Category Archives: Miscellaneous

আমাদের নেগেটিভ আবেগগুলো

আমরা বাংলাদেশীরা মানুষের প্রশংসা করতে জানিনা। এতো ঢালাওভাবে হয়তো বলা ঠিকনা, কিন্তু আমাদের এতো বড় একটা অংশ এই সমস্যায় ভোগে যে মোটামুটিভাবে বলা যায় আমরা বাংলাদেশীরা মানুষের প্রশংসা করতে পারিনা।

এই ব্যাপারটা আমি সবসময় খেয়াল করে এসেছি, কিন্তু এটা আরো বেশি করে আমার মাথায় এসেছে ডক্টর ইউনুসকে আওয়ামীলীগ সরকারের হেনস্থা করার পর।

সারা পৃথিবীতে যদি একজন বাংলাদেশীর জন্যে মানুষ আমাদেরকে চেনে, আমাদের সুনাম করে, তবে সেই মানুষটি হচ্ছে ডক্টর ইউনুস। দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং ধর্মের নামে জঙ্গীপনার কারণে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা খুব বেশি একটা কখনো ছিলো না, কিন্তু ডক্টর ইউনুস প্রায় এককভাবে সেই মর্যাদা অনেকটা ফিরিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। কিন্তু আওয়ামীলীগ এর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোপানলে পড়ে সেই মানুষটিকে এতোটা হেনস্থা হতে হবে সেটা কখনো আমি ভাবিনি।

তো ডক্টর ইউনুস এর সাথে বাংলাদেশের মানুষের অন্যকে প্রশংসা করতে না পারার সম্পর্ক কী?

ডক্টর ইউনুসকে দিয়েই শুরু করি। এমনকি হাসিনা সরকার তাঁকে হেনস্থা শুরু করার আগেও তাঁকে নিয়ে আমরা নানারকম সমালোচনা করতাম। তাঁর নোবেল পুরষ্কারকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছি অনেকে। অনেকেই বলেছিলো নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার মতো কোনো কাজ তিনি করেন নাই, আমেরিকা এবং পুঁজিবাদী পশ্চিমা দেশগুলো ষড়যন্ত্র করে তাঁকে এই পুরষ্কার দিয়েছে। আমরা সবসময় সবকিছু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করি, সবকিছুতে ষড়যন্ত্র দেখি। গরীব দেশগুলো থেকে কেউ নোবেল না পেলে বলি আমেরিকা এবং পশ্চিমা বিশ্ব ষড়যন্ত্র করে সব নোবেল নিজেরা নিয়ে যায়। আবার আমাদের কেউ পেলে বলি সেটাও একটা ষড়যন্ত্রের একটা অংশ!

ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে কেউ ডানে গেলে আমরা ভাবি কেনো সে ডানে গেলো বামে যায় নাই, আবার সে বামে গেলে সাথে সাথেই ভাবি কেনো সে ডানে না যেয়ে বামে গেলো, নিশ্চয়ই তার কোনো মতলব আছে!

ধরুন কেউ একটা নতুন গাড়ি কিনলো। আমাদের ততক্ষনাৎ প্রতিক্রিয়া কী হবে? মোটামুটি সবাই সাথে সাথে ভাববো “ব্যাটা অনেক দুই নাম্বারি টাকা কামাইছে, সেই অসৎ টাকা দিয়ে গাড়ি কিনছে”, কিংবা “গাড়ি কিনছে লোক দেখানোর জন্যে”, “মানুষ ভাত খাইতে ভাত পায়না আর উনি গাড়ি কিনছেন”, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ ভদ্রলোক হয়তো কিছু টাকা জমিয়ে চলাফেরার সুবিধার জন্যে গাড়িটা কিনেছেন, এই যা।

কেউ হয়তো একটা বড়ো বেতনের চাকরি পেয়েছে, কিংবা চাকরিতে প্রমোশন পেয়েছে, আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় “ব্যাটা একটা চাটুকার লোক”, কিংবা “সে খুবই চাল্লু, বসদের ভাঁজ করে প্রমোশন বাগাই নিছে”। খুব কম মানুষই ভাববো সে হয়তো অনেক পরিশ্রম করে চাকুরীটা পেয়েছে কিংবা প্রমোশনটা পেয়েছে।

ইদানিং আরেকটা সমালোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে কর্পোরেট কম্পানীগুলো, বিশেষ করে টেলিকম কম্পানীগুলো। কথায় কথায় ওদেরকে গালি দিয়ে আমরা কেমন যেনো একটা সুখ পাই। ওরা দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায় এমন বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান করলেও ওদেরকে আমরা গালি দিই, বলি যে দেশপ্রেমের বানিজ্যিকিকরণ হচ্ছে। আবার দেশের জন্যে কিছু না করলে বলি যে ওদের কর্পোরেট সোশাল রেস্পন্সিবিলিটি বলতে কিছু নাই। আরে ভাই, ওরা তো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চ্যারিটি না। ওদের প্রধান কাজ হচ্ছে ব্যবসা, এর ফাঁকে ওরা ওদের মতো করে দেশপ্রেমমূলক বিজ্ঞাপন বানায়, অনুষ্ঠান করে এটাই বা কম কিসের? আপনার পছন্দ না হলে বলেন কিভাবে করলে আপনার পছন্দ হবে। কিংবা আপনি একটা কম্পানী বানান এবং দেখিয়ে দেন কিভাবে বিজ্ঞাপন বানাতে হবে কিংবা অনুষ্ঠান বানাতে হবে।

আমাদের সমালোচনার আরেক নির্বিচার টার্গেট হচ্ছে বিনোদন জগতের মানুষজন। বাংলাদেশে প্রায় সবাই নিয়মিত টিভি দেখে, অনেকেই সিনেমা দেখে, গান দেখে, কিন্তু আমরা প্রায় সবাই নিয়ম করে অভিনয় কিংবা গানের শিল্পীদের সম্পর্কে অনেক বাজে কথা বলি, কটুক্তি করি। “ওই নায়ক কোনো অভিনয় পারে নাকি?”, “ওই নায়িকাটার স্বাস্থ্য দেখেছিশ?”, “আরে ওই মেয়ে তো একটা রাস্তার মেয়ে …”, “ওই ছেলে মদ-গাঞ্জা খেয়ে বেড়ায়”, “ওই মাইয়া তো খালি স্টেইজে উঠে লাফালাফি করে, ও আবার গান গাইতে জানে নাকি” ইত্যাদি ইত্যাদি। আরে বাবা, আপনি যদি এতোই বিনোদন বোদ্ধা হয়ে থাকেন, আপনার কোন গুনটা আছে আমাদের বলেন এবং দয়া করে গান গেয়ে বা অভিনয় করে আমাদের বিনোদন জগতকে সমৃদ্ধ করেন। ধন্যবাদ।

জাফর ইকবাল স্যার এবং অন্যরা মিলে যে গণিত অলিম্পিয়াড করে এটা নিয়ে জামাত-শিবিরের লোকজন বলে যে স্যার নাকি আসলে পলিটিক্স করছেন গণিত অলিম্পিয়াডের নামে। গণিত অলিম্পিয়াড যে কতো গুরুত্মপূর্ণ একটা জিনিস এইটা এইসব জামাতী ব্রেইনে ঢুকার আগে পৃথিবীর মানুষ মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি ছেড়ে অন্য গ্যালাক্সির দিকে যাত্রা করবে।

দেশে মাঝে মাঝে বিদেশী শিল্পীরা আসে, অনুষ্ঠান করে। এতেও আমাদের অনেকের সমস্যা। শাহরুখ খান এসেছিলো, এটা নিয়ে তো ব্লগ, ফেইসবুক, পত্রিকাজুড়ে সমালোচনার বন্যা। “দেশটা ভারতের দখলে চলে গেলো রে”, “দেশের মানুষ ঠিক মতো খেতে পায়না, সেখানে এতো টাকা টিকেট কেটে অনুষ্ঠান দেখা একেবারে অনুচিত” ইত্যাদি। আচ্ছা, বাংলাদেশের রুনা লায়লা বা জেমস যদি ভারতে বা আমেরিকা যেয়ে গান গায় তাহলে বাংলাদেশ ভারত কিংবা আমেরিকা দখল করে ফেলে? আর আমার কষ্ট করে উপার্জন করা দশ হাজার টাকা দিয়ে আমি যদি একটা অনুষ্টান দেখতে যাই, তাতে আপনার সমস্যাটা আসলে কোথায়? আপনার কি ঈর্ষা হচ্ছে আমি অনুষ্ঠান দেখছি বলে?

আমাদের দেশের শতকরা চল্লিশ ভাগ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এখান থেকে উপরে উঠতে হলে আমাদের আরো অনেকদূর যেতে হবে। আমরা অনেকটা পথ চলে এসেছি – আমাদের মোটামুটি একটা চলনসই গণতন্ত্র আছে, আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে, আমরা ষোল কোটি মানুষের খাবার উৎপাদন করতে পারি, দেশের বেশির ভাগ মানুষ জঙ্গিবাদকে ঘৃণা করে। আমাদের উন্নতির পথে এখনো অনেকদূর যেতে হবে, কিন্তু তাই বলে আমরা আমাদেরকে বিনোদন থেকে বঞ্চিত করবো কেনো? কিছুদিন আগে কোন একটা ভারতীয় শিল্পী আসলো ঢাকায়, এক বন্ধু দেখলাম সেটা নিয়ে লিখলো যে দেশে মানুষ যেহেতু এখনো লাইন দিয়ে সস্তায় চাল কিনে সেহেতু আমাদের এইসব অনুষ্ঠানে এতো টাকা টিকেট কেটে যাওয়া ঠিক না। ব্লগেও দেখি মানুষজন পোস্ট দিচ্ছে, এইসব অনুষ্ঠানে না যেয়ে একটা গরীব শিশুকে সাহায্য করতে।

এই ধরনের কথাবার্তায় আমি আসলে কোনো যুক্তি দেখিনা। আমার ধারণা এটা অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত আবেগ। একটা সুস্থ্য জীবনের জন্যে চিত্ত-বিনোদন খুবই দরকারী। আমরা যদি যারা টাকার অভাবে বিনোদন করতে পারছেনা তাদের কথা ভেবে আমাদের নিজেদের বিনোদন করা থেকে বিরত থাকি তাহলে আমাদের কর্মক্ষমতা এবং সৃষ্টিশীলতা কমে যাবে, এবং আমরাও দেশের অর্থনৈতিক অবনতিতে ভুমিকা রাখা শুরু করবো। দেশের দারিদ্য সীমার নিচের মানুষের সংখ্যা তখন আরো বেড়ে যাবে। এইটা একটা নেগেটিভ ফিডব্যাক লুপ। একজন দূর্বল মানুষ আরেকজন দূর্বল মানুষকে সাহায্য করতে পারেনা। অন্যকে সাহায্য করতে হলে আগে নিজেকে শক্ত হতে হবে। আর আমার ধারণা যারা মানুষকে এইসব অনুষ্ঠানে যেতে নিষেধ করে তাদের অনেকেই সুযোগ পেলে সেখানে যেতো এবং তারা নিজেরা ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি উপকারী মানুষ হয় না।

সম্প্রতি একটা লেখা পড়লাম – “যেসব মানুষের নিজের উপর শ্রদ্ধা কম তারা বেশি (কু)সংস্কারে ভোগে”। অর্থাৎ যেসব মানুষ আসলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে খুশি নয়, নিজের উপর নিজের খুব বেশি শ্রদ্ধা নাই, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে, তারা সাধারণত মানুষকে নিয়ে বেশি নেগেটিভ কথা বলে। অন্যের ভালো কিছু দেখলে তারা সহজে খুশি হতে পারেনা, তাদের প্রথম চিন্তাটি হয় নেগেটিভ। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারেনা এরা।

বাংলাদেশকে উন্নত করতে হলে আমাদেরকে, বিশেষ করে তরুন সমাজকে, অনেক প্রাণশক্তির অধিকারী হতে হবে। বেশ কিছুদিন আগে “প্রাণশক্তি” নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, যেটার কিছু কথা এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারেঃ

“প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষ কৌতুহলী হয়, আগ্রহী হয়, সবসময় কিছু একটা করতে চায়, যেকোনো জিনিসের ভালো দিকটা দেখে প্রথমে, নিজের ভুল/দোষ হলে সেটা স্বীকার নেয় সহজে, অন্যের সফলতা দেখে হিংসা করেনা, সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ায়না, অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে নিজেই এগিয়ে আসে যেকোনো কাজে, ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকেনা, এবং আশেপাশের সবার মধ্যে নিজের প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করে। একজন সফল মানুষ আরেকজন সফল মানুষকে হিংসা করবেনা। যে ছেলেগুলো হরতাল-বিক্ষোভ এর সময় নির্বিচারে অন্যের গাড়ি ভাংগে, সেই ছেলেগুলোর প্রত্যেকের একটা করে গাড়ি থাকলে ওরা কখনো এই কাজটি করতো না। অসফল মানুষ স্বভাবতই কিছুটা হীনমন্যতাবোধে ভোগে, এবং সুযোগ পেলেই তার দুঃখ-কষ্টের কারণ অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।”

মানুষকে বিশ্বাস করা খুবই দরকারী একটা জিনিস। মানুষের মঙ্গল চিন্তা করা, মানুষের খুশিতে নিজে খুশি হওয়া এগুলো খুব চমৎকার ব্যাপার। মানুষ যতোদিন থাকবে ঈর্ষা ব্যাপারটা ততোদিন থাকবে মানুষের মধ্যে, কিন্তু এটাকে একটা খারাপ বিষয় ভেবে নিজের ভেতরে মেরে ফেলতে হবে। ঈর্ষাকে শক্তিতে রুপান্তরিত করতে হবে। কেউ একটা চমৎকার ফ্ল্যাট কিনেছে দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার নামে বদনাম না করে বরং ঈর্ষান্বিত হয়ে বেশি বেশি পরিশ্রম করে নিজে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলুন না। সেও সুখি তার ফ্ল্যাটে, আপনিও সুখি আপনার ফ্ল্যাটে!

মানুষের প্রশংসা করলে সে প্রশংসা আপনিই ফিরে পাবেন। মানুষের সুখে আপনি সুখী হলে সে সুখ একদিন আপনিও পাবেন। অন্যথায় ঈর্ষা, বদনাম, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ইত্যাদি নেগেটিভ ভাবাবেগ আপনাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে, সুখ সোনার হরিণ হয়েই অধরা থেকে যাবে।

কর্পোরেটকে ঘৃণার সংস্কৃতি – এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং কর্পোরেট না থাকলে কি সভ্যতার চাকা ঘুরতো?

আমাদের অনেকেই কিছু শব্দ আওড়াতে বেশ পছন্দ করি – সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, পুঁজিবাদ-সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা বিশ্বের ষড়যন্ত্র, বস্তুবাদ, পরজীবি বুদ্ধিজীবি ইত্যাদি ইত্যাদি। ইদানিং এর সাথে যোগ হয়েছে কর্পোরেট থাবা, কর্পোরেট দখল, কর্পোরেট লোভ বা এই জাতীয় কিছু শব্দ। মোট কথা বড় কম্পানীগুলোর ব্যবসা-বানিজ্যের ধরণের বিরুদ্ধে এক ধরণের ঘৃণা বা অপছন্দতা। দেশে বড় কিছু ঘটলেই যেমন কিছু মানুষ অবধারিতভাবে ধরে নেয় এটা ইন্দো-মার্কিন-ইজরায়েল এর চক্রান্ত, তেমনি দেশের বড় বড় কম্পানীগুলো তাদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কোন নতুন কিছু করলেই গেলো গেলো রব উঠে যায়। ভাবখানা এমন এই কম্পানীগুলোর সিইও হচ্ছে স্বয়ং ইবলিশ শয়তান আর তাদের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের এই গরীব দেশটাকে চুষে নিঃশেষিত করে দেওয়া।

কর্পোরেট বলতে আমরা সাধারণত বড় কম্পানীগুলোকেই বুঝাই। এগুলোর অনেকগুলোই আবার বহুজাতিক কম্পানী। কর্পোরেট এর প্রতি আমাদের ঘৃণা যতোই হোক না কেনো, আমাদের একটা মুহুর্তও কর্পোরেট এর উৎপাদিত পণ্য ছাড়া চলবেনা। আঠারো শতকের দিকে যে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিলো ইউরোপে, আজকের কর্পোরেট তারই বিশ শতকীয় সংস্করণ। এই যে আমি যেই কম্পিউটার ব্যবহার করে এই লেখাটি লিখছি সেটি ডেল নামক বহুজাতিক কম্পানীর তৈরি, ইন্টারনেট কানেকশন নেওয়া হয়েছে আরেক বিশাল কম্পানী কমকাস্ট থেকে, আমার ঘরের প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসপত্র কোনো না কোনো কম্পানীর তৈরি। পানি, বাতাস, আর মাটি ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার তার সবই আসে কর্পোরেট থেকে। আমার নিজের চাকুরীটাও একটা বহুজাতিক কম্পানীতে! এবং এ চাকুরী পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি! এবং সেটাই কি আমাদের সবার জন্য সত্যি নয়? আমাদের সবাই কি একটা ভালো কম্পানীতে একটা ভালো চাকুরী পেলে নিজেদের ধন্য মনে করি না?

পৃথিবীর সভ্যতার চাকা ঘুরানোর মূল রসদগুলো আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এঁরা। কিন্তু এগুলো পৃথিবীর ছয় বিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে তাদের ব্যবহারের মতো পণ্য বা সেবা হিসেবে প্রস্তুত করে নিয়ে যায় মূলত বিভিন্ন বেসরকরারী প্রতিষ্ঠান এবং কম্পানীগুলো (কিছু ক্ষেত্রে সরকারও এই কাজটি করে থাকে)। কম্পানীগুলো এই কাজটি কোনো জনসেবার চিন্তা থেকে নয়, বরং পুরোপুরি মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই মুনাফা লাভ করতে গিয়ে ওরা অসংখ্য মানুষকে চাকুরী দেয় আর মানুষের জীবনকে করে দেয় অনেক বেশি আরামদায়ক। এখন ওরা কতোটুকু লাভ করবে, কিংবা কী প্রক্রিয়ায় ব্যবসা করবে এই আইনগুলি ঠিক করে দিবে দেশের সরকার, যেই সরকারকে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আনবে সেই দেশের জনগন। জনগন যেহেতু সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, তাই সরকার এমনভাবে আইন করবে যাতে জনগনের স্বার্থ সবার আগে রক্ষা হয়। এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে যারা ওই কম্পানীগুলোর মালিক/অংশীদার তারাও এই জনগনের অংশ, এবং তারাও অসংখ্য মানুষের চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখছে।

আমরা যারা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়এ পড়ছি বা পড়ে পাশ করে বের হয়েছি, আমাদের সবার লক্ষ্য কী? প্রায় সবাই কি একটা ভালো চাকুরী করতে চাই না? বড় বড় টেলিকম কম্পানীগুলো, কিংবা বড় বড় বুহুজাতিক কম্পানী-ব্যাঙ্কগুলো হয় আমাদের প্রথম টার্গেট, কারণ সেগুলো সবচেয়ে বেশি বেতন দেয়। একটা স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য সবারই টাকা দরকার হয়, টাকা নিয়ে যতোই বড় কথা বলি না কেনো আমরা। আর সেই টাকার একটা বড় অংশ অর্থনীতিতে পাম্প করে এই কম্পানীগুলো। অর্থনীতিকে সচল রাখতে কম্পানীগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

উন্নত দেশগুলিতে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে প্রচন্ড উৎসাহ দেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক বাল্বসহ অসংখ্য আবিষ্কারের জনক থমাস আলভা এডিসন ছিলেন একজন সফল উদ্দোক্তা (এন্ট্রাপ্রেনিউর)। মাইক্রোসফট এর বিল গেটস, গুগলের ল্যারি এবং সের্গেই, এইচপি এর হিউলেট এবং প্যাকার্ড – এরকম অনেক কম্পানীর প্রতিষ্ঠাতারা আক্ষরিক অর্থেই জিনিয়াস পর্যায়ের মানুষ। এই কম্পানীগুলো বিংশ এবং একবিংশ শতকের সভ্যতার পরিবর্তনের অন্যতম চালক। তেমনি করে সারা পৃথিবী জুড়ে খেলাধুলা, ইলেক্ট্রনিক্স, কম্পিউটার, টেলিকম, পেট্রোলিয়াম, কসমেটিক্স, খাদ্যদ্রব্য, যানবাহন, উড়োজাহাজ, স্বাস্থ্য – ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্ভর কম্পানী নানারকম পন্য এবং সেবা দিয়ে পৃথিবীতে আমাদের জীবন যাপনকে করে দিয়েছে অনেক বেশি সুবিধাজনক আর আরামদায়ক। আমাদের আজকের এই মোবাইল ফোন বিপ্লব, মিডিয়া বিপ্লব এগুলোর পেছনেও রয়েছে কর্পোরেট। মোবাইল ফোন ছাড়া কি একটা দিনও থাকার কথা ভাবা যায়? আর কর্পোরেটকে বাদ দিয়ে সরকারীভাবে ফোন সেবা দিতে চাইলে যে কী অবস্থা হয় সেটা টিএন্ডটি আর টেলিটককে দেখলেই বুঝা যায়!

দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য অনেকাংশেই নির্ভর করে এই কম্পানীগুলোর স্বাস্থের উপর। কম্পানীগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে টাকা কামানো, সরকার সঠিক আইনের মাধ্যমে এই কম্পানীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কম্পানীগুলোকে ঘৃণা করে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। দুঃখের বিষয় এমনকি বিয়ে করার সময় পাত্র ব্যবসা করে এমন কথা শুনলে আমাদের অভিভাবকরা তাদের মেয়ে বিয়ে দিতে চায়না অনেক সময় সেই পাত্রের কাছে। ব্যবসা মানেই মুদির দোকানী বা এরকম কিছু, কিংবা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে না পেরে কিছু একটা করার চেষ্টা – এই ধারণা থেকে আমাদের বের হতে হবে। মেধাবী ছেলেমেয়েরাও ব্যবসা করে, এবং সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনেক মেধাবী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যবসা প্রশাসন গ্র্যাজুএট কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে – এটাকে একটা বাস্তবতা হিসেবে আমাদের মেনে নিতে হবে।

আমাদের দরকার অনেক অনেক ব্যবসায়ী উদ্দোক্তা, অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। সিলিকন ভ্যালীর মতো সভ্যতা পরিবর্তনকারী ব্যবসা’র জায়গা তৈরী হয়েছে শুধুমাত্র উদ্দোক্তাদের মাধ্যমে। সিলিকন ভ্যালীর উদ্দোক্তারা প্রায় সবাই কোটিপতি, কিন্তু তাদের পন্য ব্যবহার করে আরো বেশি মানুষ কোটিপতি হয়েছে এবং তার চেয়েও বেশি মানুষ আরামদায়ক জীবন যাপন করছে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। “কর্পোরেট” শব্দটাকে একটা ভালো শব্দ হিসেবে দেখতে হবে। কর্পোরেটএ চাকুরী পাবার জন্য একের পর সিভি জমা দিবো কিন্তু ব্লগে বসে কর্পোরেটকে গালি দিবো সেটা হওয়া উচিত নয়। এরচেয়ে গণহারে সমালোচনা না করে স্পেসিফিক সমালোচনা করলে ব্যাপারটা অনেক বেশি ঠিক হয়। কর্পোরেট যেনো আমেরিকার মতো হয়ে না পড়ে – আমেরিকাকে সবাই গালি দেয় কিন্তু সবাই সেখানে যেতে চায়, ডিভি লটারিতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে বাংলাদেশ থেকে! কর্পোরেট যেনো একটা আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়, এন্ট্রাপ্রেনিউর হওয়া ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ম্যানেজার হওয়ার চেয়ে কম স্মার্ট ব্যাপার না। একটি সফল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা এবং সেটিকে সবার নিত্যদিনের ব্যবহার্য করে তোলা একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার, এবং এই কাজের জন্য দরকার ভিশন এবং এক্সিকিউশন। আজকের দিনের সেরা ব্র্যান্ডগুলি তৈরির পেছনে অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের অনেক বছরের পরিকল্পনা আর পরিশ্রম রয়েছে। এই পরিশ্রমকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

তবে কর্পোরেট যেনো মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য থাকতে হবে শক্ত আইন এবং তার শক্ত প্রয়োগ। বন উজাড় করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, চাষাবাদের জমি এবং নদী দখল করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলা, সেবার তুলনায় টাকা বেশি নেওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে সরকারকে থাকতে হবে তৎপর। কিন্তু এসব যাতে কর্পোরেট এর বিরুদ্ধে নির্বিচার ঘৃণার কারণ না হয়ে উঠে সেটি খেয়াল রাখতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কর্পোরেট এর বিকল্প নেই। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বছর বছর যে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিবিএ, অর্থনীতি, রাজনীতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, ইত্যাদি অসংখ্য বিষয় থেকে পাশ করে বের হচ্ছে তাদের পর্যাপ্ত চাকুরীর জন্য দরকার অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। শুধু খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সরকার যেনো দেশের আইনটা ঠিকমতো প্রয়োগ করে আর সাধারণ মানুষের স্বার্থের দিকটা ঠিক রাখে।

বিল গেটস এর বাড়িতে এক সন্ধ্যা

মাইক্রোসফট এ আমার ইন্টার্ণশীপ শুরু হয় ২০০৭ সালের জুন মাসের ১২ তারিখে। কিন্তু ইন্টার্ণশীপ অফার পাই প্রায় তিন মাস আগে। অফার পাওয়ার পরপরই ইন্টারনেট ঘেঁটে জানতে পারি যে মাইক্রোসফট এর চেয়ারম্যান বিল গেটস প্রতি বছর ইন্টার্ণদের তাঁর বাসায় একটা বার্বিকিউ ডিনার এর দাওয়াত করেন। এটা শোনার পর মনে হচ্ছিলো ইন্টার্ণশীপের চেয়ে এই ডিনারটা বেশি গুরুত্মপূর্ণ! তার উপর জানতে পারলাম এই বছরই বিল গেটস শেষ ডিনার অনুষ্ঠান করবে, কারণ পরের বছর উনি মাইক্রোসফট ছেড়ে দিচ্ছেন। তাই অপেক্ষা করতে থাকলাম সেই কাংখিত দিনটির জন্য।

অবশেষে সেই বহু প্রত্যাশিত ইমেইলটি পেলাম। আমাকে অন্য সব ইন্টার্ণদের সাথে ২৮ শে জুন (যতোদূর মনে পড়ে) সন্ধ্যাবেলা মহামতি(!) বিল গেটস এর বাসায় ডিনার এর নিমন্ত্রণ করা হয়েছে! মাইক্রোসফট রেডমন্ড হেডকোয়াটার্সে প্রতি বছর প্রায় চার পাঁচ’শ ইন্টার্ণ গ্রীষ্মের ছুটিতে কাজ করতে আসে। সংখ্যাটা বড় মনে হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে সারা পৃথিবীতে মাইক্রোসফট এর প্রায় ৯৫,০০০ এম্পলয়ী আছে, যার মধ্যে রেডমন্ড এর হেডকোয়াটার্সেই আছে প্রায় ৩৫,০০০। এক জায়গায় ৩৫,০০০ লোক কাজ করা মানে বিশাল ব্যাপার। মাইক্রোসফট এর রেডমন্ড ক্যাম্পাস ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকার চেয়ে বড় হবে। প্রায় শ’খানেক বিল্ডিং জুড়ে এর অফিস, শ’খানেক শাটল কার দিনরাত চলাচল করে এই বিল্ডিংগুলোর মধ্যে মানুষ পারাপার করে।

যাই হোক। মাইক্রোসফট নিয়ে আরেকদিন লিখবো। আজকে বিল গেটস এর সাথে সাক্ষাতের গল্প বলি। ওই দিন বিকাল তিন টার দিকে বিল্ডিং ৩৩ এর সামনে চলে যাই। বিল্ডিং ৩৩ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর কনফারেন্স সেন্টার। অনেকগুলো কনফারেন্স রুম আছে এখানে। বিল গেটস এর ৩০ শে জুন ২০০৮ এর বিদায়ী মিটিংও এখানে হয়েছিলো। আমার সাথে আমার দুই ইন্ডিয়ান বন্ধু ছিলো। ওরাও আমার মতোই ইন্টার্ণ। একজন রচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে আরেকজন টেক্সাস অস্টিনএ মাস্টার্স করছে। আমরা তিন জনই উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এ ছিলাম। তো বিল্ডিং এর সামনে অনেকগূলো বাস দাঁড়ানো ছিলো যেগুলো আমাদের বিল গেটস এর বাসায় নিয়ে যাবে। ইন্টার্ণরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গল্পগুজব করছে। একে অন্যের সাথে পরিচিত হচ্ছে। আমাদের লাইনে অনেকের মধ্যে ক্যালটেক থেকে আসা দুই বন্ধু ছিলো যাদের সাথে আমি অনেক্ষন কথা বলেছি। একজন কম্পিউটার সায়েন্সে আরেকজন গণিতের উপর পড়ছে ক্যালটেকে। একজন এখন আমাদের গ্রুপ নেটয়ার্কিংএ, আর আরেকজন উইন্ডোজ কার্নেল গ্রুপএ ইন্টার্ণশীপ করছে। ওদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম মানুষ কেন ক্যালটেক এর এতো সুনাম করে। দুজনই অসম্ভব প্রতিভাবান। যে নেটয়ার্কিং গ্রুপ এর সে এর আগের বছর ইন্টার্ণশীপ করেছে গুগলএ, তার আগের বছর ইয়াহু তে! এবার মাইক্রোসফটএ এসেছে দেখার জন্য মাইক্রোসফট তার কেমন লাগে! আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনটাই তো দেখলে, কোন কোম্পানীতে কাজ করতে চাও? আমি আশা করছিলাম ও গুগল বা মাইক্রোসফট এর নাম বলবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও আমাকে বললো ও একটা স্টার্ট-আপ, মানে নিজেই নতুন একটা কোম্পানী খুলতে চায়! তখন আমি বুঝলাম কিভাবে আমেরিকাতে সিলিকন ভ্যালীর জন্ম হয়। এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে এরা খুব দাম দেয়। এরা ঝুঁকি নিতে পারে।

সে যাক, বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। তো একসময় আমাদের সবাইকে বাসে উঠানো হলো। বাসে ইন্টার্ণদের গল্পগুজবে একটা হাউকাউ অবস্থা। বিল গেটস এর বাসা মাইক্রোসফট অফিস থেকে খুব দূরে নয়। জ্যাম না থাকলে ১০/১২ মিনিটের ড্রাইভ হবে বড়জোর। তাই মিনিট দশেক পরে যখন বাস থেমে গেল ভাবলাম চলে এসেছি বোধহয়। বাস থেকে নেমে ভুল বুঝতে পারলাম। আমাদের আসলে নিয়ে আসা হয়েছে একটা বড় গীর্জার সামনে। অবাক হলাম। বিল গেটস এর বাসায় ডিনার খেতে যাওয়ার আগে গীর্জায় প্রার্থনা করতে হবে নাকি? আস্তে আস্তে ব্যাপারটি পরিস্কার হলো। আমাদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সিকিউরিটি চেক এর জন্য! গীর্জার সামনে পেছনে যেহেতূ অনেক খোলা জায়গা, তাই আমাদের এখানে লাইন ধরে মেটাল ডিটেকটর এর মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিলো কোন মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা সাথে আনা চলবে না (এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে!)। আর এখন মেটাল ডিটেকটর দিয়ে শেষবারের মতো চেক করে নেওয়া হলো কোন ধাতব জিনিস আছে কিনা কারো সাথে।

সিকিউরিটি চেক করা শেষ হবার পর আমাদের এবার ছোট ভ্যানের (মাইক্রোবাস এর মতো) মতো গাড়িতে তোলা হলো। বিশাল সাইজের বাস যেহেতূ বিল গেটস এর বাড়িতে ঢুকবেনা, তাই ছোট গাড়ির ব্যবস্থা। গীর্জা থেকে বিল গেটস এর বাড়ী ছিলো খুব কাছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের গাড়িটি বাড়ির মূল গেইট দিয়ে ঢুকে পড়লো। বাড়িটি চারদিকে গাছগাছালীতে ঢাকা। তাই তেমন কিছু খেয়াল করতে পারিনি বাড়ির বাইরের অংশের। গাড়ি থেকে নেমেই আমাদের একটা দরজা দিয়ে বিল গেটস এর বাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঢুকেই আমাদের একটা সিঁড়ি দেখিয়ে দেওয়া হয়।। কাঠের সিঁড়ি। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে সে সিঁড়ি নেমে গেছে প্রায় চার-পাঁচ তলা সমান নিচের দিকে।

Bill Gates House

সিঁড়ি বেয়ে নামা শুরু করলাম আমরা। একপাশে মূল বাড়ির ভেতরের অংশ আর আরেকপাশে একটা বিশাল ড্রয়িং রুম দেখলাম। যেহেতু আমাদের ডানেবামে কোথাও ঢুকার অনুমতি নাই, তাই সোজা নিচে নেমে যেতে হলো। নিচে নেমে দেখতে পেলাম বিশাল ঘাসে ঢাকা বাড়ির ব্যাক-ইয়ার্ড। জায়গাটা ছিলো লেক ওয়াশিংটন এর পাশে। লেক এর পাড়ে বিল গেটস এর প্রাসাদপ্রম বাড়ি। সবুজ ঘাসে ঢাকা উঠানের এখানে সেখানে টেবিল এর উপর নানা রকম খাবার রাখা। সবই আমেরিকান খাবার। আমেরিকানরা লতাপাতা (সালাদ হিসেবে) টাইপের অনেক খাবার খায় সেগুলো ছিলো, বিভিন্ন ধরণের বার্গার ছিলো, স্যান্ডউইচ ছিলো, সামুদ্রিক মাছের কিছু আইটেম ছিলো, নানারকম ড্রিঙ্কস ছিলো। আরো অনেক রকম খাবার ছিলো যেগুলোর নাম মনে নাই।

সেদিন কোম্পানীর অনেক বড় এক্সিকিউটিভরা ছিলেন সেখানে। সবাই মাইক্রোসফট এর ভাইস প্রেসিডেন্ট কিংবা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বা এই গোছের কিছু। ইন্টার্ণরা কেউ কেউ খাবার নিয়ে নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছিলো, আবার কেউ কেউ কোম্পানীর সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের ঘিরে ধরে নানারকম প্রশ্ন করছিলো। আমি আমার ইন্ডিয়ান বন্ধুদের সাথে বসে গল্প করছিলাম। আর কয়েকজন এক্সিকিউটিভ এর কথা শুনছিলাম। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন উইন্ডোজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভেন সিনফস্কি। ইন্টার্ণরা ওনাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলো আর উনি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। আমি কথা বলেছিলাম আমাদের কোর অপারাটিং সিস্টেম গ্রুপ এর একজন জেনারেল ম্যানেজার এর সাথে। উইন্ডোজ নিয়ে টুকটাক কথা বলেছিলাম আমরা ওনার সাথে। এদের সাথে কথা বললে বুঝা যায় এরা কতো স্মার্টভাবে একটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। টেকনিকাল এবং মার্কেটিং উভয় দিকে এদের দারুন দখল।

প্রায় আধঘন্টা-পৌণে একঘন্টা পর মুল বাড়ির সাথে সংলগ্ন অপর একটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন বিল গেটস। আর যায় কোথায়। এখানকার বেশির ভাগ ইন্টার্ণই বিশ-বাইশ বছর বয়সের। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো তাঁর উপর। ওনার চারদিকে তৈরি হয়ে গেলো বিশাল ভিড়। প্রথমে উনি ইন্টার্ণদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিলেন। ইন্টার্ণরা দুনিয়ার সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলো তাকে। অনেক্ষণ ওদের সাথে কাটিয়ে উনি ভিড় থেকে বের হয়ে একটু উঁচুমতো একটা যায়গায় গিয়ে মাইক এর মাধ্যমে সবাইকে স্বাগতম জানালেন। বললেন তাঁর স্বপ্নের কথা, পরিশ্রম করে মাইক্রোসফটকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার কথা। গুগলের কথা বললেন। ওরা যে সার্চএ ভালো করছে আর আমাদের জন্য যে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ সেটি বললেন। প্রায় মিনিট পনের মাইক্রোসফট সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন।

সেদিন অনেক কাছে থেকে ওনাকে দেখেছি আর কথা শুনেছি। মাইক্রোসফট এর ব্যাবসায়ীক পলিসি নিয়ে অনেকরকম মতামত থাকতে পারে, কিন্তু “সফটওয়ার শিল্প” বলতে আমরা যা বুঝি এটা প্রায় এককভাবে মাইক্রোসফট তথা বিল গেটস এবং তাঁর টিম প্রতিষ্ঠা করেন। বিল গেটস একজন চরম প্রতিভাবান ব্যক্তি। তার ব্যাবসায়ীক এবং প্রযুক্তিগত দুই দিকেই অভাবনীয় দখল। মানবতার প্রতিও তাঁর অনেক টান। সেজন্য এই বছর তিনি মাইক্রোসফট থেকে অবসর (পুরোপুরি নয়, কিন্তু উনি এখন মূলত উপদেষ্টা ধরণের ভূমিকায় আছেন) নিয়ে মনোনিবেশ করেছেন মানবসেবায়। তাঁর বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতব্য প্রতিষ্ঠান। অনেকে বলছেন বিল গেটস হয়তো একদিন শান্তির জন্য নোবেল প্রাইজ পাবেন তাঁর মানবতাবাদী কাজের জন্য। গতো বছর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর সমাবর্তন বক্তৃতার একটা মূল বিষয় ছিলো মানবসেবা।

বিল গেটস চাল-চলনে একেবারে সাধারণ। কেউই তাকে দেখে মনে করবে না কতো ক্ষমতাধর, কতো স্মার্ট উনি। সেদিন একটা সাধারণ জিন্স আর টিশার্ট পরে এসেছিলেন তিনি। তাঁর কথাবার্তা খুবই সহজসরল। এই বছর যেদিন তিনি মাইক্রোসফট থেকে বিদায় নেন, মঞ্চে সবার সামনে অনেকটা ঢুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তাঁকে দেখেই বুঝা যায়, তিনি বাইরে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতন হলেও ভেতরে তাঁর অগাধ জ্ঞান। এই সারল্য, বুদ্ধি, আর জ্ঞানের বলেই তিনি আজ মাইক্রোসফট এর মতো এক বিশাল কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।

খাওয়া-দাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি ঘুরে দেখেছিলাম বাড়িটি। চারদিকে সিকিউরিটির লোকজন ছিলো, তার উপর আমাদের বাড়ির ভেতরে যাবার অনুমতি ছিলো না। তাই বাইরে থেকে যতোটুকু দেখা যায় তাই দেখেছি। লেক এর পাশে বাড়ি হওয়ায় লেক এর উপর কাঠের পাটাতন ছিলো। সেখানে একটা বড় স্পীডবোট বাঁধা ছিলো। লেক এর অপর পাড়ে সিয়াটল শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিং এর আকাশরেখা দেখা যাচ্ছিলো। যতোদূর মনে পড়ে ওনার ব্যক্তিগত জিমনেশিয়ামটি দেখেছিলাম যেটি মূল বাড়ি থেকে বাইরে অবস্থিত। বাড়িটি আকারে বেশ বড়। অনেক টাকা খরচ করে বানানো। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়ি বলে কথা!

সব মিলিয়ে ঘন্টা দুই এর মতো থাকা হলো ওখানে। ফেরার সময় হয়ে এলো। ইন্টার্ণরা ধীরে ধীরে বের হওয়া শুরু করলো বাড়ি থেকে। এক সময় আমিও বের হলাম। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম আমার ভাগ্যের কাছে। এমনিতে আমার সৌভাগ্য জিনিসটা পাওয়া হয়ে উঠেনা কখনো। তাই এমন একটা সু্যোগ পেয়ে নিজেকে অনেক ধন্য মনে করেছি। তার উপর ওই বছরই ছিলো বিল গেটস এর শেষ ইন্টার্ণ ডিনার। এটাকে নির্দ্বিধায় বড় ধরণের সৌভাগ্য বলা যায়, কী বলেন?