Category Archives: America

সবচেয়ে বড় যে ভয় – এবং যেভাবে আমি এটাকে জয় করলাম

আমার উচ্চতাভীতি (Acrophobia) আছে। উঁচু দালানের ছাদের কিনারায় দাঁড়ালে পায়ের তলায় শিরশির করে, প্লেইন যখন টেইক অফ করে মাটি ছেড়ে উঠে যেতে থাকে তখন বুকের মধ্যে ধক করে উঠে। এরপরও যখনি কাউকে আকাশে স্কাই ডাইভিং করতে দেখি তখন প্রচন্ড ইচ্ছে হয় স্কাই ডাইভিং করার। এই ভিডিও দেখার পর কার আকাশে উড়তে ইচ্ছে না করবে?

কিন্তু প্রাণের মায়া সম্ভবত সবচেয়ে বড় মায়া, মৃত্যুভয় সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভয়! একটা চমৎকার উড়ন্ত প্লেইন থেকে কোন দুঃখে আমি শুন্যে ঝাঁপ দিতে যাবো?

কিন্তু একমাত্র মানুষই সম্ভবত আপাতদৃষ্টিতে দেখতে সবচেয়ে অযৌক্তিক কাজটি অবলীলায় করতে পারে। তাই গতো রোববার একটা চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে আমি আর আমার দুই বন্ধু মিলে যখন স্কাই ডাইভিং করতে রওয়ানা দিলাম তাতে অবাক হওয়ার কিছু ছিলোনা!

নিউ ইয়র্কে এখন গ্রীষ্মকাল প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আর মাস খানেক এর মধ্যে শরৎ/হেমন্ত চলে আসবে। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ছিলো চমৎকার একটা দিন। বাইরের তাপমাত্রা ছিলো ৭৫-৮০ ফারেনহাইটের মধ্যে। রৌদ্রজ্জ্বল দিন, আকাশে হালকা ছেঁড়া মেঘের ভেলা। আমার বন্ধুদের তাদের এপার্টমেন্ট থেকে গাড়ীতে তুলে নিলাম ঠিক ১১:৩০ এ। আমাদের গন্তব্য ক্যালভারটন নামক একটা শহর। ক্যালভারটন নিউ ইয়র্ক শহর থেকে ঘন্টা দেড়েকের ড্রাইভ। শহর ছেড়ে হাইওয়েতে উঠতেই মনটা ভালো হয়ে গেলো। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। ব্যাপারটা আমি আগেও খেয়াল করেছি, যখনি আমি কোনো বড় শহর ছেড়ে বের হয়ে যাই আমার খালি বুক ভরে নিশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। চারদিকের খোলা মাঠ, চনমনে বাতাস, মনের সাথে সাথে শরীরটাও কেমন যেন ফ্রেশ হয়ে যায়!

আমেরিকার হাইওয়েতে একবার এক্সিট ভুল করলে শাস্তি হিসেবে অনেক পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। আমার প্ল্যান ছিলো নর্দার্ন স্টেইট পার্কওয়ে ধরে অনেক দূর ড্রাইভ করে এরপর লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গন্তব্যে পৌঁছাবো। কিন্তু একটা এক্সিট মিস করার কারণে অনেক ঘুরাঘুরি করে যেয়ে উঠলাম সাউদার্ন স্টেইট পার্কওয়েতে। সাউদার্ন স্টেইট পার্কওয়ে ধরে অনেক দূর যাওয়ার পর লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ে তে উঠে যাই। এরপর মিনিট পনের বিভিন্ন লোকাল হাইওয়ে ধরে আমরা আমাদের গন্তব্য ক্যালভারটন শহরের এক কোণায় অবস্থিত ড্রপ জোনে (স্কাই ডাইভিং করার স্থানটিকে ড্রপ জোন বলা হয়) পৌঁছে যাই।

ড্রপ জোন যায়গাটা আসলে একটা এয়ারপোর্টকে ঘিরে স্কাই ডাইভিং এর আয়োজন ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা গাড়ী পার্ক করে অফিস বিল্ডিংয়ে ঢুকলাম চেকইন করার জন্যে। কাউন্টারের মেয়েটি দ্রুত চেকইন শেষ করে আমাদের একটা টিভির সামনে বসিয়ে দিলো। টিভিতে মিনিট পাঁচেক এর একটা ভিডিও দেখতে হবে যেটা আমাদের আজকের স্কাই ডাইভিং এর ট্রেইনিং। ভিডিওতে আমাদের ডাইভিং এর সময় কিভাবে হাত-পা ভাঁজ করে থাকতে হবে, জাম্প করার সময় কিভাবে গায়ে লাগানো জাম্প হারনেস এর স্ট্র্যাপ ধরে উপরের দিকে চেয়ে থাকতে হবে, ল্যান্ড করার সময় ইন্সট্রাকর এর কথা অনুযায়ী স্ট্যান্ড বা স্লাইড করতে হবে কিভাবে ইত্যাদি সবকিছু ডেমন্সট্রেইট করা হলো।

ভিডিও দেখা শেষে আমাদের “কোনো ধরণের দূর্ঘটনার জন্যে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়” টাইপের কাগজপত্র সই করতে হলো। এমনকি মৃত্যু হতে পারে, বা চিকিৎসা খরচ ইত্যাদি কিছুই দাবী করবো না বলে সই করতে হলো।

অবশেষে আমাদেরকে বলা হলো বাইরে যেয়ে অপেক্ষা করার জন্যে। যথাসময়ে আমাদের নাম ধরে ডাকা হবে বলে বলা হলো।

বাইরে অপেক্ষা করার যায়গাটায় এসে তো আমাদের আক্কেলগুড়ুম। একটু পরপর আমাদের সামনে এসে টুপ টুপ করে প্যারাশুট নিয়ে পড়ছে স্কাই ডাইভাররা। বিশেষ করে যারা অভিজ্ঞ স্কাই ডাইভার তার যেভাবে বিপজ্জনকভাবে প্রচন্ড গতিতে এসে ধুপ করে ল্যান্ড করছিলো তা দেখে আমার শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেলো! অবশ্য আমরা যেটা করছি সেটা হলো ট্যান্ডেম স্কাই ডাইভিং। আমি বা আমার বন্ধুরা কেউই একা জাম্প করবোনা। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের ইন্সট্রাকটরের গায়ের সাথে শক্ত করে বাঁধা থাকবো। আমাদের পুরো জাম্পের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ইন্সট্রাকটরের হাতে, আমাদের কাজ হলো শুধু জাম্প দেওয়া এবং আকাশে উড়ে বেড়ানো উপভোগ করা!

আমরা জানতাম স্কাই ডাইভিং এর জাম্পের জন্যে ডাক পেতে বেশ কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হয়। তাই আমাদেরকে যখন প্রায় দুই ঘন্টা পর ডাকলো আমরা খুব একটা অবাক হলাম না।

মাইকে আমাদের নাম শোনার পর আমরা জাম্প গিয়ার এর জায়গাটার দিকে এগিয়ে যাই। জাম্প গিয়ার মানে নানা রকম বেল্টে ঠাসা একটা জিনিস যেটা দিয়ে আমি আমার ইন্সট্রাকট্রের গায়ের সাথে আঠার মতো লেগে থাকবো। একজন আমাদের সবাইকে গিয়ার পরিয়ে দিলো। আমার ইন্সট্রাকটর উইনি এসে আমাকে একটা গগল (এক ধরণের চশমা) দিয়ে গেলো যেটা জাম্পের সময় আমাকে পরে থাকতে হবে প্রচন্ড বাতাস থেকে চোখকে বাঁচানোর জন্যে। এরপর আমার ভিডিও এবং ফটোগ্রাফার কেইট এসে আমার সাথে পরিচিত হলো। ও আমার ছবি এবং ভিডিওর দায়িত্বে থাকবে আকাশে। একজন মানুষের প্রতিদিনের কাজ ১৩,৫০০ ফুট উপরের আকাশে ব্যাপারটা ভাবতেই আমার গায়ে চমক খেলে যায়!

এরপর আমরা একে আমাদের প্লেইনের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ছোট, পুরনো, জীর্ণ-শীর্ণ একটা প্লেইন। আমার বন্ধু কৌতুক করে বললো – “এই ভাঙ্গা প্লেইন থেকে বাঁচার জন্যে হলেও আমাদের আকাশ থেকে ঝাঁপ দিতে হবে”! প্লেইন আস্তে আস্তে চলা শুরু করলো। ছোট একটা প্লেইন। যাত্রী সব মিলিয়ে জনা দশেক হবে। এর মধ্যে প্লেইনের একমাত্র দরজাটা হাট হয়ে খুলে আছে। জীবনে কোনোদিন প্লেইনের দরজা খোলা থাকতে দেখি নাই! আমি মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি – “একটু পর যখন আকাশে থাকবো তখন তো কোনো দরজাই থাকবেনা, সুতরাং দরজা খোলা কি বন্ধ সেটা কোনো ব্যাপার না”!

কিছুক্ষণ পর প্লেইনটা মাটি ছেড়ে আকাশে উঠা শুরু করলো। প্রায় ৪৫ ডিগ্রী কোণে প্লেইনটা উঠতে উঠতে যখন নিচের সবকিছু ছোট বিন্দুতে পরিণত হলো আমি আর আমার বন্ধু শাহেদ প্রায় একসাথে একে অপরের দিকে তাকালাম। দুইজনই প্রথমবারের মতো উচ্চতা দেখে একটু ভয় পেলাম। আর কিছুক্ষণ পর এখান থেকে শুন্যে লাফিয়ে পড়বো ভাবতেই একটা হিমশীতল স্রোত রক্তের সাথে বেয়ে গেলো। আমার ক্যামেরাম্যান কেইট আমার একটা ছবি তুললো, আমি নার্ভাস ভঙ্গিতে হেসে পোজ দিলাম।

প্লেইন ১৩,৫০০ ফুট (প্রায় আড়াই মাইল/সাড়ে চার কিলোমিটার) উপরে এসে স্থিত হলো। আমি লাইনে দ্বিতীয় জাম্পার। আমার আগে সারা গায়ে টাট্টু লাগানো টিংটিঙ্গে একটা আমেরিকান ছেলে লাফ দিলো। মুহুর্তের মধ্যেই সে এবং তার ইন্সট্রাকটর শুন্যে হাওয়া হয়ে গেলো। এরপর আমার পালা। কেইট আগে বের হয়ে দরজার বাইরে যেয়ে একটা হাতল ধরে দাঁড়ালো। সে ওখান থেকে আমার লাফ দেওয়ার মুহুর্ত ক্যামেরায় ধরবে। এরপর আমার ইন্সট্রাকটর এর ঈশারার সাথে সাথেই কেইট লাফ দিবে এবং সাথে সাথে আমরাও।

আমার ইন্সট্রাক্টর প্লেইনেই আমাকে তার শরীর এর সাথে খুব শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। সে আমাকে ঠেলে ঠেলে প্লেইনের দরজার সামনে নিয়ে আসলো। আমার প্রায় পুরো শরীর প্লেইনের বাইরে, আমার হাত আমার বুকে জাম্প হারনেস এর সাথে ধরে রাখা। ঠিক সেই মুহুর্তে আমি কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার ইন্সট্রাক্টর উইনি আমাকে সহ শুন্যে ঝাঁপ দিলো। কয়েক মুহুর্তের জন্যে আমার মনে হলো এটা কী হলো? আমি দুস্বপ্ন দেখার মতো পড়েই যাচ্ছি নিচে… কিন্তু পুরো ব্যাপারটা মাত্র তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ড স্থায়ী হলো। ততক্ষণে উইনি ছোট একটা প্যারাশুট (যাকে drogue বলে) ছেড়ে দিলো। এই ছোট প্যারাশুট এর কাজ হলো পৃথিবীর অভিকর্ষনজনিত ত্বরণকে বাধা দিয়ে আমাদের মোটামুটি ঘন্টায় ১২০ মাইল বেগের মধ্যে সীমিত রাখা। প্রাথমিক জাম্পের রেশ কাটতে না কাটতেই উইনি আমার হাত ধরে সামনে তাকাতে ইশারা দিলো। আমি সামনে তাকিয়ে দেখি কেইট এসে আমাদের সামনে আমাদের সমান তালে শুন্যে ভাসছে!

কেইটকে আমাদের পাশে শুন্যে ভেসে থাকতে দেখে মজা লাগলো। সে ঠিক আমাদের দশ ফুট নিচে থেকে আমাদের দিকে চেয়ে শুয়ে ছিলো। তার হাতে ক্যামেরা ছিলো, তাই সে আমার শুন্যে ভেসে থাকা শুট করার জন্যে আমাদের নিচে এসে বাতাসের কোলে শুয়ে ছিলো সারাক্ষণ!

স্কাই ডাইভিং না করার আগ পর্যন্ত যেটা মনে হতো – প্লেইন থেকে লাফিয়ে পড়ার পর প্রচন্ড গতিতে পড়ে যেতে থাকবো – আসলে ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম নয়। ছোট প্যারাশুট খোলার পর আমাদের গতি ছিলো ঘন্টায় ১২০ মাইল। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো একটা গাড়ীতে করে ১২০ মাইল বেগে চলতে থাকলে বাতাস এসে চোখে মুখে পড়লে যা হয়। প্রচন্ড বাতাস এসে আমার মুখে পড়ছিলো। নিশ্বাস নিতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছিলো। মুখ, ঠোঁটও শুকিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু আকাশে ভেসে থাকার আনন্দ এবং উত্তেজনার কাছে সেটা আসলে কিছু ছিলোনা!

ঠিক এই সময় হঠাৎ করে প্রচন্ড ঝাঁকি খেলাম। কিছুক্ষণের জন্যে একটু হতচকিত হয়ে গেলাম। পরে বুঝলাম আমরা ভূমি ৫,০০০ ফুট উপরে এসে গিয়েছি, তাই উইনি আমাদের মূল প্যারাশুট খুলে দিয়েছে। হঠাৎ করে গতি একেবারে কমে গেলো। আমি প্রথমবারের মতো ভালো করে চার দিকে তাকানোর সুযোগ পেলাম। নিচের সবকিছু ক্ষুদ্র খেলনার মতো লাগছিলো। দূরে লং আইল্যান্ড এর সমুদ্র তীর দেখা যাচ্ছিলো।

সঠিক যায়গায় ল্যান্ডিং এর জন্যে উইনি প্যারাশুটকে বেশ কয়েকবার ডানে বামে টেনে আমাদের গতিপথ পরিবর্তন করছিলো। এসময় দুএকবার প্রচন্ড ভয় লেগে গিয়েছিলো। ওই অনুভূতিটা ছিলো সত্যিকারের ত্বরণ জনিত টান (free fall) যেটা এমনকি প্যারাশুট খোলার আগেও ছিলোনা।

জাম্প করার প্রায় পাঁচ ছয় মিনিট পর উইনি খুব দক্ষভাবে এসে প্যারাশুটটাকে ল্যান্ড করালো। মাটিতে পা রেখে আমার মনে হলো – “অবশেষে আমি এটা করেছি”! কতোদিন ধরে স্কাই ডাইভিং করতে ছেয়েছিলাম, কিন্তু মূলত ভয়ের কারণেই এতোদিন করা হয়নি। কিন্তু আমার মনে হলো শুধুমাত্র এই ফালতু ভয়ের কারণে এতো উত্তেজনা এবং আনন্দময় একটা জিনিস থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবো এর কোনো মানে হয় না। অবশেষে আমার ইচ্ছে শক্তির কাছে আমার ভয় পরাজিত হয়েছে আর এমি এমন চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করলামঃ)

Advertisements

মাইক্রোসফট এর সাতকাহন – পর্ব ১ (ইন্টার্ণশীপ ইন্টারভিউ)

ওহাইও স্টেইট বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ক্লাশ শুরু হয় ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ক্লাস শুরুর সপ্তাহ দুএকের মধ্যে একদিন ইমেইল পেলাম যে আগামী মাসে (অক্টোবর) কোনো এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্যারিয়ার ফেয়ার অনুষ্টিত হবে। আমেরিকার সব নামকরা কম্পানী সেখানে আসবে এবং তাদের কাছে সরাসরি সিভি (CV) জমা দেওয়া যাবে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি খুঁজছিলাম কম্পিউটার জায়ান্ট কম্পানীগুলোকে। মেলাটি হচ্ছিলো বিশাল এলাকা জুড়ে, একশ’র বেশি স্টল ছিলো ওখানে। সবার সামনে পেলাম আইবিএম এর স্টল। সোজা গিয়ে বললাম আমি আইবিএমএ কাজ করতে আগ্রহীঃ-) ওরা বললো ওরা সি++ জানা লোক খুঁজছে, তাই আমি মনের আনন্দে আমার সিভি জমা দিলাম। এরপর আরো অনেক কম্পানী দেখলাম কিন্তু গুগল বা মাইক্রোসফটকে কোথাও দেখলাম না। হতাশ হয়ে ফিরে আসছিলাম। ফিরে আসার পথে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম গুগল বা মাইক্রোসফট এই মেলায় এসেছে কিনা। সে বললো সে গুগলের কথা জানেনা কিন্তু মাইক্রোসফট এসেছে এবং তারা অমুক সারির অতো নাম্বার স্টলে আছে। আমি সাথে সাথে লোকটিকে ধন্যবাদ দিয়ে মাইক্রোসফটএর স্টল এর দিকে রওয়ানা দিলাম।

মাইক্রোসফট এর স্টল খুঁজে পেতে একটু সময় লাগলো। মাইক্রোসফট থেকে আসা কয়েকজন সেখানে ছিলো যারা সিভি ড্রপ করতে আসা বিভিন্ন ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলছিলো। তো একসময় আমার পালা আসলো। ইন্ডিয়ান একটা ছেলে আমার দিকে এগিয়ে এসে হাত বাড়ালো। আমিও হাত বাড়িয়ে হাত মেলালাম। আমি তখনো ছাত্র, মাত্র আমার মাস্টার্স শুরু করেছি, বললাম আমি সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতে মাইক্রোসফটএ ইন্টার্ণশীপ করতে আগ্রহী। সে আমার সিভিটি নিলো। ভালো করে দেখলো সেটি। এরপর আমার কিসে আগ্রহ, কী ধরণের কাজ ভালো পারি এসব জিজ্ঞেস করলো। আমিও আমার মতো করে উত্তর দিয়ে গেলাম। এরপর সে বললো সে আমার সিভি সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিবে এবং আমার যোগ্যতার সাথে ম্যাচ করে এমন পজিশন খালি থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করবে। বিদায় নেবার সময় আমার হাতে একটা সুডকু (একধরণের পাজল গেইম) বই ধরিয়ে দিয়ে বললো – “তুমি যেহেতু প্রব্লেম সল্ভিং পছন্দ করো, তাই তোমাকে এই পাজল এর বইটি দিচ্ছি। আমার ধারণা তুমি এটা উপভোগ করবে”।

সেদিন ল্যাবে ফিরে এসে আমি মোটামুটি এই ক্যারিয়ার ফেয়ার এর কথা ভুলেই গেলাম। নতুন পরিবেশে পড়ালেখার চাপে আমার তখন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এরমধ্যে একদিন ইমেইল পেলাম মাইক্রোসফট থেকে। “নভেমবর মাসের অমুক তারিখে আমাদের ক্যাম্পাস ইন্টারভিয়ার এর সাথে তোমার একটা ইন্টারভিউ এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের জানাও তুমি সেসময় এটায় উপস্থিত থাকতে পারবে কিনা”। আমি মনে মনে বললাম, “আবার জিগায়!”। সাথে সাথে ইমেইল এর উত্তর দিলাম – “ধন্যবাদ আমাকে ইন্টারভিউএ আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আমি ওইদিন যথাসময়ে জায়গামতো উপস্থিত থাকবো”। এরপর ওরা জায়গা ও সময় কনফার্ম করে আরেকটা এমেইল দিয়েছিলো। আমি মনে মনে দিন গুনতে লাগলাম।

ইন্টারভিউ এর দিন ঘনিয়ে আসতে থাকায় আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে প্রাথমিক ইন্টারভিউয়ে আসতে পারে এমন প্রশ্ন ডাউনলোড করে পড়া শুরু করলাম। টুকটাক প্রোগ্রাম লিখে ভুলে যাওয়া প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ এর সিনট্যাক্স ঝালাই করে নিলাম। ইন্টারভিউ এর জায়গাটি ছিলো আমাদের কম্পিউটার সায়েন্স বিজ্ঞান বিভাগের উলটা দিকের বিল্ডিং, তাই সেটি খুঁজে পাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হলো না। ইন্টারভিউ এর দিন আমি যথাসময়ে ইন্টারভিউ এর নির্ধারিত ভবনে যেয়ে পৌঁছালাম। ওখানে ডেস্কে থাকা মেয়েটিকে বললাম আমি কেনো এসেছি। ও কম্পিউটারে আমার নাম দেখে নিশ্চিত হয়ে নিয়ে আমাকে একটা ফর্ম ধরিয়ে দিলো। ফর্মটি পূরণ করে আমি সোফায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম আমার ইন্টারভিউয়ার এর জন্য।

একসময় আমার ইন্টারভিউয়ার আসলো। লম্বা মতোন এক আমেরিকান ভদ্রলোক এসে হাত বাড়িয়ে আমার নাম জিজ্ঞেস করলো আর নিজের পরিচয় দিলো? ও জানালো ও ভিজুয়াল স্টুডিও গ্রুপ এর একজন ম্যানেজার। আমি ওকে অনুসরণ করে ছোট একটি কক্ষে প্রবেশ করলাম। এখানেই আমার ইন্টারভিউ হবে। ও আমার সিভি বের করলো। আমার সিভি দেখে আমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। সিভিতে যেসব স্কিলস এর কথা লিখেছি ওগুলো নিয়ে কয়েক মিনিট আলোচনা করলো। এরপর আমাকে স্ট্রিং সম্পর্কিত একটা প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধান করতে বললো। আমি কাগজে সেটির কোড লিখলাম। আমার কোড নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো। কিভাবে আমার এই কোড আমি ব্রেক করবো সেটা জিজ্ঞেস করলো। এই কোডকে টেস্ট করার জন্য টেস্ট কেইস লিখতে বললো। এরপর আরো কিছু টুকটাক প্রোগ্রামিং প্রশ্ন করে আমার ইন্টারভিউ শেষ করলো। শেষ করার আগে এখানে যা নিয়ম, আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমার কোনো প্রশ্ন আছে কিনা তার জন্য। আমি প্রস্তুত ছিলাম। তাকে মাইক্রোসফট এর সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে দুএকটা প্রশ্ন করলাম। ও আমাকে সেগুলোর ব্যাখ্যা দিলো। এভাবে শেষ হলো সেদিনের ইন্টারভিউ পর্ব।

ইন্টারভিউ শেষে আবার আমার ব্যস্ত পড়ালেখার জীবনে ফিরে গেলাম। কিন্তু মনে মনে ভীষণ অপেক্ষা করতে থাকলাম একটা ইমেইল এর জন্য! ওরা যদি আমাকে পছন্দ করে থাকে তাহলে আমাকে ওরা মাইক্রোসফট এর প্রধান অফিস ওয়াশিংটন স্টেইট এর রেডমন্ড নামক শহরে নিয়ে যাবে একদিন সারাদিন ইন্টারভিউ এর জন্য। আমার ইন্টারভিউ মোটামুটি ভালোই হয়েছিলো, কিন্তু সবাই নিশ্চয়ই এখানে ভালো ইন্টারভিউ দেয়! সবাই বলছিলো সাধারণত দুই সপ্তাহের মধ্যে ওরা রেজাল্ট জানিয়ে দেয়, কিন্তু ২ সপ্তাহ চলে গেলেও ওদের ইমেইল এর কোনো দেখা মিললো না। এ পর্যায়ে আমি সব আশা ছেড়ে দিলাম। অবশেষে তিন সপ্তাহ পর আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার মেইলবক্সে মাইক্রোসফট থেকে একটা ইমেইল আসলো যে আমাকে মাইক্রোসফট এর প্রধান কার্যালয়ে একদিন সারাদিন ইন্টারভিউ এর জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। এই ইমেইল পেয়ে আমার খুশি আর দেখে কে। ইন্টার্ণশীপ না পাই, নিদেনপক্ষে মাইক্রোসফট এর খরচে ওদের প্রধান কার্যালয় দেখে ঘুরে তো আসা যাবে!

সামনে ক্রিসমাসের ছুটি থাকায় আমার ইন্টারভিউ ওরা ঠিক করে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। রেডমন্ড যাওয়া-আসার প্লেইন টিকেট, হোটেল এর বিল, থাকা-খাওয়া সবই মাইক্রোসফট বহন করবেঃ-) আমার ফ্লাইট এর দিন ঠিক করি ইন্টারভিউ এর আগেরদিন। কিন্তু ফ্লাইট এর দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভয়েস মেইল পাই এয়ারলাইন্স থেকে যে মত্রারিরিক্ত তুষারপাতের ফলে আমার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর নামই মনে হয় কপাল। আরেকটু বেলা গড়ানোর পর আমি যোগাযোগ করি মাইক্রোসফটএ আমার রিক্রুটার এর সাথে। সে তখন একটু সময় নিয়ে দুই সপ্তাহ পর আমার ইন্টারভিউ এর দিন পুননির্ধারণ করে। আমার অনুরোধে ওরা আমেরিকার তুষারপাতপ্রবণ এলাকা (মিড-ওয়েস্ট এলাকা) এড়িয়ে অন্য শহরের মধ্য দিয়ে কানেক্টিং ফ্লাইট ঠিক করে দেয়।

সৌভাগ্যক্রমে আমার নতুন ইন্টারভিউ এর দিন কোনো ঝামেলা ছাড়াই সিয়াটল এয়ারপোর্ট এসে পৌঁছাই। সিয়াটল এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা রেডমন্ডে আমার হোটলে চলে আসি। বিকেলে মাইক্রোসফট এর সাইদ ভাই আমাকে মাইক্রোসফট ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন। মাইক্রোসফট ক্যাম্পাস একটা বিশাল এলাকা। একশ’র মতো বিল্ডিং আছে এখানে। উইন্ডোজ আর অফিস (ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদি) এর সবচেয়ে বড় দুটি প্রডাক্ট হলেও সার্চ, এমএসএন, এক্সবক্স, জুন মিউজিক প্লেয়ার, উইন্ডোজ সার্ভার, এসকিএল সার্ভার, ভিজুয়াল স্টুডিও – ইত্যাদি অসংখ্য গ্রুপ এর অফিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো এলাকা জুড়ে। সে যাক, মাইক্রোসফট এর অফিস এবং সফটওয়্যার ব্যবসা নিয়ে আরেকদিন লিখবো। আজ আমার ইন্টারভিউ নিয়ে লেখা যাক।

তো পরদিন আমি সকাল দশটার সময় বিল্ডিং ১৯ এ চলে যাই। বিল্ডিং ১৯ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর রিক্রুটিং বিল্ডিং। সকল নতুন চাকুরীপ্রার্থীকে সবার আগে এখানে চেকইন করতে হয়। তো রিসেপশনে যেয়ে নাম বলতেই আমাকে বলা হলো আমার রিক্রুটার একটু পরে এসেই আমাকে নিয়ে যাবে। আমি লবিতে সোফায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরই আমার রিক্রুটার ডেভিড এসে নিজের পরিচয় দিলো এবং আমাকে নিয়ে ওর অফিসএ নিয়ে গেলো। সেখানে আমার নন-টেকনিকাল ইন্টারভিউ হলো। আমি কেনো মাইক্রোসফটএ কাজ করতে চাই, আর কোন কোন কম্পানীতে এপ্লাই করছি, আমার স্যালারি এক্সপেক্টেশন কেমন, কী ধরণের কাজ আমার পছন্দ এই সব। ঘন্টা খানেক ওর সাথে থেকে ও আমাকে আমার প্রথম টেকনিকাল ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়। মাইক্রোসফটএ বিভিন্ন বিল্ডিং এর মধ্যে সারাক্ষণ অনেক শাটল কার চলাচল করে। ও আমাকে সেরকম একটা কারে করে বিল্ডিং ৪০ এ আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়।

বর্ণনা অনেক লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার এর গল্প না বললেই নয়। যেহেতূ তখন লাঞ্চ এর সময় হয়ে গিয়েছেলো, তাই আমার প্রথম ইন্টারভিউটি ছিলো একটা লাঞ্চ ইন্টারভিউ। লাঞ্চ ইন্টারভিউ মানে হচ্ছে ইন্টারভিউয়ার চাকরীপ্রার্থীকে লাঞ্চএ নিয়ে যাবে এবং খাবার খেতে খেতে বিভিন্ন প্রশ্ন করবে। আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ারের নাম ছিলো আ্যলেক্স। ও একজন চাইনিজ-আমেরিকান। গতো প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর ধরে আমেরিকাতে আছে। তো ও আমাকে ক্যাফেটারিয়ার দিকে নিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলো আমার কী ধরণের খাবার পছন্দ। আমি মাছে ভাতে বাঙ্গালী। ওকে বললাম ঝাল মশলা দেওয়া ইন্ডিয়ান (বাংলাদেশী খাবার বললে ওরা চিনেনা, আমাদের টাইপের খাবারকে ওরা ইন্ডিয়ান খাবার বলে) খাবার আমি পছন্দ করি, আমেরিকান খাবার তখনো আমার মুখে রচে না। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, “চলো আমার সাথে”। আমাকে নিয়ে সোজা পার্কিং গারাজে যেয়ে ওর বিশাল জীপ গাড়িতে উঠলো। এরপর আমাকে নিয়ে গেলো মায়ুরি নামের এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টএ! মায়ুরিতে ভাত আর মশলা দেওয়া মুরগীর তরকারী খেতে খেতে দিলাম আমার মাইক্রোসফট এর প্রথম ইন্টারভিউ!

এরপর একে একে আরো তিনটি ইন্টারভিউ দিই। প্রত্যেক ইন্টারভিউয়ার তার ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়। চার ইন্টারভিউয়ারের প্রথম দুইজন ছিলো উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এর, আর শেষের দুজন ছিলো উইন্ডোজ ফান্ডামেন্টালস গ্রুপ এর। শেষ ইন্টারভিউ নেন উইন্ডোজ গ্রুপ এর একজন ডিরেক্টর। তাঁর সাথে কথা বলার সময়ই মনে হয়েছিলো আমার ইন্টারভিউ মনে হয় খারাপ হয়নি। ইন্টারভিউ এর শেষে তিনি যে কথাগুলি বলেছিলেন সেটা এখনো আমার মনে আছে – “ঠিক আছে তুমি তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাও আর মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া করো। দেখি আমি তোমার জন্য কী করতে পারি”। তাঁর এ ধরণের কথা আমার কাছে খুব পজিটিভ মনে হয়েছিলো!

এর এক সপ্তাহ পরেই আমার সেমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় আমি ওইদিন রাতেই ওহাইও ফিরে আসি। পরেরদিন সকালবেলা আমার দাঁতের ডাক্তার এর সাথে এপয়েন্টমেন্ট ছিলো। সকালে আমি আমার দাঁতের স্কেলিং করাচ্ছিলাম। আমার ফোন বন্ধ ছিলো। দাঁতের ক্লিনিক থেকে বের হয়ে মোবাইল অন করতেই দেখি একটা ভয়েস মেইল। মাইক্রোসফট থেকে আমার রিক্রুটার ডেভিড ফোন করেছে। ভয়েস মেইলএ ও জানালো আমার ইন্টারভিউ এর রেজাল্ট রেডি ওর কাছে, আমি যেনো ওকে কল ব্যাক করি। আমারতো তখন বুকের ভেতর ড্রামের বাড়ি হচ্ছে। আমি সাথে সাথেই ওকে কল করি। আর তখনি ও আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো খবরগুলির একটি জানালোঃ মাইক্রোসফট এর দুটি গ্রুপ – উইন্ডোজ ফান্ডামেন্টালস আর উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং – আমাকে সামনের সামারের জন্য একটি ইন্টার্ণশীপ অফার করছে!! গ্রুপ দুইটির ডিরেক্টর দুজন আমাকে ফোন করে তাঁদের গ্রুপ সম্পর্কে বলবেন, এরপর আমি যে গ্রুপ পছন্দ করি সেটিতেই জয়েন করতে পারবো।

এটা ছিলো আমার জীবনের একটা শ্রেষ্ঠ সময়। নেটওয়ার্কিং এর প্রতি আমার আগ্রহ থাকায় আমি নেটওয়ার্কিং গ্রুপকেই সিলেক্ট করি। অবশ্য ফান্ডামেন্টালস গ্রুপ আমাকে ঘুষ হিসেবে এক্সবক্স গেমস, ওয়েব ক্যাম, বিভিন্ন ধরণের মাক্রোসফট কম্পানী স্যুভেনীর পাঠিয়েছিলো ওদের গ্রুপ এর দিকে আকৃষ্ট করার জন্য! কিন্তু ঘুষ দিয়ে কি আর সবকিছু হয়ঃ-)

২০০৭ এর জুন মাসের ১২ তারিখে আমি মাইক্রোসফটএ উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এর ওয়েব ক্লায়েন্ট টিম (যারা http প্রটোকল implement করে) এর একজন ইন্টার্ণ হিসেবে জয়েন করি। শুরু হয় আরেক বিচিত্র আনন্দ যাত্রা। সে যাত্রার খবর আগামী পর্বে। এইবেলা এখানেই ইতি টানি!

বিল গেটস এর বাড়িতে এক সন্ধ্যা

মাইক্রোসফট এ আমার ইন্টার্ণশীপ শুরু হয় ২০০৭ সালের জুন মাসের ১২ তারিখে। কিন্তু ইন্টার্ণশীপ অফার পাই প্রায় তিন মাস আগে। অফার পাওয়ার পরপরই ইন্টারনেট ঘেঁটে জানতে পারি যে মাইক্রোসফট এর চেয়ারম্যান বিল গেটস প্রতি বছর ইন্টার্ণদের তাঁর বাসায় একটা বার্বিকিউ ডিনার এর দাওয়াত করেন। এটা শোনার পর মনে হচ্ছিলো ইন্টার্ণশীপের চেয়ে এই ডিনারটা বেশি গুরুত্মপূর্ণ! তার উপর জানতে পারলাম এই বছরই বিল গেটস শেষ ডিনার অনুষ্ঠান করবে, কারণ পরের বছর উনি মাইক্রোসফট ছেড়ে দিচ্ছেন। তাই অপেক্ষা করতে থাকলাম সেই কাংখিত দিনটির জন্য।

অবশেষে সেই বহু প্রত্যাশিত ইমেইলটি পেলাম। আমাকে অন্য সব ইন্টার্ণদের সাথে ২৮ শে জুন (যতোদূর মনে পড়ে) সন্ধ্যাবেলা মহামতি(!) বিল গেটস এর বাসায় ডিনার এর নিমন্ত্রণ করা হয়েছে! মাইক্রোসফট রেডমন্ড হেডকোয়াটার্সে প্রতি বছর প্রায় চার পাঁচ’শ ইন্টার্ণ গ্রীষ্মের ছুটিতে কাজ করতে আসে। সংখ্যাটা বড় মনে হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে সারা পৃথিবীতে মাইক্রোসফট এর প্রায় ৯৫,০০০ এম্পলয়ী আছে, যার মধ্যে রেডমন্ড এর হেডকোয়াটার্সেই আছে প্রায় ৩৫,০০০। এক জায়গায় ৩৫,০০০ লোক কাজ করা মানে বিশাল ব্যাপার। মাইক্রোসফট এর রেডমন্ড ক্যাম্পাস ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকার চেয়ে বড় হবে। প্রায় শ’খানেক বিল্ডিং জুড়ে এর অফিস, শ’খানেক শাটল কার দিনরাত চলাচল করে এই বিল্ডিংগুলোর মধ্যে মানুষ পারাপার করে।

যাই হোক। মাইক্রোসফট নিয়ে আরেকদিন লিখবো। আজকে বিল গেটস এর সাথে সাক্ষাতের গল্প বলি। ওই দিন বিকাল তিন টার দিকে বিল্ডিং ৩৩ এর সামনে চলে যাই। বিল্ডিং ৩৩ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর কনফারেন্স সেন্টার। অনেকগুলো কনফারেন্স রুম আছে এখানে। বিল গেটস এর ৩০ শে জুন ২০০৮ এর বিদায়ী মিটিংও এখানে হয়েছিলো। আমার সাথে আমার দুই ইন্ডিয়ান বন্ধু ছিলো। ওরাও আমার মতোই ইন্টার্ণ। একজন রচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে আরেকজন টেক্সাস অস্টিনএ মাস্টার্স করছে। আমরা তিন জনই উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এ ছিলাম। তো বিল্ডিং এর সামনে অনেকগূলো বাস দাঁড়ানো ছিলো যেগুলো আমাদের বিল গেটস এর বাসায় নিয়ে যাবে। ইন্টার্ণরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গল্পগুজব করছে। একে অন্যের সাথে পরিচিত হচ্ছে। আমাদের লাইনে অনেকের মধ্যে ক্যালটেক থেকে আসা দুই বন্ধু ছিলো যাদের সাথে আমি অনেক্ষন কথা বলেছি। একজন কম্পিউটার সায়েন্সে আরেকজন গণিতের উপর পড়ছে ক্যালটেকে। একজন এখন আমাদের গ্রুপ নেটয়ার্কিংএ, আর আরেকজন উইন্ডোজ কার্নেল গ্রুপএ ইন্টার্ণশীপ করছে। ওদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম মানুষ কেন ক্যালটেক এর এতো সুনাম করে। দুজনই অসম্ভব প্রতিভাবান। যে নেটয়ার্কিং গ্রুপ এর সে এর আগের বছর ইন্টার্ণশীপ করেছে গুগলএ, তার আগের বছর ইয়াহু তে! এবার মাইক্রোসফটএ এসেছে দেখার জন্য মাইক্রোসফট তার কেমন লাগে! আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনটাই তো দেখলে, কোন কোম্পানীতে কাজ করতে চাও? আমি আশা করছিলাম ও গুগল বা মাইক্রোসফট এর নাম বলবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও আমাকে বললো ও একটা স্টার্ট-আপ, মানে নিজেই নতুন একটা কোম্পানী খুলতে চায়! তখন আমি বুঝলাম কিভাবে আমেরিকাতে সিলিকন ভ্যালীর জন্ম হয়। এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে এরা খুব দাম দেয়। এরা ঝুঁকি নিতে পারে।

সে যাক, বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। তো একসময় আমাদের সবাইকে বাসে উঠানো হলো। বাসে ইন্টার্ণদের গল্পগুজবে একটা হাউকাউ অবস্থা। বিল গেটস এর বাসা মাইক্রোসফট অফিস থেকে খুব দূরে নয়। জ্যাম না থাকলে ১০/১২ মিনিটের ড্রাইভ হবে বড়জোর। তাই মিনিট দশেক পরে যখন বাস থেমে গেল ভাবলাম চলে এসেছি বোধহয়। বাস থেকে নেমে ভুল বুঝতে পারলাম। আমাদের আসলে নিয়ে আসা হয়েছে একটা বড় গীর্জার সামনে। অবাক হলাম। বিল গেটস এর বাসায় ডিনার খেতে যাওয়ার আগে গীর্জায় প্রার্থনা করতে হবে নাকি? আস্তে আস্তে ব্যাপারটি পরিস্কার হলো। আমাদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সিকিউরিটি চেক এর জন্য! গীর্জার সামনে পেছনে যেহেতূ অনেক খোলা জায়গা, তাই আমাদের এখানে লাইন ধরে মেটাল ডিটেকটর এর মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিলো কোন মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা সাথে আনা চলবে না (এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে!)। আর এখন মেটাল ডিটেকটর দিয়ে শেষবারের মতো চেক করে নেওয়া হলো কোন ধাতব জিনিস আছে কিনা কারো সাথে।

সিকিউরিটি চেক করা শেষ হবার পর আমাদের এবার ছোট ভ্যানের (মাইক্রোবাস এর মতো) মতো গাড়িতে তোলা হলো। বিশাল সাইজের বাস যেহেতূ বিল গেটস এর বাড়িতে ঢুকবেনা, তাই ছোট গাড়ির ব্যবস্থা। গীর্জা থেকে বিল গেটস এর বাড়ী ছিলো খুব কাছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের গাড়িটি বাড়ির মূল গেইট দিয়ে ঢুকে পড়লো। বাড়িটি চারদিকে গাছগাছালীতে ঢাকা। তাই তেমন কিছু খেয়াল করতে পারিনি বাড়ির বাইরের অংশের। গাড়ি থেকে নেমেই আমাদের একটা দরজা দিয়ে বিল গেটস এর বাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঢুকেই আমাদের একটা সিঁড়ি দেখিয়ে দেওয়া হয়।। কাঠের সিঁড়ি। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে সে সিঁড়ি নেমে গেছে প্রায় চার-পাঁচ তলা সমান নিচের দিকে।

Bill Gates House

সিঁড়ি বেয়ে নামা শুরু করলাম আমরা। একপাশে মূল বাড়ির ভেতরের অংশ আর আরেকপাশে একটা বিশাল ড্রয়িং রুম দেখলাম। যেহেতু আমাদের ডানেবামে কোথাও ঢুকার অনুমতি নাই, তাই সোজা নিচে নেমে যেতে হলো। নিচে নেমে দেখতে পেলাম বিশাল ঘাসে ঢাকা বাড়ির ব্যাক-ইয়ার্ড। জায়গাটা ছিলো লেক ওয়াশিংটন এর পাশে। লেক এর পাড়ে বিল গেটস এর প্রাসাদপ্রম বাড়ি। সবুজ ঘাসে ঢাকা উঠানের এখানে সেখানে টেবিল এর উপর নানা রকম খাবার রাখা। সবই আমেরিকান খাবার। আমেরিকানরা লতাপাতা (সালাদ হিসেবে) টাইপের অনেক খাবার খায় সেগুলো ছিলো, বিভিন্ন ধরণের বার্গার ছিলো, স্যান্ডউইচ ছিলো, সামুদ্রিক মাছের কিছু আইটেম ছিলো, নানারকম ড্রিঙ্কস ছিলো। আরো অনেক রকম খাবার ছিলো যেগুলোর নাম মনে নাই।

সেদিন কোম্পানীর অনেক বড় এক্সিকিউটিভরা ছিলেন সেখানে। সবাই মাইক্রোসফট এর ভাইস প্রেসিডেন্ট কিংবা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বা এই গোছের কিছু। ইন্টার্ণরা কেউ কেউ খাবার নিয়ে নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছিলো, আবার কেউ কেউ কোম্পানীর সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের ঘিরে ধরে নানারকম প্রশ্ন করছিলো। আমি আমার ইন্ডিয়ান বন্ধুদের সাথে বসে গল্প করছিলাম। আর কয়েকজন এক্সিকিউটিভ এর কথা শুনছিলাম। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন উইন্ডোজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভেন সিনফস্কি। ইন্টার্ণরা ওনাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলো আর উনি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। আমি কথা বলেছিলাম আমাদের কোর অপারাটিং সিস্টেম গ্রুপ এর একজন জেনারেল ম্যানেজার এর সাথে। উইন্ডোজ নিয়ে টুকটাক কথা বলেছিলাম আমরা ওনার সাথে। এদের সাথে কথা বললে বুঝা যায় এরা কতো স্মার্টভাবে একটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। টেকনিকাল এবং মার্কেটিং উভয় দিকে এদের দারুন দখল।

প্রায় আধঘন্টা-পৌণে একঘন্টা পর মুল বাড়ির সাথে সংলগ্ন অপর একটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন বিল গেটস। আর যায় কোথায়। এখানকার বেশির ভাগ ইন্টার্ণই বিশ-বাইশ বছর বয়সের। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো তাঁর উপর। ওনার চারদিকে তৈরি হয়ে গেলো বিশাল ভিড়। প্রথমে উনি ইন্টার্ণদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিলেন। ইন্টার্ণরা দুনিয়ার সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলো তাকে। অনেক্ষণ ওদের সাথে কাটিয়ে উনি ভিড় থেকে বের হয়ে একটু উঁচুমতো একটা যায়গায় গিয়ে মাইক এর মাধ্যমে সবাইকে স্বাগতম জানালেন। বললেন তাঁর স্বপ্নের কথা, পরিশ্রম করে মাইক্রোসফটকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার কথা। গুগলের কথা বললেন। ওরা যে সার্চএ ভালো করছে আর আমাদের জন্য যে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ সেটি বললেন। প্রায় মিনিট পনের মাইক্রোসফট সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন।

সেদিন অনেক কাছে থেকে ওনাকে দেখেছি আর কথা শুনেছি। মাইক্রোসফট এর ব্যাবসায়ীক পলিসি নিয়ে অনেকরকম মতামত থাকতে পারে, কিন্তু “সফটওয়ার শিল্প” বলতে আমরা যা বুঝি এটা প্রায় এককভাবে মাইক্রোসফট তথা বিল গেটস এবং তাঁর টিম প্রতিষ্ঠা করেন। বিল গেটস একজন চরম প্রতিভাবান ব্যক্তি। তার ব্যাবসায়ীক এবং প্রযুক্তিগত দুই দিকেই অভাবনীয় দখল। মানবতার প্রতিও তাঁর অনেক টান। সেজন্য এই বছর তিনি মাইক্রোসফট থেকে অবসর (পুরোপুরি নয়, কিন্তু উনি এখন মূলত উপদেষ্টা ধরণের ভূমিকায় আছেন) নিয়ে মনোনিবেশ করেছেন মানবসেবায়। তাঁর বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতব্য প্রতিষ্ঠান। অনেকে বলছেন বিল গেটস হয়তো একদিন শান্তির জন্য নোবেল প্রাইজ পাবেন তাঁর মানবতাবাদী কাজের জন্য। গতো বছর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর সমাবর্তন বক্তৃতার একটা মূল বিষয় ছিলো মানবসেবা।

বিল গেটস চাল-চলনে একেবারে সাধারণ। কেউই তাকে দেখে মনে করবে না কতো ক্ষমতাধর, কতো স্মার্ট উনি। সেদিন একটা সাধারণ জিন্স আর টিশার্ট পরে এসেছিলেন তিনি। তাঁর কথাবার্তা খুবই সহজসরল। এই বছর যেদিন তিনি মাইক্রোসফট থেকে বিদায় নেন, মঞ্চে সবার সামনে অনেকটা ঢুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তাঁকে দেখেই বুঝা যায়, তিনি বাইরে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতন হলেও ভেতরে তাঁর অগাধ জ্ঞান। এই সারল্য, বুদ্ধি, আর জ্ঞানের বলেই তিনি আজ মাইক্রোসফট এর মতো এক বিশাল কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।

খাওয়া-দাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি ঘুরে দেখেছিলাম বাড়িটি। চারদিকে সিকিউরিটির লোকজন ছিলো, তার উপর আমাদের বাড়ির ভেতরে যাবার অনুমতি ছিলো না। তাই বাইরে থেকে যতোটুকু দেখা যায় তাই দেখেছি। লেক এর পাশে বাড়ি হওয়ায় লেক এর উপর কাঠের পাটাতন ছিলো। সেখানে একটা বড় স্পীডবোট বাঁধা ছিলো। লেক এর অপর পাড়ে সিয়াটল শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিং এর আকাশরেখা দেখা যাচ্ছিলো। যতোদূর মনে পড়ে ওনার ব্যক্তিগত জিমনেশিয়ামটি দেখেছিলাম যেটি মূল বাড়ি থেকে বাইরে অবস্থিত। বাড়িটি আকারে বেশ বড়। অনেক টাকা খরচ করে বানানো। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়ি বলে কথা!

সব মিলিয়ে ঘন্টা দুই এর মতো থাকা হলো ওখানে। ফেরার সময় হয়ে এলো। ইন্টার্ণরা ধীরে ধীরে বের হওয়া শুরু করলো বাড়ি থেকে। এক সময় আমিও বের হলাম। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম আমার ভাগ্যের কাছে। এমনিতে আমার সৌভাগ্য জিনিসটা পাওয়া হয়ে উঠেনা কখনো। তাই এমন একটা সু্যোগ পেয়ে নিজেকে অনেক ধন্য মনে করেছি। তার উপর ওই বছরই ছিলো বিল গেটস এর শেষ ইন্টার্ণ ডিনার। এটাকে নির্দ্বিধায় বড় ধরণের সৌভাগ্য বলা যায়, কী বলেন?

হেমন্ত – দেশে ও বিদেশে

fallleaves00831

এখানে এখন হেমন্ত কাল চলছে। অবশ্য চলছে বলা ঠিক হবে না, চলে যাচ্ছে। আমেরিকাতে হেমন্ত বেশিদিন থাকে না। কিন্তু যে কয়দিন থাকে সে সময়টাতে পুরো প্রকৃতি অপার্থিবভাবে রঙ্গিন হয়ে উঠে। সে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য।

blue-sky51

যখনি এখানে হেমন্ত আসে তখনি আমার মনে পড়ে যায় বাংলাদেশের হেমন্তের কথা। বাংলাদেশেও হেমন্ত খুব একটা বেশি সময় ধরে থাকে না। নভেম্বর মাসটাই মূলত হেমন্ত। হেমন্তের আকাশ থাকে অবিশ্বাস্য রকমের নীল। পুরো আকাশ জুড়ে শুধু নীলের খেলা। সারা আকাশে এক ফোটা মেঘের দেখা নেই। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসে। শরৎ পেরিয়ে হেমন্ত আসতে আসতে সেই রোদ হয়ে উঠে অতি মনোরম। ফসলের মাঠ হয়ে উঠে সবুজ আর হলুদ।

দেশে থাকতে হেমন্ত আমাকে কেমন অন্যরকম করে তুলতো। বাতাসে, রোদ্দুরে কেমন যেন মিষ্টি একটা ভাব। আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে বুক ভরে নিশ্বাস নিলেই প্রকৃতির সতেজতাকে নিজের ভেতরে নিয়ে যাওয়া যায়। আকাশটা মনে হতো বিশাল বক্ষ হয়ে পৃথিবীর অনেক কাছে চলে এসেছে। চৈত্রের আকাশে চিলেরা ডানা মেলে যেভাবে ঘুরে ঘুরে উড়ে, হেমন্তের আকাশে আমার ঠিক তেমনি উড়তে ইচ্ছে করতো। আমার মুক্ত আকাশে স্কাই ডাইভিং করার ইচ্ছেটা মনে হয় এই হেমন্তের আকাশ দেখেই হয়েছে!

ঢাকাতে তো আকাশ দেখার মতো খোলা জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে। সৌভাগ্যক্রমে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটেছে ঢাকার বাইরে, সিলেটে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শহরের বাইরে, একেবারে গ্রাম এলাকায়। চারদিকে ছিল ছোট-বড় টিলা। আর অনেক দূরে, দিগন্তের কাছাকাছি ছিল ভারতের উঁচু উঁচু পাহাড়। ওগুলো ছিল হিমালয় থেকে বের হওয়া শাখাপ্রশাখা। ছোট-বড় পাহাড়ের পেছনে আদিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ যে কতো সুন্দর সেটা যারা দেখেনি তাদের বলে বোঝানো যাবে না। কাছের সবুজ পাহাড় কিংবা দূরের কালচে নীল পাহাড় আঁকাবাঁকা হয়ে মিশে গেছে দিগন্তে, সে এক অপূর্ব দৃশ্য!

হেমন্তের সারা দিন ধরে চলে মিষ্টি, মায়াবী আলোর খেলা। আকাশে আলো, বাতাসে আলো, আলো আমার চোখে, আলো আমার মুখে, আলো আমার প্রাণে… আমি গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠি – “আলো আমার আলো, ওগো আলো ভুবন ভরা, আলো নয়ন ধোয়া আমার আলো হৃদয় হরা; নাচে আলো নাচে ও ভাই আমার প্রাণের কাছে, বাজে আলো বাজে ও ভাই হৃদয় বীণার মাঝে…”। এ আলো গ্রীষ্মের খররৌদ্রতপ্ত আলো নয়, এ আলো এক অতি মনোরম মনপ্রাণ জাগানিয়া আলো। আর সন্ধ্যার গোধূলীর আলো তো এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। পুরো পশ্চিম আকাশ জুড়ে চলে লাল এর খেলা। এ লাল রঙ কোন পৃথিবীর রঙ নয়, সে এক অপার্থিব ধরণের আলোর নাচ চলে হেমন্তের সন্ধ্যা গুলোতে। সিলেটের সন্ধ্যার আকাশ
আমার চেয়ে কেউ বেশি সময় নিয়ে দেখেছে বলে মনে হয় না!

বাংলাদেশের হেমন্ত যেমন গাঢ় নীল আকাশ আর মনোরম আলো দিয়ে চেনা যায়, আমেরিকার হেমন্ত তেমনি চেনা যায় গাছের পাতা রঙ্গিন হয়ে উঠা এবং কিছুদিন পর তার ঝরে যাওয়া দেখে। এখানে হেমন্তকে বলা হয় “Fall”, যার অর্থ পতন বা পড়া। এখানে প্রায় সব গাছের পাতা ঝরে পড়ে হেমন্তে। কিন্তু পাতা ঝরে পড়ার আগে সেগুলো বিচিত্র সব রঙ ধারণ করে। সেই রঙ এর বর্ণনা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এতো সুন্দর সেই রঙের বাহার, এতো বিচিত্র রকমের সেই রঙগুলো, সেই রঙ দেখলে সাথে সাথে মনেও তা ধরে যায়। লাল, হলুদ, আর সবুজের যতো রকমফের সম্ভব আমেরিকার হেমন্তে সেই সব রঙ দেখা যায় গাছের পাতাতে।

প্রকৃতি মনে হয় ভয়াবহ সৌন্দর্য্য বেশিক্ষণ রাখতে চায় না আমাদের সামনে। তাই হেমন্তও বেশিদিন থাকে না কোথাও। বাংলাদেশে নীল আকাশের বুকে স্বপ্নের উড়াউড়ি শুরু না হতেই আস্তে আস্তে শীত চলে আশে কুয়াশার চাদরে, নরম রোদের সূর্যটাকে আরো নরম করে দিয়ে। আমেরিকায় গাছের পাতাগুলির রঙ্গে মন রাঙ্গানোর সাথে সাথেই শুরু হয় পাতা ঝরা। রাস্তাঘাট সব ভরে যায় মরা, নিস্তেজ রঙ্গিন পাতায়। আর কনকনে শীতের বাতাস ঝাপ্টা দিয়ে জানিয়ে দেয় সে আসছে…

হেমন্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের উপভোগের বস্তুগুলোর স্বল্পস্থায়ীত্বের কথা। এ জীবনে কিছুই থাকে না চিরকাল ধরে। না সুখ, না স্বপ্ন, না সৌন্দর্য্য। কিন্তু সুখ-স্বপ্ন-সৌন্দর্য্য উপভোগ করার ইচ্ছা ও মানসিকতা থাকলে ওগুলো ঘুরে ফিরে আসতেই থাকবে, আমাদের শুধু চোখ মেলে দেখতে হবে চারপাশে।

Tagged , , , , ,
Advertisements