ফেইসবুকের সর্বশেষ ডিজাইনটি করা হয়েছে আসলে টুইটারকে নকল করে এবং একে টপকে যাওয়ার জন্য। খেয়াল করে দেখবেন ফেইসবুক সারাক্ষণ সবার স্টেটাস আপডেট আপনার পেইজে নিয়ে আসে। অনেক খবর, যেমন মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু, মানুষ প্রথম জেনেছে ফেইসবুকে বন্ধুদের স্টেটাস মেসেজ থেকে!

টুইটার সর্বশেষ সবাইকে টপকে যায় সাম্প্রতিক ইরানের সাধারণ নির্বাচনের সময়। ইরান সরকারের নানারকম সেন্সরশীপের কারণে ইরানের ভেতরের খবর বাইরে যাবার পথ প্রায় বন্ধ তখন। ইরানের জনগণ তখন টুইটার ব্যবহার করে নির্বাচন পরবর্তী আন্দোলন-সহিংসতার খবর ওয়েবে পোস্ট করতে থাকে। সিএনএন এর মতোন সংবাদ সংস্থা যখন সংবাদ সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছিলো টুইটারের মতো অনলাইন মেসেজিং সাইট তখন হয়ে উঠলো সংবাদের প্রধান উৎস। এমনকি টুইটার তাদের নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষণ কাজ পিছিয়ে দেয় ইরানের সংবাদ প্রবাহ চালু রাখার জন্য। টুইটারের এমন একচেটিয়া আধিপত্য দেখে গুগল আর ফেসবুক তড়িঘড়ি করে চালু করে ফার্সী সার্ভিস

সারা বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর ব্যবহার কমে আসছে ওয়েব এর কারণে। এমনকি বিজ্ঞাপন এর একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে ওয়েবএ। ওয়েব এর বিজ্ঞাপন বাজার যে কতো বড় সেটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে গুগল। কেবলমাত্র বিজ্ঞাপন এর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে কম্পানীটি। মাইক্রোসফট প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই বাজারের একটা অংশ ধরার জন্য, যার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে তাদের বিং সার্চ ইঞ্জিন এবং উইন্ডোজ আজুর ওয়েব অপারেটিং সিসটেম। সংবাদমাধ্যমগুলো যদি ওয়েবএ তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত না করে তাহলে তাদের ভবিষ্যত যে অন্ধকার সেটা প্রায় নিশ্চিত!

পৃথিবীজুড়ে ওয়েবএ প্রাপ্ত সার্ভিসগুলো মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো দিবে। অনলাইনে কেনাকাটা, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে ফেইসবুকের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া, বাসার যাবতীয় বিল কম্পিউটারে কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে সেরে ফেলা, বাস-ট্রেইন-প্লেইন এর টিকেট কয়েক মিনিটের মধ্যে অনলাইনে কিনে ফেলা, যে কোন ঘটনা-দুর্ঘটনার খবর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্লগ ও সোশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পেয়ে যাওয়া ইত্যাদি সুবিধা ইতোমধ্যে সবাই পেতে শুরু করেছে। এই গতিতে প্রযুক্তি চলতে থাকলে আর দশ-বিশ বছরের মধ্যে জীবন যে কতো সহজ হয়ে যাবে সেটা এখন কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। ওয়েব সেবা’র ব্যাপ্তি কয়েকগুন বেড়ে যাচ্ছে মোবাইল ফোনের সাহায্যে। ওয়েব একসেস সমৃদ্ধ মোবাইল ফোনকে এখন বলা হয় স্মার্ট ফোন। কপমিউটার এর চেয়ে অনেক বেশি বহনযোগ্য হওয়ায় মোবাইল এর মাধ্যমে আরো বেশি মানুষকে ওয়েব সেবার আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে। আ্যপলের আইফোন, গুগলের এন্ড্রয়েড, মাইক্রোসফট এর উইন্ডোজ মোবাইল – এগুলো সবই প্রায় ডেস্কটপ কম্পিউটার এর সমান ক্ষমতা সম্পন্ন অপারেটিং সিসটেম মোবাইল এর জন্য। এভাবে মোবাইল ফোনগুলো হয়ে উঠছে একেকটি বহনযোগ্য কম্পিউটার। আমার জীবনের প্রথম কম্পিউটার ছিলো এএমডি কে৬ টু যার প্রসেসর স্পিড ছিলো ৪৫০ MHz. আ্যপলের সর্বশেষ আইফোন এর প্রসেসর স্পিড হচ্ছে ৬৫০ MHz!

ওয়েব কম্পানীগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে মানুষ বেশি বেশি সেবা পাচ্ছে কম মূল্যে বা (প্রায়ই) বিনা মূল্যে। গুগল, মাইক্রোসফট, ফেইসবুক, টুইটার, ফ্রেন্ডফিড এর মতো কম্পানীগুলো বাঘা বাঘা কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রযুক্তিকে আরো বেশি মানুষের কাজে লাগানোর জন্য। এতে ওদের ব্যবসা হচ্ছে ঠিক, কিন্তু পৃথিবীর সভ্যতার চাকাও ঘুরছে সামনের দিকে। মানুষের জীবন হয়ে উঠছে আরো আরামদায়ক। দুখের বিষয় আমরা বাংলাদেশে থেকে এর অনেক কিছুই পাচ্ছিনা শুধুমাত্র ভালো গতির ইন্টারনেট আর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ এর অভাবে। আর এভাবেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি বাকী পৃথিবী থেকে। আমাদের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী – এরা যেদিন নিজেদের পরিবারের বাইরে দেশের মানুষের কথা ভাবা শুরু করবেন এবং যেদিন আমাদের দেশের মানুষেরা জীবনকে আরো বেশি ভালোবাসা শুরু করবে, আরো সাহসী আর এডভেঞ্চারাস হয়ে উঠবে, সেদিন থেকে বদলে যাওয়া শুরু করবে আমাদের দেশ!