বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কেনো আমাদের বারবার হতাশ করে কিংবা আমরা কেনো বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলতে পারিনা

work-harder

প্রতি বার বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন প্রচন্ড আশা জাগিয়ে আমাদের হতাশ করে – আমাদের বুকটা ভেঙ্গে যায় কষ্টে, আমরা অবাক হয়ে ভাবি কেনো সাকিব-তামিম-মুশফিকের মতো মেধাবী ক্রিকেটাররা আমাদের বারবার হতাশ করে!

এটা একবার নয়, বার বার ঘটছে।  এবং খুব একটা ভুল হওয়ার আশঙ্কা না করেও বলা যায় এটা অদূর ভবিষ্যতেও ঘটতে থাকবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল বাংলাদেশে আসে রীতিমতো ঝড় হয়ে। সারাদেশে কেউ যেন এড্রেনালিন হরমোন ঢেলে দেয় এই সময়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ কখনো এই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। আগামী কয়েক দশকে পারবে তেমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। আহা, বাংলাদেশ যদি মেসি-নেইমার-রোনাল্ডোদের সাথে বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলতে পারতো!

কিন্তু কেনো আমাদের ক্রিকেট এবং ফুটবলের এই দুরাবস্থা?

প্রিয় পাঠক, আপনি এ লেখাটি হয়তো পড়ছেন ঢাকায় বসে, কিংবা অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা-ইউরোপে বসে, কিংবা বাংলাদেশের অন্য যেকোনো জেলায় বসে। আপনি হয়তো একজন ছাত্র, কিংবা হয়তো একজন গৃহিনী, কিংবা একজন চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, কিংবা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক। হয়তোবা আপনি একজন কর্মহীন বেকার। আপনি হয়তো একজন সংস্কৃতিকর্মী – গায়ক, গায়িকা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, মডেল, চিত্রশীল্পি। হয়তো আপনি একজন সাংবাদিক, লেখক, বা ফটোগ্রাফার।

আমাদের অবস্থান যেখানেই হোক না কেনো, আমাদের পেশা যেটাই হোক না কেনো, দেশের ক্রিকেট এবং ফুটবল দল এর কাছে আমাদের সবারই চাওয়া একটা – বিশ্বের সেরা দলগুলোর সম-মানের পারফরম্যান্স! আমরা চাই আমাদের ক্রিকেট দল বীর বিক্রমে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মতো দলগুলোকে গুঁড়িয়ে দিক (আহা – সত্যিই যদি সেটি ওরা করতে পারতো!), আমাদের ফুটবল দল নিয়মিত বিশ্বকাপে যেয়ে বিশ্বসেরা দলগুলোকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করুক।

কিন্তু আমরা সবাই জানি সেটি কখনো ঘটেনা। আমাদের ক্রিকেট দল আমাদের নিয়মিত মন খারাপ করে দেয়, নিজ দেশের ফুটবলারদের পরিবর্তে আমরা মেসি-নেইমার-রোনাল্ডোদের নিয়ে মেতে উঠি। আমাদের ঘরে ঘরে উড়ে ব্রাজিল-আর্জেনটিনার পতাকা।

আমাদের ক্রিকেট বা ফুটবল দলের এই ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণ(গুলো) কী?

এই প্রশ্নের উত্তর আরেকটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।

প্রিয় পাঠক, আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর কারণ(গুলো) কী?

আপনার পেশা যাই হোক না কেনো আপনি সেটাতে কতোটুকু সফল, কতোটুকু তৃপ্ত? আপনার কাজ কতোটুকু বিশ্বমানের? আপনার পেশায় আপনি কি অস্ট্রেলিয়া-ইউরোপ-আমেরিকা-ভারতের একজনের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারবেন?

তামিম-সাকিব-মুশফিকরা আমার আপনার মতোই বাংলাদেশের আলো-বাতাস-পানি খেয়ে বড় হয়েছে, হচ্ছে। যে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিবেশ বাংলাদেশে বিরাজমান সেটাই তাদের কাজ করার ভিত্তি। আপনি খেলোয়াড়দের যতোই কোটি টাকা বেতন/স্পন্সরশিপ দেননা কেনো, যতো বড় বিদেশী কোচ দিয়ে প্রশিক্ষণ দেননা কেনো – দিনের শেষে তারা বাংলাদেশেই থাকে। তাদের বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিতজন সবাই বাংলাদেশী। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ এর মধ্য দিয়েই তাদের দিন কাটাতে হয়। এই পরিবেশ-পরিস্থিতি এর মধ্য দিয়ে আপনি অনেক চেষ্টা করে যতোটুকু সফল হতে পেরেছেন, আমাদের ক্রিকেটার ফুটবলাররাও ততোটুকুই হয়েছেন এবং হচ্ছেন।

আমরা উঠতে বসতে রাজনীতিবিদিদের গালি দিই – এটা সত্য তারা এর বেশিরভাগই ডিজার্ভ করে – কিন্তু রাজনীতিবিদরা কিন্তু আমাদের থেকেই উঠে আসা মানুষ। রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে আমাদের নিজেদের দিকে আগে তাকানো উচিৎ। আমরা কি আমাদের নিজেদের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করছি?

আমরা বাংলাদেশীরা দিনের একটা বড় সময় ব্যয় করি অন্যের সমালোচনা করতে। রাজনীতিবিদরা খারাপ, আওয়ামীলীগ খারাপ, বিএনপি খারাপ। সিভিল সোসাইটি ধান্দাবাজ, প্রথম আলো খারাপ, ডক্টর ইউনুস খারাপ। পুলিশ, সরকারী কর্মকর্তারা ঘুখখোর। ব্যবসায়ীরা মুনাফাখোর। এই লিস্টের শেষ নেই! (সমালোচনা নিয়ে কিছুদিন আগে একটা লিখেছিলামঃ http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29344027)

শেষ কবে কারো প্রশংসা করেছেন মনে আছে?

আমার মনে হয় আমাদের প্রশংসা করা শিখতে হবে আরো বেশি। প্রশংসা করার মানুষ খুব বেশি না খুঁজে পেলে একটা কাজ করুণঃ নিজে এমন একটা কিছু করূন যাতে মানুষ আপনার প্রশংসা করবে! মুশফিক-সাকিব-তামিমরা হতাশ করছে? নিজে একজন বিশ্বমানের ছাত্র, ছাত্রী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী, ব্যবসায়ী হয়ে যান। তখন সবাই প্রশংসা করার মতো, গর্ব করার মতো একজন নতুন মানুষ পাবে।

কে না চায় তার দেশের দল বিশ্বসেরা পারফরম্যান্স করুক। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা আমাদের ক্রিকেট দল থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা করে ফেলছি। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে – বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট, কিংবা অলিম্পিকে – সাফল্য পেতে হলে আমাদের দেশের ওভারঅল পারিবারিক, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে “প্রাণ” এর সঞ্চার করতে হবে। আমার মনে হয় আমাদের সবার জীবনে বড্ড বেশি “প্রাণ” এর অভাবঃ http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28989710

“প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষ কৌতুহলী হয়, আগ্রহী হয়, সবসময় কিছু একটা করতে চায়, যেকোনো জিনিসের ভালো দিকটা দেখে প্রথমে, নিজের ভুল/দোষ হলে সেটা স্বীকার নেয় সহজে, অন্যের সফলতা দেখে হিংসা করেনা, সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ায়না, অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে নিজেই এগিয়ে আসে যেকোনো কাজে, ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকেনা, এবং আশেপাশের সবার মধ্যে নিজের প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করে। একজন সফল মানুষ আরেকজন সফল মানুষকে হিংসা করবেনা। যে ছেলেগুলো হরতাল-বিক্ষোভ এর সময় নির্বিচারে অন্যের গাড়ি ভাংগে, সেই ছেলেগুলোর প্রত্যেকের একটা করে গাড়ি থাকলে ওরা কখনো এই কাজটি করতো না। অসফল মানুষ স্বভাবতই কিছুটা হীনমন্যতাবোধে ভোগে, এবং সুযোগ পেলেই তার দুঃখ-কষ্টের কারণ অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।”

ভালো ফুটবলার এবং ক্রিকেটার এর আগে আমাদের দরকার ষোল কোটি ভালো মানুষ, লক্ষ লক্ষ ভালো ছাত্র-ছাত্রী, হাজার হাজার ভালো শিক্ষক, দক্ষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, পরিচালক। আমাদের সমালোচনা করার এবং সমালোচনাকারী মানুষের অভাব নাই – কিন্তু আমাদের দরকার বেশি বেশি প্রশংসা করার এবং প্রশংসাকারী মানুষ। ব্লগ-ফেইসবুকে দুনিয়ার সবার সমালোচনা করে করে নিজের ওয়াল  এবং মানুষের নিউজ ফিড ভরিয়ে ফেলে নেগেটিভিটি ছাড়ানোর পাশাপাশি অন্যের প্রশংসা ছড়ান, নিজে ভালো কিছু করে অন্যকে আপনার প্রশংসা করার সুযোগ করে দিন।

যে দেশের সাধারণ মানুষ ভালো, ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষকগণ মেধাবী, সাধারণ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-সাংবাদিক-পুলিশ-সরকারী কর্মকর্তারা দক্ষ, শিল্পী-পরিচালকরা উঁচু মানের, সেই দেশের ক্রিকেটাররা যখন তখন ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দিতে পারে, আর সেই দেশের ফুটবল টিম প্রতি বিশ্বকাপে খেলতে পারবে – এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

elevator-success-stairs

অপরাজিত – ২

Boat_in_river,_Bangladesh

Image source: http://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/6/66/Boat_in_river%2C_Bangladesh.jpg

(বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর “অপরাজিত” উপন্যাস থেকে নেওয়া)

ইছামতী এই চঞ্চল জীবনধারার প্রতীক। ওর দু’পাড় ভরিয়া প্রতি চৈত্র বৈশাখে কত বনকুসুম, গাছপালা, পাখি-পাখালি, গাঁয়ে গাঁয়ে গ্রামের ঘাট – শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া কত ফুল ঝরিয়া পড়ে, কত পাখির দল আসে যায়, ধারে ধারে কত জেলেরা জাল ফেলে, তীরবর্তী গৃহস্তবাড়িতে হাসি-কান্নার লীলাখেলা হয়, কত গৃহস্ত আসে, কত গৃহস্ত যায় – কত হাসিমুখ শিশু মায়ের সঙ্গে নাহিতে নামে, আবার বৃদ্ধাবস্থায় তাহাদের নশ্বর দেহের রেণু কলস্বনা ইছামতীর স্রোতোজলে ভাসিয়া যায় – এমন কত মা, কত ছেলেমেয়ে, তরুণতরুণী মহাকালের বীথিপথে আসে যায় – অথচ নদী দেখায় শান্ত, স্নিগ্ধ, ঘরোয়া, নিরীহ…

আজকাল নির্জনে বসিলেই তাহার মনে হয়, এই পৃথিবীর একটা আধ্যাত্মিক রুপ আছে, এর ফুলফল, আলোছায়ার মধ্যে জন্মগ্রহণ করার দরুণ এবং শৈশব হইতে এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার দরুণ এর প্রকৃত রুপটি আমাদের চোখে পড়ে না। এ আমাদের দর্শন ও শ্রবণগ্রাহ্য জিনিসে গড়া হইলেও আমাদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও ঘোর রহস্যময়, এর প্রতি রেণু যে  অসীম জটিলতায় আচ্ছন্ন – যা কিনা মানুষের বুদ্ধি ও কল্পনার অতীত, এ সত্যটা হঠাৎ চোখে পড়ে না। যেমন সাহেব বন্ধুটি বলিত, “ভারতবর্ষের একটা রুপ আছে, সে তোমরা জান না। তোমরা এখানে জন্মেছ কিনা, অতি পরিচয়ের দোষে সে চোখ ফোটে নি তোমাদের।”

আকাশের রঙ আর এক রকম – দূরের সে গহন হিরাকসের সমুদ্র ঈষৎ কৃষ্ণাভ হইয়া উঠিয়াছে – তার তলায় সারা সবুজ মাঠটা, মাধবপুরের বাঁশবনটা কি অপূর্ব, অদ্ভুত, অপার্থিব ধরনের ছবি ফুটাইয়া তুলিয়াছে!… ও যেন পরিচিত পৃথিবীটা নয়, অন্য কোনো অজানা জগতের কোনো অজ্ঞাত দেবলোকের…

প্রকৃতির একটা যেন নিজস্ব ভাষা আছে। অপু দেখিয়াছে, কতদিন বক্রতোয়ার উপল-ছাওয়া-তটে শাল ঝাড়ের নিচে ঠিক দুপুরে বসিয়া – দূরে নীল আকাশের পটভূমিতে একটা পত্রশূন্য প্রকান্ড কি গাছ – সেদিকে চাহিলেই এমন সব কথা মনে আসিত যা অন্য সময় আসার কল্পনাও করিতে পারিত না – পাহাড়ের নিচে বনফলের জঙ্গলেরও একটা কি বলিবার ছিল যেন। এই ভাষাটা ছবির ভাষা – প্রকৃতি এই ছবির ভাষায় কথা বলেন – এখানেও সে দেখিল গাছপালায়, উইঢিপির পাশে শুকনো খড়ের ঝোপে, দূরের বাঁশবনের সারিতে – সেই সব কথাই বলে – সেই সব ভাবই মনে আনে। প্রকৃতির এই ছবির ভাষাটা সে বোঝে। তাই নির্জন মাঠে, প্রান্তরে, বনের ধারে একা বেড়াইয়া সে যত প্রেরণা পায় – যে পুলক অনুভব করে তা অপূর্ব – সত্যিকার Joy of Life – পায়ের তলার শুকনো লতা-কাটি, দেয়াড়ের চরে রাঙ্গা-রোদ-মাখানো কষাড় ঝোপ, আকন্দের বন, ঘেঁটুবন – তার আত্মাকে এরা ধ্যানের খোরাক যোগায়, এ যেন অদৃশ্য স্বাতী নক্ষত্রের বারি, তারই প্রাণ মুক্তার দানা বাঁধে।

সন্ধার পুরবী কি গৌরীরাগিণীর মতো বিষাদ-ভরা আনন্দ, নির্লিপ্ত ও নির্বিকার – বহুদূরের ওই নীল কৃষ্ণাভ মেঘরাশি, ঘন নীল, নিথর, গহন আকাশটা মনে যে ছবি আঁকে, যে চিন্তা যোগায়, তার গতি গোমুখী-গঙ্গার মতো অনন্তের দিকে, সে সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কথা বলে, মৃত্যুপারের দেশের কথা কয়, ভালবাসা-বেদনা-ভালবাসিয়া হারানো – বহুদূরের এক প্রীতিভরা পুনর্জন্মের বাণী…

এইসব শান্ত সন্ধ্যায় ইছামতীর তীরের মাঠে বসিলেই রক্তমেঘস্তুপ ও নীলাকাশের দিকে চাহিয়া চারিপাশের সেই অনন্ত বিশ্বের কথাই মনে পড়ে। মনে পড়ে বাল্যে এই কাঁটাভরা সাঁইবাবলার ছায়ায় বসিয়া মাছ ধরিতে ধরিতে সে দূর দেশের স্বপ্ন দেখিত – আজকাল চেতনা তাহার বাল্যের সে ক্ষুদ্র গন্ডি পার হইয়া ক্রমেই দূরে আলোকের পাখায় চলিয়াছে – এই ভাবিয়া এক এক সময় সে আনন্দ পায় – কোথাও না যাক – যে বিশ্বের সে একজন নাগরিক, তা ক্ষুদ্র, দীন বিশ্ব নয়। লক্ষ কোটি আলোক-বর্ষ যার গণনার মাপকাঠি, দিকে দিকে অন্ধকারে ডুবিয়া ডুবিয়া নক্ষত্রপুঞ্জ, নীহারিকাদের দেশ, অদৃশ্য ইথারের বিশ্ব যেখানে মানুষের চিন্তাতীত, কল্পনাতীত দূরত্বের ক্রমবর্ধমান পরিধিপানে বিস্তৃত – সেই বিশ্বে সে জন্মিয়াছে…

milky-way

ঐ অসীম শূন্য কত জীবলোকে ভরা – কি তাদের অদ্ভুত ইতিহাস! অজানা নদীতটে প্রণয়ীদের কত অশ্রুভরা আনন্দতীর্থ – সারা শূন্য ভরিয়া আনন্দস্পন্দনের মেলা – ইথারের নীল সমুদ্র বাহিয়া বহু দূরের বৃহত্তর বিশ্বের সে-সব জীবনধারার ঢেউ প্রাতে, দুপুরে, রাতে, নির্জনে একা বসিলেই তাহার মনের বেলায় আসিয়া লাগে – অসীম আনন্দ ও গভীর অনুভূতিতে মন ভরিয়া ওঠে – পরে সে বুঝিতে পারে শুধু প্রসারতার দিকে নয় – যদিও তা বিপুল ও অপরিমেয় – কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চেতনা-স্তরের আর একটা Dimension যেন তার মন খুঁজিয়া পায় – এই নিস্তব্দ শরত-দুপুর যখন অতীতকালের এমনি এক মধুর মুগ্ধ শৈশব-দুপুরের ছায়াপাতে স্নিগ্ধ ও করূণ হইয়া ওঠে তখনই সে বুঝিতে পারে চেতনার এ স্তর বাহিয়া সে বহুদূর যাইতে পারে – হয়তো কোনো অজ্ঞাত সৌন্দর্যময় রাজ্যে, দৈনন্দিন ঘটনার গতানুগতিক অনুভূতিরাজি ও একঘেয়ে মনোভাব যে রাজ্যের সন্ধান দিতে পারিতই না কোনোদিন…

নদীর ধারে আজিকার এই আসন্ন সন্ধ্যায় মৃত্যুর নব রুপ সে দেখিতে পাইল। মনে হইল, যুগে যুগে এ জন্মমৃত্যুচক্র কোন বিশাল-আত্মা দেবশিল্পীর হাতে আবর্তিত হইতেছে – তিনি জানেন কোন জীবনের পর কোন অবস্থার জীবনে আসিতে হয়, কখনো বা বৈষম্য – সবটা মিলিয়া অপূর্ব রসসৃষ্টি – বৃহত্তর জীবনসৃষ্টির আর্ট-

ছ’হাজার বছর আগে হয়তো সে জন্মিয়াছিল প্রাচীন ঈজিপ্টে – সেখানে নলখাগড়া প্যাপিরাসের বনে, নীলনদের রৌদ্রদীপ্ত তটে কোন দরিদ্র ঘরের মা বোন বাপ ভাই বন্ধুবান্ধবদের দলে কবে সে এক মধুর শৈশব কাটাইয়া গিয়াছে – আবার হয়তো জন্ম নিয়াছিল রাইন নদীর ধারে – কর্ক-ওক, বার্চ ও বীচবনের শ্যামল ছায়ায় বনেদি ঘরের প্রাচীন প্রাসাদে, মধ্যযুগের আড়ম্বরপূর্ণ আবহাওয়ায়, সুন্দরমুখ সখীদের দল। হাজার হাজার বছর পর হয়তো সে আবার ফিরিয়া আসিবে – তখন কি মনে পড়িবে এবারকার জীবনটা? – কিংবা কে জানে আর হয়তো এ পৃথিবীতে আসিবে না – ওই যে বটগাছের সারির মাথায় সন্ধ্যার ক্ষীণ প্রথম তারকাটি – ওদের জগতে অজানা জীবনধারার মধ্যে হয়তো এবার নবজন্ম! – কতবার যেন সে আসিয়াছে… জন্ম হইতে জন্মান্তরে, মৃত্যু হইতে মৃত্যুর মধ্য দিয়া… বহু দূর অতীতে ও ভবিষ্যতে বিস্তৃত সে পথটা যেন সে বেশ দেখিতে পাইল… কত নিশ্চিন্দিপুর, কত অপর্ণা, কত দুর্গা দিদি – জীবনের ও জন্মমৃত্যুর বীথিপথ বাহিয়া ক্লান্ত ও আনন্দিত আত্মার সে কি অপরুপ অভিযান… শুধু আনন্দে, যৌবনে, পুণ্যে ও দুঃখে, শোকে ও শান্তিতে…। এই সবটা লইয়া যে আসল বৃহত্তর জীবন – পৃথিবীর জীবনটুকু যার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র – তার স্বপ্ন যে শুধুই কল্পনাবিলাস, এ যে হয় তা কে জানে – বৃহত্তর জীবনচক্র কোন দেবতার হাতে আবর্তিত হয় তা কে জানে?… হয়তো এমন সব প্রাণী আছেন যাঁরা মানুষের মতো ছবিতে, উপন্যাসে, কবিতায় নিজেদের শিল্পসৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করেন না – তাঁরা এক এক বিশ্ব সৃষ্টি করেন – তার মানুষের সুঝে-দুঃখে উখথানে-পতনে আত্মপ্রকাশ করাই তাঁদের পদ্ধতি – কোন মহান বিবর্তনের জীব তাঁর অচিন্ত্যনীয় কলাকুশলতাকে গ্রহে গ্রহে নক্ষত্রে নক্ষত্রে এ-রকম রুপ দিয়াছেন – কে তাঁকে জানে?…

একটি অবর্ণনীয় আনন্দে, আশায়, অনুভূতিতে, রহস্যে মন ভরিয়া উঠিল। প্রাণবন্ত তার আশা, সে অমর ও অনন্ত জীবনের বাণী বনলতার রৌদ্রদগ্ধ শাখাপাত্রের তিক্ত গন্ধ আনে – নীলশূন্যে বালিহাঁসের সাঁই সাঁই রব শোনায়। সে জীবনের অধিকার হইতে তাহাকে কাহারো বঞ্চনা করিবার শক্তি নাই – তার মনে হইল সে দীন নয়, দুঃখী নয়, তুচ্ছ নয় – ওটুকু শেষ নয়, এখানে আরম্ভও নয়। সে জন্মজন্মান্তরের পথিক আত্মা, দূর হইতে কোন সুদূরের নিত্য নূতন পথহীন পথে তার গতি, এই বিপুল নীল আকাশ, অগণ্য জ্যোতির্লোক, সপ্তর্ষিমন্ডল, ছায়াপথ, বিশাল অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার জগৎ, বহির্ষদ পিতৃলোক, – এই শত সহস্র শতাব্দী, তার পায়ে-চলার পথ – তার ও সকলের মৃত্যুদ্বারা অস্পৃষ্ট সে বিরাট জীবনটা নিউটনের মহাসমুদ্রের মতো করলেই পুরোভাগে অক্ষুন্নভাবে বর্তমান – নিঃসীম সময় বাহিয়া সে গতি সারা মানব যুগে বাধাহীন হউক।…

অপু তাহাদের ঘাটের ধারে আসিল। ওইখানটিতে এমন এক সন্ধ্যার অন্ধকারে বনদেবী বিশালাক্ষী স্বরুপ চক্রবর্তীকে দেখা দিয়াছিলেন কতকাল আগে!

আজ যদি আবার তাহাকে দেখা দেন!

- তুমি কে?
– আমি অপু।
– তুমি বড় ভালো ছেলে। তুমি কি বর চাও?
– অন্য কিছু চাই নে, এ গাঁয়ের বনঝোপ, নদী, মাঠ, বাঁশবনের ছায়ায় অবোধ, উদ্গ্রীব,  স্বপ্নময় আমার সেই যে দশ বৎসর বয়সের শৈশবটি – তাকে আর একটি বার ফিরিয়ে দেবে দেবী? -

“You enter it by the Ancient way
Through Ivory Gate and Golden”

অপরাজিত…

Le-Meridien-Bora-Bora---Aerial
প্রথম জীবনের সে-সব মাধুরীভরা মুহূর্তগুলি যৌবনের কলকোলাহলে কোথায় মিলাইয়া গেল? কোথায় সে নীল আকাশ, মাঠ, আমের বউলের গন্ধভরা জ্যোৎস্নারাত্রি? পাখি আর ডাকে না, ফুল আর ফোটে না, আকাশ আর সবুজ মাঠের সঙ্গে মেশে না – ঘেঁটুফুলের ঝোপে ফোটা সদ্যফোটা ফুলের তেতো গন্ধ আর বাতাসকে তেতো করে না। জীবনে সে যে রোমান্সের স্বপ্ন দেখিয়াছিল – যে স্বপ্ন তাহাকে একদিন শত দুঃখের মধ্য দিয়া টানিয়া আনিয়াছে, তার সন্ধান তো কই এখনো মিলিল না? এ তো একরঙ্গা ছবির মতো বৈচিত্রহীন, কর্মব্যস্ত, একঘেয়ে জীবন – সারাদিন এখানে অফিসের বদ্ধ জীবন, রোকড়, খতিয়ান, মর্টগেজ, ইনকামট্যাক্সের কাগজের বোঝার মধ্যে পক্ককেশ প্রবীন ঝুনো সংসারাভিজ্ঞ ব্যক্তিগণের সঙ্গে সপিনা ধরানোর প্রকৃষ্ট উপায় সম্বন্ধে পরামর্শ করা, এটর্নিদের নামে বড় বড় চিঠি মুসাবিদা করা – সন্ধ্যায় পায়রার খোপের মতো অপরিষ্কার নোংরা বাসাবাড়িতে ফিরিয়াই তখনি আবার ছেলে পড়াইতে ছোটা।

অফিসে সে নানা স্থানের ভ্রমণকাহিনী পড়ে, ডেস্কের মধ্যে পুরিয়া রাখে। পুরোনো বইয়ের দোকান হইতে নানা দেশের ছবিওয়ালা বর্ণনাপূর্ণ বই কেনে – নানা দেশের রেলওয়ে বা স্টিমার কোম্পানি যে সব দেশে যাইতে সাধারণকে প্রলুব্ধ করিতেছে – কেহ বলিতেছে, হাওয়াই দ্বীপে এসো একবার – এখানকার নারকেল কুন্জে, ওয়াকিকির বালুময় সমুদ্রবেলায় জোৎস্নারাত্রে যদি তারাভিমুখী ঊর্মিমালার সঙ্গীত না শুনিয়া মর, তবে তোমার জীবন বৃথা।

এল পাশো দেখ নাই। দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়ার চুনাপাথরের পাহাড়ের ঢালুতে, শান্ত রাত্রির তারাভরা আকাশের তলে কম্বল বিছাইয়া একবারটি ঘুমাইয়া দেখিও।।। শীতের শেষে নুড়িভরা উঁচুনিচু প্রান্তরে কর্কশ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে দু-এক ধরণের মাত্র বসন্তের ফুল প্রথম ফুটিতে শুরু করে, তখন সেখানকার সোডা-আলকালির পলিমাটিপড়া রৌদ্রদীপ্ত মুক্ত তরুবলয়ের রহস্যময় রুপ – কিংবা ওয়ালোয়া হ্রদের তীরে উন্নত পাইন ও ডগলাস ফারের ঘন অরণ্য, হ্রদের স্বচ্ছ বরফগলা জলে তুষারকিরীট মাজামা আগ্নেয়গিরির প্রতিচ্ছায়ার কম্পন – উত্তর আমেরিকার ঘন, স্তব্দ্ধ, নির্জন অরণ্যভূমির নিয়ত পরিবর্তনশীল দৃশ্যরাজি, কর্কশ বন্ধুর পর্বতমালা, গম্ভীরনিনাদী জলপ্রপাত, ফেনিল পাহাড়ি নদীতীরে বিচরণশীল বলগা হরিণের দল, ভালুক, পাহাড়ি ছাগল, ভেড়ার দল, উষ্ন প্রস্রবণ, তুষারপ্রবাহ, পাহাড়ের ঢালুর গায়ের সিডার ও মেপল গাছের বনের মধ্যে বুনো ভ্যালোরিয়ান ও ভায়োলেট ফুলের বিচিত্র বর্ণসমাবেশ – দেখ নাই এসব? এস এস!

টাহিটি! টাহিটি! কোথায় কত দূরে, কোন জোৎস্নালোকিত রহস্যময় কূলহীন স্বপ্নসমুদ্রের পারে, শুভরাত্রে গভীর জলের তলায় যেখানে মুক্তার জন্ম হয়, সাগরগুহায় প্রবালের দল ফুটিয়া থাকে, কানে শুধু দূরশ্রুত সংগীতের মতো তাহাদের অপূর্ব আহবান ভাসিয়া আসে। অফিসের ডেস্কে বসিয়া এক-একদিন সে স্বপ্নে বিভোর হইয়া থাকে – এই সবের স্বপ্নে। এই রকম নির্জন স্থানে, যেখানে লোকালয় নাই, ঘন নারিকেল কুন্জের মধ্যে ছোট কুটিরে, খোলা জানালা দিয়া দূরের নীল সমুদ্র চোখে পড়িবে – তার ওপারে মরকতশ্যাম ছোট ছোট দ্বীপ, বিচিত্র পক্ষীরাজি, অজানা দেশের অজানা আকাশের তলে তারায় আলোয় উজ্জ্বল মাঠটা একটা রহস্যের বার্তা বহিয়া আনিবে – কুটিরের ধারে ফুটিয়া থাকিবে ছোট ছোট বনফুল – শুধু সে আর অপর্ণা।

(বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর “অপরাজিত” উপন্যাস থেকে নেওয়া)

Tagged , ,

ভালোবাসা

What-is-love

সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা একমুখী হয়, দ্বিমুখী নয়।

ভালোবাসা দেওয়ার জিনিস, নেওয়ার জিনিস নয়। আপনি যদি ভালোবাসা দেওয়ার চেয়ে ভালোবাসা পাওয়াতে বেশি সুখ পান, তাহলে আপনি এখনো ভালোবাসার গভীরে যেতে পারেননি। গভীর ভালোবেসে যে সুখ পাওয়া যায় তার সাথে প্রায় অন্য কোনো সুখের তুলনা চলেনা!

ভালোবাসার সাথে প্রত্যাশার (expectation) কোনো সম্পর্ক নাই। সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু ভালোবাসার মানুষটিকে সুখী করতে চায়, তার থেকে কোনো প্রতিদান আশা করে না। প্রত্যাশার চাপ আস্তে আস্তে ভালোবাসাকে মেরে ফেলে। আপনার ভালোবাসার মানুষটি আপনার প্রত্যাশা পূরণের মেশিন নয়।

সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে মুক্ত করে, বেঁধে ফেলে না। ভালোবাসা আফিমের মতো, লোহার শিকল নয়। আপনার ভালোবাসার মানুষ খুব সম্ভবত আপনার কাছে ফিরে আসবে যদি আপনি তাকে মুক্ত করে দেন। লোহার শিকল দিয়ে ভালোবাসার মানুষকে আটকে রাখার চেষ্টা করলে পাখি খাঁচা ভেঙ্গে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। শেকল পরানোর চেয়ে পাখিকে ভালোবাসার আফিম খাওয়ান বরং।

প্রেম হচ্ছে আকর্ষণ (শারীরিক এবং মানসিক) + ভালোবাসা + প্রত্যাশা। প্রেমের প্রথম দিকে এই তিনটির সবগুলোই মোটামুটি সমান পরিমাণে থাকে। ভঙ্গুর প্রেমে প্রত্যাশার পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে, আকর্ষণ এবং ভালোবাসা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। শ্বাশ্বত প্রেমে প্রত্যাশা প্রায় থাকেইনা, কিন্তু থাকে তীব্র ভালোবাসা; যদিও আকর্ষণ ধরে রাখাটা যেকোনো প্রেমেই কঠিন একটা কাজ। যেকোনো কিছুতে সময়ের সাথে সাথে আকুর্ষণ কমে যাওয়াটা খুব সম্ভবত মানুষের ডিএনএতে লেখা আছে। এ ব্যাপারে আমাদের খুব বেশি কিছু করার নাই।

বিয়ে হচ্ছে প্রেম + দায়িত্ব। স্বামী হিসেবে দায়িত্ব, স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব, জামাই হিসেবে দায়িত্ব, ঘরের বউ হিসেবে দায়িত্ব। সর্বোপরি পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব। যে সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের কাছ থেকে প্রত্যাশা সর্বনিম্ন সে সম্পর্ক সাধারণত বেশিদিন টিকে। ভঙ্গুর বৈবাহিক সম্পর্কে মানুষের আকর্ষণ এবং ভালোবাসা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, আর প্রত্যাশা আর দায়িত্ব আকশের কাছাকাছি চলে যায়। শ্বাশ্বত বৈবাহিক সম্পর্ক শ্বাশ্বত প্রেমের মতোই মূলত ভালোবাসা নির্ভর – প্রত্যাশা করার আগেই ভালোবাসা থেকে একে অপরকে সুখী করে ফেলে।

নিজে অসুখী হয়ে অন্যকে ভালোবেসে সুখী করা যায়না। কেউ আপনার জীবনে সুখ এনে দেবে ভেবে কারো সাথে প্রেমে জড়াবেন না। বরং আপনি কারো জীবনে সুখ এনে দেবেন ভেবে প্রেম করুন।

যেকোনো মানুষকে, যেকেনো বস্তুকে, এমনকি যেকোনো পশুকেও ভালোবাসা যায়। ভালোবাসলে যদি সুখ না পাওয়া যায় তাহলে সে ভালোবাসা গভীর ভালোবাসা না। দেশের কথা ভেবে যদি বুকের ভেতর সুখ-আবেগের মোচড় না উঠে তাহলে দেশকে আপনার আরো ভালোবাসতে হবে।

ভালোবাসা, প্রেম, আর অবসেশন – তিনটা ভিন্ন জিনিস। অবসেশন হচ্ছে কাউকে বা কোনো কিছুকে পাওয়ার জন্যে অযৌক্তিক রকম মরিয়া হয়ে উঠা। অবসেশনকে গভীর প্রেম বলে ভুল হতে পারে। অবসেশন মূলত ভালোবাসার মানুষের মাধ্যমে নিজেকে সুখী করার একটা চেষ্টা।

ভালোবাসার সাথে যৌনতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নাই। সেক্সের জন্যে ভালোবাসার চেয়ে আকর্ষণের বেশি দরকার। তবে আকর্ষণের সাথে ভালোবাসা যোগ হলে সেটা হয় সর্বোৎকৃষ্ট সেক্স। আকর্ষন ছাড়া শুধু ভালোবাসা দিয়ে যৌন জীবনে খুব বেশি সুখী হওয়া যায়না।

পুনশ্চঃ উপরের কথাগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত ভাবনা। এই ভাবনাগুলোর কোনোটি বা সবগুলো অন্য কারো ভাবনার সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে এটা আমি আশা করি না। আর সময়ের সাথে সাথে আমার নিজের ভাবনারও পরিবর্তন হতে পারে!

ডিম

(অ্যান্ডি উইয়ার এর লেখা “দি এগ” গল্পের বাংলা অনুবাদ। মূল রচনাঃ http://www.galactanet.com/oneoff/theegg_mod.html)

Chicken_egg

*image source: http://commons.wikimedia.org/wiki/File:Chicken_egg.png

যেদিন তুমি মারা গেলে সেদিন তুমি তোমার বাড়ি ফিরছিলে।

তুমি একটা কার দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলে। সাধারণ একটা দূর্ঘটনা, কিন্তু তোমার আঘাতটা মারাত্মক ছিলো। তুমি স্ত্রী এবং দুই সন্তান রেখে গিয়েছিলে। মৃত্যুর সময় তুমি খুব বেশি ব্যথা পাওনি। হাসপাতালের ডাক্তার এবং নার্সরা মিলে তোমাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বিশ্বাস করো – তোমার শরীর এমনভাবে ভেঙ্গে গিয়েছিলো যে তোমার জন্যে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাই ভালো হয়েছে।

এরপরই তোমার সাথে আমার দেখা হয়।

“কী… কী হয়েছে?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “আমি কোথায়?”
“তুমি মারা গিয়েছো,” আমি নিরাবেগভাবে বললাম। এটা কথা নিয়ে খেলার সময় ছিলোনা।
“একটা… একটা ট্রাক আসছিলো এবং সেটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এগিয়ে আসছিলো…”
“হ্যাঁ,” আমি বলেছিলাম।
“আমি… আমি মারা গিয়েছিলাম?”
“হ্যাঁ। কিন্তু এটা নিয়ে মন খারাপ কোরো না। সবাইকেই মরতে হয়,” আমি বলেছিলাম।

তুমি চারদিকে একবার চোখ বুলালে। চারদিকে ছিলো শুধু শুন্যতা। শুধু তুমি আর আমিই ছিলাম সেখানে। “এটা কোন জায়গা?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “এটাই কি মৃত্যুর পরের জীবন?”
“সেটা বলতে পারো,” আমি বলেছিলাম।
“তুমি কি ঈশ্বর?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে?
“হ্যাঁ,” আমি জবাব দিয়েছিলাম। “আমি ঈশ্বর।”
“আমার সন্তানরা… আমার স্ত্রী,” তুমি বলেছিলে।
“কেন, তাদের কী হয়েছে?”
“ওরা কি ভালো আছে? ওরা আমাকে ছাড়া ভালো থাকবে?”
“আমি এটাই দেখতে চেয়েছি,” আমি বলেছিলাম। “তুমি এই মাত্র মারা গেলে আর তোমার প্রথম চিন্তা হচ্ছে তোমার পরিবার নিয়ে। চমৎকার।”
তুমি খুশি হয়ে আমার দিকে তাকালে। তোমার কাছে আমাকে ঈশ্বর মনে হচ্ছিলো না। আমাকে একজন সাধারন মানুষ মনে হচ্ছিলো তোমার কাছে। হয়তো পুরুষ, কিংবা মহিলা। কোনো শক্তিশালী কেউ যাকে তুমি চেননা। কিংবা একজন স্কুল শিক্ষক, কিন্তু কোনোভাবেই ঈশ্বর নয়।
“চিন্তা কোরোনা,” আমি বলেছিলাম। “তারা ভালো থাকবে। তোমার সন্তানদের কাছে তুমি একজন চমৎকার মানুষ হয়ে থাকবে। তারা এখনো মানুষ হিসেবে তোমার দোষত্রুটি বুঝার মতো বড় হয়নি। তোমার স্ত্রী তোমার জন্যে অনেক কাঁদবে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে আসলে একটা বিশাল ভারমুক্ত হবে। সত্যি কথা বলতে কি – তোমাদের স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কটা আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়ছিলো। জানিনা এটা শুনে কি তুমি খুশি হবে কিনা – কিন্তু তোমার স্ত্রী ভারমুক্ত হবার কারণে নিজেকে দোষী ভাববে।”
“ওহ্‌,” তুমি বলেছিলে। “তাহলে এখন কী হবে আমার? আমি কি বেহেশতে যাবো নাকি দোজখে যাবো?”
“তুমি বেহেশত বা দোজখ এর কোনোটাতেই যাবা না,” আমি বলেছিলাম। “তোমাকে আবার জন্ম দেয়া হবে।”
“ওহ্‌,” তুমি বলেছিলে। “তাহলে হিন্দু ধর্মের কথাই ঠিক,”
“সব ধর্মই আসলে তাদের মতো করে সত্যি,” আমি বলেছিলাম। “হাঁটো আমার সাথে।”

তুমি আমার সাথে সাথে হাঁটতে শুরু করেছিলে। “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“বিশেষ কোথাও না,” আমি বলেছিলাম। “আমার হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে ভালো লাগে।”
“তাহলে ঘটনা কী দাঁড়ালো?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে। “আমি যদি আবার জন্ম নিই তাহলে সবকিছুই আবার শুন্য থেকে শুরু হবে? একটা নবজাতক শিশু হয়ে আমি জন্ম নিবো। অতএব আমার এই জীবনের সব অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য থাকবেনা।”
“সেটা ঠিক না,” আমি বলেছিলাম। “তোমার মধ্যে এই মুহুর্তে তোমার অতীত সব জীবনের অর্জিত সব জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা আছে। শুধু তুমি এই মুহুর্তে সেগুলো মনে করতে পারছোনা।”
আমি হাঁটা থামিয়ে তোমার কাঁধে হাত রাখলাম। “তোমার আত্মা আসলে তোমার কল্পনার চাইতেও অনেক বড়, সুন্দর, এবং মহান। মানুষের মন আসলে তার সম্পূর্ণ সত্ত্বার একটা ক্ষুদ্র অংশ ধারণ করতে পারে। এটা অনেকটা একটা গ্লাসে একটা আঙ্গুল রেখে দেখার মতো যে গ্লাসের পানি ঠান্ডা না গরম। তুমি তোমার একটা ক্ষুদ্র অংশ সেখানে ছোঁয়াও, এবং এরপর যখন তুমি সেটা বের করে আনো এর সবকিছু ততক্ষনে তুমি জেনে যাও।
গতো ৪৮ বছর ধরে একজন মানুষের জীবন যাপন করছো কিন্তু তুমি এখনো তোমার অস্তিত্বের একটা বড় অংশ দেখতে পাওনি। আমরা যদি এখানে দীর্ঘ সময় ধরে থাকি, তাহলে তুমি আস্তে আস্তে সব মনে করতে পারবা। কিন্তু তোমার বিভিন্ন জীবনের মাঝখানে এটা করার কোনো মানে হয়না।”
“আমাকে কতোবার জন্ম দেওয়া হয়েছে?”
“অনেক বার। অসংখ্য বার। একেক বার একে ধরণের জীবন তোমাকে দেয়া হয়েছে।” আমি বলেছিলাম। “এবার তোমাকে ৫৪০ খ্রিস্টাব্দের এক চীনা কৃষক মেয়ে হিসেবে জন্ম দেওয়া হবে।”
“দাঁড়াও, কী বললে?” তুমি তোতলাতে তোতলাতে বলেছিলে। “তুমি আমাকে সুদূর অতীতে পাঠিয়ে দিচ্ছো?”
“টেকনিকালি সেটা তুমি বলতে পারো। তোমরা যেটাকে সময় বলো সেটা শুধু তোমাদের জগতেই আছে। আমি যেখান থেকে আসছি সেখানে সময়ের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।”
“তুমি কোথা থেকে আসছো?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে।
“আমি কোনো এক জায়গা থেকে আসছি। অন্য কোনো জায়গা থেকে। এবং আমার মতো আরো অনেকে আছে। আমি জানি তোমার জানতে ইচ্ছা করবে আমাদের জায়গাটা কেমন কিন্তু বিশ্বাস করো তুমি সেটা বুঝবেনা।”
“ওহ্‌,” একটু মন খারাপ করে তুমি বলেছিলে। “কিন্তু… আমি যদি বিভিন্ন সময়ে এভাবে জন্ম নিয়ে থাকি তাহলে হয়তো এক সময় আমার নিজের সাথে আমার দেখা হয়েছে?”
“অবশ্যই। এটা প্রায়ই ঘটে থাকে। কিন্তু যেহেতু তোমার সেই জীবনগুলো প্রত্যেকে নিজের জীবনকাল এর বাইরে কিছু জানেনা তারা জানেওনা যে তারা আসলে একই ব্যক্তি।”
“কিন্তু এসব কিছুর মানে কী?”
“হাহা, তুমি আমাকে জীবনের মানের কথা জিজ্ঞেস করছো?” আমি বলেছিলাম। “সবাই কি জানতে চায়না তাদের জীবনের মানে কী? উদ্দেশ্য কী?”
“কিন্তু এটা একটা খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন,” তুমি তোমার প্রশ্নে অনড় থাকলে।
আমি তোমার চোখের দিকে তাকালাম। “জীবনের মানে হচ্ছে, এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে তুমি পরিণত একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারো।”
“তুমি বলতে চাচ্ছো মানবজাতির কথা? তুমি চাও পুরো মানবজাতি পরিণত হোক, বুদ্ধিমান হয়ে উঠুক?”
“না, শুধুমাত্র তুমি। আমি এই পুরো বিশ্বজগৎ শুধুমাত্র তোমার জন্যে বানিয়েছি। একেকটা জীবন পার হওয়ার পর তুমি আরো পরিণত হয়ে উঠো, আরো বুদ্ধিমান, এবং প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠো।”
“কেবল আমি? বাকি সবার কী হোলো?”
“আর কেউ বাকি নাই,” আমি বলেছিলাম। “এই বিশ্বজগতে আছি শুধু আমি আর তুমি।”
তুমি হতবুদ্ধের মতো আমার দিকে তাকালে। “কিন্তু পৃথিবীর আর সব মানুষ…”
“তারা সবাই আসলে তুমি। তোমার ভিন্ন ভিন্ন জন্ম।”
“দাঁড়াও… পৃথিবীর সবাই আসলে আমি?”
“এইতো তুমি বুঝতে পারছো,” আমি বলেছিলাম তোমার পিঠ চাপড়ে।
“পৃথিবীতে যতো মানুষ জন্ম নিয়েছে তারা সবাই আমি?”
“এবং ভবিষ্যতে যারা নিবে তারাও…”
“আমি আব্রাহাম লিংকন?”
“এবং তুমিই তার আততায়ী জন ওয়াইলক্স বুথ,” আমি যোগ করেছিলাম।
“আমি হিটলার?” তুমি অবিশ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলে।
“এবং তুমিই সেই লক্ষ লক্ষ মানুষ যাদেরকে হিটলার মেরেছিলো।”
“আমি যিশু খ্রিস্ট?”
“এবং তুমিই তার সব অনুসারী খ্রিস্টান মানুষ।”

তুমি কথা হারিয়ে ফেলেছিলে। “যতোবার তুমি কাউকে আঘাত করেছো তুমি আসলে নিজেকেই নিজে আঘাত করেছো। মানুষের প্রতি দেখানো তোমার সব ভালোবাসা আসলে তুমি তোমার প্রতিই দেখিয়েছো। পৃথিবীতে জন্ম নেয়া প্রতিটি মানুষের সব সুখ আর দুঃখের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এক সময় তুমিও যাবে।”
তুমি দীর্ঘ সময় নিয়ে ভাবলে।
“কেনো?” তুমি জিজ্ঞেস করলে। “এসব কিছু করার কী দরকার ছিলো?”
“কারণ – একদিন তুমি আমার মতো হয়ে যাবে। সেটাই তোমার আসল পরিচয়। তুমি আমাদেরই দলের। তুমি আমার সন্তান।”
“কী বললে?” তুমি চরম অবিশ্বাস নিয়ে তাকালে। “তুমি বলছো আমি ঈশ্বর?”
“না, এখনো না। তুমি এখনো একটা ভ্রূণ। সে ভ্রূণ এখনো বড় হচ্ছো। যখন তুমি সব কালের সব মানব জন্ম পার করবে, তখন তোমার জন্ম নেয়ার সময় হবে।”
“তাহলে এই পুরো বিশ্বজগৎ,” তুমি বলেছিলে, “এটা শুধু…”
“একটা ডিম।” আমি বলেছিলাম। “এখন তোমার পরবর্তী জীবন শুরু করার সময় হয়েছে।”

এবং এরপর আমি তোমাকে তোমার গন্তব্যের পথে পাঠিয়ে দিলাম।

রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে না তাকিয়ে যেভাবে বাংলাদেশকে উন্নত করা যায়

shahbag_candlevigil

 

শাহবাগের যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলন এর মাধ্যমে মানুষের দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের জন্যে কিছু করার ইচ্ছা দেখে আমি অভিভূত।

রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই থাকুক না কেনো সবাই মোটামুটি একটা জায়গায় এসে একমত – বাংলাদেশকে একটা সমৃদ্ধ, আধুনিক, চমৎকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই সবাই। জামাত-শিবির এবং তাদের মতো জঙ্গি দলগুলো চাইবে আমাদেরকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো বানিয়ে ফেলতে। কিন্তু আমরা চাইলেই তাদের প্রায় চোখের সামনে দিয়ে আমাদের দেশটাকে একটা উন্নত এবং আধুনিক দেশে পরিণত করে ফেলতে পারি। এমনকি আওয়ামীলীগ এবং বিএনপিও যদি আমাদের বিরুদ্ধে যায় তবু আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারি!

বাংলাদেশকে উন্নত করতে চাইলে আমাদেরকে -আমাকে এবং আপনাকে – অংশ নিতে হবে এই কাজে। দেশের প্রতি ভালোবাসার জন্যে একদিনের মধ্যে যদি শাহবাগ লক্ষ মানুষের জনসমুদ্রে পরিণত হতে পারে তাহলে এই লক্ষ মানুষই পারবে দেশকে বদলে দিতে। এটা কোনো গোপন ব্যাপার নয় যে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি ক্ষমতার যাওয়ার ব্যাপারে যতোটুকু আগ্রহী হবে দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখানোতে ততোটা আগ্রহী তারা হবে না। জামাত-শিবির এবং জঙ্গি দলগুলো ব্যস্ত দেশটাকে মধ্য যুগে ফিরিয়ে নেওয়াতে। জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র দলগুলো ব্যস্ত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বড় দলগুলোর ভাড়া খাটায়। এই অবস্থায় দেশটাকে উন্নত করার, সমৃদ্ধ করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আসলে আমাদের সাধারণ মানুষের হাতে, ছাত্র-শিক্ষক-চাকুরিজীবি-ব্যবসায়ী-শ্রমজীবি মানুষের হাতে।

মনে হতে পারে আমরা একটা তৃতীয় রাজনৈতিক দল তৈরি করতে পারি। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির মতো দলের শেকড় বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। একদিন হঠাৎ করে আমরা একটা রাজনৈতিক দল করবো আর মানুষ দলে দলে আমাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাবে সেটি হবার নয়! অনেক অনেক দিন (কয়েক দশক!) ধরে চেষ্টা করলে হয়তো একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যাবে কিন্তু সেটাও নিশ্চিত নয়, এবং এই দীর্ঘ সময়ে আসলে আমরা দেশের জন্যে অনেক বেশি কিছু করে ফেলতে পারতাম। সবচেয়ে বড় কথাঃ আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে একটা সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে পরিণত করা, ক্ষমতায় যাওয়া নয়!

তাহলে কিভাবে আমরা খুব সহজে রাজনৈতিক দলগুলোর নাকের ডগা দিয়ে আমাদের দেশটাকে একটা সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে পরিণত করতে পারবো?

বাংলাদেশকে একটা চমৎকার এবং সুখী দেশে পরিণত করতে হলে আমাদেরকে বাংলাদেশের মানুষগুলোর প্রত্যেককে একেকজন চমৎকার এবং সুখী মানুষে পরিণত করতে হবে! বাংলাদেশ মানে যতোটা না ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটা ব-দ্বীপ তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ষোল কোটি মানুষ। একটা দেশকে সঙ্গায়িত করে তার মানুষেরা। আমাদেরকে ক্ষমতায় কে আছে সেটা না ভেবে নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের এবং কাছের মানুষদের চমৎকার মানুষে পরিণত করতে হবে। দেশের জন্যে কিছু করার এই পদ্ধতির নাম আমি দিয়েছি “মুহম্মদ জাফর ইকবাল মডেল”। জাফর ইকবাল স্যার যেমন কোনো ব্যক্তিগত লোভ বা স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে, কোনো দলের দিকে না তাকিয়ে, “একজন মাহাথির” এর অপেক্ষায় না থেকে একেবারে নিজে থেকে নিজের মতো করে দেশের জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন – নিজের বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করে যাচ্ছেন, দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে উদ্দীপ্ত করে যাচ্ছেন – আমাদেরকে সেভাবেই কোনো স্বপ্নের দল বা ব্যক্তির অপেক্ষা না করে দেশের জন্যে কাজ করে যেতে হবে। প্রত্যেকে নিজের অবস্থানে থেকে কাজ করে গেলে বাংলাদেশকে একটা উন্নত দেশের পরিণত করতে খুব বেশি সময় লাগবেনা। শুধু দেশকে নিয়ে স্বপ্নটাকে জিইয়ে রাখতে হবে, কখনো হতাশ হলে চলবেনা, নিজের নাম কামাইয়ের কথা ভুলে যেতে হবে, ফেইসবুকে কয়টা লাইক পেলাম সেটার কথা ভুলে কাজ করে যেতে হবে।

দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চাইলে আমাদের প্রথমে তিনটা মূল জিনিস নিয়ে কাজ করতে হবেঃ নিজেকে এবং আশে পাশের সবাইকে একটা চমৎকার বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, মানুষের মনে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আনার জন্যে কাজ করতে হবে, এবং দেশের মানুষের শারীরীক এবং মানসিক স্বাস্থের জন্যে কাজ করতে হবে।

আসুন দেখি এই তিনটা জিনিস কিভাবে আমাদের দেশের চেহারা বদলে দিতে পারে। কিভাবে জামাত-শিবির এর মতো জঙ্গি দল এবং তাদের মদদ-দাতা দলগুলোর চোখের সামনে দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে তাদেরকে অস্তিত্বশুন্য করে দিতে পারি কোনো রকম সহিংসতা ছাড়াই।

একটা চমৎকার বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষাঃ

রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ধর্ম নিয়ে আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের কারো মধ্যে কোনো দ্বিমত নাই। মধ্যাকর্ষণ নিয়ে সবাই একমত, কার-বাস-ট্রাক চলার প্রযুক্তি নিয়ে সবাই একমত, রাস্তা বানানোর ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়েও সবাই একমত। বিজ্ঞানে কোনো হাঙ্কি-ফাঙ্কি নাই। সবকিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই এরপর কোনো কিছুকে নিশ্চিত বলে ঘোষনা করা হয়। তাই বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলে কিংবা মানুষ বিজ্ঞান মনষ্ক হলে মানুষের চিন্তা ভাবনা অনেক যৌক্তিক হয়। কোনো কিছু ভালো করে যাচাই বাছাই না করে মানুষ তখন আর বিশ্বাস করে না। বগুড়ার যে মানুষগুলো সাইদিকে চাঁদে দেখা গিয়েছে বলে রাতের বেলা ঘুম থেকে উঠে ছুটে যেয়ে থানা আক্রমণ করতে গিয়েছে তারা বিজ্ঞান মনষ্ক হলে কোনোদিন সাইদিকে চাঁদে দেখতো না। বিজ্ঞান মনষ্ক মানুষকে সাইদি তার ওয়াজ-মাহফিলে বেহেশতের টিকেট দিতে পারবেনা। মানুষ যখন ক্রিটিকাল থিঙ্কিং করে তখন কোনো গুজবে তাকে বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা যাতে আধুনিক বিজ্ঞান-ভিত্তিক হয় সে ব্যাপারে আমাদের কাজ করতে হবে। বিশ্বজগতের বিবর্তন, জীবজগতের বিবর্তন, পৃথিবীর জন্মের পর থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন বছরের বিবর্তন, মানুষের গুহা মানব থেকে উঠে এসে আজকের এই অবস্থায় আসার ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটা মুখস্ত-নির্ভর পরীক্ষার ব্যবস্থা থেকে উদ্ধার করে মস্তিষ্ককে ব্যবহার করার ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। মানুষ তার মস্তিস্কের ক্ষমতার এক ক্ষুদ্রাংশ ব্যবহার করে; আমাদেরকে মস্তিস্কের সেই ব্যবহৃত অংশের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যে কাজ করতে হবে।

এটা ঠিক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার যদি তার দায়িত্ব ঠিকভাবে না করে (ইচ্ছা এবং/অথবা যোগ্যতার অভাবে) – যেটার সম্ভাবনাই বেশি – তাহলে আমাদেরকে আমাদের মতো করে কাজ করে যেতে হবে। শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সাইদ স্যার কয়েক দশক ধরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র দিয়ে আমাদের আলোকিত করার কাজ করে যাচ্ছেন; জাফর ইকবাল স্যার, মুনীর হাসান ভাই আর তাদের সাথে শত শত তরুণ তরুণী গণিত, ভাষা, বিজ্ঞান, এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে; রাগীব হাসানের শিক্ষক ডট কম বিনামূল্যে দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স। এগুলো হচ্ছে যেগুলোর খবর আমরা জানি। আমাদের জানার বাইরে কতো অসংখ্য মানুষ তাদের মতো করে শিক্ষা বা শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বই লিখে, পত্র-পত্রিকায় লিখে, ব্লগ লিখে, কিংবা কনফারেন্স-সেমিনার-বক্তৃতা আয়োজন করেও অনেকে দেশের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। সবকিছুর উপরে, সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বাবা-মা’রা। অন্যদের জন্যে কী করছেন সেটি যতোটা না গুরুত্মপূর্ণ তার চেয়ে গুরুত্মপূর্ণ হচ্ছে নিজের ছেলেমেয়েদের একটা চমৎকার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। স্কুল-কলেজে তারা যাই শিখুক না কেনো আপনি আপনার সন্তানকে একজন মানবিকতাবোধসম্পন্ন, বিজ্ঞান মনস্ক, যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। চিন্তা করে দেখুন বাংলাদেশের সব বাবা-মা যদি তাদের সন্তানদের একজন চমৎকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে তাহলে বাংলাদেশ কতো সহজে একটা আধুনিক এবং উন্নত দেশে পরিণত হতে পারে?

মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাঃ

আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভূমিকায় আছে এই কথাগুলোঃ

“We hold these truths to be self-evident, that all men are created equal, that they are endowed by their Creator with certain unalienable Rights, that among these are Life, Liberty and the pursuit of Happiness.”

অর্থাৎ – “আমরা এই সত্যগুলিকে স্বতসিদ্ধ বলে জানিঃ সকল মানুষ সমান অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়; এবং সবাই সৃষ্টিকর্তা হতে কিছু অধিকার জন্মগতভাবে পায় যার মধ্যে আছে বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাধীনভাবে জীবন ধারণের অধিকার, এবং নিজের জীবনে সুখী হওয়ার অধিকার”।

সেই ১৭৭৬ সাল থেকে আমেরিকার শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হচ্ছে এই কথাগুলো। সব মানুষ সমান। কেউ কারো থেকে বড় বা ছোট নয়। আইন সবার জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য। খেটে খাওয়া শ্রমিক থেকে শুরু করে বিলিওনেয়ার শিল্পপতি সবার আইনের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে সমান।

আমাদের বাংলাদেশে আমরা ছোটকাল থেকে শিখি “বড়দের সম্মান করো”, “গুরুজনকে মান্য করো”, “শিক্ষকদের সম্মান করো”, “তোমার বসকে সম্মান করো”, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের কখনোই শেখানো হয়নি যে *সব* মানুষকে সম্মান করো, শ্রদ্ধা করো, ভালোবাসো! ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; খেটে খাওয়া রিকশাওয়ালাকে শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; কঠোর পরিশ্রম করা গার্মেন্টস কর্মীদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; ঘরের কাজ করার মানুষগুলোকে শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়; আপনি অফিসের বড় কর্তা হলেও আপনার অধস্তনদের শ্রদ্ধা করা যায়, ভালোবাসা যায়। কার পকেটে বা ব্যাংকে কতো টাকা আছে কিংবা কে কতো চমৎকার বাসায় থাকে, বা কে কতো দামী জামা-কাপড় পরে এগুলো মনে না রেখে মানুষের সাথে মিশলে আমি কী হনুরে অসুখ থেকে বাঁচা যায়।

যে কারণেই হোক আমাদের সমাজে সব মানুষকে সমান করে দেখার অবস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি। প্রাচীন মুসলমান সমাজে ছিলো আশরাফ-আতরাফ ভেদাভেদ, হিন্দু সমাজে ছিলো বর্ণ সমস্যা। “সম্ভ্রান্ত বংশ” বলে একটা চরম অমানবিক শ্রেণী প্রথা এখনো চালু আছে আমাদের সমাজে।

শুধু দেশ দিয়ে নয়, সারা পৃথিবীর জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য – পৃথিবীর সকল মানুষ সমান! আমার দেশ পৃথিবীর সেরা দেশ সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি, কোনো পরম মানদন্ডে সেটি সত্যি নয়। তেমনিভাবে আমার ধর্ম পৃথিবীর সেরা ধর্ম সেটাও আমার একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতি, কোনো পরম মানদন্ডে সেটি সত্যি নয়। পৃথিবীর প্রতি এক’শ জন মানুষের মধ্যে প্রায় দুইজন আমার দেশের মানুষ, প্রতি এক’শ জন মানুষের মধ্যে প্রায় একুশ জন আমার ধর্মের মানুষ, তাই আমার দেশ বা আমার ধর্ম পৃথিবীর সবার দেশ বা ধর্মের উপরে এই ধরণের চিন্তা করা মানে পৃথিবীর একটা বড় অংশের মানুষকে আমার থেকে ছোট করা হয় (আসলে তো নিজেকেই নিজে ছোট করা হয়)!

জন্মস্থানের কারণে, ধর্মের কারণে, বংশের কারণে, গায়ের রঙ এর কারণে, পেশা’র কারণে কাউকে নিজের থেকে ছোট ভাবার মতো অমানবিক আর কিছুই হতে পারে না!

আমাদের সবার মাঝে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে কাজ করতে হবে। এই শিক্ষা সবার আগে শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যদি দেখে তাদের বাবা-মা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে, কিংবা ঘরের কাজ করার মানুষকে নির্যাতন করছে, অসম্মান করছে, তাহলে সেই ছোট ছেলেমেয়েগুলো বড় হয়ে নিজেরাও তাই করবে। বাবা-মা’র উচিৎ ছেলেমেয়েদের মধ্যে সব ধরণের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসাবোধ তৈরি করে দেওয়া।

একজন মানুষ তখনই দেশের জন্যে কিছু করতে উদবুদ্ধ হবে যখন তার মধ্যে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকবে। কেউ দেশের জন্যে কিছু করতে চায় – এই কথাটার মানে হচ্ছে সে দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চায়! তাই দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি করার পুর্বশর্ত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মানুষকে ভালোবাসে এমন মানুষ তৈরি করা!

একটা সুস্থ এবং শক্ত শরীর (এবং মন):

আমাদের দেশে সব সময় অবহেলিত একটা বিষয় হচ্ছে সুস্বাস্থ্য। পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব হচ্ছে শরীর এর মাধ্যমে অথচ আমাদের বড় হয়ে উঠার মধ্যে শরীর নিয়ে কোনো শিক্ষা বা প্রচার একেবারে নাই বললেই চলে! আমার শরীর যে একটা খুবই গুরুত্মপূর্ণ জিনিস এবং আমার যে এই শরীরকে অনেক যত্ন নেওয়া উচিৎ, অনেক শক্ত করে তোলা উচিৎ এটা আমাকে খুব বেশি কখনো বলা হয়নি। শরীরের প্রতি যত্ন ব্যাপারটা “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল” ভাবসম্প্রসারণ এর মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে আমাদের জীবনে।

শরীর যে একটা গুরুত্মপূর্ণ জিনিস এটা আমি সত্যিকারভাবে বুঝতে পারি বিদেশে পড়তে আসার পর। এখানে বেশিরভাগ মানুষেরই চমৎকার স্বাস্থ্য, রাস্তায় বেরুলেই মানুষজনকে সকাল বিকেল দৌড়াতে দেখি, জিমে গেলে দেখা যায় সবাই শরীরকে শক্ত করার জন্য নানা ব্যায়াম করছে। এখানে সত্তর-আশি বছরের মানুষকে একা একা নিজের এবং ঘরের কাজ করতে দেখি যেখানে আমাদের দেশে ষাট এর পর বেশির ভাগ মানুষ এটা সেটা নানা অসুখ-বিসুখে কুপোকাত হয়ে পড়ে।

এখানে সব হাই স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সব ধরণের খেলাধুলার দল আছে এবং সেই স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই অলিম্পিকে যেয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পদক জিতে আসে। আমাদের বাংলাদেশে আমরা কয়জন ছেলেমেয়ে নিয়মিত খেলাধুলা করে বড় হয়েছি? আমরা কয়জন নিয়মিত ব্যায়াম করি?

আমাদের দেশের মানুষজনের শরীরের দিকে তাকালেই আমাদের শরীরের দৈন্য দেখা যায়, অযত্নের ছাপ দেখা যায়। বাংলা সিনেমা দেখলে হয়তো মনে হতে পারে আমরা অনেক স্বাস্থ্যবান কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা আসলে উলটা। আমাদের ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগই বয়স ত্রিশ পেরুতে না পেরুতেই নধর একটা ভুড়ি গজিয়ে ফেলে। কেউ কেউ ভুড়ি না গজিয়ে শীর্ণকায় হয়। ব্যাপারটা নিয়ে মজা করা যায় কিন্তু এটা আমাদের শরীরের প্রতি অযত্ন আর অবহেলার প্রমাণ দেয়।

শরীরের সাথে মনের সম্পর্ক খুব নিবিড়। শরীর যদি দুর্বল হয়, চর্বির ভারে পেট যদি গড়িয়ে পড়ে তাহলে সেই শরীরে একটা চমৎকার মন থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই শরীরের একটা বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিস্ক থাকাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। শরীরের প্রতি অযত্নের কারণে মানুষ আগে আগে বুড়িয়ে যায় এবং আমাদের মতো একটা গরীব দেশের জন্যে তখন অনেক বেশি অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে হয়। আমরা যদি আমাদের শরীরের যত্ন নিই, যদি একটা শক্তিশালী শরীর এবং ব্রেইন ধরে রাখতে পারি তাহলে বেশি বুড়ো হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অনেক বেশি দিন নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে, দেশের জন্যে কাজ করে যেতে পারি!

আমাদেরকে দেশের মানুষকে শরীর ভালো রাখার, শক্ত রাখার গুরুত্ম বোঝাতে হবে। রেডিও-টিভি, পত্র-পত্রিকায় এটা নিয়ে বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। যারা স্বাস্থ্য-পুষ্টি-মেডিক্যাল বিষয়ে জানেন তাদের এটা নিয়ে লেখালেখি করতে হবে, রেডিও-টিভিতে যেয়ে বলতে হবে।

একটা শক্ত শরীরের মানুষ একটা শক্ত মনের অধিকারী হয়। তখন সে জীবনে চ্যালেঞ্জ নিতে কম ভয় পায়, বেশি ঝুঁকি নিতে পারে, বেশি পরিশ্রম করতে পারে, নিজের ব্যররথতার জন্যে অন্যকে বা ভাগ্যকে দোষ দেয় না, নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজে নিয়ে নেয়, লটারি জেতার আশায় বসে থাকে না, মানুষের দোষ ত্রুটি খঁজে বেড়ায় না।

শেষ কথাঃ

দেশের উন্নয়ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আলাদা কোর্স আছে, এমনকি অনার্স-মাস্টার্স-পিএইচডি করার বিষয় পর্যন্ত আছে। আমি উন্নয়ন বিষয়ক পন্ডিত নই, কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্যে আমাদের বাংলাদেশের মানুষের পেছনে বিনিয়োগ করতে হবে সবার আগে। যাদের দ্বারা আমরা স্বপ্ন দেখি, যাদের জন্যে আমরা স্বপ্ন দেখি, তাদেরকে উন্নত হওয়ার জন্যে আগে প্রস্তুত করতে হবে। এরপর এটা একটা পজেটিভ ফিডব্যাক লুপের মতো নিজেকে নিজে টেনে নিয়ে যাবেঃ একদল চমৎকার মানুষ আরেক দল চমৎকার মানুষ তৈরি করবে, তারা সবাই মিলে আরো চমৎকার মানুষ তৈরি করবে, এবং এভাবে এক সময় বাংলাদেশের বেশির মানুষ একেকজন স্বপ্নের মানুষে পরিণত হবে!

আর সেটি হবে তখন আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ!

যে দু’টো জিনিস আপনার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে

sky

ছোটকালে পেপারে একটা বিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখতাম, একজন জ্যোতিষের বিজ্ঞাপন – প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে ঝামেলা, স্বামী-স্ত্রীতে অমিল, মানসিক সমস্যা, কর্মস্থলে সমস্যা, যাদু-টোনা, রোগ-বালাই, জমিজমা নিয়ে ঝামেলা, মামলা-মোকদ্দমা, ইত্যাদি যেকোনো সমস্যা সেই জ্যোতিষ সাহেব সমাধান করে দিতে পারতেন। তিনি ঠিক কিভাবে সেটি করতেন সেটা জানা হয়নি কোনোদিন, কিন্তু সারাজীবন এই “প্যানাসিয়া”‘র সন্ধান করে এসেছি। যে জিনিসটি সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে সেটিকে ইংরেজীতে প্যানাসিয়া বলা হয়। প্যানাসিয়া আসলে গ্রীক পুরাণের একজন দেবীর নাম। দেবী প্যানাসিয়া একধরণের তরল পদার্থ খাইয়ে মানুষের যাবতীয় অসুখ-বিসুখ ভালো করে দিতে পারতেন!

তো সেই প্যানাসিয়ার সন্ধান পাওয়া হয়ে উঠেনি এখনও। কিন্তু পুরো পৃথিবী এখনও ব্যস্ত আছে কিভাবে মানুষের জীবনে আরো সুখ আনা যায়, আরো সাফল্য আনা যায়, রোগ-বালাইকে কিভাবে আরো দূরে রাখা যায়, ব্যক্তি এবং জাতি হিসেবে কিভাবে আরো উন্নতি করা যায়, ইত্যাদি নিয়ে।

আমি সারাজীবন নিজেকে নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট করেছি। নানা ধরণের “প্যানাসিয়া”‘ ট্রাই করেছি। নিজের জীবনের সব এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে যখন ভাবতে বসেছি তখন অনেকগুলো এক্সপেরিমেন্টকে মোটামুটি সফল মনে হয়েছে। সফল এক্সপেরিমেন্টগুলোর মধ্যে দু’টোকে আমার প্রায় প্যানাসিয়া’র কাছাকাছি পর্যায়ের বলে মনে হয়েছে। এই দু’টো জিনিস হচ্ছে – ১। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা, ২। ব্যায়াম। শুধুমাত্র এই দু’টো জিনিস অনুসরণ করে জীবনের অসংখ্য সমস্যার সমাধান করা যায়। আমি নিজে এটা করেছি – আপনিও ট্রাই করে দেখুননা!

মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা

মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার ব্যাপারটাকে পুরনো দিনের নীতিকথা মনে হতে পারে। কিন্তু এই পৃথিবীর প্রায় সাতশ কোটি মানুষের পুরো সভ্যতা টিকে আছে মূলত মানুষে মানুষে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার কারণে। একটু সময় নিয়ে নিজেকে নিয়ে একটু ভাবুন। মানুষকে কতোটুকু ভালোবাসেন আপনি? কতোটুকু শ্রদ্ধা করেন? আপনার স্বার্থ বা দরকারের উর্ধে উঠে মানুষকে ভালোবাসতে পারেন? আপনার ব্যক্তিগত চিন্তার সাথে বিপরীত বা সাংঘর্ষিক চিন্তার মানুষগুলোকে কতোটুকু শ্রদ্ধা করেন আপনি? কতোটুকু ভালোবাসেন?

আপনি রিকশায় করে যাওয়ার সময় একটা কার যদি বিপজ্জনকভাবে আপনার রিকশা’র পাশ দিয়ে চলে যায় বা রাস্তার গর্তে জমে থাকা পানি ছিটিয়ে দেয় আপনার গায়ে তখন কি আপনি দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ওই গাড়ির মালিকের মুন্ডুপাত করেন? সে ধনী হয়েছে বলে কি তাকে অভিসম্পাত করেন? কিংবা আপনি গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো রিকশার কারণে যদি আটকে যান বা রিকশার চাকা থেকে আপনার গাড়িতে আঁচড় লাগে তখন কি ছোটলোকের বাচ্চা বলে ওই রিকশাওয়ালাকে গালি দেন?

পৃথিবীতে প্রায় সাতশ কোটি মানুষ আছে। এবং মানুষ হচ্ছে প্রচন্ড সমাজবদ্ধ জীব। আমরা এতোটাই একসাথে থাকি যে একাকীত্মকে প্রায় একটা সমস্যা হিসেবে দেখি আমরা। তো যে সমাজ ছাড়া আমরা থাকতে পারিনা সেই সমাজের প্রধান উপাদানই হচ্ছে মানুষে মানুষে ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া মানুষ বেশিদিন বাঁচতে পারেনা।

তাই বলে কি পৃথিবীতে ঘৃণার অস্তিত্ত্ব নাই? হিটলারকে ঘৃণা করা কি দোষের কিছু? স্বাধীনতার সময় আমাদের বাংলাদেশীদের হত্যাকারী, খুনী ধর্ষক পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের ঘৃণা করা অপরাধ?

না, ঘৃণা করা অপরাধ নয় কোনো। ঘৃণাও ভালোবাসার মতো একটা মানবীয় গুন। কিন্তু ভালোবাসা দেওয়া এবং নেওয়া দুটোতেই সুখ আছে, আনন্দ আছে। আর ঘৃণা করা এবং ঘৃণিত হওয়া দু’টোই কষ্টের ব্যাপার। শুধু শুধু কাউকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু শুধু শুধু ঘৃণা করা যায়না!

আমাদের বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে শ্রদ্ধা ব্যাপারটা শুধু মুরুব্বি কিংবা সামাজিক/রাষ্ট্রীয় উঁচু পদে থাকা মানুষকে দেখানো হয়। শ্রদ্ধা যখন এইভাবে একমুখী হয় তখন সেটা আসলে আর শ্রদ্ধা থাকেনা, সেটা আসলে ভয় হয়ে যায়। আপনার বস কিংবা কোনো মন্ত্রীকে আপনি যে শ্রদ্ধা দেখাচ্ছেন সেও যদি আপনাকে মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা না করে তাহলে এটা হচ্ছে একধরণের শাসক এবং শোষক সম্পর্ক, শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সম্পর্ক নয়। একইভাবে আপনি শুধু আপনার থেকে বয়সে বড় মানুষকে শ্রদ্ধা করেন কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চাদের যখন তখন ধমক মারেন তাহলে সেটাও সত্যিকারের শ্রদ্ধা নয়। ছোট ছেলেমেয়েরাও মানুষ এবং তারাও আমাদের শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য!

শ্রদ্ধা-ভালোবাসা দেখানোর ক্ষেত্রে আপনার ব্যক্তিগত মতামত বা স্বার্থ সামনে এসে দাঁড়ালে সেই শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় খাদ থেকে যাবে। আপনি কোনো রাজনৈতিক দলকে দেখতে পারেননা, তাই বলে সেই রাজনৈতিক দল এবং তার কর্মী-সমর্থকদের দিনরাত গালাগাল করবেন? হাসিনা-খালেদাকে দেখতে পারেননা অতএব তাদেরকে প্রতিদিন দশবার গালাগাল করবেন? বাংলা সিনেমার কোনো নায়ক-নায়িকাকে পছন্দ করেন না, তাই তদের নিয়ে যাচ্ছেতাই বলবেন? রাস্তায়, মার্কেটে, বা অফিসে মেয়েরা আপনার মনমতো জামাকাপড় পরবেনা তাই ওদেরকে কটুক্তি করবেন?

আপনার কি মনে হয় আপনার চারদিকে সবাই স্বার্থপর? সবাই শুধু নিজের ধান্ধায় ঘুরে? সবাই নির্বোধ? বিএনপি খারাপ, আওয়ামী লীগ খারাপ? আমেরিকা খারাপ, ভারত খারাপ, পাকিস্তান খারাপ? বুদ্ধিজীবিরা সব  দালাল? পত্রিকাগুলা সব কর্পোরেট ধান্দাবাজ? বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নাই, এই দেশকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, দেশটা চোর-বাটপারে ভরে গেছে? আপনার ফেইসবুকের প্রতিদিনের স্ট্যাটাসে শুধুই মানুষের দুর্বলতা, দেশের দুর্বলতাগুলো উঠে আসে? আপনার কি শুধু মনে হয় সবকিছু ভেঙ্গে পড়ছে, সবকিছু নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছে? চারদিকের এই স্বার্থপর, নষ্ট-ভ্রষ্ট মানুষগুলোকে ভালোবাসতে এবং শ্রদ্ধা করতে কষ্ট হয় আপনার?

যদি চারদিকের পৃথিবীকে এতো স্বার্থপর, ভঙ্গুর, দুর্বল, এবং খারাপ মনে হয় তাহলে একবার ভালো করে নিজের দিকে তাকান। নিজের কথা ভাবুন। আপনি নিজে কতোটা স্বার্থহীন, কতোটা শক্ত, কতোটা ভালো? ভঙ্গুর সিস্টেম এর জন্যে আপনি কী করেছেন? আপনি ছাত্র/ছাত্রী হলে কতোটুকু ভালো ছাত্র/ছাত্রী? আপনি চাকুরিজীবি হলে আপনার চাকুরিতে আপনি কতোটুকু দক্ষ? আপনি শিক্ষক হলে কতোটুকু ভালো শিক্ষক?

আমি দেখেছি যারা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মানুষকে ভালোবাসে তারা সাধারণত ব্যক্তিজীবনে বেশি সুখী হয়। শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা খুবই সুখকর অনুভূতিদায়ক জিনিস, তাই কারো প্রতি যখন শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা প্রদর্শন করবেন তখন সেটা আপনার মনে সুখানুভূতি দিয়ে ভরিয়ে তুলবে। চিন্তা করে দেখুন প্রতিদিন কতো মানুষের সংস্পর্শে আসি আমরা। এই মানুষগুলোর সবার প্রতি যদি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা দেখান তাহলে আপনার দিনটা কতো চমৎকার হবে ভেবে দেখেছেন?

ব্যায়াম

পৃথিবীতে যদি কোনো ওষুধ না থাকতো তাহলে শুধুমাত্র ব্যায়াম দিয়েই আমরা আমাদের অর্ধেকেরও বেশি অসুখ সারিয়ে ফেলতে পারতাম।

দশ হাজার বছর আগ পর্যন্তও মানুষ ছিলো শিকারী। মানুষের শরীর বসে থাকার মতো করে বিবর্তিত হয়নি। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা আমাদেরকে ঘর এবং অফিসবন্দী করে ফেলেছে। খাবার এর প্রয়োজনে আমাদের এখন আর বের হতে হয়না। আমাদের অফিসের দৈনন্দিন কাজ আমরা শরীর দিয়ে না করে ব্রেইন দিয়ে করি। ফলশ্রুতিতে আমাদের শরীরের অংগ-প্রতংগগুলি ঠিকভাবে বেড়ে উঠে না। নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম যেভাবে আপনাকে সাহায্য করেঃ

- ওজন নিয়ন্ত্রণঃ নিয়মিত ব্যায়াম করলে আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। খাবার থেকে শরীর যে ক্যালরি পায় সেটি ব্যবহার না করলে সেটা চর্বিতে রুপান্তরিত হয়ে যায় এবং শরীরকে মোটা করে ফেলে।
– অসুখ-বিসুখকে দূরে রাখাঃ ব্যায়াম করলে আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম ভালো থাকে, তাই ব্যাক্টেরিয়া-ভাইরাস সহজে আক্রমণ করতে পারেনা।  ব্যায়াম হার্ট এর পেশিগুলোকে শক্ত করে তোলে, দরকারী কোলেস্টরেল বাড়িয়ে দেয় আর ক্ষতিকারক কোলেস্টরেল কমিয়ে দেয়, শরীরে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে।
– মনকে চাঙ্গা করেঃ ব্যায়ামের সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ অবদান সম্ভবত এটা মনকে চাঙ্গা করে তোলে। আমাদের ভালো মুড এর জন্যে যে নিউরোট্রান্সমিটারগুলো দায়ী, ব্যায়াম করার সময় সেই নিউরোট্রান্সমিটারগুলো ব্রেইনে নিঃসৃত হয় আমাদের মন প্রফুল্ল হয়ে উঠে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে দেখবেন আপনার মন সবসময় ভালো থাকে, মানুষের প্রতি আপনার ভালোবাসা বেড়ে যাবে, বিশ্বাস বেড়ে যাবে!
– ব্যায়ামের ফলে আমাদের শরীর এবং মন শক্ত হয়ে উঠে। শরীরের মাংসপেশীগুলো শক্ত হয়, আমাদের হার্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, আমরা মনের শক্তি ব্যবহার করে শারীরিক দুর্বলতা-অক্ষমতাকে অতিক্রম করি।

ব্যায়াম আমাদের মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অবস্থাকে প্রতিফলিত করে। বেঁচে থাকার জন্যে আমাদের খেতে হয়। আর খেতে হলে আমাদের খাবার এর ব্যবস্থা করতে হয়, খাবার প্রস্তুত করতে হয়। আমাদের যতোই আলস্য লাগুক না কেনো খাবার সংগ্রহ এবং প্রস্তুত এর প্রক্রিয়ার নধ্য দিয়ে আমাদের যেতেই হয়। কিন্তু খাবার খেয়ে ফেলার পর আমাদের শরীর তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি পায় এবং কর্মক্ষম হয় উঠে। ব্যায়ামের ব্যাপারটিও ঠিক তেমনি। আমাদের শরীরকে (এবং মনকে) সুস্থ রাখতে ব্যামের দরকার। ব্যায়াম করতে হয়তো আলস্য লাগতে পারে, কিন্তু একবার ব্যায়াম করে ফেলার পর আমাদের শরীর মন চাঙ্গা হয়ে উঠে!

আমি জানি ব্যায়াম যতোই ভালো জিনিস হোকনা কেন আলস্যের কারণে আমাদের বেশিরভাগেরই ব্যায়াম করা হয়ে উঠেনা। কিভাবে আলস্যকে কাটিয়ে ব্যায়াম এর অভ্যাস করা যায় সেটা নিয়ে ভবিষ্যতে একটা পোস্ট দিবো কিন্তু আপাতত শুধু দু’টো পরামর্শ দিয়ে রাখিঃ

১। যেকোনো জিনিস শুরু করাটা হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন। প্যারাশুট নিয়ে প্লেইন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার মতো, ঝাঁপ দিয়ে দিলে আর কোনো সমস্যা নাই কিন্তু ঝাঁপ দেওয়াতেই যতো ভয় এবং অনীহা। তায় ব্যায়াম করার সিদ্ধান্ত নিলে জাস্ট শুরু করে দিন। ভালো না লাগলেও শুরু করুণ। কষ্ট লাগলেও শুরু করুণ। মনে করুণ এটা একটা ওষুধ – তেতো কিন্তু আপনার কোনো ভয়ংকর অসুখ ভালো করে দিবে। কয়েক সপ্তাহ কষ্ট করে করতে থাকলে দেখবেন পরের দিকে আর তেমন সমস্যা হচ্ছে না অভ্যাসটা ধরে রাখতে।

২। অল্প অল্প করে শুরু করুণ। এই টেকনিকটার নাম হচ্ছে কাইজেন। ব্যায়াম করতে ভালো না লাগলে প্রথমদিন শুধু ২ মিনিট ব্যায়াম করুণ। হ্যাঁ, জাস্ট ২ মিনিট। এরপর প্রতিদিন ১ মিনিট করে বাড়ান। এক মাসের মাথায় দেখবেন আপনি আধ ঘন্টা করে ব্যায়াম করছেন প্রতিবারে!

ব্যায়ামের উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবেনা। আশা করি শুধু ব্যায়াম নিয়ে ভবিষ্যতে একটা লেখা লিখবো।

ব্যায়াম আমার নিজের জীবনকে অনেক বদলে দিয়েছে, আমি নিশ্চিত আপনার জীবনকেও বদলে দিতে পারে ব্যায়াম।

ব্যায়াম নিয়ে দু’টো সাইট যেগুলো আমি নিয়মিত অনুসরণ করিঃ নার্ড ফিটনেস, ব্লগ অফ ইম্পসিবল থিংস। ব্লগগুলি নিয়মিত পড়ুন, দেখবেন ব্যায়াম নিয়ে, নিজের শরীর এবং মন নিয়ে আপনার অনেক চিন্তাভাবনা বদলে যাবে!

জীবনে সুখী হতে হলে, সফল হতে হলে আসলে আরো অনেক কিছু দরকার, কিন্তু একটা চমৎকার মন এবং চমৎকার শরীর না থাকলে সুখ আর সাফল্য কখনোই আসবেনা। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আপনাকে একটা চমৎকার মন দিবে আর নিয়মিত ব্যায়াম দিবে একটা চমৎকার শরীর।

আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও

Ivy_League_Logo-Large
১। বিশ্বজিত

চব্বিশ বছর বয়সী বিশ্বজিতকে ছাত্রলীগের ছেলেরা রড-চাপাতি-ছুরি দিয়ে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে।  চব্বিশ বছর বয়সে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। চব্বিশ বছর বয়সে আমার মনে ছিলো পাহাড় সমান স্বপ্ন। বিশ্বজিত আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়নি। দারিদ্র্যের কারণে ক্লাস নাইনের পর পড়ালেখায় ক্ষান্ত দিয়েছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত বিশ্বজিতেরও আমার মতো পাহাড় সমান স্বপ্ন ছিলো। ওই বয়সে কার না স্বপ্ন থাকে? অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন, চমৎকার একটা মেয়ের সাথে জীবন কাটানোর স্বপ্ন, নিজের পরিবারের জন্যে কিছু করার স্বপ্ন, সম্ভব হলে দেশের জন্যে কিছু করার স্বপ্ন – সব মিলিয়ে একটা অর্থপূর্ণ জীবন যাপনের স্বপ্ন।

২। আমন্ত্রণ টেইলার্স

বিশ্বজিত ছয় বছর ধরে দর্জির দোকান “আমন্ত্রণ টেইলার্স” গড়ে তুলেছিলেন। বিশ্বজিতদের তো দর্জি বা এরকম কিছুই হতে হয়। বিশ্বজিত যদি দর্জি না হতো তাহলে হয়তো রিকশা চালাতো। কিংবা হতে হতো বাসের নিরীহ যাত্রী। কিংবা কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে আসা কোনো এক সাধারণ তরুণ। বিশ্বজিতের বাবা তো আর কোটিপতি রাজনীতিবিদ নয়। কোটিপতি আমলা কিংবা সামরিক অফিসারও নয়। কিংবা নয় ধনী ব্যবসায়ী। এমন না যে কোটিপতি হওয়াটা কোনো অপরাধ। কিন্তু বিশ্বজিতের বাবা কোটিপতি হতে পারবেনা। কোটিপতির ছেলে দর্জি হয়না। কোটিপতির ছেলে রিকশাওয়ালা হয়না। কোটিপতির ছেলে অবরোধের মধ্য দিয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক এর সামনে দিয়ে হেঁটে শাঁখারীবাজার এর দর্জি দোকানে একজন কাস্টমার ধরার জন্যে সকাল নয়টার সময় ঘর থেকে বের হয়না। কোটিপতির ছেলে আমেরিকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। কিংবা পড়ালেখা শেষ করে আমেরিকাতেই বড় অংকের চাকরি করে। এমন না যে আমেরিকায় থাকা কোনো অপরাধ। কিন্তু বিশ্বজিতরা আমেরিকায় থাকেনা। বিশ্বজিতদের থাকতে হয় লক্ষ্মীবাজারের ঋষিকেশ দাস রোডে।

বিশ্বজিতরা বারিধারায় থাকেনা, বনানীতে থাকেনা, ধানমন্ডিতেও নয়। বিশ্বজিতরা থাকে টঙ্গিতে কিংবা যাত্রাবাড়ি পার হয়ে ঢাকার কোনো এক কোণে। বিশ্বজিতরা মুড়ির টিন মার্কা বাস এর হ্যান্ডলে ঝুলে ঝুলে কাজ করতে যায়। হরতাল অবরোধের সময় বিশ্বজিতদের বাসে আগুন লাগানো একটা ফরজ কাজ। যাদের দিয়ে আগুন লাগানো হয় তাদের নামও হয় বিশ্বজিত। কিংবা নাহিদ। অথবা শাকিল।

৩। বারিধারা, বোস্টন, বা ভার্জিনিয়া

বারিধারা বা ডিওএইচএস বা বনানীতে বিশ্বজিতরা থাকেনা। বিশ্বজিতের খুনী নাহিদ, শাকিলরাও থাকেনা সেখানে। কিন্তু তাদেরকে যারা খুন করে কিংবা খুনীতে পরিণত করে তারা সেখানে থাকে। আর তাদের সন্তানরা থাকে বোস্টনে, কিংবা ভার্জিনিয়ায়। কিংবা লন্ডনে। কেউ কি কখনো আমাদের রাজনীতিবিদদের, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের, ব্যবসায়ীদের, বুদ্ধিজীবিদের,  কিংবা তাদের সন্তানদের দর্জি হতে দেখেছে? কেউ কি তাদের সন্তানদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেখেছে? তাদের সন্তানদের হাতে কোনোদিন চাপাতি, রড, ছুরি, রামদা দেখেছে কেউ? কেউ কি দেখেছে আমাদের নীতিনির্ধারকদের কোনো সন্তানকে তারই বয়সী কয়েকজন ছাত্র ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলছে? ভার্জিনিয়া-নিউ ইয়র্ক-বোস্টন এর আই-৯৫ হাইওয়েতে হাই স্পিডে চলতে থাকা এসইউভির ভেতরে হাই ভলিউমে যখন এই কর্তাব্যক্তিদের সন্তানরা গান শুনছে ঠিক সেই সময় তাদেরই সমবয়সী নাহিদ, শাকিলরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারছে বিশ্বজিতদের। বিশ্বজিতের শরীর থেকে ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়া রক্তের সাথে আমেরিকার দশ লেইনের রাস্তায় ড্রাইভ করতে থাকা কিংবা নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের কোনো ফার্মে কাজ করা সন্তানদের রক্তের পার্থক্য কতোটুকু?

৪। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি

দেশের কর্তাব্যক্তি যারা – রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবি – তাদের যাদের সন্তানরা বিদেশে পড়ালেখা করছে বা করেছে তারা দয়া করে একটু নিজের সন্তানদের জিজ্ঞেস করে দেখুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঠিক কী করা হয়। ব্যাপারটা হয়তো আপনাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, কিন্তু এটাই সত্যিঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করা হয়! সারপ্রাইজ! একটা ছেলে বা মেয়ে আঠারো/উনিশ বছর বয়সে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তার পছন্দের বিষয় বা বিষয়গুলোতে শিক্ষা লাভ করে, গবেষণা করে। পাশাপাশি সে খেলাধুলা করে, গান-কবিতা-অভিনয় ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কাজে জড়িত হয়, সুযোগ পেলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কোথাও কাজ করে, কেউ বা ক্লাব-সঙ্গগঠন করে নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা অর্জন করে। কোনো সভ্য দেশের সভ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাড়াটে মাস্তান হয়ে বিশ-একুশ বছরের ছেলেমেয়েরা রামদা-চাপাতি হাতে খুনাখুনি করেনা!

ছাত্রছাত্রীদের রাজনীতি নিয়ে কথা উঠলেই অবধারিতভাবে কয়েকটা জিনিস বলা হবেই! প্রথমটি হচ্ছেঃ ছাত্ররাজনীতি না থাকলে আমরা বায়ান্ন, একাত্তর, নব্বই এর মতো অধিকার আদায় এর আন্দোলন কিভাবে করবো? এর মানে কি পৃথিবীর যাবতীয় অধিকার আদায় এর উত্তর হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি? পৃথিবীর গতো কয়েক হাজারের ইতিহাসে সব অধিকার আদায় হয়েছে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে? আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেখানেই যতো সমস্যা হয়েছে সব অনাচার অবিচার বন্ধ করা হয়েছে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে?  হাই স্কুল, প্রাইমারী স্কুলেও কি আমরা রাজনীতি চালু করে দিবো যাতে ওরাও আমাদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করতে পারে? আমি বাংলাদেশের দুইটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছি, এর প্রায় কোনো সময়ই কোনো ছাত্র সঙ্গঠনকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করতে দেখিনি। সব সময় সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাই নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্যে আন্দোলন করেছে। এই আন্দোলন এর জন্যে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কোনো রাজনৈতিক অং সঙ্গগঠন এর সদস্য হতে হয়নি। উলটা ছাত্রলীগ/ছাত্রদল/ছাত্র শিবির সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর  নির্মমভাবে অত্যাচার করেছে। নব্বই এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন এর পর বাইশ বছর পার হয়েছে। এই বাইশ বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর হয়ে মাস্তানি-গুন্ডামি করা ছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলো আর কোনো ভালো করেছে? এমনকি ২০০৬-২০০৮ সালের মিলিটারি-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনও সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাই করেছে!

দ্বিতীয় আরেকটি কথা বলা হয় ছাত্ররাজনীতি না থাকলে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হবে কিভাবে? আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি ছাত্রলীগের শাকিল, নাহিদ এর মতো খুনী ছেলেরা আমাদের দেশের ভবিষ্যত নেতা হবে? যে দেশের অনেক বর্ষীয়ান নেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আমাদের মনে শঙ্কা জাগায় সেই দেশের পড়ালেখা না করা, সন্ত্রাস করে দিন পার করে দেওয়া ছেলেমেয়েরা আমাদের ভবিষ্যত নেতা হবে? এরচেয়ে ভালো করে লেখাপড়া করা, সত্যিকারের স্মার্ট, ট্যালেন্টেড ছেলেমেয়েরাই কি ভালো নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা?

আর কারো যদি রাজনীতি করার ইচ্ছা থাকে তাহলে সে ক্যাম্পাসের বাইরে যেয়ে মূল দলের সাথে রাজনীতি করুক। রাজনীতি করা একটা সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। কোনো ছাত্র বা ছাত্রীর যদি রাজনীতি না করলে ভালো লাগেনা, সে তো যে কোনো সময় যেয়ে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারে। কিন্তু সেটা করবে ক্যাম্পাসের বাইরে যেয়ে, মূল দলের সাথে। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় শুধুই পড়ালেখা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কাজকর্ম, আর স্বপ্ন দেখার জায়গা!

৫। আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও

আজ থেকে প্রায় পনের বছরেরও বেশি সময় আগে শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিবিদ নামক সন্ত্রাসীদের তান্ডব দেখে “আমাদের ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দাও” শিরোনামে একটি হৃদয়-স্পর্শী লেখা লিখেছিলেন। স্যার তখন সবে দীর্ঘ আঠারো বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে দেশে ফিরেছেন, বিশ-একুশ বছরের ছেলেমেয়েদের তিনি দেখে এসেছেন ক্যাম্পাসে এসে পড়ালেখা করছে, গবেষণা করছে, সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান করছে, খেলাধুলা করছে। রামদা-চাপাতি-কাটা রাইফেল হাতে একে অপরকে নির্দয়ভাবে আক্রমণ করার ব্যাপারটি তখনও তাঁর কাছে নতুন ছিলো। যে বয়সে এই ছেলেগুলোর জীবনকে পূর্ণ উদ্দ্যমে উপভোগ করার কথা, নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করার কথা, ভবিষ্যত রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন নতুন অর্থনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে দিনভর যুক্তি-তর্ক-আলোচনা করার কথা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করার কথা, খেলাধূলা করে অলিম্পিকের সোনা জেতার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা – সেই স্বর্ণ সময়ে এই ছেলেগুলো চাপাতি-রড-রাইফেল নিয়ে তাদেরই সমবয়সী আরেক দল ছেলেকে পশুর মতো পিটিয়ে মারছে – এই হাহাকার করা কথাগুলোই উঠে এসেছিলো জাফর স্যারের সেই লেখায়। কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা জানি, জাফর স্যারের এই হাহাকার আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিদের একবিন্দু স্পর্শ করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে স্বপ্ন দেখার এবং সে স্বপ্ন পূরণের জন্যে কাজ করার জায়গা। আমেরিকায় আসার পর আমি আমেরিকার অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়েছি। যখনি কোনো নতুন জায়গায় গিয়েছি, আমি সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঘুরে বেড়িয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লনের সবুজ ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে আমি সদ্য কৈশোর পার হওয়া ছেলেমেয়েদের উচ্ছাস আর উল্লাস দেখি। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদ-সামরিক বেসামরিক আমলা-ব্যবসায়ী-বুদ্ধিজীবির সন্তানরা পড়ালেখা করে। মনে মনে ভাবি আচ্ছা বিশ্বজিত যদি এখানে পড়তে পারতো? বিশ্বজিত এখানে পড়লে সেদিন বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে দিয়ে না যেয়ে হেঁটে যেতো ভার্জিনিয়ার কোনো সাজানো পার্কে, কিংবা ডিনার করতো বোস্টনের কোনো চমৎকার রেস্টুরেন্টে, কিংবা দেখতে যেতো সান ফ্রান্সিস্কো গোল্ডেন গেইট ব্রিজ!

খুনী ছাত্রনেতা শাকিল আর নাহিদ – আহা, ওরা যদি পড়তে আসতো কোনো আইভি লিগ ইউনিভার্সিটিতে? চাপাতির বদলে শাকিল হয়তো নতুন কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতো, নাহিদ হয়তো স্ট্রিং থিওরির উপর কাজ করতো। হয়তো ওদের থাকতো একজন ভালোবাসার মানুষ, চমৎকার এক প্রেমিকা যাকে দেখে ওরা মানুষকে, জীবনকে ভালোবাসতে শিখতো!

আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা – রাজনীতিবিদ, সামরিক বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবিগণ – এদের প্রায় কারোর সন্তানই বিশ্বজিত, শাকিল, কিংবা, নাহিদের মতো অবস্থায় নাই। এর মানে তাঁরা ভালো করেই বুঝেন বিশ্বজিত, শাকিল, এবং নাহিদরা যেভাবে জীবন চালিয়েছে/চালাচ্ছে সেটা একটা অর্থবহ জীবন হতে পারেনা! তবে কেনো নিজের সন্তানদের নিরাপদে রেখে অন্যের সন্তানদের দিয়ে রাজনীতির নামে খুনাখুনি করানো হয়?

আমরা কি আমাদের সন্তানদের জন্যে রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেতে পারিনা? ফিরে পেতে পারিনা আমাদের ছেলেমেয়েদের?

সবচেয়ে বড় যে ভয় – এবং যেভাবে আমি এটাকে জয় করলাম

আমার উচ্চতাভীতি (Acrophobia) আছে। উঁচু দালানের ছাদের কিনারায় দাঁড়ালে পায়ের তলায় শিরশির করে, প্লেইন যখন টেইক অফ করে মাটি ছেড়ে উঠে যেতে থাকে তখন বুকের মধ্যে ধক করে উঠে। এরপরও যখনি কাউকে আকাশে স্কাই ডাইভিং করতে দেখি তখন প্রচন্ড ইচ্ছে হয় স্কাই ডাইভিং করার। এই ভিডিও দেখার পর কার আকাশে উড়তে ইচ্ছে না করবে?

কিন্তু প্রাণের মায়া সম্ভবত সবচেয়ে বড় মায়া, মৃত্যুভয় সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভয়! একটা চমৎকার উড়ন্ত প্লেইন থেকে কোন দুঃখে আমি শুন্যে ঝাঁপ দিতে যাবো?

কিন্তু একমাত্র মানুষই সম্ভবত আপাতদৃষ্টিতে দেখতে সবচেয়ে অযৌক্তিক কাজটি অবলীলায় করতে পারে। তাই গতো রোববার একটা চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে আমি আর আমার দুই বন্ধু মিলে যখন স্কাই ডাইভিং করতে রওয়ানা দিলাম তাতে অবাক হওয়ার কিছু ছিলোনা!

নিউ ইয়র্কে এখন গ্রীষ্মকাল প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আর মাস খানেক এর মধ্যে শরৎ/হেমন্ত চলে আসবে। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ছিলো চমৎকার একটা দিন। বাইরের তাপমাত্রা ছিলো ৭৫-৮০ ফারেনহাইটের মধ্যে। রৌদ্রজ্জ্বল দিন, আকাশে হালকা ছেঁড়া মেঘের ভেলা। আমার বন্ধুদের তাদের এপার্টমেন্ট থেকে গাড়ীতে তুলে নিলাম ঠিক ১১:৩০ এ। আমাদের গন্তব্য ক্যালভারটন নামক একটা শহর। ক্যালভারটন নিউ ইয়র্ক শহর থেকে ঘন্টা দেড়েকের ড্রাইভ। শহর ছেড়ে হাইওয়েতে উঠতেই মনটা ভালো হয়ে গেলো। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। ব্যাপারটা আমি আগেও খেয়াল করেছি, যখনি আমি কোনো বড় শহর ছেড়ে বের হয়ে যাই আমার খালি বুক ভরে নিশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। চারদিকের খোলা মাঠ, চনমনে বাতাস, মনের সাথে সাথে শরীরটাও কেমন যেন ফ্রেশ হয়ে যায়!

আমেরিকার হাইওয়েতে একবার এক্সিট ভুল করলে শাস্তি হিসেবে অনেক পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। আমার প্ল্যান ছিলো নর্দার্ন স্টেইট পার্কওয়ে ধরে অনেক দূর ড্রাইভ করে এরপর লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গন্তব্যে পৌঁছাবো। কিন্তু একটা এক্সিট মিস করার কারণে অনেক ঘুরাঘুরি করে যেয়ে উঠলাম সাউদার্ন স্টেইট পার্কওয়েতে। সাউদার্ন স্টেইট পার্কওয়ে ধরে অনেক দূর যাওয়ার পর লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ে তে উঠে যাই। এরপর মিনিট পনের বিভিন্ন লোকাল হাইওয়ে ধরে আমরা আমাদের গন্তব্য ক্যালভারটন শহরের এক কোণায় অবস্থিত ড্রপ জোনে (স্কাই ডাইভিং করার স্থানটিকে ড্রপ জোন বলা হয়) পৌঁছে যাই।

ড্রপ জোন যায়গাটা আসলে একটা এয়ারপোর্টকে ঘিরে স্কাই ডাইভিং এর আয়োজন ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা গাড়ী পার্ক করে অফিস বিল্ডিংয়ে ঢুকলাম চেকইন করার জন্যে। কাউন্টারের মেয়েটি দ্রুত চেকইন শেষ করে আমাদের একটা টিভির সামনে বসিয়ে দিলো। টিভিতে মিনিট পাঁচেক এর একটা ভিডিও দেখতে হবে যেটা আমাদের আজকের স্কাই ডাইভিং এর ট্রেইনিং। ভিডিওতে আমাদের ডাইভিং এর সময় কিভাবে হাত-পা ভাঁজ করে থাকতে হবে, জাম্প করার সময় কিভাবে গায়ে লাগানো জাম্প হারনেস এর স্ট্র্যাপ ধরে উপরের দিকে চেয়ে থাকতে হবে, ল্যান্ড করার সময় ইন্সট্রাকর এর কথা অনুযায়ী স্ট্যান্ড বা স্লাইড করতে হবে কিভাবে ইত্যাদি সবকিছু ডেমন্সট্রেইট করা হলো।

ভিডিও দেখা শেষে আমাদের “কোনো ধরণের দূর্ঘটনার জন্যে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়” টাইপের কাগজপত্র সই করতে হলো। এমনকি মৃত্যু হতে পারে, বা চিকিৎসা খরচ ইত্যাদি কিছুই দাবী করবো না বলে সই করতে হলো।

অবশেষে আমাদেরকে বলা হলো বাইরে যেয়ে অপেক্ষা করার জন্যে। যথাসময়ে আমাদের নাম ধরে ডাকা হবে বলে বলা হলো।

বাইরে অপেক্ষা করার যায়গাটায় এসে তো আমাদের আক্কেলগুড়ুম। একটু পরপর আমাদের সামনে এসে টুপ টুপ করে প্যারাশুট নিয়ে পড়ছে স্কাই ডাইভাররা। বিশেষ করে যারা অভিজ্ঞ স্কাই ডাইভার তার যেভাবে বিপজ্জনকভাবে প্রচন্ড গতিতে এসে ধুপ করে ল্যান্ড করছিলো তা দেখে আমার শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেলো! অবশ্য আমরা যেটা করছি সেটা হলো ট্যান্ডেম স্কাই ডাইভিং। আমি বা আমার বন্ধুরা কেউই একা জাম্প করবোনা। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের ইন্সট্রাকটরের গায়ের সাথে শক্ত করে বাঁধা থাকবো। আমাদের পুরো জাম্পের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ইন্সট্রাকটরের হাতে, আমাদের কাজ হলো শুধু জাম্প দেওয়া এবং আকাশে উড়ে বেড়ানো উপভোগ করা!

আমরা জানতাম স্কাই ডাইভিং এর জাম্পের জন্যে ডাক পেতে বেশ কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হয়। তাই আমাদেরকে যখন প্রায় দুই ঘন্টা পর ডাকলো আমরা খুব একটা অবাক হলাম না।

মাইকে আমাদের নাম শোনার পর আমরা জাম্প গিয়ার এর জায়গাটার দিকে এগিয়ে যাই। জাম্প গিয়ার মানে নানা রকম বেল্টে ঠাসা একটা জিনিস যেটা দিয়ে আমি আমার ইন্সট্রাকট্রের গায়ের সাথে আঠার মতো লেগে থাকবো। একজন আমাদের সবাইকে গিয়ার পরিয়ে দিলো। আমার ইন্সট্রাকটর উইনি এসে আমাকে একটা গগল (এক ধরণের চশমা) দিয়ে গেলো যেটা জাম্পের সময় আমাকে পরে থাকতে হবে প্রচন্ড বাতাস থেকে চোখকে বাঁচানোর জন্যে। এরপর আমার ভিডিও এবং ফটোগ্রাফার কেইট এসে আমার সাথে পরিচিত হলো। ও আমার ছবি এবং ভিডিওর দায়িত্বে থাকবে আকাশে। একজন মানুষের প্রতিদিনের কাজ ১৩,৫০০ ফুট উপরের আকাশে ব্যাপারটা ভাবতেই আমার গায়ে চমক খেলে যায়!

এরপর আমরা একে আমাদের প্লেইনের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ছোট, পুরনো, জীর্ণ-শীর্ণ একটা প্লেইন। আমার বন্ধু কৌতুক করে বললো – “এই ভাঙ্গা প্লেইন থেকে বাঁচার জন্যে হলেও আমাদের আকাশ থেকে ঝাঁপ দিতে হবে”! প্লেইন আস্তে আস্তে চলা শুরু করলো। ছোট একটা প্লেইন। যাত্রী সব মিলিয়ে জনা দশেক হবে। এর মধ্যে প্লেইনের একমাত্র দরজাটা হাট হয়ে খুলে আছে। জীবনে কোনোদিন প্লেইনের দরজা খোলা থাকতে দেখি নাই! আমি মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি – “একটু পর যখন আকাশে থাকবো তখন তো কোনো দরজাই থাকবেনা, সুতরাং দরজা খোলা কি বন্ধ সেটা কোনো ব্যাপার না”!

কিছুক্ষণ পর প্লেইনটা মাটি ছেড়ে আকাশে উঠা শুরু করলো। প্রায় ৪৫ ডিগ্রী কোণে প্লেইনটা উঠতে উঠতে যখন নিচের সবকিছু ছোট বিন্দুতে পরিণত হলো আমি আর আমার বন্ধু শাহেদ প্রায় একসাথে একে অপরের দিকে তাকালাম। দুইজনই প্রথমবারের মতো উচ্চতা দেখে একটু ভয় পেলাম। আর কিছুক্ষণ পর এখান থেকে শুন্যে লাফিয়ে পড়বো ভাবতেই একটা হিমশীতল স্রোত রক্তের সাথে বেয়ে গেলো। আমার ক্যামেরাম্যান কেইট আমার একটা ছবি তুললো, আমি নার্ভাস ভঙ্গিতে হেসে পোজ দিলাম।

প্লেইন ১৩,৫০০ ফুট (প্রায় আড়াই মাইল/সাড়ে চার কিলোমিটার) উপরে এসে স্থিত হলো। আমি লাইনে দ্বিতীয় জাম্পার। আমার আগে সারা গায়ে টাট্টু লাগানো টিংটিঙ্গে একটা আমেরিকান ছেলে লাফ দিলো। মুহুর্তের মধ্যেই সে এবং তার ইন্সট্রাকটর শুন্যে হাওয়া হয়ে গেলো। এরপর আমার পালা। কেইট আগে বের হয়ে দরজার বাইরে যেয়ে একটা হাতল ধরে দাঁড়ালো। সে ওখান থেকে আমার লাফ দেওয়ার মুহুর্ত ক্যামেরায় ধরবে। এরপর আমার ইন্সট্রাকটর এর ঈশারার সাথে সাথেই কেইট লাফ দিবে এবং সাথে সাথে আমরাও।

আমার ইন্সট্রাক্টর প্লেইনেই আমাকে তার শরীর এর সাথে খুব শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। সে আমাকে ঠেলে ঠেলে প্লেইনের দরজার সামনে নিয়ে আসলো। আমার প্রায় পুরো শরীর প্লেইনের বাইরে, আমার হাত আমার বুকে জাম্প হারনেস এর সাথে ধরে রাখা। ঠিক সেই মুহুর্তে আমি কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার ইন্সট্রাক্টর উইনি আমাকে সহ শুন্যে ঝাঁপ দিলো। কয়েক মুহুর্তের জন্যে আমার মনে হলো এটা কী হলো? আমি দুস্বপ্ন দেখার মতো পড়েই যাচ্ছি নিচে… কিন্তু পুরো ব্যাপারটা মাত্র তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ড স্থায়ী হলো। ততক্ষণে উইনি ছোট একটা প্যারাশুট (যাকে drogue বলে) ছেড়ে দিলো। এই ছোট প্যারাশুট এর কাজ হলো পৃথিবীর অভিকর্ষনজনিত ত্বরণকে বাধা দিয়ে আমাদের মোটামুটি ঘন্টায় ১২০ মাইল বেগের মধ্যে সীমিত রাখা। প্রাথমিক জাম্পের রেশ কাটতে না কাটতেই উইনি আমার হাত ধরে সামনে তাকাতে ইশারা দিলো। আমি সামনে তাকিয়ে দেখি কেইট এসে আমাদের সামনে আমাদের সমান তালে শুন্যে ভাসছে!

কেইটকে আমাদের পাশে শুন্যে ভেসে থাকতে দেখে মজা লাগলো। সে ঠিক আমাদের দশ ফুট নিচে থেকে আমাদের দিকে চেয়ে শুয়ে ছিলো। তার হাতে ক্যামেরা ছিলো, তাই সে আমার শুন্যে ভেসে থাকা শুট করার জন্যে আমাদের নিচে এসে বাতাসের কোলে শুয়ে ছিলো সারাক্ষণ!

স্কাই ডাইভিং না করার আগ পর্যন্ত যেটা মনে হতো – প্লেইন থেকে লাফিয়ে পড়ার পর প্রচন্ড গতিতে পড়ে যেতে থাকবো – আসলে ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম নয়। ছোট প্যারাশুট খোলার পর আমাদের গতি ছিলো ঘন্টায় ১২০ মাইল। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো একটা গাড়ীতে করে ১২০ মাইল বেগে চলতে থাকলে বাতাস এসে চোখে মুখে পড়লে যা হয়। প্রচন্ড বাতাস এসে আমার মুখে পড়ছিলো। নিশ্বাস নিতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছিলো। মুখ, ঠোঁটও শুকিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু আকাশে ভেসে থাকার আনন্দ এবং উত্তেজনার কাছে সেটা আসলে কিছু ছিলোনা!

ঠিক এই সময় হঠাৎ করে প্রচন্ড ঝাঁকি খেলাম। কিছুক্ষণের জন্যে একটু হতচকিত হয়ে গেলাম। পরে বুঝলাম আমরা ভূমি ৫,০০০ ফুট উপরে এসে গিয়েছি, তাই উইনি আমাদের মূল প্যারাশুট খুলে দিয়েছে। হঠাৎ করে গতি একেবারে কমে গেলো। আমি প্রথমবারের মতো ভালো করে চার দিকে তাকানোর সুযোগ পেলাম। নিচের সবকিছু ক্ষুদ্র খেলনার মতো লাগছিলো। দূরে লং আইল্যান্ড এর সমুদ্র তীর দেখা যাচ্ছিলো।

সঠিক যায়গায় ল্যান্ডিং এর জন্যে উইনি প্যারাশুটকে বেশ কয়েকবার ডানে বামে টেনে আমাদের গতিপথ পরিবর্তন করছিলো। এসময় দুএকবার প্রচন্ড ভয় লেগে গিয়েছিলো। ওই অনুভূতিটা ছিলো সত্যিকারের ত্বরণ জনিত টান (free fall) যেটা এমনকি প্যারাশুট খোলার আগেও ছিলোনা।

জাম্প করার প্রায় পাঁচ ছয় মিনিট পর উইনি খুব দক্ষভাবে এসে প্যারাশুটটাকে ল্যান্ড করালো। মাটিতে পা রেখে আমার মনে হলো – “অবশেষে আমি এটা করেছি”! কতোদিন ধরে স্কাই ডাইভিং করতে ছেয়েছিলাম, কিন্তু মূলত ভয়ের কারণেই এতোদিন করা হয়নি। কিন্তু আমার মনে হলো শুধুমাত্র এই ফালতু ভয়ের কারণে এতো উত্তেজনা এবং আনন্দময় একটা জিনিস থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবো এর কোনো মানে হয় না। অবশেষে আমার ইচ্ছে শক্তির কাছে আমার ভয় পরাজিত হয়েছে আর এমি এমন চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করলামঃ)

ভারতের বিএসএফ এর অমানবিকতা এবং আমাদের আত্মমর্যাদাহীনতা

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশের একজন যুবককে ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করেছে। এবং এই নির্যাতনের ভিডিওটি ভারতের এবং বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রকাশ হয়েছে। আমি কোনোভাবেই ভিডিওটি পুরো দেখতে পারিনি। একটা মানুষকে হাত-পা বেঁধে একদল অস্ত্রধারী মানুষ এভাবে পেটাচ্ছে – এই দৃশ্য আমি বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারিনি। ছোটবেলায় সাপকে মারার জন্যে দেখতাম আমাদের গ্রামের মানুষগুলো লাঠিসোঁটা নিয়ে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তো। বেচারা সাপ কিছুক্ষণ তেড়েবেড়ে একটু পড় একটা প্রাণহীন নিথর দেহে পরিণত হতো। বাংলাদেশী যুবকটির ভাগ্য ভালো, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাকে প্রাণহীন নিথর দেহে পরিণত করেনি।

মানুষের জীবনের প্রতি কতোটুকু ঘৃণা থাকলে কেউ কাউকে এভাবে পেটাতে পারে। বিএসএফ এর সেই জওয়ানগুলো নিশ্চয়ই তাদের নিজের দেশ ভারতের কোনো মানুষকে ধরে এভাবে পেটাতো না। কিংবা তারা কি কখনো পশ্চিমা কোনো দেশের সাদা চামড়ার কোনো মানুষকে এভাবে পেটাতো কোনোদিন? কোনো চীনা নাগরিককে? এমনকি ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানী কোনো যুবককে? যতো বড়ই অপরাধ করুক না কেনো সে যুবক?

বিএসএফ যেভাবে বাংলাদেশী মানুষজনদের ধরে মেরে ফেলে, কিংবা পিটিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়, তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় বাংলাদেশীদের তারা প্রায় মানুষই মনে করেনা। রাস্তার অপরিচিত কুকুরটিকে গুলি করে মেরে ফেলা যায়, জঙ্গলে সামনে পড়া সাপটিকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলা যায়, একদল পিঁপড়াকে দলিত মথিত করে মেরে ফেলা যায় নিমিষে। ভারতের বিএসএফ ঠিক সেই ব্যবহারটিই করে আমাদের সাথে।

কিন্তু কেনো বিএসএফ এমন করে আমাদের সাথে?

আমরা দেশে বসে যতোই মনে করিনা কেনো বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটা গুরুত্মপূর্ণ দেশ, কথাটা কিন্তু খুব একটা সত্যি না। বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা গুরুত্মপূর্ণ অবস্থানে তো নয়ই, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের আসলে তেমন কোনো গুরুত্মই নাই। বাংলাদেশের কোনো খবর বাইরে খুব বেশি গুরুত্ম সহকারে প্রকাশ পায়না, এবং বাংলাদেশকে মোটের উপর একটা অশিক্ষিত, পশ্চাদপদ, এবং দরিদ্র জাতি হিসেবেই বিবেচনা করা হয় বাইরের পৃথিবীতে।

আমরা ভেবে ভেবে সুখ পেতে পারি যে আমেরিকা, ভারত, ইজরায়েল, এবং বাকী পৃথিবী আমাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করে বসে আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাইরের পৃথিবীতে আমাদের নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই খুব একটা। প্রতিবেশি হিসেবে ভারতের কিছুটা মাথাব্যথা থাকতে পারে, কিন্তু সেই পর্যন্তুই। আমাদেরকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা নিয়ে ভারত বসে থাকলে তাদের বছর বছর জিডিপির হার ৭%-৯% হতো না। তারা নিজেদের স্যাটেলাইট, জঙ্গিবিমান, সুপার কম্পিউটার বানাতে পারতো না।

আর আমেরিকার কাছে বাংলাদেশ এতোই তুচ্ছ একটা দেশ যে আমাদেরকে নিয়ে কোনো সময় ব্যয় করাও আমেরিকার জন্যে সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার ধারণা বাংলাদেশকে নিয়ে আমেরিকার একমাত্র মাথাব্যথা হচ্ছে আমরা যেনো আত্মঘাতী জঙ্গি তৈরি করার একটা ঘাঁটি না হয়ে উঠি, যারা একদিন একটা বিমান নিয়ে যেয়ে আমেরিকার মাটিতে বিল্ডিং ধ্বংস করতে যাবে। এর বাইরে বাংলাদেশ এর কাছে আমেরিকার কী পাওয়ার আছে আমার ঠিক মাথায় ঢুকেনা।

আমি জানি নিজেদের সমালোচনা-দুর্বলতার কথা শুনতে কারোরই ভালো লাগার কথা না। অনেকেই আমার উপরের লেখাগুলো পড়ে আহত হবেন, ক্ষেপে যাবেন, কিংবা একমত হবেননা। কিন্তু আমি আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং চিন্তাভাবনা শেয়ার করলাম এখানে। পছন্দ না হলে সামনে আর পড়ার দরকার নেই, কারণ সামনে আরো আত্ম-সমালোচনা আছেঃ)

ধরুন, বিএসএফ ওই যুবককে না মেরে বাংলাদেশের কোনো সন্ত্রাসীকে মেরেছে। তাহলে কি আপনি এতো কষ্ট পেতেন? এতোটা ক্রুদ্ধ হতেন? খুব সম্ভবত হতেন। এবার বলেন, আমাদের র‍্যাব যখন বাংলাদেশীদের ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলে, গুলি করে লাশ ফেলে রাখে রাস্তায়, তখন আপনার কেমন লাগে? আপনি যদি র‍্যাব দ্বারা বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা সমর্থন করেন তাহলে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশীদের হত্যা সমর্থন করেন না কেনো?

ব্যাপারটা দেখা যাচ্ছে যে আপনি পিটিয়ে বা আইন বহির্ভূতভাবে মানুষকে হত্যা সমর্থন করেন, কিন্তু কে সেটা করলো সেটার দিকে খেয়াল করেন। বিএসএফ মারলে দোষ, কিন্তু র‍্যাব মারলে দোষ নয়?

২০০৬ এর ২৮শে অক্টোবর শিবির এর একটা ছেলেকে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করলো আওয়ামী লিগের লোকজন, আপনি (যদি আপনি আওয়ামী লীগ সমর্থক হোন আরকি) নিশ্চয়ই সেটা সমর্থন করেন? শিবির যখন রগ কাটে, কিংবা জামাতী রাজাকাররা যখন আমাদের বাংলাদেশীদের, কিংবা বুদ্ধিজীবিদের একাত্তরে হত্যা করেছিলো তখন ওরা নিশ্চয়ই কোনো মানবিকতা দেখায়নি। অতএব, এখন ওদেরকে অমানবিকভাবে মেরে ফেলার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ নেই?

ছাত্রলীগ এর সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোপাকুপি, খুনাখুনি দেখার পর মনে হয় না ছাত্রদল, কিংবা ছাত্র শিবির, কিংবা র‍্যাব-পুলিশ ধরে যদি এদেরকে পিটিয়ে মেরে ফেলতো আপনার (যদি আপনি বিএনপি কিংবা জামাত সমর্থন হোন আরকি) খুবই খুশি লাগতো। আচ্ছা বিএসএফ যদি ছাত্রলীগ এর এই সব গুন্ডাদের ধরে মেরে ওই যুবকের মতো পিটিয়ে মেরে ফেলতো তাহলে কি আপনার একই রকম খুশি লাগতো?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল সাইদি যুদ্ধাপরাধী নন বলার পর একদল তরুণ যখন তাঁর কক্ষ ভাংচুর করেছে, তখন অনেকে – বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সমর্থক লোকজন – এটাকে সমর্থন দিয়েছেন। একজন মানুষ যুদ্ধাপরাধী নন, এই মতামত দেওয়ার পর তার অফিস কক্ষ ভাঙ্গা তাদের কাছে কোনো অপরাধ নয়। এখানেও সেই একই যুক্তি – এইসব রাজাকার, আলবদরেরা যখন আমাদের বাংলাদেশীদের ধরে কচুকাটা করেছিলো তখন ওরাতো কোনো মানবিকতা দেখায়নি?

বিএনপির দ্বিতীয় দফা শাসনের সময় “অপারেশন ক্লিন হার্ট” নামে সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়া হয়েছিলো সাধারণ মানুষকে ধরে ধরে উত্তম মধ্যম দেওয়া, কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে পিটিয়ে মেরে ফেলার জন্যে। শফিক রেহমানের মতো মানুষেরা সেটার প্রশংসা করে বলেছিলেন সব যুদ্ধে কিছু “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” হয়। দেশের ভালো করতে গেলে কিছু মন্দ ঘটতেই পারে। অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় সেনাবাহিনী অসংখ্য সাধারণ মানুষকে ধরে নির্যাতন করেছে, রাস্তায় থামিয়ে অপমান করেছে, সন্তানের সামনে পিতাকে কান ধরে উঠবস করিয়েছে। মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলে পরে বলেছে হার্ট এটাকে সেই মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষেরা হাততালি দিয়েছি আমাদের সেনাবাহিনীর বীরত্ম দেখে।

ব্লগে, ফেইসবুকে আমাদের অসংখ্য মানুষকে (বিশেষ করে পুরুষ মানুষকে) দেখেছি হাসান সাইদ নামক পুরুষটিকে সমর্থন করতে, যে তার স্ত্রী রুমানার নাক কামড়ে ছিড়ে ফেলেছিলো, চোখ অন্ধ করে দিয়েছিলো। কেনো সেই মানুষগুলো হাসান সাইদকে সমর্থন দিয়েছিলো? কারণ রুমানার নাকি এক ইরানী যুবকের সাথে প্রেম ছিলো। অন্য পুরুষের সাথে প্রেম এর শাস্তি হচ্ছে নাক ছিঁড়ে ফেলা, চোখ ঘুঁটে অন্ধ করে দেওয়া! এবং এই মানুষগুলো দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল, অর্থনীতি, রাজনীতি, ইত্যাদি পড়ুয়া ছেলেমেয়ে!

আমরা আমাদের রিকশাওয়ালাদের পাঁচ টাকার জন্যে মার দিই, গালি দিই। আমাদের ঘরের কাজের লোকজনের সাথে আমরা কৃতদাসের মতো ব্যবহার করি।

আমাদের রাস্তা দিয়ে মেয়েরা হেঁটে যেতে পারেনা। কয়েক’শ চোখ তাকে ধর্ষণ করে বেড়ায়। অসংখ্য মুখ তার সম্পর্কে বাজে, রসালো মন্তব্য করে। এবং এই ধর্ষণকারী চোখগুলি, মুখগুলি আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া তরুণ।

তো বিএসএফ এর এক বাংলদেশী যুবককে নির্দয়ভাবে পেটানোর সাথে আমাদের দেশের এইসব অমানবিকতার সম্পর্ক কী?

সম্পর্ক হচ্ছে আমরা যদি আমাদের নিজেদের মর্যাদা না রাখতে পারি, আমরা যদি বাংলাদেশী হয়ে অন্য বাংলাদেশীদের এতো নির্দয়ভাবে মারতে পারি, পেটাতে পারি, ধর্ষণ করতে পারি, উত্যক্ত করতে পারি, র‍্যাব-সেনাবাহিনী দিয়ে পেটাতে পারি, এবং এতোকিছুর পর আমাদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কারণে সেই অমানবিকতা, নিষ্টুরতা, নির্দয়তা, অসভ্যতা সমর্থন করতে পারি, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা একটা আত্মমর্যাদাহীন, আত্মসম্মানহীন জাতিতে পরিণত হবো এবং সেটা আমরা হচ্ছি।

আমরা যদি আমাদের নিজেদের মর্যাদা নিজেরাই না রাখতে পারি, তাহলে বিএসএফ কি আমাদের সেই মর্যাদা দিবে?

আমি কিন্তু এখানে বিএসএফ এর এই আচরণকে সমর্থন করছিনা, আমি ওদের এই আচরণের কারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি মাত্র।

বিএসএফ কখনো আমেরিকার একজন নাগরিককে এভাবে পেটাবেনা। কারণ আমেরিকা নিজেদের মর্যাদা রাখার চেষ্টা করে এবং ভারতের এই আচরণের সাথে সাথে ভারত সেটার দাঁতভাঙ্গা জবাব পাবে।

আমেরিকা নিজেদের মাটিতে কাউকে অমানবিক নির্যাতন করতে পারেনা বলে (আইনের কারণে) কিউবার গুয়ানতানামোতে নিয়ে বিদেশীদের সাথে এই নিষ্ঠুর, নির্মম আচরণ করে। (ভাগ্যিস ওবামা এসে মানুষ নির্যাতনের এই কল বন্ধ করে দিয়েছে)।

যতোদিন আমরা নিজেরা নিজেদেরকে সম্মান দেওয়া শিখবোনা, আমার ধারণা বিএসএফও ততোদিন আমাদের সাথে এমন আচরণ করে যাবে।

আমরা যদি একটা মর্যাদাবান যাতি হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারি, আমরা যদি নিজেরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত-র‍্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনী-ছাত্রলীগ-ছাত্রদল-ছাত্র শিবির-সাধারণ মানুষ সবাইকে যদি আইনের শাসনের আওতায় নিয়ে বিচার করি, তাহলেই আমরা একটা চমৎকার সমাজ এবং জাতি গড়তে পারবো।

পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসনের একটা দেশ উন্নত হতে খুব বেশিদিন লাগেনা। এবং আমরা একটা উন্নত দেশ হতে পারলে বিএসএফ আমাদের যুবকদের ধরে নিয়ে পেটানোর পরিবর্তে একজন আমেরিকান নাগরিকের মতো ব্যবহার করবে। আর যদি সেটা না করে তবে বিএসএফকে একটা শক্ত পিটুনী দেওয়ার মতো শক্তিও তখন আমাদের থাকবে। আমাদের সশস্ত্রবাহিনী তখন অপারেশন ক্লিন হার্ট এবং ক্রস ফায়ার বাদ দিয়ে একটা সত্যিকারের শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হবে, যারা সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের সাথে ব্যাটাগিরি না দেখিয়ে ভারতের মতো দেশের সাথে ব্যাটাগিরি দেখানোর সামর্থ্য রাখবে। আর আমাদের তরুণ-তরুণীরা ব্লগে-ফেইসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়াও বাংলাদেশে ভারতের মতো পারমানবিক শক্তি-স্যাটেলাইট-জঙ্গিবিমান-সুপারকম্পিউটার তৈরির জন্যে মেধাবী হওয়ার জন্যে কাজ করবে।

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.