আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি


কিছুদিন আগে একটা ওয়েব সাইটে একটা চমৎকার লেখা পড়ি। ভদ্রলোক গতো আট বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং বিভিন্ন দেশের ভাষা এবং সংস্কৃতি শিখছেন। তার পৃথিবী ভ্রমনের আট বছর পুর্তি উপলক্ষে তিনি তার ভ্রমন থেকে কী শিখেছেন সেটার একটা লিস্ট দিয়েছেন ভাবলাম অনুবাদ করে ফেলি:)

মূল লেখার লিঙ্কঃ http://www.fluentin3months.com/life-lessons/

আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি
===========================================

আট বছর।
৪১৬ সপ্তাহ, যেটা প্রায় ৩০০০ দিন।

এই দীর্ঘ সময় আমার কোনো নির্ধারিত ঘর ছিলোনা। আমি ঘুরে বেড়িয়েছি দেশ থেকে দেশে, এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে। আমার সারা জীবনের অর্জন করা সব সম্বল আমার ট্রাভেল ব্যাগে করে নিয়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এই সময়টা। এটা ছিলো আমার জীবনের একটা বড় অংশ, এবং আমি এখনো এটা করে চলেছি।

এর আগেও আমি অবশ্য কয়েকটা জায়গায় ভ্রমন করেছি – দুটো গ্রীষ্ম আমেরিকায়, আর এক মাস স্পেইনে। এবং ২০০৩ সালে, আমার একুশতম জন্মদিনের সপ্তাহটিতে, আমি আমার জন্মস্থান আয়ারল্যান্ড ছাড়ি চিরদিনের জন্যে। এর কয়েকদিন আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করি, এবং আমি জানতাম এরপর হয়তো আমি আয়ারল্যান্ডে শুধু বেড়াতে আসবো, যদিও আমি জীবনে কখনো আমার পরিবারের সাথে ক্রিসমাস ডিনার না খেয়ে থাকিনি। কিন্তু আয়ারল্যান্ড আর আমার বাড়ি না। এখন থেকে “যেখানে আমি যাবো সেটাই হবে আমার বাড়ি”।

এর আগে আমার জীবনের প্রায় সবটুকু আমি ব্যয় করেছি বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে। কিন্তু সেখানে আমি গুরুত্মপূর্ণ প্রায় কিছুই শিখিনি। বইয়ে লেখা জিনিসগুলো প্রায় সবই আমি আগে থেকে জানতাম, কিন্তু আমি যা হতে চেয়েছি জীবনে সেটা আমি শিখেছি গতো আট বছরে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে। এবং আমার নিশ্চিতভাবে এখনো অনেক কিছু শেখার আছে।

গতোকাল ছিলো আমার ২৯-তম জন্মদিন, এবং এই সপ্তাহে আমার পৃথিবী ভ্রমনের আট বছর পূর্ণ হচ্ছে। তাই ভাবলাম আমার এই আট বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ২৯টি শিক্ষা আপনাদের সাথে শেয়ার করি। এগুলো বেশিরভাগই জীবন নিয়ে সাধারণ কথাবার্তা, কিন্তু এগুলো আমি শিখেছি সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের সাথে মেশার পরঃ

১। সব জায়গায় সব মানুষ আসলে একই জিনিস চায়

যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি অনেক ভিন্ন, আপনি ইটালিয়ান কোটিপতি থেকে শুরু করে গৃহহীন ব্রাজিলিয়ান, নেদারল্যান্ডস এর জেলে, ফিলিপাইনের কম্পিটার প্রোগ্রামার এর সাথে তাদের নিজের ভাষায় তাদের মতো করে কথা বলে দেখবেন যে তারা সবাই জীবনের গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলোর ব্যাপারে একই রকম চিন্তা করে।

সবাই চায় স্বীকৃতি, ভালোবাসা, নিরাপত্তা, বিনোদন, এবং একটা ভবিষ্যতের আশা। এই চাওয়াগুলির প্রকাশ এবং এগুলো পাওয়ার জন্যে সবার কাজে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এই বাহ্যিক ব্যাপারগুলো উপেক্ষা করলে দেখবেন পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ আসলে প্রায় একই জিনিস চায়।

২। সুখ ভবিষ্যতের জন্যে তুলে রাখা বড় ভুল

অসংখ্য মানুষ ভাবে “ওই একটা জিনিস” যদি ঠিক হয়ে যায় “তাহলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে”।

এটা একটা ঘোর (ডিলুশন)।

যখন “ওই একটা জিনিস” ঠিক হবে, তখন “আরো একটা” জিনিস আপনার জীবনে বাকি থেকে যাবে। জীবনে কখনো সবকিছু একসাথে আপনার কাছে ধরা দিবেনা। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি জীবনে সুখী হওয়া শুধু একটা জিনিস ঠিক হয়ে যাওয়ার উপর নির্ভর করেনা, এভাবে সুখী হওয়াও যায়না। এরচেয়ে এই মুহুর্তে আপনার যা আছে তা নিয়ে সুখী হোন, বর্তমানকে উপভোগ করুন, এবং একইসাথে ভবিষ্যতের জন্যে জন্যে কাজ করে যান। সাফল্য আসলে একটা ভ্রমন, গন্তব্য নয়!

আপনার জীবনের একটা বড় অংশ যদি একটা বড় কিছুর জন্যে কাজ করে চলে যায় তাহলে সে কাজটি হয়ে যাওয়ার পর আপনার জীবনে আর তেমন কিছুই থাকবেনা। কোনো বড় কিছুর জন্যে কাজ করলেও নিজেকে সুখী হওয়া থেকে বঞ্চিত করবেন না, কাজটি শেষ হওয়া পর্যন্ত সুখী হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে থাকবেন না, কাজ করতে করতেই সুখী হওয়ার চেষ্টা করুন।

ধীরে ধীরে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন এবং এই ভ্রমন উপভোগ করুন।

অনুষ্টানটি উপভোগ করুন, শেষ দৃশ্যের জন্যে তাড়াহূড়ো করবেন না।

আমাদের জীবন হচ্ছে এখন – অতীত এবং ভবিষ্যত কোনোটাই না।

৩। “একদিন আমার সময় আসবে আর আমি সুখী হবো” – এটা একটা ফালতু চিন্তা। আপনি কখনোই লটারি জিতবেন না। বাস্তববাদী হোন।

অনেকের ভাগ্য নিয়ে একটা অদ্ভুত ধারণা আছে – আল্লাহ/ঈশ্বর/ভগবান/দেবতা কেউ একদিন কোনোভাবে তাদের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিবেন। তারা ভাবেন তারা “সৌভাগ্য পাবার যোগ্য” এবং “একদিন সব এমনি এমনি ঠিক হয়ে যাবে” তাদের জন্যে। কেউ কেউ ভাবেন একদিন তারা লটারি জিতবেন কিংবা ভালো কিছু একটা ঘটবে তাদের জীবনে। অনেক মেয়ে ভাবে একদিন তার রাজপুত্র এসে তাকে নিয়ে যাবে স্বপ্নের দেশে!

এই ধরণের ভাবনা আসে পৃথিবী কীভাবে কাজ করে সেটা সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা থেকে। হতে পারে আমি ভুল, হয়তো প্রার্থনা বা আশা থেকে ভালো কিছু ঘটতে পারে, হয়তোবা মানুষ হিসেবে ভালো হয়ে থাকতে পারলে একসময় ভালো কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু আশা, প্রার্থনা, এবং ভালো হওয়ার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম করে চাওয়ার জিনিসটাকে অর্জন করার চেষ্টা করে যেতে দোষ কোথায়?

আমি ব্যক্তিগতভাবে জাদু, জ্বীন-পরী, জ্যোতিষবিদ্যা, কিংবা কোনো অদৃশ্য সত্ত্বায় বিশ্বাস করিনা । এগুলোর ব্যাপারে আমি সন্দিহান এবং আমি বিশ্বাস করি এগুলো সবকিছু অসম্ভব এবং হাস্যকর। এইসব অদৃশ্যে বিশ্বাস না করাটা আমার জীবনকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। একজন বাস্তববাদী মানুষ হিসেবে পৃথিবীকে আমি খুব যুক্তির জায়গা হিসেবে দেখি যেখানে প্রকৃতির তৈরি বৈজ্ঞানিক নিয়ম এবং মানুষের তৈরি সামাজিক নিয়ম অনুসারে সবকিছু চলে। এবং পৃথিবীকে এভাবে দেখার কারণে আমি অনেক সহজভাবে সবকিছু দেখতে পারি।

এই বিশ্বজগত আপনাকে কিছু দেবার জন্যে পণ করে বসে নেই। আপনাকেই আপনার জীবন গুছিয়ে তোলার জন্যে কাজ করে যেতে হবে।

৪। নিয়তি বলে কিছু নাই, এবং এটা একটা সুখবর!

নিয়তি’র দোহাই দিয়ে আমরা অনেকেই জীবনে ভালো কিছু করা থেকে বিরত থাকি। আসল ঘটনা হচ্ছে নিয়তি বলে কিছু নাই ।

আপনার ব্যর্থতা কিংবা সীমাবদ্ধতা আপনার জন্ম কোথায় হয়েছে সেটার উপর নির্ভর করেনা, কিংবা আপনি কাকে চিনেন, আপনার জিন কেমন, আপনার কতো টাকা আছে, আপনার বয়স, আপনার অতীত, বা অন্য কোনো কিছুর সাথেই এর কোনো সম্পর্ক নাই। কোনো কিছুর দোহাই দিয়ে আপনার সীমাবদ্ধতাকে আপনি জাস্টিফাই করতে পারবেননা।

যদি সত্যিকারভাবে সংকল্পবদ্ধ হন, তাহলে জীবনে অর্জন করার অজস্র সুযোগ আছে – আপনি কে কিংবা আপনার কাছে কতো টাকা আছে এটা কোনো ব্যাপারই না।

৫। আপনার থেকে ভিন্ন বিশ্বাস ও মতের মানুষের সাথে কথা বলুন এবং তাদের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করুন

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সাথে পৃথিবীর অনেক মানুষের বিশ্বাসের কোনো মিল নাই। কিন্তু মানুষ এই ভিন্ন বিশ্বাসে থেকেও জীবনের তাৎপর্য খুঁজে পায়। যদি সবাই আমার মতো বিশ্বাস করতো এবং ভাবতো তাহলে পৃথিবীটা একটা রসকষহীন জায়গায় পরিণত হতো।

অতএব আমি যখন আমার থেক ভিন্ন বিশ্বাসের কোনো মানুষের সাথে মিশি, তখন তাদেরকে আমার বিশ্বাসে নিয়ে আসার চেয়ে তাদের বিশ্বাস তাদের কাছে রেখে একসাথে মিলে চলার চেষ্টা করাই ভালো।

কেউ যখন তার কোনো বিশ্বাস এর ব্যাপারে “১০০% নিশ্চিত” এবং বহু বছর ধরে সেই বিশ্বাস ধারণ করে আসছে, তখন তাকে কিছু চালাকী কথাবার্তার মাধ্যমে তার বিশ্বাস থেকে সরানো যায় না। সবাই কিছু কিছু ব্যাপারে বদ্ধ মনের মানুষ, আমি নিজেও তাই।

কেউ যদি নিজে নিজের বদ্ধ মন থেকে বের হতে না পারে তাহলে তাকে সেটাই বিশ্বাস করতে দেওয়া উচিত। আপনিই ঠিক আর অন্যরা ভুল – পৃথিবীকে এটা বোঝানোর দায়িত্ব নেওয়ার দরকার নাই। কখনো কখনো হয়তো আপনার বিশ্বাসটিই ভুল!

পৃথিবী আরো অনেক বেশি মজার জায়গা হয় যখন সেখানে বিভিন্ন বিশ্বাসের এবং আগ্রহের মানুষ থাকে। আমার নিজের সন্দেহবাদীতা সত্ত্বেও আমি অনেক জ্যোতিষী, হস্তরেখা বিশারদ, অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ, রক্ষণশীল মানুষ, এবং প্রযুক্তিকে ঘৃনা করে এমন অনেক মানুষের সাথে মিশেছি। এবং সেজন্যে আমার জীবন অনেক বেশী বৈচিত্রময় এবং সমৃদ্ধ
হয়েছে।

আপনি যদি শুধুমাত্র যারা আপনার সব কথায় হ্যাঁ বলে এমন মানুষদের সাথে মিশেন তাহলে আপনি কখনো ভুল করছেন কিনা এটা জানার সুযোগ পাবেন না এবং নতুন জিনিস শিখতেও পারবেন না।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

One thought on “আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি

  1. […] আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি – ২ Filed under: Uncategorized — bilash @ 8:57 pm পর্ব – ১ […]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: